ভার্চুয়ালজগতে নিরাপত্তা ও ঝুঁকি


১৩ মার্চ ২০২৫ ১৬:২৭

॥ সাইদুর রহমান ॥
ইন্টারনেটে কাজ করতে গিয়ে আমরা নানা কারণেই নিজের অজান্তেই ব্যক্তিগত ই-মেইল অ্যাড্রেস, নাম, পেশা ও অবস্থান উল্লেখ করছি। এটি কোনো না কোনো সার্ভারে সংরক্ষিত হচ্ছে। এর ফলে ব্যক্তিগত তথ্যগুলো আর ব্যক্তিগত থাকছে না। দেখা দিচ্ছে ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারের আশঙ্কা। বাস্তবতা হচ্ছে, ইন্টারনেটের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি চুরি করে কাউকে উত্ত্যক্ত এবং ব্ল্যাকমেইল করার ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে সামাজিক মর্যাদা খর্ব করার ঘটনাও কম নয়। সামান্য অসতর্কতার কারণে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন অনেক সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। প্রতিটি জিনিসেরই ভালো দিকের পাশাপাশি মন্দ দিকও থাকে। ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়ালজগতেরও অনেক ভালো দিকের পাশাপাশি কিছু মন্দ দিক রয়েছে। ইন্টারনেট যেমন আমাদের জন্য বিশাল তথ্যভাণ্ডার হিসেবে কাজ করছে এবং সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের একটা বড় মাধ্যমে পরিণত হয়েছে, ঠিক তেমনি অনেক উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটু অসতর্ক হলেই সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তাঝুঁকির মধ্যে পড়তে হচ্ছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন খুব সহজেই মেয়ে বা ছেলে বন্ধু পাওয়া যায়। একে-অপরকে ভালোভাবে না জেনে, না চিনে পরস্পরের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলছে তারা। অস্বচ্ছ ধারণার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার কারণে মানুষের আবেগ একটা জায়গায় আর আবদ্ধ থাকছে না। আবেগ-অনুভূতিতে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন আসছে। অনেকেই মিষ্টি কথার ফাঁদে পড়ে অন্যকে সহজেই বিশ্বাস করেন। অনেকে জানেনও না যে, ইন্টারনেটেও বাস্তব জগতের মতো খারাপ মানুষের অভাব নেই। সরল বিশ্বাসকে পুঁজি করে অনেক প্রতারক মেয়েদের টার্গেট করে। এমনকি গৃহবধূদের ফাঁদে ফেলে দেয়। দীর্ঘদিন ধরে একটা সম্পর্ক তৈরি করে। এরপর অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং সেটা ভিডিও করে পরে ব্ল্যাকমেইল করে। ব্ল্যাকমেইলের কারণে সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে সরলমনা মানুষ। অনেকে এ অবস্থার মধ্যে পড়ে মানষিক রোগী হয়ে যান।
ইন্টারনেটের মাধ্যমে অনেকেই কেনাকাটা ও আর্থিক লেনদেন করে থাকেন। কখনো ভুলে জালিয়াতি চক্রের ওয়েবসাইটে ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডের পাসওয়ার্ড লিখে ফেললে তা চুরি হয়ে যেতে পারে। কারণ কোনো কোনো জালিয়াত চক্র কৌশলে কোনো বিখ্যাত ওয়েবসাইটের মতো করে অবিকল নকল ওয়েবসাইটে ভিজিটরদের নিয়ে যায়। সেসব ওয়েবসাইটে লেনদেন করার সময় কার্ডের তথ্য চুরি হয়ে যায়। এছাড়া জালিয়াত চক্র এটিএম মেশিনের সঙ্গে স্কিমিং ডিভাইস যুক্ত করে দেয়। কার্ড রিডার স্লটে যুক্ত করা স্কিমিং ডিভাইসটি, কোনো গ্রাহক তার কার্ড সোয়াইপ করলে বা চার্জ করলে ম্যাগনেটিক স্ট্রিপ থেকে তথ্য কপি করে নেয়। আর কার্ডের পিন নম্বর পাওয়ার জন্য মেশিনের কাছে ক্যামেরা সেটআপ করে রাখে। এরপর ওইসব তথ্য ব্যবহার করে যখন-তখন অর্থ হাতিয়ে নেয় জালিয়াত চক্রের সদস্যরা।
গোপনীয়তা ও নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে অনেকে ইন্টারনেট ব্যবহার করা থেকেও তা ব্যবহার থেকে বিরত থাকছেন। কেউ কেউ আবার ইন্টারনেটে আর্থিক লেনদেন বা কেনাকাটা থেকে বিরত থাকেন। আমেরিকার অনেক নাগরিকও ইন্টারনেটে মৌলিক কাজ বন্ধ রেখেছেন কেবল গোপনীয়তা ও নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে। কারণ তারা ইন্টারনেটে এমন সব হয়রানির শিকার হয়েছেন যে, এ প্রযুক্তিই এখন তাদের কাছে ভীতিকর মনে হয়। তবে বাস্তবতা হলো, ইন্টারনেট বা ভার্চুয়ালজগতকে পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সতর্কতা অবলম্বনের মাধ্যমে এর ব্যবহার চালিয়ে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। কিছু সতর্কতা অবলম্বন করলে নিরাপত্তাঝুঁকি অনেকটাই মোকাবিলা করা সম্ভব।
ইন্টানেট ব্যবহারে নিরাপদ থাকতে পাবলিক ওয়াইফাই যথাসম্ভব এড়িয়ে যেতে হবে। কারণ হ্যাকাররা একই নেটওয়ার্কের অধীনে থাকা ডিভাইসগুলোর নিয়ন্ত্রণ সহজেই নিতে পারে। এমন কোনো ছবি কখনোই তোলা বা শেয়ার করা উচিত নয়, যা কোনো তৃতীয় ব্যক্তি দেখলে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। মনে রাখা উচিত, ছবি হাজারবার ডিলিট করলেও তা রিকভার করার সম্ভাবনা থেকেই যায়। তাই স্পর্শকাতর ছবি তোলা থেকে বিরত থাকতে হবে। নিজের ব্যবহার করা পুরোনো ফোনও অপরিচিত লোকদের কাছে বিক্রি করা উচিত নয়। কারণ পুরোনো মোবাইলের ডিলিট করা তথ্য রিকভার করে তা অপব্যবহারের আশঙ্কা থেকে যায়। ফেসবুক বা ইমোর মতো সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো ধরনের ব্যক্তিগত ছবি আদান-প্রদান করা ঠিক নয়। কারণ যদি একজনের অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়, তাহলে অপরজনও বিপদে পড়বেন। কোনো অবস্থাতেই নিজের ব্যক্তিগত পাসওয়ার্ড অন্যকে দেওয়া যাবে না।
ভেবেচিন্তে যেকোনো লিঙ্কে ক্লিক করা উচিত। কারণ ম্যালওয়্যার লিঙ্কে ক্লিক পড়ে গেলে নিজের অ্যাকাউন্টের এক্সেস হ্যাকারের কাছে চলে যেতে পারে। দোকানে ফোন ঠিক করতে দিলে ঠিক না হওয়া পর্যন্ত পাশে থাকা উচিত। এছাড়া অনলাইনে ডলার বা পাউন্ড বিনিময় করা থেকে বিরত থাকা উচিত। কারণ আইনের দৃষ্টিতে এটি অবৈধ। এ লেনদেন করতে গিয়ে কোনো সমস্যায় পড়লে বা ডলার বিক্রয় করতে গিয়ে ধরা পড়লে আইনি সমস্যায় পড়তে হবে। অনলাইনে কোনো পণ্য কিনলে তা আগে ভালো করে যাচাই-বাছাই করে নিতে হবে। সাইবার ক্রাইম, অনলাইন ব্ল্যাকমেইল, অনলাইনে ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকিÑএ সংক্রান্ত যেকোনো ধরনের সমস্যায় পড়লে দ্রুত থানায় জানাতে হবে। অনেকে লজ্জার কারণে অথবা বাড়তি ঝামেলা এড়িয়ে যেতে এ সংক্রান্ত বিষয়ে থানায় অভিযোগ করেন না। এটা ঠিক নয়। অভিযোগ না করলে অপরাধের প্রবণতা আরও বাড়বে।
সাইবার নিরাপত্তা : ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়ালজগতে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সবারই একটি বিষয় মনে রাখা উচিত, আর তা হলো কোনো কিছু সিলেক্ট করে একবার সেন্ড বাটনে চাপ দিলে তা নিমিষের মধ্যে অন্যের কাছে পৌঁছে যায়। শুধু তাই নয়, নিমিষে ছড়িয়ে পড়তে পারে গোটা সাইবারজগতে। একবার কিছু পাঠানোর পর তা দ্রুত মুছে ফেললেও তা ওই সময়ের মধ্যে অন্যের চোখে পড়তে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ভুলে ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি ও ভিডিও অন্যের কাছে চলে গেছে। যিনি ছবি বা ভিডিও পেলেন, তিনি ভাবতে পারেন ছবিটি তাকে উদ্দেশ্য করেই পাঠানো হয়েছে। কিন্তু যিনি পাঠিয়েছেন, তিনি হয়তো কখনোই চাননি, তার ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও এমন কেউ দেখুক। এ ধরনের সমস্যাগুলো সাধারণত নিজের তৈরি করা সমস্যা। কিন্তু কিছু সমস্যা রয়েছে, যা অন্যদের মাধ্যমে তৈরি হয়। এর মধ্যে কম্পিউটার ভাইরাস ও ম্যালওয়্যার অন্যতম।
কম্পিউটার ভাইরাস হচ্ছে এক ধরনের প্রোগ্রাম, যা সাধারণত অন্য একটি সফটওয়্যারের সাথে সংযুক্ত অবস্থায় থাকে এবং পরবর্তীতে পুরো সিস্টেমে ছড়িয়ে পড়ে। ভাইরাস বেশিরভাগ সময় সফটওয়্যার অথবা ফাইল শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে কম্পিউটার থেকে কম্পিউটারে ছড়িয়ে পড়ে। এ জগতের আরেকটি বড় হুমকি হচ্ছে ম্যালওয়্যার। ভালোভাবে যাচাই-বাছাই না করে কোনো সফটওয়্যার ইনস্টল কিংবা ব্রাউজার প্লাগিন ইনস্টল করলে কম্পিউটারে ম্যালওয়্যার ঢুকে পড়তে পারে। এছাড়া কিছু ম্যালওয়্যার রয়েছে, যা কম্পিউটারকে লক করে দিতে পারে। লক করার পর আনলক কোডের জন্য টাকা চাইতে পারে। এছাড়া সাইবারজগতে আরও বেশ কিছু হুমকি রয়েছে। যেমন ব্যাকডোর। এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে একজন হ্যাকার কিংবা স্প্যামার অন্যের নেটওয়ার্ক সংযোগ ব্যবহার করতে পারবে। এছাড়া রয়েছে ‘কি লগার’ নামের ম্যালওয়্যার। এর কাজ হলো ইউজার আইডি, পাসওয়ার্ড ও অন্য যেকোনো স্পর্শকাতর তথ্যসহ যা কিছু কম্পিউটারে টাইপ করা হবে, তার সব কিছু রেকর্ড করবে এবং পরবর্তীতে কি লগারের প্রোগ্রামার কে পাঠিয়ে দেবে।
একটি ভয়ানক ম্যালওয়্যার হচ্ছে ‘রুট কিট’। সহজে এটা ধরা যায় না। রুট কিট অন্য ম্যালওয়্যারকে লুকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। স্পাইওয়্যার হচ্ছে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ওপর গোয়েন্দাবৃত্তি করার একটি মাধ্যম। ইন্টারনেটে যা কিছু করা হবে, তার সবকিছু মনিটর করা যায় এর মাধ্যমে। অনেক পরিচিত একটি ম্যালওয়্যার হচ্ছে ট্রোজান হর্স। এটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর আর্থিক তথ্য চুরি করতে ব্যবহার করা হয়। এটি পুরো কম্পিউটারকে নষ্ট করে দিতে পারে।
এছাড়া সাইবারজগতে রয়েছে ওয়ার্ম। এটি এক ধরনের খাদক। ওয়ার্মের খাবার হলো বিভিন্ন ফাইল। একটি ড্রাইভে যখন ওয়ার্ম ঢুকে পড়ে, তখন এটি আস্তে আস্তে ড্রাইভটি খালি করে ফেলে। সব ফাইল নষ্ট করে দেয়।
বর্তমানে আরও নানা উপায়ে ইন্টারনেট ব্যবহারীদের বিপদে ফেলা হচ্ছে। অনেক সময় আকর্ষণীয় নানা অফার দিয়ে ব্যক্তিগত ইমেইল একাউন্টে চিঠি আসে। অনেক সময় বিখ্যাত কোনো প্রতিষ্ঠান ও পরিচিত বন্ধুর নাম ব্যবহার করে প্রতারকরা। তারা এ ধরনের নাম ব্যবহার করে। কারণ এর ফলে যিনি ইমেইল পেলেন, তিনি আস্থার সঙ্গে তা খুলে দেখেন এবং পড়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু এগুলো আসলে ফিশিং ইমেইল। এ ধরনের ইমেইলের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করা হয়। এ অবস্থায় সাইবার নিরাপত্তা জোরদারে সবার আগে সচেতনতা জরুরি। নিজে সচেতন হলে অনেক ঝুঁকিই সহজে মোকাবিলা করা সম্ভব।
এর পাশাপাশি কম্পিউটার অপারেটিং সিস্টেম আপ টু ডেট রাখা উচিত। এন্টি-ভাইরাস ব্যবহার করলে ভাইরাসের আক্রমণ থেকে কম্পিউটার সিস্টেমকে নিরাপদ রাখা সম্ভব। নিজের প্রয়োজনীয় তথ্যের ব্যাকআপ রাখা উচিত। বিজ্ঞাপন দেখলেই ক্লিক দেওয়া যাবে না। অপরিচিত ইমেইল খোলা ঠিক নয়। শুধু ইমেইল ওপেন করার কারণেই তথ্য চলে যেতে পারে হ্যাকারের কাছে। অনেক সময় দেখা যায় উগ্রপন্থিরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে নানা উপায়ে মানুষকে নিজেদের কাছে টেনে নিচ্ছে। এক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে।
ক্রমাগত সাইবার অপরাধ বেড়ে চললেও তা মোকাবিলায় দরিদ্র দেশগুলোর পক্ষ থেকে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ লক্ষ করা যাচ্ছে না। অনেক দেশই সাইবার পুলিশ গঠন করেছে। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানেও সাইবার পুলিশের তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। সাইবার পুলিশের মাধ্যমে অনেক অপরাধীকে চিহ্নিত করা সম্ভব হলেও এর একটা বড় অংশই থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। কারণ তারা এমন কৌশলে কাজ করে যে, তাদের চিহ্নিত করা সম্ভব হয় না।