মৃত্যু এত সহজ!
১৩ জুন ২০২৫ ০৮:৩২
॥ হাফসা সারোয়ার ‘রুনি’ ॥
আমাদের পাঁচ ভাই-বোনের ছিল এক মধুময় জীবন। আব্বাকে আমরা ভয় পেতাম। হয়তো সম্মানবোধের জায়গা থেকে একটু দূরে দূরে থাকতাম। তবে তিনি কোনোদিন গায়ে হাত তুলেছেন মনে পড়ে না। ব্যক্তিত্ব ছিল তার অসাধারণ তবে কেন জানি না ভয় পেতাম। আমরা বোনেরা যখন বড় হলাম, ঘর সংসার হলো, এই আব্বাই তখন আমাদের বন্ধুর মতো হয়ে গেলেন। আমার মনে আছে আমি যখন প্রথম শ্বশুর বাড়ি যাই তখন আব্বাকে ছেড়ে যেতে আমার প্রাণটা ভেঙে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল আব্বাকে মনে হয় হারিয়ে ফেলছি, আগের মতো আর পাবো না। এ দুঃখ আজও মনে পড়ে।
অথচ আম্মার সাথে আমাদের ছিল প্রাণের সম্পর্ক। ছোটবেলায় আম্মার গলা ধরে কত যে গল্প শুনতাম, তার জীবনের কথা এমনভাবে বলতেন মনে হতো সব এখন ঘটছে। একটু বড় হয়ে বুঝলাম তিনি গভীর জ্ঞানের অধিকারী। তিনি প্রচুর বই পড়তেন। বই ছাড়া আম্মাকে কখনো দেখিনি। তিনি আমাদের সম্মান করে পরম স্নেহে বড় করেছেন।
আমরা বড় তিন বোন, আমার পরই দুই ভাই নিয়াজ মাখদুম আর স্নেহের সাইফুল্লাহ মানসুর। আমার সবচেয়ে ছোট ভাই কবি সাহিত্যিক মানুষ, অসাধারণ তার কণ্ঠ। যখনি কাছে পাই মুগ্ধ হয়ে তার গান শুনি। তার চমৎকার একটা হৃদয় আছে। তার পরিশীলিত বোধ এবং দয়া অনেককে স্পর্শ করে। তাই আপনজনের কঠিন মৃত্যু সম্মুখে দেখা তার জন্য কষ্টদায়ক ছিল। তার আকাক্সক্ষা ছিল কোনো প্রিয়জনের মৃত্যু যেন সে না দেখতে পায়।
কিন্তু আমার আকাক্সক্ষা একটু অন্য আঙ্গিকে। আব্বা হঠাৎ করে অনেক অসুস্থ হয়ে গেলেন, ব্রেইন স্ট্রোক করলেন। হলি ফ্যামিলিতে ভর্তি, যথাসাধ্য সেবা-যত্ন করছি কিন্তু হঠাৎ তিনি আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেলেন, যখন আমি কাছে ছিলাম না। এরপর অনেক মৃত্যু হয়েছে নিকটজনদের কিন্তু কোনো মৃত্যুই আমি দেখিনি। আমি প্রায়ই ভাবতাম, মৃত্যু কীভাবে হয়! মৃত্যু কেমন! সেটা কি অনেক কঠিন! এক সময় আল্লাহর কাছে মনে মনে চাইলাম আমি যেন কোনো আপনজনের মৃত্যু দেখতে পাই।
কিছুদিন পর বাংলাদেশ বিমানে লন্ডন যাচ্ছি। পাশে ছিল এক ভদ্রলোক বয়স সত্তরের মতো হবে। সিলেটি মানুষ লন্ডনে যাচ্ছেন মেয়ের বিয়েতে। দুপুরের খাবার দেয়া হয়েছে, ভদ্রলোকটি দু-তিন চামচ খেয়েছেন এবং হঠাৎ মাথা উপরে তুলে এক দৃষ্টিতে তাকালেন এবং এক মিনিট পরে মাথাটা ঝুঁকে দিলেন। তারপর ডাক্তার আসলেন এবং দেখে বললেন তিনি আর নেই। আমি অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে ভাবলাম মৃত্যু এত সহজ! অথচ মানুষ মাসের পর মাস হাসপাতালের বেডে পড়ে থাকে মৃত্যুর অপেক্ষায়।
এরপর ঘটে জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়ের ঘটনা। পরম শ্রদ্ধেয়া আম্মা সুস্থই ছিলেন। আম্মা কুরআনের হাফেজা হওয়ায় এ বয়সেও ব্রেইন ছিল প্রখর। আমরা উনার পরামর্শ নিতাম। মৃত্যুর আগে একেবারে ভালো আমার হাতে খাবার খেলেন, ছেলেমেয়েকে ডেকে কথা বললেন, নসিহত করলেন এরপর আমার পাশে শুয়ে ডানে ফিরে পাঁচ সেকেন্ডে চলে গেলেন। আমি বুঝতেই পারিনি মৃত্যু এতটাই সহজ!
তিনি জীবনে যা চেয়েছেন সব পূরণ হয়েছে। তিনি রোগমুক্ত সহজ মৃত্যু চাইতেন। দোয়ার যে কত শক্তি সেটা আম্মার ক্ষেত্রে দেখেছি। আম্মার মেঝজামাই ‘মামুন আল আযামী’ অনেক বছর পর আম্মার মৃত্যুর দিনই বাসায় এলেন। আম্মাকে পরম শ্রদ্ধা করতেন। বলতেনÑ ‘মা’ আমি আপনার ছেলে অন্যরা জামাই। সাইফুল্লাহ মানসুর দেশে আসার কথা, ফজরে এসে পৌঁছল শেষ রাতে আম্মা ইন্তেকাল করলেন। আম্মাকে কাছে পেল, কি যে মিরাক্যাল!
আম্মার এক আকাক্সক্ষা ছিল সব সময়ই বলতেন আমার বড় ছেলে আলেম, সে আমার জানাযা পড়াবে। নিয়াজ সুদূর আমেরিকায় থাকে, ভাবছি কি করে সম্ভব! পরের দিন ভোর ছয়টায় এসে হাজির। বলেÑ আপু কি করে যে টিকিট পেয়েছি, আল্লাহ সব সহজ করেছেন। বাদ জোহর বায়তুল মোকাররমের বিশাল জানাযায় সে ইমামতি করেছে। আল্লাহ মেহেরবান আম্মার আশা পূর্ণ হয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ।
এমন মায়ের পেটে জন্ম নিয়ে ধন্য আমার জীবন! ধন্য আমার হৃদয়! এমন ‘গুণী’ মায়ের কথা লিখতে গিয়ে বহুবার চোখ মুছেছি। আল্লাহর পথে সমর্পিত, নিবেদিতপ্রাণ আমার ‘মা’ অতি সহজে আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেলেন।
পবিত্র রমজানে মালয়েশিয়ায় এসেছি ভাইয়ের বাসায়। ভাইকে ডেকে বললাম, ভাইয়ুÑ আমাদের মনের আকাক্সক্ষাকেই আল্লাহ কবুল করেছেন। স্রষ্টার কাছে এখন একটাই চাওয়া পৃথিবীতে সমৃদ্ধ জীবন এবং ঈমানের সাথে সহজ মৃত্যু। আমিন।