কুরবানির ঈদ


৪ জুন ২০২৫ ১২:৩২

॥ মুহাম্মদ ইসমাঈল ॥
কুরবানির ঈদ ঈদুল আজহা নামে পরিচিত। বিশ্বের মুসলমানগণ পরম ত্যাগের নমুনাস্বরূপ জিলহজ মাসের দশ তারিখে মহাসমারোহে পশু জবেহের মাধ্যমে যে আনন্দ উৎসব পালন করে, তাই ঈদুল আজহা বা কুরবানির ঈদ। হযরত ইবরাহিম (আ.) আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে প্রাণপ্রিয় পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ.)-কে কুরবানি করার যে ঐতিহাসিক নজির স্থাপন করে গেছেন, সেই সুন্নতকে জারি রাখার জন্যই মুসলিম জাতি প্রতি বছর পশু কুরবানির মাধ্যমে ঈদুল আজহা পালন করে থাকে। মুসলমানগণ জিলহজ মাসের দশ তারিখে উন্মুক্ত মাঠে খোলা আকাশের নিচে ঈদগাহে কুরবানির তাৎপর্যকে পরস্পরের মধ্যে প্রগাঢ় করার লক্ষ্যে একত্রে ঈদুল আজহার দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করে। তারপর আল্লাহর সন্তুষ্টির লাভের উদ্দেশ্যে সামর্থ্য অনুযায়ী পশু কুরবানির মাধ্যমে আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠে।
ইতিহাসে প্রথম কুরবানি
মানব ইতিহাসের প্রথম কুরবানি দুনিয়ার প্রথম মানব হযরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের কুরবানি।
আল-কুরআনে, উল্লেখ রয়েছে, “এবং তাদেরকে আদমের দুই পুত্রের কাহিনী ঠিকমতো শুনিয়ে দাও। যখন তারা দুজনে কুরবানি করল, একজনের (হাবিলের) কুরবানি কবুল হলো, অপরজনের কুরবানি কবুল হলো না।” [সূরা আল মায়েদা : ২৭]।
প্রকৃতপক্ষে আদম পুত্র হাবিল মনের ঐকান্তিক আগ্রহ সহকারে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি হাসিলের জন্য একটি অতি সুন্দর দুম্বা কুরবানি হিসেবে পেশ করল। আকাশ থেকে একখণ্ড আগুন এসে হাবিলের কুরবানি জ¦ালিয়ে গেল। তখনকার সময় এ জ¦ালানোই ছিল কুরবানি কবুল হওয়ার আলামত।
অপরদিকে আদম পুত্র কাবিল অমনোযোগ সহকারে খাদ্যের অনুপযোগী কিছু পরিমাণ খাদ্যশস্য কুরবানি হিসেবে পেশ করল। কিন্তু আকাশ থেকে আগত আগুন কাবিলের খাদ্যশস্য স্পর্শই করলো না। আর তা ছিল আল্লাহর দরবারে কুরবানি কবুল না হওয়ার আলামত।
সকল শরিয়তে কুরবানির নির্দেশ
আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে যত শরিয়ত নাজিল হয়েছে, সকল শরিয়তের মধ্যেই কুরবানির নির্দেশ ছিল। প্রত্যেক উম্মতের আর্থিক ইবাদতের এ ছিল একটা অপরিহার্য অংশ।
“এবং আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কুরবানির এক রীতিপদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছি; যেন তারা ঐসব পশুর ওপর আল্লাহর নাম নিতে পারে, যেসব পশু আল্লাহ তাদেরকে দান করেছেন।” [সূরা হজ : ৩৪]।
এ আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, প্রত্যেক শরিয়তের ইবাদতের মধ্যে কুরবানি বিদ্যমান ছিল। অবশ্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশ ও জাতির নবীদের শরিয়তের অবস্থার প্রেক্ষিতে কুরবানির নিয়ম-পদ্ধতি ও খুঁটিনাটি বিষয়সমূহ ভিন্ন ভিন্ন ছিল। কিন্তু মৌলিক দিক দিয়ে সকল আসমানী শরিয়তে এ নির্দেশ একই ধরনের ছিল যে, পশু কুরবানি কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহর নাম নিয়েই করতে হবে।
“অতএব ঐসব পশুর উপরে শুধুমাত্র আল্লাহর নাম নাও।”
এ আয়াতে পশুর ওপর আল্লাহর নাম নেয়াকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় প্রকাশ করা হয়েছে। অর্থাৎ পশু জবেহ করতে হলে আল্লাহর নাম নিয়ে কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই জবেহ করতে হবে। কারণ এসব পশু তিনিই মানুষকে দান করেছেন। প্রবল শক্তিশালী পশুও তিনি মানুষের অধীন করে দিয়েছেন। তিনিই এ পশুর মধ্যে মানুষের জন্য বিভিন্ন প্রকার কল্যাণ নিহিত রেখেছেন।
কুরবানির বিস্ময়কর ঘটনা
সারা দুনিয়ার মুসলমানগণ যে কুরবানি করে এবং তার ফলে বিরাট উৎসর্গের যে দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়, তা প্রকৃত পক্ষে হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর ফিদিয়া। আল-কুরআনে এ মহান কুরবানির ঘটনা উল্লেখ করে তাকে ইসলাম, ঈমান ও ইহসান বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
কুরবানি প্রকৃতপক্ষে এমন এক সংকল্প, দৃঢ় বিশ্বাস, আত্মসমর্পণ ও জীবন দেয়ার বাস্তব বহিঃপ্রকাশ যে, মানুষের কাছে যা কিছু আছে, তা সবই আল্লাহর মালিকানার এবং তাঁর পথেই তা উৎসর্গীকৃত হওয়া উচিত। এটা এ সত্যেরও নিদর্শন যে, আল্লাহর ইঙ্গিত হলেই বান্দা তাঁর রক্ত দিতেও দ্বিধা করবে না। এ ধরনের শপথ, আত্মসমর্পণ ও জীবন বিলিয়ে দেয়ার নাম ঈমান, ইসলাম ও ইহসান। আল-কুরআনের ঘোষণা, “যখন সে [ইসমাঈল] তাঁর সাথে চলাফেরার বয়সে উপনীত হলো, তখন একদিন ইবরাহীম তাকে বললো প্রিয় পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, তোমাকে যেন জবেহ করছি। পুত্র [বিনা দ্বিধায়] বললো, আব্বা! আপনাকে যে আদেশ করা হয়েছে, তা শিগগির পালন করে ফেলুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীল দেখতে পাবেন। অবশেষে যখন পিতা পুত্র উভয়ে আল্লাহর কাছে নিজেদের সোপর্দ করলো এবং ইবরাহিম পুত্রকে শুইয়ে দিল [জবেহ করার জন্য], তখন আমরা তাকে সম্বোধন করে বললাম, ইবরাহিম! তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখিয়েছ। আমরা সৎকর্মশীলদের এরূপ প্রতিদানই দিয়ে থাকি। বস্তুত এ এক সুস্পষ্ট অগ্নিপরীক্ষা। আর আমরা বিরাট কুরবানি ফিদিয়াস্বরূপ দিয়ে তাকে [ইসমাঈলকে] উদ্ধার করেছি। আর আমরা ভবিষ্যতের উম্মতের মধ্যে [ইবরাহিমের] এ সুন্নতকে স্মরণীয় করে রাখলাম। শান্তি ইবরাহিমের প্রতি, এভাবে জীবনদানকারীদের আমরা এ ধরনের [মর্যাদাসম্পন্ন] প্রতিদানই দিয়ে থাকি। নিশ্চয়ই সে আমাদের মুমিন বান্দাদের অন্যতম। [আস সাফ্ফাত : ১০২-১১১]।
যতদিন দুনিয়া টিকে থাকবে, ততদিন মুসলমানদের মধ্যে কুরবানির এ বিরাট স্মৃতি হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর ফিদিয়ারূপে অক্ষুণ্ন থাকবে। আল্লাহ এ ফিদিয়ার বিনিময়ে হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর জীবন রক্ষা করেন এ উদ্দেশ্যে যে, কিয়ামত পর্যন্ত যেন তাঁর জন্যে উৎসর্গকৃত বান্দাগণ ঠিক এ দিনে দুনিয়াজুড়ে কুরবানি করতে পারে। এভাবে যেন তারা আনুগত্য ও জীবন দেয়ার এ মহান ঘটনার স্মৃতি জাগ্রত রাখতে পারে। কুরবানির এ অপরিবর্তনীয় সুন্নতের প্রবর্তক হযরত ইবরাহিম (আ.) এবং হযরত ইসমাঈল (আ.)। আর এ সুন্নতকে কিয়ামত পর্যন্ত জারি রাখবে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতের জীবনদানকারী মুমিনগণ।
শেষ নবী (সা.)-এর প্রতি নির্দেশ
কুরবানি ও জীবনদানের প্রেরণা ও চেতনা সমগ্র জীবনে জাগ্রত রাখার জন্যে সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
বল, (হে মুহাম্মদ!) আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ সব কিছুই আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জন্য। তাঁর কোনো শরিক নেই, আমাকে এভাবেই নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং আমি সকলের আগে তাঁর অনুগত ও ফরমাবরদার।
আল্লাহর ওপর পাকাপোক্ত ঈমান এবং তাঁর তাওহীদের ওপর দৃঢ় বিশ্বাসের অর্থ এই যে, মানুষের সকল চেষ্টা-চরিত্র তাঁরই সন্তুষ্টির জন্য নির্দিষ্ট হবে। আর সে ঐ সব কিছু তাঁরই পথে উৎসর্গ করে তার ঈমান, ইসলাম, আনুগত্য ও জীবন দেয়ার প্রমাণ পেশ করবে।
কুরবানির প্রকৃত স্থান তো সেটা যেখানে প্রতি বছর লাখ লাখ হাজী তাদের নিজ নিজ কুরবানি পেশ করে। প্রকৃতপক্ষে কুরবানি হচ্ছে হজের অন্যতম একটি আমল।
কিন্তু মেহেরবান আল্লাহ এ বিরাট মর্যাদা থেকে তাদেরও বঞ্চিত করেননি, যারা মক্কা থেকে দূরে রয়েছে এবং হজে শরিক হয়নি। কুরবানির আদেশ শুধু তাদের জন্য নয় যারা বায়তুল্লাহর হজ করে, বরং এ এক সাধারণ নির্দেশ। আর এ কুরবানি প্রত্যেক সচ্ছল মুসলমানের জন্য অপরিহার্য আমল। হাদীস শরীফ থেকে প্রমাণিত আছে যে, হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রা.) বলেন, নবী (সা.) দশ বছর মদীনায় বাস করেন এবং প্রতি বছর কুরবানি করতে থাকেন। [তিরমিযী, মিশকাত]।
নবী করীম (সা.) বলেন, যে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটে না আসে। [জামেউল ফাওয়ায়েদ]।
হযরত আনাস (র.) বলেন, নবী করীম (সা.) ঈদুল আজহার দিনে বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের পূর্বে কুরবানি করেছে, তাকে পুনরায় কুরবানি করতে হবে। যে নামাজের পরে করেছে তার কুরবানি পূর্ণ হয়েছে এবং সে ঠিক মুসলমানের পদ্ধতি অবলম্বন করেছে।
কুরবানির আধ্যাত্মিক দিক
আল-কুরআন কুরবানির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যের প্রতি ইঙ্গিত করেছে। সত্য কথা এই যে, কুরবানি প্রকৃতপক্ষে তাই, যা এসব উদ্দেশ্যের অনুভূতি সহকারে করা হয়।
১. কুরবানির পশু আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের নিদর্শন- আর কুরবানির উটগুলোকে আমরা তোমার জন্য আল্লাহর নিদর্শনাবলীর একটি বানিয়ে দিয়েছি- [হজ : ৩৬]। যে কুরবানি করেন সে আসলে এ আবেগ অনুভূতি প্রকাশ করে যে, কুরবানির পশুর রক্ত তার আপন রক্তেরই স্থলাভিষিক্ত। সে এ ধরনের আবেগও প্রকাশ করে যে, তার নিজের জীবনও আল্লাহর পথে ঐভাবে কুরবানি করতে দ্বিধা নেই, যেভাবে এ পশু সে কুরবানি করছে।
২. কুরবানি আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের বাস্তব কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম- এভাবে এসব পশুকে তোমাদের জন্য বশীভূত করে দিয়েছি, যাতে করে তোমরা কৃতজ্ঞ হতে পার। [হজ : ৩৬]। আল্লাহ তায়ালা পশুকে মানুষের বশীভূত করে দিয়ে তাদের ওপর বিরাট অনুগ্রহ করেছেন। মানুষ এসব থেকে বহু উপকার লাভ করে। তার দুধ পান করে, গোশত খায়। তার হাড়, চামড়া, পশম প্রভৃতি দিয়ে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী তৈরি করে। চাষাবাদে তার সাহায্য নেয়। তাদের পিঠে বোঝা বহন করে, তাদেরকে বাহন হিসেবেও ব্যবহার করে। তাদের দ্বারা নিজেদের প্রভাব প্রতিপত্তিও প্রকাশ করে। কুরআন এসবের উপকারের দিকে ইঙ্গিত করে ও তাদেরকে মানুষের বশীভূত করার উল্লেখ করে- আল্লাহর ইবাদত ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রেরণা সঞ্চার করতে চায়। সেই সাথে এ চিন্তাধারাও সৃষ্টি করতে চায় সে, মহান আল্লাহ এ বিরাট নিয়ামত দান করেছেন- তাঁর নামেই কুরবানি হওয়া উচিত। ফলে কুরবানি আল্লাহর দেওয়া অগণিত নিয়ামতের বাস্তব কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম।
৩. কুরবানি আল্লাহর মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের বহিঃপ্রকাশ- আল্লাহ এভাবে পশুকে তোমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন, যাতে করে তোমরা তাঁর দেয়া হেদায়াত অনুযায়ী তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ কর। [হজ : ৩৭]। অর্থাৎ আল্লাহর নামে পশু জবেহ করা প্রকৃতপক্ষে এ কথারই ঘোষণা দেওয়া, আল্লাহ এসব নিয়ামত দান করেছেন এবং যিনি এসব আমাদের জন্য বংশীভূত করে দিয়েছেন, তিনিই এসবের প্রকৃত মালিক। কুরবানি সেই আসল মালিকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং এ কথারও বাস্তব বহিঃপ্রকাশ যে, মুমিন অন্তর থেকেই আল্লাহর মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রতি বিশ্বাস রাখে। পশুর গলায় ছুরি চালিয়ে সে উপরোক্ত সত্যের বাস্তব বহিঃপ্রকাশ ও ঘোষণা দেয় এবং মুখে বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে এ সত্যের স্বীকৃতি দান করে।
কুরবানি প্রাণশক্তি
প্রাক-ইসলামী যুগের লোকেরা কুরবানি করার পর তার গোশত বায়তুল্লাহর সম্মুখে এনে রেখে দিত। তার রক্ত বায়তুল্লাহর দেয়ালে মেখে দিত। কুরআন বললো, তোমাদের এ গোশত ও রক্তের কোনোই প্রয়োজন আল্লাহর নেই। তাঁর কাছে তো কুরবানির সে আবেগ অনুভূতি পৌঁছে, যা জবেহ করার সময় তোমাদের মধ্যে সঞ্চারিত হয় অথবা হওয়া উচিত। গোশত ও রক্তের নাম কুরবানি নয়। বরং কুরবানি এমন এক তত্ত্বেরই নাম যে, আমাদের সবকিছুই আল্লাহর জন্যে এবং এসব কিছুই তাঁর পথে উৎসর্গ করার জন্য।
কুরবানিদাতা শুধুমাত্র পশুর গলায় ছুরি চালায় না। বরং তার সকল কুপ্রবৃত্তির ওপর ছুরি চালিয়ে তাকে নির্মূল করে। এ অনুভূতি ব্যতিরেকে যে কুরবানি করা হয়, তা হযরত ইবরাহিম [আ.]-এর সুন্নত নয়, বরং একটা জাতীয় রসম-রেওয়াজ মাত্র। তাতে রক্ত ও গোশতের ছড়াছড়ি হয় বটে, কিন্তু সেই তাকওয়ার অভাব দেখা যায় যা কুরবানির প্রাণ শক্তি।
ঐসব পশুর রক্ত ও মাংস আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, বরং তোমাদের পক্ষ থেকে কেবলমাত্র তোমাদের তাকওয়া তাঁর কাছে পৌঁছে। যে কুরবানির পেছনে তাকওয়ার আবেগ-অনুভূতি নেই, আল্লাহর দৃষ্টিতে সে কুরবানির কোনোই মূল্য নেই। আল্লাহর কাছে সে আমলই গৃহীত হয় যার প্রেরণা দান করে তাকওয়া। আল্লাহ শুধুমাত্র মুত্তাকিদের আমল কবুল করেন।
কুরআনির পদ্ধতি
জবেহ করার জন্য পশুকে এমনভাবে শোয়াতে হবে- যেন তা কেবলামুখী হয়, ছুরি খুব ধারালো হতে হবে। যথাসম্ভব কুরবানির পশু নিজ হাতে জবেহ করতে হবে। কোনো কারণে নিজে জবেহ করতে না পারলে তার নিকট দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।
কুরবানির ফজিলত
নবী করীম [সা.] কুরবানির ফজিলত ও অসংখ্য সওয়াবের কথা উল্লেখ করে বলেন, জিলহজ মাসের ১০ তারিখে কুরবানির রক্ত প্রবাহিত করা থেকে ভালো কাজ আল্লাহর কাছে আর কিছু নেই। কিয়ামতের দিন কুরবানির পশু তার শিং, পশম ও ক্ষুরসহ হাজির হবে। কুরবানির রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই তা কবুল হয়ে যায়। অতএব মনে আগ্রহ সহকারে এবং সন্তুষ্টচিত্তে কুরবানির কর। [তিরমিযী, ইবনে মাজাহ্]। সাহাবায়ে কেরাম [রা.] নবী [সা.]কে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এ কুরবানি কী? নবী বলেন, এ তোমাদের পিতা ইবরাহিম [আ.]-এর সুন্নত। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এতে আমাদের জন্য কি সওয়াব রয়েছে? নবী বলেন, তার প্রত্যেক পশমের জন্য এক একটি সওয়াব পাওয়া যাবে। [তিরমিযী, ইবনে মাজাহ]। হযরত আবু সাঈদ খুদরী [রা.] বলেন যে, নবী [সা.] হযরত ফাতেমা যোহরা [রা.]কে বলেন, ফাতেমা এসো, তোমার কুরবানির পশুর কাছে দাঁড়িয়ে থাক। এজন্য যে, তার যে রক্তকণা মাটিতে পড়বে তার বদলায় আল্লাহ তোমার পূর্বের গুনাহগুলো মাফ করে দেবেন। হযরত ফাতেমা [রা.] বলেন, এ সুসংবাদ কি আহলে বায়েতের জন্য নির্দিষ্ট, না, সকল উম্মতের জন্য? নবী বলেন, আমাদের আহলে বায়েতের জন্যেও এবং সকল উম্মতের জন্যও। [জামেউল ফাওয়ায়েদ]। হযরত ইবনে বারীদাহ [রা.] তাঁর পিতার বরাত দিয়ে বলেন, নবী [সা.] ঈদুল ফিতরের দিন কিছু না খেয়ে নামাযে যেতেন না। আর ঈদুল আজহার দিন ঈদুল আজহার নামাযের আগে কিছু খেতেন না। [তিরমিযী, আহমাদ]। তারপর নামায থেকে ফিরে এসে কুরবানির পশুর কলিজা খেতেন।
ঈদুল আজহা মানবসভ্যতায় ত্যাাগের মহিমা প্রতিষ্ঠায় প্রবল ভূমিকা রাখে। ভোগে নয়, ত্যাগেই সুখ। তাই আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ আর স্বেচ্ছাচারিতার কুরবানিই হোক আমাদের জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য।
লেখক : কবি।