‘তবুও আশায় বাঁধিনু ঘর’
২০ মার্চ ২০২৫ ১৪:২৮
॥ মাহবুবুল হক ॥
আজ শরীর ও মন সঠিক অবস্থানে নেই। খুব যুক্তি-টুক্তি দিয়ে লিখবো না বলেই মনস্থির করেছি। খুব সহজ ও সরলভাবে এগিয়ে যাবো, ইনশাআল্লাহ।
এখন টক অব দ্য কান্ট্রি হলো জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের ৪ দিনের বাংলাদেশ সফর। এ সফরের গভীরে যেতে না পারলেও বাংলাদেশের মানুষ বেজায় খুশি বলে মনে হয়েছে। মহাসচিবকে কাক্সিক্ষত মেহমান বলেই আহলান-সাহলান করা হয়েছে। মাসটা মাহে রমাদান। এ মাসে মজলুম দেশবাসী বরাবর একটু শান্ত-স্থির থাকে। অন্যান্য মাসের তুলনায় একটু ধৈর্য ও সহ্যের মধ্যে অবস্থান করে। এ মাসে রাজনীতি একটু কম করে। ধর্ম-কর্ম নিয়েই একটু ব্যস্ত থাকে। তাছাড়া বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মাহে রমাদানে এবারই প্রথম নিত্যপ্রয়োজনীয়; বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্যের দাম তুলনামূলকভাবে কম থাকায় মজলুম দেশবাসী এমনিতেই একটু স্বস্তি ও শান্তির আবহে রয়েছে। সব মিলিয়ে পরিবেশ ও পরিস্থিতি ভালো থাকায় মেহমানের দিকে নজর দেয়ার একটু সুযোগ দেশবাসীর হয়েছে।
এদিকে নষ্ট ও দুষ্ট লোকেরা বোকার মতো প্রচার-প্রোপাগান্ডা করেছিল যে, জাতিসংঘের নেতা আসছেন পতিত ও পলাতক হাসিনাকে পুনর্বাসিত করতে। এ বিষয়ে তারা অনেক যুক্তি ও উদাহরণও প্রচার করেছিল। নষ্টের দল তো আসলে বোকার দল। তাই তারা ভেবেছিল, বলে-ব্যাটে তো মিলেই যাচ্ছে। ওরাও খুশি ছিল। আশান্বিত ছিল। আশায় আশায় বুক বেঁধে অপেক্ষা করেছিল। ফলে উচ্চতম এ মেহমানের কোনো বিরোধিতা তেমন কেউ করেনি। সুতরাং এ বিষয়ে বিপক্ষে তেমন কোনো পক্ষ ছিল না। বলতে দ্বিধা নেই, কিছুটা রিজার্ভ ছিলেন ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলো (কম-বেশি)। আমরা সবাই জানি, এর অনেক যৌক্তিক কারণও আছে। জাতিসংঘ গঠিত হওয়ার পর এ পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বের বা মুসলিম জনগণের সাধারণ ধারণা হলো যুদ্ধ যেন না হয়, পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ যেন বন্ধ হয়ে যায়, একটা সহাবস্থানের মধ্যে যেন দুনিয়া চলতে পারে। আধিপত্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ এবং কলোনানিজম যাতে দুনিয়ায় আর বিস্তার না করে, সেজন্যই তো জাতিসংঘের সৃষ্টি। কিন্তু ধারাবাহিক অভিজ্ঞতা হলো, জাতিসংঘ পরবর্তী কোনো যুদ্ধই থামাতে পারেনি। যুদ্ধ তো চলছেই, জানা যায় এখনো প্রায় ৪০টি দেশের মধ্যে যুদ্ধ চলছে। মুসলিম বিশ্বের কোনো সমস্যাই জাতিসংঘ সমাধান করতে পারেনি। সাম্রাজ্যবাদী ইহুদি ও নাসারাদের সম্প্রসারণবাদী যুদ্ধ থামানো তো দূরের কথা, কখনো মিনিমাইজও করতে পারেনি। গত ৮০ বছরে ইহুদিরা ফিলিস্তিনসহ মধ্যপ্রাচ্যে যে ধ্বংসের লীলা সৃষ্টি করেছে, জাতিসংঘ সেসবের কোনো সুরাহা করতে পারেনি। তারা মুখ-রক্ষার জন্য কিছু বাণী মাঝে মাঝে উচ্চকিত করেছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের জরুরি মিটিং ডেকেছে। দেখা গেছে, সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিনের পক্ষে বা মুসলিম দেশগুলোর পক্ষে পজিটিভ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু সিদ্ধান্তকারী মহল অর্থাৎ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ তা ভণ্ডুল করে দিয়েছে। মুসলিম বিশ্বের স্থায়ীভাবে সাধারণ ধারণা, জাতিসংঘ মুসলিম বিশ্বের বন্ধু নয়। তারা সুবিচার করতে পারে না, ন্যায়বিচার করতে পারে না, সমতা বিধান করতে পারে না। কখনো কখনো তারা বাহ্যিকভাবে সহানুভূতিশীল বাণী সমুজ্জ্বল করলেই তারা বাইরের যুদ্ধ কখনো ঠেকাতে পারেনি। শুধু তাই নয়, দেশে দেশে গৃহযুদ্ধও কখনো ঠেকাতে পারেনি। আফ্রিকার যেসব দেশ কলোনিমুক্ত হয়ে বাধ্য হয়ে গ্রহণ করা নাসারা ধর্ম থেকে ইসলামের দিকে ধাবিত হওয়ার প্রচেষ্টায় উদ্যত হয়েছিল, সেসব কারণে সংঘটিত যুদ্ধ ছাড়াও উপজাতি ও নৃগোষ্ঠীর গৃহযুদ্ধ থামাতে পারেনি।
পাকিস্তান ও ভারত সৃষ্টিকালে ইন্ডিয়া যে চুক্তি লঙ্ঘন করে কাশ্মীর, মানভেদর হায়দ্রাবাদ, জুনাগড় জোর করে দখল করে রেখেছিল, তারও তো কোনো সুরাহা জাতিসংঘ করতে চায়নি বা পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র যে ভিয়েতমানকে নরকে পরিণত করল, কোরিয়া যে ভাগ হয়ে গেল, চীন যে তাইওয়ান দখল করে রাখলো, সেসব তো মুসলিম বিশ্ব ভোলেনি। উইঘুরে মুসলিমদের ওপর যুগের পর যুগ নির্যাতন অব্যাহত রাখলো, মুসলিম বিশ্বের মধ্যে একের পর এক সাম্রাজ্যবাদী যুক্তরাষ্ট্র বহুকাল যুদ্ধ বজায় রাখলো এবং পরবর্তীতে সাম্রাজ্যবাদী সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সাম্রাজ্যবাদী যুক্তরাষ্ট্র সমৃদ্ধ ইসলামী দেশ আফগানিস্তানকে জাহান্নামে পরিণত করে ছাড়ল, সেসব কি মুসলিম বিশ্ব বা দুনিয়াবাসী ভুলে গেছে? জুনিয়র বুশ মিথ্যা রটিয়ে রটিয়ে মুসলিম বিশ্বের ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া ধ্বংস করে দিল, এসব বিষয়ে জাতিসংঘ কি কিছু করতে পেরেছে? ইরাক ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ কে লাগিয়েছে? লাগিয়েছে সাম্রাজ্যবাদী ও উপনিবেশবাদী শক্তি। যুদ্ধ থামাতে জাতিসংঘ কোনো ভূমিকাই পালন করতে পারেনি। কোনো প্রচেষ্টাই তাদের দেখা যায়নি। মুসলিম হলেও সোশ্যালিস্ট রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের ধ্বজাধারী ইরাক যখন কুয়েত দখল করল, তখন কুয়েত কারো তেমন সহানুভূতি পায়নি। বরং পাশ্চাত্যের মুখপাত্ররা বলেছিল, এত ছোট ছোট দেশের দরকার কি! এখন ইয়েমেনে যে যুদ্ধ চলছে, তার প্রধান হোতা কে? আধিপত্যবাদী যুক্তরাষ্ট্র। রাজতান্ত্রিক দেশ সৌদি আরবকে দিয়ে ইয়েমেনকে দখল করার বা ধ্বংস করার প্রচেষ্টা তো চলছেই। উপনিবেশবাদী ব্রিটেন আর্জেন্টিনার দ্বীপ ফকল্যান্ড অন্যায়ভাবে আক্রমণ চালিয়ে সেই যে দখল করল, এখনো সে অবস্থা ঝুলে আছে। এসব থাক।
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর দেশে দেশে নির্যাতিত, নিপীড়িত, নিষ্পেষিত, অত্যাচারিত মজলুম মানুষ যখন উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তখন কি জাতিসংঘ মুক্তিকামী মানুষের আজাদীর জন্য সাহায্য-সহযোগিতা করতে পেরেছিল?
দেখা গেছে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কখনো মানবতার মুক্তি চায়নি। কারণ এ যাবত নিরাপত্তা পরিষদে যারা সদস্য ছিল এবং আছে, তাদের অধিকাংশই পুরনো উপনিবেশবাদী, সাম্রাজ্যবাদী, আধিপত্যবাদী ও সম্প্রসারণবাদী রাষ্ট্র। তারা কখনো তাদের মনের গভীরে যে ক্ষত রয়েছে, তা ভুলতে পারেনি। এককালে তাদের অধীনে যেসব দেশ ছিল, সেসব দেশে মজলুম ও মুক্তিকামী মানুষ মুক্তি-সংগ্রামের মাধ্যমে তাদের একসময় বিতাড়িত করেছিল, সেই অপমান-লাঞ্ছনা ও গঞ্জনা; এককথায় উপনিবেশবাদী শক্তি এখনো তা ভুলতে পারেনি। এটা একটা বড় ধরনের কারণ। আমাদের দেশে পতিত রাজা-বাদশাহ, নবাব-জমিদার, তালুকদার-চৌধুরীদের উত্তরাধিকারদের মনন গবেষণা করলে সহজে এ দুষ্ট ঐতিহ্যের প্রমাণ পাওয়া যাবে।
তবে জাতিসংঘ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, উদ্বাস্তু সমস্যা, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, শিশু ও নারী পরিচর্চাসহ শান্তি মিশন বজায় ও অব্যাহত রাখার পক্ষে অনেক কাজ করেছে এবং করছে। এ বিষয়ে মুসলিম বিশ্বসহ সারা বিশ্বের মানুষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে পারে না।
আমরা জাতিসংঘের প্রশংসা করি বা না করি, সেটা ভিন্ন কথা। তবে জাতিসংঘ দ্বিধা না করে সবসময় বাংলাদেশের একটি বিষয়ে প্রশংসা করেছে। সেটা হলো শান্তি মিশনে বাংলাদেশ এ যাবত যাদের পাঠিয়েছে, জাতিসংঘ তাদের ভূয়সী প্রশংসা করেছে। তারা সুযোগ পেলেই বলেছে, বাংলাদেশের শান্তি মিশনের সদস্যরা নৈতিকতার দিক থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ। তাদের আন্তরিকতা, সততা ও সেবাপ্রবণতা অনুকরণযোগ্য।
এখন আসি আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে জাতিসংঘের দূতিয়ালি প্রসঙ্গে। প্রায় সব নির্বাচনের পূর্বে আমরা জাতিসংঘের সালিশের জন্য আহ্বান জানিয়েছিলাম। তারা আমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল। কিন্তু কার্যত আমাদের মনান্তর ও মতান্তর বা রাজনৈতিক কলহ-বিবাদ জাতিসংঘ কোনো সময় মেটাতে পারেনি। এ বিষয়ে যতবার তারা এসেছে, ততবার তারা ব্যর্থ হয়েছে। তারা ব্যর্থ হয়েছে, না আমরা ব্যর্থ হয়েছিÑ সেই বিচার-বিশ্লেষণে এ মুহূর্তে আমরা যাচ্ছি না।
২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর জাতিসংঘ আমাদের পরিবেশ-প্রতিবেশ, অবস্থা-ব্যবস্থা এবং সার্বিকভাবে আমাদের ধ্বংস ও বিনির্মাণের ওপর জাতিসংঘ যে রিপোর্ট পেশ করেছে, তা সত্যের সাথে ছিল বিপুলভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সত্যি কথা বলতে কী, জাতিসংঘের কাছে এমন ক্লিন, ক্লিয়ার ও ক্রিস্টাল অভিমত আমরা আশা করিনি। কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক, জাতিসংঘ এবার বাংলাদেশি জাতি ও বাংলাদেশের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে, যা আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পথে অবশ্যম্ভাবী বিষয় বলে ইতিহাসে চিহ্নিত থাকবে। গণঅভ্যুত্থানের সময় পতিত সরকার যে জুলুম, নির্যাতন ও অত্যাচার করেছে, জাতিসংঘ তা ছবির মতো তুলে ধরেছে। এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ও বাংলাদেশের জনগণ সাথে সাথে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর এডভোকেট মো. তাজুল ইসলাম যথার্থভাবে বলেছেন, অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জাতিসংঘের এই দলিল সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান বিশ্বনন্দিত ও শ্রদ্ধেয় নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আন্তরিক আহ্বানে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ৪ দিনের সফরে বাংলাদেশে এসেছেন এবং সফর শেষে বিদায়ও নিয়েছেন। তিনি এখানে এসে যা যা করেছেন, তার সবই ছিল উল্লেখযোগ্য ও সময়োপযোগী। তিনি রাজনৈতিক দল, সিভিল সোসাইটি, আমলাসহ ওপর মহলের সবার সাথে খোলামেলা কথা বলেছেন, একত্রে ও ভিন্নভাবে সকল মহলের মতামত ও অভিমত জানার চেষ্টা করেছেন। উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছেন এবং সরলভাবে স্বস্তি ও আনন্দ প্রকাশ করেছেন। দীপ্তভাবে আশা প্রকাশ করেছেন, আমাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা বেশিদিন আর থাকবে না। নির্বাচন কমিশনের কাছেও তিনি বিশেষভাবে অনুরোধ করেছেনÑ তারা যেন গণতন্ত্রের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন।
একটা কথা এখানে বলে রাখা ভালো। প্রফেসর ড. ইউনূসের কারণে তিনি খুব ফরমাল ছিলেন না। বেশ খোলামেলা ইনফরমাল ছিলেন। তিনি ভালোভাবে উপলব্ধি করেছেন বাংলাদেশে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি হয়নি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এখন যেভাবে বিরাজ করছে, ইতোপূর্বে এত সুন্দর অবস্থা কখনো ছিল না। যার বা যাদের উসকানিতে কিছু কিছু দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটত তা এবার আর সেভাবে ঘটেনি। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামার কথা যারা প্রচার করেছে, তারা দেশের স্বার্থে নয়, ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও দলের স্বার্থে তা করেছে।
বাংলাদেশের মানুষ ভোট চায়, নির্বাচন চায়, একটা সুষ্ঠু, সুস্থ, সৎ ও কার্যকরী জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের মানুষ দারুণভাবে আকাক্সক্ষা করছে। জাতিসংঘ মহাসচিব সে বিষয়টি দারুণভাবে উপলব্ধি করেছেন। বাংলাদেশের সকল বিষয়ে ইন্ডিয়ার আধিপত্য যে বিরাজমান, তা-ও তিনি উপলব্ধি করেছেন। বাংলাদেশ যে কখনো নিরঙ্কুশভাবে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিরাজমান ছিল না, তা-ও তিনি হৃদয়াঙ্গম করেছেন। একদিকে ইন্ডিয়া; অপরদিকে মিয়ানমারÑ এ দুই বৃহৎ রাষ্ট্রের ঝাঁকাঝাঁকিতে বাংলাদেশ যে অস্থির ও পেরেশান হয়ে আছে, তা-ও তার বোধগম্য হয়েছে।
রোহিঙ্গাদের বিষয়ে তিনি অবগত ছিলেন। রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা এবং তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থার সঙ্গে তিনি দীর্ঘ বছর ধরে সংযুক্ত আছেন। এ বিষয়টি আলো-অন্ধকার সম্পর্কে তিনি বিশেষভাবে পরিজ্ঞাতা। ইন্ডিয়া, মিয়ানমার, চায়না এবং যুক্তরাষ্ট্রের কারণে এ সমস্যার সমাধান হচ্ছে না, বরং ধীরে ধীরে সমস্যাটি জটিল আকার ধারণ করছে, তা-ও তিনি ভালোভাবে অবগত আছেন। রোহিঙ্গারা উদ্বাস্তু। তারা নিকট প্রতিবেশী দেশের অধিবাসী। সেখানকার গৃহযুদ্ধের (মুসলিম কিলিং) কারণে তাদের বাংলাদেশে বাধ্য হয়ে চলে আসতে হয়েছে। অর্থাৎ তাদের নিজ দেশ থেকে তাদের উৎখাত করা হয়েছেÑ এসব তিনি সবই জানেন এবং এও জানেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প সরকার হঠাৎ করেই তাদের জন্য বরাদ্দকৃত ডোনেশন প্রায় অর্ধেক করে দিয়েছে। এর প্রকৃষ্ট অর্থ হলো, ট্রাম্প সরকার রোহিঙ্গাদের বিষয়ে হাত টেনে নিচ্ছে। এ ধরনের একটা দুর্ভাগ্যজনক জটিল সময়ে জাতিসংঘ মহাসচিব বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের প্রধান উপদেষ্টার হাত ধরে সেখানকার প্রকৃষ্ট অবস্থা জানার জন্য অনেকটা ইনফরমালভাবে চলে গেছেন। শোনা যায়, সেদিন তিনি প্রফেসর ইউনূসের অনুরোধে ফাস্টিং করেছেন। সেদিন প্রফেসর ড. ইউনূস মাথায় টুপি পরেছিলেন এবং জাতিসংঘ মহাসচিবের গায়ে বাঙালির পাঞ্জাবি চড়িয়েছিলেন। এক লাখ রোহিঙ্গা মুসলিমের ইফতার পার্টিতে তারা আনন্দের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছিলেন। অর্থাৎ ১০ শতাংশ রোহিঙ্গার সঙ্গে তারা খানাপিনা করেছিলেন। এ এক অপূর্ব ও অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক ঘটনা। যদিও ঘটনাটির উৎস বিয়োগান্তক, নির্মম ও নিষ্ঠুর। সেখানে গুতেরেস এ বিশাল ইফতার পার্টিতে আনন্দের সাথে ঘোষণা দিয়েছিলেন, রোহিঙ্গাদের খাদ্যের সংকুলানের বিষয়ে জাতিসংঘ যথাসাধ্য কাজ করবে। বিশ্বের গর্ব বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের প্রধান উপদেষ্টা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে দোয়া করো আগামী ঈদে যেন তোমরা তোমাদের দেশে ঈদ করতে পারবে। দাওয়াত পেলে আমিও সেখানে ঈদ করব, ইনশাআল্লাহ।’ অ্যান্তোনিও গুতেরেসের সামনে এ ধরনের কথা বলার মধ্যে রাজনীতি নেই, আছে মানবিক কূটনীতি।
সবকিছু মিলিয়ে সফরটা একদম ব্যর্থ হয়ে যাবে বলে মনে হয় না। রমাদানের এক শুক্রবারে টুপি-পাঞ্জাবি পরে জুমার সালাত আদায় করা ও লাখো মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ইফতার করা, মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা সাধারণ কোনো বিষয় নয়। এসব ছিল ড. ইউনূসের ‘এক নতুন মানবিক কূটনীতি।’ এ কূটনীতির বিজয় হবে, ইনশাআল্লাহ।
তারপরও কথা থেকে যায়। জাতিসংঘ মহাসচিব তো একচ্ছত্র অধিপতি নন। তিনি চাইলেই তো সবকিছু করতে পারবেন না। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে বা নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করতে পারবেন। নিজের অভিমত ব্যক্ত করতে পারবেন। কিন্তু তাতে কাজটা যে হয়ে যাবে, তা তো নয়। তবে আমরা আশাবাদী।