আল কুরআনের শিক্ষার বাস্তবায়নে ফুলেফলে ভরে উঠবে সমাজ


২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৫:৪৯

॥ জাফর আহমাদ ॥
কুরআনের শিক্ষার আলোয় প্রতিষ্ঠিত সমাজ-রাষ্ট্র শান্তি ও সমৃদ্ধির সমাজ উপহার দেবে, যেখানে থাকবে না লাঞ্ছনা, বঞ্চনা ও অধিকারহারা মানুষের ক্রন্দন রোল। ফুলেফলে সমাজটা ভরে উঠবে। চারদিকে পাখিরা গাইবে নতুন গান। হ্যাঁ, আল কুরআন পৃথিবীতে এসেছিল মানুষের সমাজকে ফুলে-ফলে সাজিয়ে দিতে। সেই কুরআন সমাজের সর্বস্তরে একসময় প্রতিষ্ঠিত ছিল বা কুরআন অনুযায়ী সেই জীবন পরিচালিত হতো। আমরা সেসব স্থান থেকে কুরআনকে উচ্ছেদ করে দিয়েছি। আবার শান্তির সমাজ পেতে হলে সেসব স্থানে কুরআনকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, যদি আমরা এই কাজ না করি, তাহলে সকলকেই রাসূলুল্লাহ সা. কর্তৃক আল্লাহর দরবারে দায়েরকৃত মামলার বিবাদী বা চার্জশিটভুক্ত আসামি হয়ে যাবো। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর রাসূল বলবে, “হে আমার রব! আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা এ কুরআনকে বাস্তুচ্যুত করেছিল।” (সূরা ফুরকান : ৩০)।
রাসূলুল্লাহ সা.-এর ২৩ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে মানুষের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল স্তরে আল কুরআনকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। আল কুরআন অনুযায়ী তিনি এমন এক সোনার সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা বিনির্মাণ করেছিলেন যেখানে মানুষ কুরআন অনুযায়ী মানুষ কথা বলত এবং কুরআন অনুযায়ী কথা পরিহার করত। আইন আদালত ও রাষ্ট্রের সকল অবকাঠামো পরিচালিত হতো কুরআন অনুযায়ী। স্কুল-কলেজের শিক্ষার প্রধান ও মূল বিষয় ছিল আল কুরআন। রাসূলুল্লাহ সা. এই কুরআনের বদৌলতেই পৃথিবী বিখ্যাত সোনার মানুষ তৈয়ার করেছিলেন। এ সোনার মানুষেরা ছিলেন হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা.।
আল কুরআন জাহেলিয়াতের যুগের সবচেয়ে অন্ধকার আত্মার মানুষদের সত্য ও সুন্দরের আলোয় আলোকিত করেছে। ক্রীতদাসকে উচ্চতর মর্যাদার ব্যক্তিত্বে পরিণত করেন। আল কুরআন স্পর্শে অনেক জিরো থেকে হিরোয় পরিণত হয়েছেন। কুরআনের নির্দেশনা অনুসরণ করে রাসূলুল্লাহ সা. এ ধরনের লাখ লাখ মানুষ তৈয়ার করেছিলেন। কুরআন অনুযায়ী তিনি নিরাপদ সমাজব্যবস্থা কায়েম করেছিলেন, সে রাষ্ট্রের এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্তে সুন্দরী নারী, মূল্যবান সব অলংকার পরে রাতে অথবা দিনে একাকী পথ চলেছেন, কেউ তার ওপর হামলে পড়বে তো দূরের কথা, কেউ তার দিকে মুখ তুলেও থাকাননি। আল কুরআন অনুযায়ী তিনি এমন এক অর্থ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যে, যাকাত গ্রহণ করার মতো কোনো ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া যেত না।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক সত্য হলো, আমরা কুরআনকে সেসব জায়গা থেকে উচ্ছেদ করেছি। কুরআনকে তার নিজস্ব স্থান থেকে বাস্তুচুত্য করেছি এবং সেসব স্থানে অবৈধ স্থাপনা তথা মানবরচিত মতবাদ স্থাপন করেছি। কুরআনকে হাসি-ঠাট্টার বস্তুতে পরিণত করেছি। ফলে আমাদের জীবনে নেমে এসেছে অমানিশার ঘোর অন্ধকার। বিষয়টি এখানেই থেমে থাকলে হয়তো ভালো হতো, কিন্তু দুনিয়ার জীবনে অপমান, অপদস্থ ও লাঞ্ছনার পরেও পরকালে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। আল কুরআনেই সংকীর্ণ জীবনের ধমকি প্রদান করা হয়েছে। সংকীর্ণ জীবন মানে এই নয় যে, দুনিয়ায় অভাব-অনটনের মধ্যে জীবনযাপন করতে হবে। বরং মানসিক স্থিরতা লাভ করতে পারবে না। কোটিপতি হয়েও মানসিক অস্থিরতায় ভুগবে। সাত মহাদেশের মহাপরাক্রমশালী সম্রাট হয়েও মানসিক অস্থিরতা ও অতৃপ্তির হাত থেকে মুক্তি পাবে না। তার চারপাশের সমগ্র সামাজিক পবিবেশের প্রত্যেকটি জিনিসের সাথে তার লাগাতর দ্বন্দ্ব লেগেই থাকবে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর যে ব্যক্তি আমার ‘জিকির’ (আল কুরআন) থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে তার জন্য হবে দুনিয়ায় সংকীর্ণ জীবন এবং কিয়ামতের দিন আমি তাকে উঠাবো অন্ধ করে। সে বলবে, হে আমার রব! দুনিয়ায় তো আমি চক্ষুষ্মান ছিলাম, কিন্তু এখানে আমাকে অন্ধ করে উঠালে কেন? আল্লাহ বললেন, হ্যাঁ, এভাবেই তো। আমার আয়াত যখন তোমার কাছে এসেছিল, তুমি তাকে ভুলে গিয়েছিলে এবং সেভাবেই আজ তোমাকেও ভুলে যাওয়া হচ্ছে। এভাবেই আমি সীমালঙ্ঘনকারী এবং নিজের রবের আয়াত অমান্যকারীকে (দুনিয়ায়) প্রতিফল দিয়ে থাকি এবং আখিরাতের আযাব বেশি কঠিন এবং বেশিক্ষণ স্থায়ী।” (সূরা ত্বহা : ১২৪-১২৭)।
শুরুতেই বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমে কুরআনকে সমাজের সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, সেই কুরআনকে যারা সমাজের সর্বস্তর থেকে বাস্তুচ্যুত করেছে বা উচ্ছেদ করেছে বা ঘরছাড়া করেছে, তাদের বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সা. কিয়ামতের দিন আল্লাহর আদালতে মামলা ঠুকে দেবেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর রাসূল বলবে, হে আমার রব! আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা এ কুরআনকে বাস্তুচ্যুত করেছিল।” (সূরা ফুরকান : ৩০)। রাসূলুল্লাহ সা.-এর এ মামলা থেকে তারাই রেহাই পেতে পারে বা মামলার চার্জশিট থেকে নিজের নামটি বাদ যেতে পারে, যদি তিনি সেই কুরআনকে পুনরায় তার সস্থানে ফিরিয়ে এনে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার আন্দোলনে করেন। অন্যথায় মামলার চার্জশিটে নিজের নামটি নথিভুক্ত হয়ে যেতে পারে। আল কুরআনকে যারা বাস্তুচ্যুত করেছে বা আল কুরআনকে তার স্বস্থান থেকে উচ্ছেদ করেছে, তারা রাসূলুল্লাহ সা.-এর দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি তো হবেই কিন্তু কুরআনের হক জানার পরও যারা কুরআনের হক ফিরিয়ে দেয়ার ব্যাপারে উদাসীন তারাও রাসূলুল্লাহ সা.-এর মামলার বিশেষ আসামি নথিভুক্ত হবেন। কারণ তিনি জুলুম হতে দেখেও চুপ ছিলেন। এ পরিস্থিতি থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য একমাত্র উপায় হলো, কুরআনের হক আদায় করার জন্য এবং কুরআনকে তার সস্থানে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
কুরআন এসেছে মানুষকে আলোর পথ দেখাতে। শয়তান প্ররোচনার মাধ্যমে আলোর পথকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করার জন্য এবং মানুষকে বিপদসংকুলে নিক্ষেপ করার জন্য এ মানুষ দিয়েই কুরআনকে উচ্ছেদ করেছে এবং সেই স্থানে মানুষের মস্তিস্ক প্রসূত আইনকানুন প্রতিষ্ঠিত করেছে। এ সকল আইন ও কানুন মানুষের উপকারের পরিবর্তে হাজারো সমস্যা এসে সমাজ ও সভ্যতাকে অস্থির করে তুলেছে। কোথাও শান্তি নেই। একটু শান্তির প্রত্যাশায় এক মানুষের আদর্শকে বাদ দিয়ে সেখানে অন্য মানুষের আদর্শ প্রতিষ্ঠিত করে শান্তি আনয়নের চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু আগের চেয়ে আরো জঠিল আরো বেশি করে সমস্যার অক্টোপাসে জড়িয়ে পড়েছে। তাছাড়া এসব আইনকানুন প্রকৃতিবিরোধী বলে প্রকৃতিও মানুষকে একটার পর একটা চপেটাঘাত করেই চলেছে। কারণ প্রকৃতির আইন ও কুরআনের আইনকানুন রচয়িতা এক আল্লাহ তায়ালা। ফলে প্রকৃতি আইন এবং আল কুরআনের আইনের কোনো বৈপরিত্য নেই। আজকের পৃথিবী অশান্তির দাবানলে জ্বলছে। কোথাও শান্তি নাই, শান্তি নাই। শান্তির পিপাসায় মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন মতবাদের দ্বারস্থ হয়ে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে বার বার ফিরে আসছে। মনে করুন বিশাল সমুদ্র, যার পানি মিষ্টি, এর পাশে দাঁড়িয়ে কোনো ব্যক্তি যদি তৃষ্ণার্থ হয়ে মরতে থাকে, তবে তার চেয়ে বড় বোকা আর কে হতে পারে? সমুদ্র থেকে এক অঞ্জলি পানি পান করলেই তো তার তৃষ্ণা মিটে যায়। সারা পৃথিবীর মানুষ আজ শান্তির পিপাসায় কাতরাচ্ছে। এ পিপাসা নিবারণের জন্য তারা চলে যাচ্ছে ড্রেনের পচা ও পূতি গন্ধময় পানির কাছে। তা পান করে রোগ-বালাই ও ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ছে মানুষের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বময়। ড্রেনের পচা পানি হলো, মানুষের মনগড়া মতবাদ, যা মানুষের মস্তিষ্ক প্রসূত। অথচ লোকটি আগে দেখল না তার ঘরে পানি আছে কিনা। তার ঘরে যে পানি আছে তার নাম ‘আবে হায়াত’ তথা ‘আল-কুরআন’।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় আমাদের বিরাট জনগোষ্ঠী আল কুরআনের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। আমাদের অনেকে হয়তো কুরআনকে পড়তে পারি না অথবা যারা আমরা পড়তে পারি, তারা এর অর্থ জানি না, অথবা অর্থ জানলেও গভীরে প্রবেশ করে তার আবেদনে সাড়া দেই না। সারা বিশ্বের মুসলমানদের দুরাবস্থার মূল কারণ এখানেই। আমাদের দেশের সাধারণ মুসলমানদের কথা আর কী বলবো? জাতির বিবেক বলে যাদেরকে আমরা শ্রদ্ধা করি, যাদের দায়িত্ব ছিল আল-কুরআনের সামগ্রিক ও প্রকৃত শিক্ষাকে মানুষের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে স্তরে পৌঁঁছে দেয়া, সেই আলেম সমাজই আজ দ্বিধাবিভক্ত,আত্মকলহে জর্জরিত। দুর্ভাগ্য বলতে হবে সেসব আলেমদের যাদের কাছে কুরআন নামক অমূল্য সম্পদ থাকার পরও বিভিন্ন মতবাদে লিপ্ত হয়ে ইসলামকে নাস্তানাবুদ করে চলেছেন। নিজেদের জেদ, শ্রেষ্ঠত্ব ও হেয়ালিপনার বশবর্তী হয়ে বিভেদের বিষ বৃক্ষ রোপণ করে চলেছেন। ফলে তা থেকে না উপকৃত হচ্ছেন নিজেরা, না উপকৃত হচ্ছন দেশবাসী।
আর আমরা সাধারণ মুসলমানগণ, তাদের বিরাট অংশ এ ভুল ধারণা নিয়ে বসে আছি, তা হলো- ‘কুরআন বোঝা আমাদের কাজ নয়, এটি আলেম-ওলামাদের কাজ।’ অথচ আল কুরআনের মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলছেন, “হে মানুষ! তোমাদের প্রতি তোমাদের রবের নিকট হতে এসেছে উপদেশ, তোমাদের অন্তরে যে (রোগ) আছে তার আরোগ্য এবং মুমিনদের জন্যে হিদায়াত ও রহমত।” (সূরা ইউনুস : ৫৭)। আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, “ইহা মানবজাতির জন্যে ব্যাখ্যা এবং মুত্তাকিদের জন্যে পথ নির্দেশ ও উপদেশ বাণী।” তিনি আরো বলেছেন, “তোমাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে তোমাদের নিকট স্পষ্ট প্রমাণ এসেছে গেছে সুতরাং কেউ তা দেখলে তার দ্বারা সে নিজেই লাভবান হবে। আর কেউ না দেখলে সে নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” (সূরা আন’আম : ১০৪)। হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত রাসূল সা. বলেছেন, “যার অন্তরে কুরআনের কিছুই নেই সে পরিত্যক্ত ঘর তুল্য।” (তিরমিযী)।