কুরবানির ঈদ
৪ জুন ২০২৫ ১২:৪৫
॥ শরীফ আবদুল গোফরান ॥
আচ্ছা বল তো, ত্যাগের মহিমা কী? ত্যাগের মহিমা ছাড়া দুনিয়ায় বড় কিছু করা যায় না। মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইবরাহীম (আ.) ও হযরত ইসমাঈল (আ.) ত্যাগের যে মহিমা দেখিয়েছেন, কেউ কি আর তা দেখাতে পারবে? বিশ্ব ইতিহাসে এ ঘটনার অন্ত নেই। কিন্তু এমন ধরনের চমকপ্রদ ঘটনা আর দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া যাবে না। মনকাড়া হৃদয়স্পর্শী তুলনাহীন ঘটনা আর ঘটবে কিনা, তাও জানি না। আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের কাহিনী বিশ্ব ইতিহাসে অনেক রয়েছে। কিন্তু এমন নিখাদ পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণের কাহিনী দ্বিতীয়টি তোমরা খুঁজে পাবে না।
ত্যাগের মহিমায় আমাদের অতীত সত্যি সমুজ্জ্বল, আলোকিত, প্রাণবন্ত। তবু আমরা কাল বা সময়কে আলোকিত করতে পারিনি।
ত্যাগ শুধু ত্যাগই নয়, আল্লাহর পথে ত্যাগ। আল্লাহর পথে ত্যাগ বা কুরবানি ছাড়া মানবতার মুক্তি পাওয়া যায় না। আমরা যে গরু কুরবানি করি, এ গরুর চামড়া, পশম বা গোশত কিছুই আল্লাহর কাছে পৌঁছাবে না। আল্লাহর কাছে পৌঁছাবে আমাদের ত্যাগ। আল্লাহর দেখানো পথে ত্যাগ স্বীকার করলে দুনিয়ায় শান্তি নেমে আসবে, আখিরাতেও মুক্তি পাওয়া যাবে। এ পথ ভোগের পথ নয়, কুরবানির পথ। যার সাধ্য ও সামর্থ্য যত বেশি, সে তত বেশি কুরবানি করবে। এ কুরবানির ফলে দুনিয়ার জীবন থেকে অশিক্ষা, কুশিক্ষা, কুসংস্কার, দরিদ্রতা, অনাচার, অবিচার দূর হয়ে যাবে। দুনিয়ার জীবনটা শান্তি সুষমায় ভরে উঠবে।
কুরবানি করার অর্থ নিজের স্বার্থ ত্যাগ করা। আমরা যদি নিজ নিজ স্বার্থ ত্যাগ করি, তাহলে প্রকারান্তরে অন্যদের স্বার্থও সংরক্ষিত হবে। সুতরাং একজনের ত্যাগের মাধ্যমে আরেকজনের প্রাপ্তি। এ প্রাপ্তিযোগই দুনিয়ার মানুষকে দরিদ্রতা, অজ্ঞতা ও মূর্খতা থেকে মুক্তি দিতে পারে।
আমরা কুরবানির গোশত ভাগ করে নিজের পরিবার, দীনদরিদ্র, আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যে ভাগ করে থাকি। আমাদের সমস্ত মেধা, উদ্যোগ, শ্রম ও সম্পদ যদি কুরবানির গোশতের মতো ভাগ করে বিতরণ করতে পারি, তবেই সম্পদের বিকেন্দ্রীকরণ হবে। তাহলেই তো সমাজে হানাহানি, মারামারি, হিংসা-বিদ্বেষ থাকবে না। আমার মনে হয়, এটাই হওয়া উচিত কুরবানির শিক্ষা। হযরত ইবরাহীম (আ.) ও ইসমাঈল (আ.) সর্বশ্রেষ্ঠ ত্যাগের মাধ্যমে আমাদের জন্য এ শিক্ষাই রেখে গেছেন। আসলে এ শিক্ষাটাই সবার আগে আমাদের বোঝা উচিত। আর তা বুঝতে হলে আমাদের জানতে হবে কুরবানির কাহিনী। এবার কুরবানির কাহিনীটা কী আমরা তা জানার চেষ্টা করি।
হযরত মুহাম্মদ (সা.) হলেন আমাদের শেষ নবী। কিন্তু তাঁর আগে পৃথিবীতে এসেছিলেন অনেক নবী। এদের একজনের নাম ছিল হযরত ইবরাহীম (আ.)। এক রাতে হযরত ইবরাহীম (আ.) স্বপ্নে দেখলেন, আল্লাহ তাকে লক্ষ করে বলছেন, ‘ইবরাহীম কুরবানি করো।’ পরদিন সকালে তিনি কয়েকটি দুম্বা কুরবানি করলেন। কিন্তু দ্বিতীয় রাতেও তিনি আবার স্বপ্নে দেখলেন, আল্লাহ তাকে বলছেন, ‘ইবরাহীম কুরবানি করো।’ পরদিন সকালে তিনি একশ’ উট কুরবানি দিলেন।
তৃতীয় রাতে তিনি আবার স্বপ্নে দেখলেন, আল্লাহ বলছেন, ‘ইবরাহীম! তোমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস কুরবানি করো।’ ঘুম থেকে উঠে ইবরাহীম (আ.) মহাভাবনায় পড়ে গেলেন। সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কী হতে পারে? অনেক ভাবলেন। তারপর দেখলেন পুত্র ইসমাঈল ছাড়া তাঁর কাছে প্রিয় আর কিছু নেই। আল্লাহ নিশ্চয়ই ইসমাঈলকে কুরবানি করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ছেলেকে ডাকলেন- স্বপ্ন এবং আল্লাহর ইচ্ছার কথা খুলে বললেন। বাবার মুখে আল্লাহর ইচ্ছার কথা শুনে ইসমাঈল (আ.) বললন, ‘বাবা আমি রাজি। আপনি আল্লাহর হুকুম পালন করুন।’ হযরত ইবরাহীম (আ.) তখন ছেলেকে নিয়ে জনমানবহীন এক জায়গায় গেলেন। ছেলের হাত, পা, চোখ বেঁধে দিলেন। তারপর ধারালো ছোরা ছেলের গলায় চালাতে লাগলেন। হঠাৎ দৈব শব্দ শুনতে পেলেন। সামনে-পেছনে তাকালেন, কিন্তু কাউকে দেখতে পেলেন না। কে যেন তাকে বলছেন, ‘ইবরাহীম ছুরি ফেলে দাও।’ ছেলেকে কুরবানি দিতে হবে না। পরীক্ষায় তুমি জয়ী হয়েছ।
হযরত ইবরাহীম (আ.) আল্লাহর উদ্দেশে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। তিনি দেখলেন, পাশেই দাঁড়িয়ে আছে একটি দুম্বা। দাঁড়িয়ে থাকা এ দুম্বাটি তিনি কুরবানি করলেন। হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর আত্মত্যাগের সেই স্মৃতিকে জীবন্ত রাখার জন্যই আমরা প্রতি বছর কুরবানি করে থাকি।
কুরবানির ঈদ কি শুধু পশু জবাই করা, হইচই আর আনন্দ করার জন্য? না! কুরবানি হলো আল্লাহর ইচ্ছার কাছে নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসকে বিলিয়ে দেয়া। এ কথাটি বোঝার মধ্যেই লুকিয়ে আছ আমাদের জাতীয় জীবনের একটি সেরা উৎসবের তাৎপর্য।