শহীদ ও আহতদের গেজেট প্রকাশের দাবি

জুলাই বিপ্লবীদের মূল্যায়ন জরুরি


২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৩:০৫

স্টাফ রিপোর্টার : হাসিনার দলীয় ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গুলির মুখে বুক পেতে দেওয়া জুলাই বিপ্লবীদের রাষ্ট্রীয় সহায়তা দেওয়া শুরু করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। তবে বিপ্লবে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের সবাই সরকারি গ্রেজেটভুক্ত হননি। প্রকৃত আহতদের তালিকা চূড়ান্ত হয়নি এখনো। রাষ্ট্রীয় অনুদান প্রক্রিয়া শুরু হলেও বিপ্লবে প্রাণ দেওয়া শহীদ পরিবারের সদস্য, আহত এবং তাদের স্বজনরা বেশকিছু দাবি নিয়ে রাজধানীর শাহবাগে কর্মসূচিও পালন করেছেন। স্বৈরাচার পতন আন্দোলনে অংশ নেওয়া বিপ্লবীদের যৌক্তিক সব দাবি মেনে নেওয়ার পক্ষে দেশের সচেতন নাগরিকরা। তাদের ভাষ্য, বিপ্লবে অংশ নেওয়া বীরদের যথাযথ মূল্যায়ন করা জরুরি। গত ১০ ফেব্রুয়ারি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ২১টি শহীদ পরিবার ও আহত ৭ ব্যক্তির মধ্যে রাষ্ট্রীয়ভাবে আর্থিক সহায়তার চেক হস্তান্তর করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে এ সহায়তা কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ওইদিন সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে এ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে তিনটি শহীদ পরিবার ও তিনজন জুলাই যোদ্ধা বক্তব্য রাখেন। তারা হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন। রাষ্ট্রীয় সম্মাননাপ্রাপ্তি, আর্থিক সহযোগিতা ও পুনর্বাসনসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। জুলাই গণআন্দোলনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তারা কান্নায় ভেঙে পড়েন। অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘সবসময় ভাবি, যাদের কারণে, যাদের ত্যাগের বিনিময়ে দেশটাকে আমরা নতুন বাংলাদেশ বলার সাহস করছি, তাদের এ ত্যাগ কোনো নিক্তি দিয়ে মাপা যায় না।’
এদিকে সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদরা ‘জুলাই শহীদ’ নামে অভিহিত হবেন। আহত ব্যক্তিরা ‘জুলাই যোদ্ধা’ নামে অভিহিত হবেন। পরিচয়পত্র পাবেন। প্রতিটি শহীদ পরিবার এককালীন ৩০ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা পাবে। এর মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাতীয় সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা দেওয়া হবে। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাইয়ে জাতীয় সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ২০ লাখ টাকা সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রতিটি শহীদ পরিবারকে প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়া হবে। শহীদ পরিবারের কর্মক্ষম সদস্যরা সরকারি ও আধাসরকারি চাকরিতে অগ্রাধিকার পাবেন।
জুলাই যোদ্ধারা দুটি মেডিকেল ক্যাটাগরি অনুযায়ী সুবিধা পাবেন। গুরুতর আহত ব্যক্তিদের ‘ক্যাটাগরি এ’ অনুযায়ী এককালীন ৫ লাখ টাকা দেওয়া হবে। এর মধ্যে ২০২৪-১৫ অর্থবছরে নগদ (ব্যাংক চেকের মাধ্যমে) ২ লাখ টাকা দেওয়া হবে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নগদ (ব্যাংক চেকের মাধ্যমে) ৩ লাখ টাকা দেওয়া হবে। পাশাপাশি গুরুতর আহত প্রত্যেক জুলাই যোদ্ধা মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতা পাবেন। বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে আজীবন চিকিৎসাসুবিধা পাবেন। মেডিকেল বোর্ডের সুপারিশে দেশি-বিদেশি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা পাবেন। তারা কর্মসহায়ক প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন-সুবিধা পাবেন।
‘ক্যাটাগরি বি’ অনুযায়ী, জুলাই যোদ্ধাদের এককালীন ৩ লাখ টাকা দেওয়া হবে। এর মধ্যে ২০২৪-১৫ অর্থবছরে নগদ (ব্যাংক চেকের মাধ্যমে) ১ লাখ টাকা দেওয়া হবে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নগদ (ব্যাংক চেকের মাধ্যমে) ২ লাখ টাকা দেওয়া হবে। পাশাপাশি মাসিক ১৫ হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হবে। কর্মসহায়ক প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও অগ্রাধিকারভিত্তিতে সরকারি-আধাসরকারি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। জুলাই যোদ্ধাদের পরিচয়পত্র প্রদান করা হবে। তারা পরিচয়পত্র দেখিয়ে সরকার কর্তৃক বিভিন্ন সুবিধাদি পাবেন। এখন পর্যন্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ৮৩৪ শহীদের তালিকা গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে সরকার। এছাড়া আহত ব্যক্তিদের তালিকাও প্রস্তুত করা হয়েছে। খুব শিগগির তালিকাটি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে জুলাই ও আগস্টে রাজধানীসহ সারা দেশে ১ হাজার ৪২৩ জন শহীদ হয়েছেন। এ সময় ২২ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে এ তথ্য জানিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্বাস্থ্যবিষয়ক কেন্দ্রীয় উপকমিটির সদস্য সচিব এবং কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক তরিকুল ইসলাম।
এদিকে শাহবাগে আন্দোলনে অংশ নেওয়া জুলাই বিপ্লবের আহত ও স্বজন বেশকিছু দাবি জানিয়েছেন। দাবিগুলো হচ্ছে, আহতদের দুটি ক্যাটাগরিতে বিবেচনায় যারা স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন তাদের মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতা, এককালীন ভাতা এবং পরিবারে দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে সরকারি বা আধাসরকারি পর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। আহতদের মধ্যে যারা সেরে উঠেছেন এবং কর্মক্ষম আছেন তাদের ১৫ হাজার টাকা মাসিক এবং এককালীন ভাতার ব্যবস্থা এবং সরকারি বা আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। গণঅভ্যুত্থানে আহত ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে আহত ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো হুমকি, হয়রানি বা হত্যাচেষ্টা হলে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান থাকতে হবে। এছাড়া আহত ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের মানসিক কাউন্সেলিং, হয়রানি প্রতিরোধ এবং সমস্যা সমাধানের জন্য টোল-ফ্রি হটলাইন চালুর দাবিও রয়েছে তাদের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. নিয়াজ আহমেদ খান বলেছেন, রাষ্ট্র সংস্কার যেমন জরুরি, তেমনিভাবে গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের বিপ্লবে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা জরুরি। তিনি আরো বলেন, এই বিপ্লব স্বল্পসময়ে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। ছাত্রদের ওপর বিশ্বাস রেখে আপামর জনগণ রাস্তায় নেমে আসায় এ বিপ্লবের সফলতা দ্রুত এসেছে।
বিশ্লেষকরাও মনে করেন, ফ্যাসিস্ট শাসন উৎখাতে যারা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা, তাদের এবং তাদের স্বজনদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে যে খারাপ দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হবে, তার দায় থেকে কেউ মুক্তি পাবে না। অবশ্য এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই করা জরুরি, যাতে রং বদলে ফ্যাসিবাদের কোনো দোসর সুবিধা নিতে না পারে।