প্রত্যাশা সৎ, যোগ্য, দুর্নীতিমুক্ত নেতৃত্ব


১৩ জুন ২০২৫ ০৮:১৯

॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
ঈদুল আজহা কয়েকদিন আগেই শেষ হলো। বাংলাদেশসহ দুনিয়ার সব দেশে ১ দিনের ব্যবধানে ঈদুল আজহা পালিত হলো। মুসলমানদের আদি পিতা হযরত ইবরাহিম আ. ও তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাঈল আ.-এর ত্যাগের কথা স্মরণ করে প্রতি বছরের জিলহজ মাসের ৯ তারিখ হজযাত্রীরা আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করেন। পরের দিন ১০ জিলহজ পশু কুরবানির প্রথা ইসলামের প্রথম যুগ থেকেই মুসলমানদের মধ্যে চালু হয়ে আসছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সৌদি আরবে জিলহজ মাসের ৯ তারিখ ছিল বৃহস্পতিবার। আরাফাতের ময়দানে গোটা দুনিয়ার মুসলিম, নারী-পুরুষ লাব্বায়িক আল্লাহুম্মা লাব্বায়িক ধ্বনিতে হাজির হয়েছিল। নামিরা মসজিদে জোহর ও আসর এক সাথে আদায় করে মাগরিব পর্যন্ত অপেক্ষা করে আরাফাত ময়দানের অদূরে মিনায় এসে তারা মাগরিব ও এশার নামাজ একসাথে আদায় করেন। ফজরের পর শয়তানকে পাথর মেরে ঘরে এসে পশু কুরবানি করে চুল, নখ, কেটে হজের প্রাথমিক কাজ শেষ করেন।
আমরা শনিবার বাংলাদেশে ঈদের মাঠে বা মসজিদে দুই রাকাতের ওয়াজিব ঈদের নামাজ পড়ার জন্য নারী-পুরুষ, ছেলেমেয়ে সবাই দলে দলে হাজির হয়ে নামাজ আদায় করে এবং খুতবা শুনে একে অপরের সাথে কোলাকুলি করে বাসায় ফিরে যার যার সাধ্যানুযায়ী পশু কুরবানি করেছি।
আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে গ্রামে কুরবানি করার যে প্রচলিত প্রথা চালু রয়েছে এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তাছাড়া বর্তমানে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার দশ দিনের লম্বা ছুটি মঞ্জুর করেছিল। ফলে দেশগ্রামে যাওয়ার সংখ্যা বেড়েছে। ট্রেনের ছাদ, লঞ্চের ডেকে গাদাগাদি করে গ্রামে গেছে মানুষ। সড়ক পথ ভালো হওয়ার কারণে বাস ও নিজস্ব গাড়িসহ মানুষ তাদের গন্তব্যে পৌঁছেছে। গোটা দেশেই আনন্দের বন্যা বয়ে গেছে।
এবারে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস আদা-রসুন, পিঁয়াজ, কাঁচামরিচ, মশলা জাতীয় সব জিনিসেরও দাম ক্রেতাদের আয়ত্তে ছিল। পশুর দামও স্বাভাবিক ছিল। প্রতিবেশী ভারত থেকে গরু না এলেও দেশীয় খামারিরা ছোট-বড় গরু সরবরাহ করতে সক্ষম হয়েছে। যা দেশের অর্থনীতির জন্য শুভ সংবাদ। আবার প্রমাণ হলোÑ যদি সরকার এবং জনগণ দেশের স্বার্থে কাজ করে তাহলে আমরা ইচ্ছা করলেই আমাদের প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে পশু এবং দুধ আমাদের দেশেই উৎপাদন করতে সক্ষম।
আমি নিজে ঢাকায় ঈদের নামাজ ও কুরবানি করে রাতেই নিজ এলাকা পাবনায় চলে যাই। বন্ধুবর মাওলানা ইকবালের বাসায় সুস্বাদু নাশতা খেয়ে শিক্ষাজীবনের প্রথম দশ বছর যে বেড়া উপজেলায় কেটেছিল, সেখানে জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে জমজমাট ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছি। বেড়া পৌর ভবনের বিশাল অডিটোরিয়ামে সভায় পাবনা জেলা আমীর ও বেড়া সাঁথিয়ার আগামী সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী ব্যারিস্টার নাজিব মুমিনসহ আশপাশের কয়েকটি সংসদীয় এলাকার প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। মুহুর্মুহু স্লোগান উঠছিল সব দল দেখা শেষ, এবার ভোট দেব সৎ, যোগ্য, চরিত্রবান লোক দেখে।
ইতোমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে জোট সরকারের দুইজন মন্ত্রী শহীদ মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ পাঁচ বছর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় চালিয়ে সততা ও যোগ্যতার প্রমাণ রেখে গেছেন। অথচ তাদেরকেই মিথ্যা অভিযোগে হাসিনা ও তার অনুগত বিচার বিভাগ ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে। এটা দুনিয়ায় বিরল ঘটনা। বর্তমানেও ইউনিয়ন-চেয়ারম্যান-মেম্বার থেকে শুরু করে সংসদ সদস্য নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী সৎ ও যোগ্য লোক তৈরি করে রেখে গেছেন। আমরা দেখেছি ৫ আগস্টের বিপ্লবের পর শত সুযোগ আসলেও জামায়াতের নেতা-কর্মীরা হাটঘাট, বাজারে চাঁদাবাজি, দখলবাজিতে যোগ দেয়নি। অতীতে আওয়ামী লীগের লোকদের খাওয়া হাটবাজার বিএনপির লোকেরা দখলে নিয়েছে এবং চাঁদাবাজির মহোৎসবে জনগণের ন্যায্য পাওনা চাঁদাবাজি ছাড়া চলতে পারছে না।
এছাড়া দলের নেতারা এ চাঁদাবাজির সিলসিলা আইনগত বৈধতা দেওয়ার জন্য দ্রুত সংসদ নির্বাচনের জিকির তুলেছে, যা অধিকাংশ জনগণ মানে না। জনগণ চায় অতি দ্রুত জুলাই সনদ তৈরি করে এর ওপর গণভোট দিয়ে জনগণের ম্যান্ডেট কার্যকর করা। যাতে করে কোনো দলীয় সরকার এসে জুলাই সনদের কাটছাট করতে না পারে।
অতীত সরকারের ফেলে যাওয়া স্থানীয় প্রশাসনে কোনো নির্বাচিত সদস্য উপস্থিত নেই। সবাই পালিয়ে বেড়াচ্ছে। ফলে অতি সত্ত্বর স্থানীয় নির্বাচন দিয়ে জনগণের প্রত্যাশিত সৎ, যোগ্য জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করার সুযোগ দিন। স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই প্রকৃতপক্ষে এলাকার আইনশৃঙ্খলা থেকে শুরু করে জনগণের অভাব-অভিযোগ মিটিয়ে থাকেন। সংসদ সদস্যরা দেশের আইন প্রণয়নের কাজ করেন।
সর্বক্ষেত্রেই মানুষের চাহিদা সৎ, যোগ্য, নৈতিকতাসম্পন্ন নেতার। তারা দল-মত, মার্কা ভেদে ভালো মানুষেরই শাসন কায়েমের প্রত্যাশা করছে। জুলাই বিপ্লবের সরকার অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত সরকার গত ১০ মাসে উল্লেখযোগ্য যেসব কাজ করেছে তার মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থায় সিন্ডিকেট প্রায় ভেঙ্গে দিয়েছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসের দাম কমে এসেছে। জ¦ালানি তেলের দাম বাড়েনি বরং কিছু কমেছে। সড়কপথে চাঁদাবাজি অনেকটাই কমে এসেছে। চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে। যা করতে পারলে দেশের অভূতপূর্ব কল্যাণ সাধিত হবে। আমরা এ উদ্যোগের সাফল্য চাই।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস একজন নোবেল বিজয়ী মানুষ। আমাদের দেশে এ মানের একমাত্র ব্যক্তি। যাকে পতিত সরকার জেলে ভরিয়ে মেরে ফেলার পাঁয়তারা করছিল। মহান আল্লাহ তায়ালা জুলাই বিপ্লব ঘটিয়ে হাসিনাকে দেশ থেকে পালানোর ব্যবস্থা করে ড. ইউনূসকে দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় বসানোর ব্যবস্থা করেছেন। তিনি ক্ষমতায় এসে দেশকে খাদের কিনারা থেকে উপরে উঠানোর চেষ্টা করছেন। দেশে দেশে ড. ইউনূসের সফর করার ফলে জাপান, চীন, আমেরিকা, যুক্তরাজ্য সবাই বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বিদেশে বসবাসরতরা নির্দ্বিধায় তাদের টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠানোর কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েই চলেছে। যা দেশের জন্য ইতিবাচক। পতিত সরকারের চুরি-চামারি ও লুটের কারণে দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছিল। তাদের সহযোগীরা দেশের টাকা বিদেশে পাঠিয়ে, ব্যাংক লুট করে অর্থনীতির বারোটা বাজিয়ে দিয়েছিল। ড. ইউনূসের সরকার লুটপাট বন্ধ করেছে। বিদেশে টাকা পাচার বন্ধ করেছে। এবং বিদেশে পাঠানো টাকা ফেরত আনার চেষ্টা চলছে।
জুলাই বিপ্লবের পূর্বে দিনে-দুপুরে ঠাণ্ডা মাথায় ছাত্র-জনতাকে গুলি করে হত্যা করেছে। আয়নাঘরে সামরিক ও বেসামরিক লোকদের অমানুষিক নির্যাতন করেছে। বছরের পর বছর ৩ী৩ ফুট জায়গায় না খেয়ে, অর্ধখেয়ে জীবন-যাপন করতে বাধ্য করেছিল। তাদের কুশীলবদের বিচার শুরু হয়েছে। দ্রুততম সময়ে বিচারকার্য শেষ করে প্রকাশ্য দিবালোকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলাতে হবে।
বিএনপি ছাড়া সব রাজনৈতিক দল, ছাত্র-জনতা হাসিনা সরকারের দোসরদের বিচারের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার পক্ষে। আমরা চাই বর্তমান সরকার তাদের প্রধান কাজ বিচারকার্য দ্রুত এগিয়ে নিবে। বিভিন্ন বিভাগের সংস্কারের কাজ যৌক্তিক সময়ের মধ্যে শেষ করে জুলাই সনদের ওপর গণভোট, স্থানীয় নির্বাচন শেষ করে সংসদ নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হোক।
জনগণ ৫৪ বছর বিভিন্ন দলীয় সরকার দেখেছে। বাকশালী সরকার দেখেছে, স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের অব্যবস্থাপনা দেখেছে, লুটপাট, চাঁদাবাজি, টাকা পাচারকারী, ব্যাংক ডাকাতির সরকার দেখেছে। জুলাই বিপ্লবের পর গঠিত এ সরকারের মাধ্যমে সর্বস্তরে সৎ, যোগ্য, দেশদরদি নেতা বানাতে চায়। এ ক্ষেত্রে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভালো মানুষের সরকার দেখতে চায়। এজন্য ড. মুহাম্মদ ইউনূস সাহেবকে আমরা সমর্থন দিয়ে তার হাতকে শক্তিশালী করে সামনের দিনগুলো পার করতে চাই।
অতীত সরকারের দোসররা প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় এখনো ঘাপটি মেরে অবস্থান করছে। তাদের ইন্ধনে মাঝে মধ্যেই বিভিন্ন ইস্যু দাড় করিয়ে সচিবালয় অচল করে এ সরকারকে বিভিন্নভাবে সংকটে ফেলার অপতৎপরতা চালাচ্ছে। এসব অপতৎপরতা কঠোর হস্তে দমন করতে হবে।
বিএনপির নেতাদের বলব, আপনারা শহীদ জিয়াউর রহমানের গড়া বিএনপিতে ফিরে আসুন। তিনি ডান-বাম, ইসলামী দলগুলোর সাহায্য-সহযোগিতায় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। আজকে বিএনপির যেসব নেতা বড় বড় কথা বলছেন, তারা কিন্তু গত ১৬ বছরে আন্দোলন করে তাদের নেত্রী বেগম জিয়াকেও মুক্ত করতে পারেননি। তাদের বড় বড় আইনজীবী থাকতেও আইনের লড়াই করে তাদের নেতা-নেত্রীদের মুক্ত করতে পারেননি। এমনকি বেগম খালেদা জিয়ার বাড়ির সামনে থেকে একটি বালুর ট্রাকও সরাতে পারেননি।
জুলাই বিপ্লবের পর ছাত্র-জনতার ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকার এসে বিএনপি জামায়াতসহ সব দলের হাজার হাজার নেতা-কর্মীদের মুক্ত করে দিয়েছেন। মামলার নিষ্পত্তি করেছেন। অতএব বেশি বাড়াবাড়ি না করে সরকারকে ভালো কাজে সহযোগিতা করুন, দেশকে এগিয়ে নেয়ার কাজে শরিক হন।
প্রতিবেশী দেশ ভারত সরকার এ দেশকে অস্থিতিশীল করার সব চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। গত ৫৪ বছরে ব্যবসা-বাণিজ্য, আন্তঃনদীর পানি সরবরাহ থেকে শুরু করে সবকিছুই নিয়ে গেছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। শুধু তাই নয়, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, শেখ মুজিবুর রহমান, শহীদ জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর জন্যও ভারতই দায়ী। দেশের মধ্য দিয়ে তাদের সেভেন সিস্টারে অবাধে রেল, সড়ক পথ সবকিছু ব্যবহারের পাঁয়তারা করছিল। বিদ্যুৎ সরবরাহ থেকে শুরু করে সব ব্যবসার ক্ষেত্রে তাদের আধিপত্য বজায় রেখে সব চুক্তি সম্পাদন করেছিল। পতিত আ’লীগ সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করেছিল। যা সবই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ছিল।
বর্তমানে ছাত্র-জনতার বিপ্লবের সরকার অনেক অসম চুক্তি বাতিল করেছে। নিজেদের সক্ষমতা বাড়িয়ে সিলেট, চিটাগাং বিমানবন্দর দিয়ে রফতানি বাণিজ্যের দ্বার উন্মোচন করেছে। আমাদের বিশ্বাস আমরাই আমাদের দেশ চালাতে পারব, ইনশাআল্লাহ। আমরা যদি ইউনিয়নের মেম্বার থেকে শুরু করে চেয়ারম্যান, মেয়র, সংসদ সদস্য- সৎ, যোগ্য, চাঁদাবাজমুক্ত লোকদের নির্বাচিত করতে পারি তাহলে এ দেশ উন্নয়নের উচ্চশিখরে পৌঁছাতে পারবে। আমাদের দেশের মাটি, পানি, সমুদ্রবন্দর এবং জনসম্পদ সবই উন্নয়নের অনুকূল। শুধু দরকার সৎ, যোগ্য নেতৃত্ব। আমরা আগামীতে এ নেতৃত্বের আশায় রইলাম।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : rnabi1954@gmail.com