রাজনৈতিক মেরুকরণ তীব্র হচ্ছে
২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৯:৩১
সক্রিয়ভাবে দৃশ্যমান ইসলামী শক্তি ও ছাত্র নাগরিক আন্দোলন
॥ ফারাহ মাসুম ॥
বাংলাদেশের রাজনীতি বর্তমানে এক গভীর ও ঐতিহাসিক রূপান্তরকাল অতিক্রম করছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটলেও, সেইসঙ্গে শেষ হয়নি রাজনৈতিক মেরুকরণ। বরং রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্র বদলের সঙ্গে সঙ্গে মেরুকরণের চরিত্রও বদলে গেছে। একসময় যেখানে দ্বন্দ্বের মূল অক্ষ ছিল আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপির ক্ষমতার দখল ও নিয়ন্ত্রণ ঘিরে- সেখানে এখন মেরুকরণ বিস্তৃত হয়েছে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো, গণতন্ত্রের রূপ, বৈধতার উৎস এবং সংস্কারের পরিধি ও সময়কে কেন্দ্র করে।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচন এ রূপান্তরকালীন রাজনীতির প্রথম বড় পরীক্ষা। প্রশ্ন এখন আর শুধু কে সরকার গঠন করবে- তা নয়; বরং কোন রাজনৈতিক দর্শন, কোন রাষ্ট্রচিন্তা এবং কোন সামাজিক চুক্তি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে পরিচালনার বৈধতা পাবে- সেই প্রশ্নই নির্বাচনের কেন্দ্রে উঠে আসছে।
এ বাস্তবতায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ আগামী নির্বাচনে আরও তীব্র হলেও তা হবে আগের চেয়ে অনেক বেশি বহুমাত্রিক, স্তরভিত্তিক ও আদর্শঘন। এটি আর শুধু দল বনাম দলের দ্বন্দ্ব নয়; বরং পুরোনো ক্ষমতাকাঠামো বনাম নতুন রাষ্ট্র পুনর্গঠনের আকাক্সক্ষার সংঘর্ষ।
পুরোনো দ্বিদলীয় মেরুকরণ ভাঙছে, কিন্তু সংঘাত কমছে না
দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি কার্যত আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি- এই দ্বিমেরু কাঠামোর মধ্যেই আবদ্ধ ছিল। নির্বাচন, সংসদ, রাজপথ, প্রশাসন- সব ক্ষেত্রেই এ দ্বন্দ্বই রাজনীতির প্রধান নির্ধারক ছিল। তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান সেই কাঠামোকে মৌলিকভাবে ভেঙে দিয়েছে।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত, সাংগঠনিকভাবে বিপর্যস্ত এবং অতীত মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম-খুন, নির্বাচন ব্যবস্থার ধ্বংস ও প্রশাসনিক দমননীতির কারণে গভীর বৈধতা সংকটে রয়েছে। দলটি রাজনীতিতে পুনর্গঠনের চেষ্টা করলেও সমাজের বড় একটি অংশের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ।
অন্যদিকে বিএনপি রাজপথের প্রধান সংগঠিত শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হলেও তাদের ঘিরে রয়েছে ভিন্ন ধরনের অনাস্থা। বিশেষ করে শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত, তরুণ ও জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী নাগরিকদের মধ্যে একটি প্রশ্ন প্রবল- বিএনপি ক্ষমতায় গেলে কি সত্যিই কাঠামোগত পরিবর্তন হবে, নাকি পুরোনো ব্যবস্থারই পুনরাবৃত্তি ঘটবে?
এ শূন্যস্থানেই রাজনীতিতে দৃশ্যমান হচ্ছে ইসলামী রাজনৈতিক শক্তি আর ছাত্র-নাগরিক আন্দোলন থেকে উঠে আসা নতুন শক্তি, নতুন ভাষ্য ও নতুন নৈতিক দাবি। তারা এখনো ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলের মতো সমান্তরালভাবে এগোচ্ছে। তারা রাজনীতির বয়ান, প্রশ্ন ও সীমারেখা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে দ্বিদলীয় কাঠামো শিথিল হলেও সংঘাত কমেনি; বরং সংঘাতের রেখা বিস্তৃত হয়েছে ক্ষমতা বনাম সংস্কার, নির্বাচন বনাম জবাবদিহি, স্থিতিশীলতা বনাম ন্যায়বিচার- এসব নতুন অক্ষ বরাবর।
নতুন মেরুকরণের তিনটি প্রধান অক্ষ
১. সংস্কার বনাম দ্রুত নির্বাচন
সবচেয়ে তীব্র ও নির্ধারক মেরুকরণ তৈরি হচ্ছে সংস্কার বনাম দ্রুত নির্বাচন প্রশ্নে। একপক্ষের যুক্তি- জুলাই অভ্যুত্থান কেবল সরকার পতনের আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বৈধতা পুনর্নির্মাণের দাবি। তাদের মতে, সংবিধান, নির্বাচন কমিশন, পুলিশ-প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা ও নিরাপত্তাকাঠামোয় মৌলিক সংস্কার ছাড়া নির্বাচন হলে তা পুরোনো সংকটকেই পুনরুৎপাদন করবে।
এ ধারার রাজনীতি জুলাই শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগকে নৈতিক মূলধন হিসেবে ব্যবহার করে সংস্কারকে ‘ঐতিহাসিক দায়’ হিসেবে উপস্থাপন করছে।
অন্যদিকে দ্রুত নির্বাচনপন্থীরা যুক্তি দিচ্ছে- দীর্ঘ অন্তর্বর্তীকাল গণতন্ত্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তারা মনে করে, সংস্কারের প্রশ্ন সংসদের ভেতরে গণতান্ত্রিকভাবে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। নির্বাচন বিলম্বিত হলে ক্ষমতার বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হবে।
এ দ্বন্দ্বেই মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়াচ্ছে সংস্কারকামী ও ছাত্র-নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আর ঐতিহ্যবাহী দলগুলো। এটি কেবল কৌশলগত নয়; বরং গণতন্ত্রের সংজ্ঞা নিয়েই একটি মৌলিক মতপার্থক্য।
২. পুরোনো রাজনৈতিক এলিট বনাম ‘জুলাই-উত্থিত’ শক্তি
এ মেরুকরণটি আদর্শগতের চেয়ে বেশি নৈতিক ও ঐতিহাসিক। একদিকে রয়েছে ৯০-পরবর্তী দলীয় রাজনীতির এলিট কাঠামো ক্ষমতাকেন্দ্রিকতা, ক্লায়েন্টেলিজম (সুবিধাভোগী অনুগত গোষ্ঠী), প্রশাসন দখল ও নির্বাচন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ। অন্যদিকে রয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা- শহীদদের স্মৃতি, রাষ্ট্রীয় সহিংসতার সাক্ষ্য এবং ‘আমরা ক্ষমতা চাই না, কাঠামো বদলাতে চাই’- এই ভাষ্য।
এ বিভাজন বিশেষভাবে প্রভাব ফেলতে পারে যুব ভোটার ও প্রথমবার ভোটারদের ওপর। তাদের কাছে প্রশ্নটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব নয়, বরং রাষ্ট্র তাদের সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক স্থাপন করবে, সেই প্রশ্ন।
এ মেরুকরণ ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ- তারা যদি কেবল ক্ষমতার ভাষায় কথা বলে, তবে এ ভোটার ব্লক বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।
৩. রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব বনাম ভূরাজনৈতিক বাস্তববাদ
পরবর্তী নির্বাচনে বিদেশনীতি ও নিরাপত্তা ইস্যু অপ্রত্যাশিতভাবে ভোটের বিষয় হয়ে উঠতে পারে। এক ধারায় রয়েছে ভারতকেন্দ্রিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নির্ভরতার বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী অবস্থান। সীমান্ত হত্যা, পানিবণ্টন, নির্বাচনকালীন আন্তর্জাতিক ভূমিকা- এসব প্রশ্নে এ ধারার রাজনীতি সরব।
অন্য ধারাটি ‘ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি’র নামে বাস্তববাদী সমঝোতার পক্ষে। তারা যুক্তি দেয়, আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে ভারসাম্য রক্ষা ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব নয়।
এ দ্বন্দ্ব নির্বাচনকে কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় না রেখে আঞ্চলিক ভূরাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করে দিচ্ছে।
নির্বাচনকেন্দ্রিক সম্ভাব্য তিনটি দৃশ্যপট
আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতি কোন পথে এগোবে- তা নির্ভর করছে ক্ষমতার ভারসাম্য, সংস্কারের গতি এবং জনগণের আস্থার ওপর। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অন্তত তিনটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট কল্পনা করা যায়। প্রতিটি দৃশ্যপটই ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক মেরুকরণ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনা বহন করে।
দৃশ্যপট এক : নিয়ন্ত্রিত বহুদলীয় মেরুকরণ
এ দৃশ্যপটে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তুলনামূলক নিয়ন্ত্রিত ও পূর্বানুমেয় পরিবেশে। বিএনপি প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে এবং সরকার গঠনের দৌড়ে এগিয়ে থাকবে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দল হিসেবে বিএনপি এ নির্বাচনকে ‘ফিরে আসার’ সুযোগ হিসেবে দেখবে এবং মাঠে ব্যাপক সাংগঠনিক শক্তি প্রয়োগ করবে।
আওয়ামী লীগ এ পরিস্থিতিতে সীমিত পরিসরে পুনর্গঠনের চেষ্টা করবে। দলটি সরাসরি ক্ষমতায় ফেরার বদলে টিকে থাকা, সংসদে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতের জন্য সাংগঠনিক ভিত্তি পুনর্নির্মাণে মনোযোগ দেবে। তবে অতীত দমননীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে দলটির প্রতি সামাজিক আস্থা সীমিত থাকবে।
এ দৃশ্যে নতুন রাজনৈতিক শক্তি; বিশেষ করে জামায়াত ও অন্য ইসলামী দলগুলো এবং ছাত্র-নাগরিক আন্দোলন থেকে উঠে আসা প্ল্যাটফর্মগুলো ভালো সাফল্য পেতে পারে। তাদের উপস্থিতি রাজনীতিতে নৈতিক ও বয়ানগত প্রবল চাপ তৈরি করছে। সংসদ ও জনপরিসরে সংস্কার, জবাবদিহি ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিচার প্রশ্নে তারা গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক মেরুকরণ থাকবে, তবে তা নিয়ন্ত্রিত থাকবে। সহিংসতা তুলনামূলক কম হবে এবং আন্তর্জাতিক মহল নির্বাচনকে ‘গ্রহণযোগ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারে। তবে এর সীমাবদ্ধতা হলো- এতে কাঠামোগত সংস্কারের প্রশ্ন আংশিকভাবে চাপা পড়তে পারে এবং পুরোনো রাজনীতির অনেক বৈশিষ্ট্য অব্যাহত থাকার ঝুঁকি থাকবে।
দৃশ্যপট দুই : সংস্কার প্রশ্নে তীব্র সংঘাত
দ্বিতীয় দৃশ্যপটটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্থিরতাপূর্ণ। যদি নির্বাচন কমিশন, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা বা সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হয়, তাহলে ‘নির্বাচন মানি না’ বনাম ‘নির্বাচনই সমাধান’- এ দ্বন্দ্ব রাজপথে রূপ নিতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে সংস্কারপন্থী শক্তি ও ছাত্র-নাগরিক আন্দোলনের একটি অংশ নির্বাচনকে “অপর্যাপ্ত সংস্কারের বৈধতা দেওয়ার প্রক্রিয়া” হিসেবে প্রত্যাখ্যান করতে পারে। অন্যদিকে ঐতিহ্যবাহী দলগুলো নির্বাচনকে একমাত্র সাংবিধানিক পথ হিসেবে তুলে ধরবে। এ দ্বন্দ্ব রাজনৈতিক মেরুকরণকে তীব্র ও আবেগঘন করে তুলবে।
রাজপথে বিক্ষোভ, পাল্টা সমাবেশ, প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা চাপে পড়বে এবং অর্থনীতি ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। আন্তর্জাতিক মহল; বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলো- নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে পারে।
এ দৃশ্যপটে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো- নির্বাচন যদি ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে নতুন সরকারের বৈধতাও দুর্বল হয়ে পড়বে। ফলে রাজনৈতিক মেরুকরণ নির্বাচনের পরেও প্রশমিত না হয়ে দীর্ঘস্থায়ী সংকটে রূপ নিতে পারে।
দৃশ্যপট তিন : নতুন রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস
তৃতীয় দৃশ্যপটটি তুলনামূলকভাবে আশাবাদী এবং দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তি প্রবলভাবে দৃশ্যপটে হাজির হবে। ছাত্র-নাগরিক শক্তির আংশিক হলেও প্রাতিষ্ঠানিক প্রবেশ ঘটবে- হোক তা নতুন রাজনৈতিক দল, জোট বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মাধ্যমে। তারা সংসদে বা রাজনীতির মূল স্রোতে দৃশ্যমান উপস্থিতি তৈরি করতে সক্ষম হবে।
এ পরিস্থিতিতে ঐতিহ্যবাহী দলগুলো কেবল ক্ষমতার ভাষায় নয়, সংস্কার, জবাবদিহি ও প্রতিষ্ঠানগত পরিবর্তনের ভাষ্য গ্রহণে বাধ্য হবে। রাজনীতির বয়ান ধীরে ধীরে ব্যক্তি ও দলকেন্দ্রিকতা থেকে সরে নীতি, কাঠামো ও রাষ্ট্রচিন্তাকেন্দ্রিক হয়ে উঠতে পারে।
এ দৃশ্যে মেরুকরণ থাকবে, তবে তা হবে আদর্শভিত্তিক- সংস্কার বনাম স্থিতাবস্থা, জবাবদিহি বনাম দায়মুক্তি, নাগরিক রাষ্ট্র বনাম ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাষ্ট্র- এ ধরনের স্পষ্ট রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি হবে। এটি গণতন্ত্রের জন্য স্বাস্থ্যকর হতে পারে। কারণ সংঘাতটি সহিংসতার বদলে রাজনৈতিক বিতর্ক ও নীতিগত প্রতিযোগিতায় রূপ নেবে।
তবে এ দৃশ্যপট বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সংগঠিত তরুণ ভোটার, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা। এসব শর্ত পূরণ না হলে এ সম্ভাবনা সীমিত হয়ে পড়তে পারে।
এ তিনটি দৃশ্যপটের কোনটি বাস্তবে রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে ক্ষমতাসীন অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশল এবং নাগরিক সমাজের সক্রিয়তার ওপর। তবে যেকোনো দৃশ্যপটেই স্পষ্ট- এ নির্বাচন শুধু ক্ষমতা বদলের লড়াই নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি সন্ধিক্ষণ।
কোন ফ্যাক্টরগুলো রাজনৈতিক মেরুকরণ নির্ধারণ করবে?
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ কোন দিকে যাবে- তা নির্ধারিত হবে কয়েকটি নির্দিষ্ট কিন্তু পারস্পরিকভাবে সংযুক্ত ফ্যাক্টরের ওপর। এ ফ্যাক্টরগুলো কেবল নির্বাচনী ফল নয়, বরং নির্বাচনপূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, রাষ্ট্রীয় বৈধতা এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ রূপরেখাও নির্ধারণ করবে।
১. সংস্কার কমিশনের সুপারিশ কতটা বাস্তবায়িত হয়
সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের মাত্রাই হবে মেরুকরণের সবচেয়ে বড় সূচক। যদি সংবিধান, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও নিরাপত্তা কাঠামোয় দৃশ্যমান ও বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার শুরু হয়, তাহলে সংস্কারপন্থী শক্তির মধ্যে আস্থার সৃষ্টি হবে এবং নির্বাচনকে ‘পুরোনো ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি’ হিসেবে দেখার প্রবণতা কমবে। বিপরীতে যদি কমিশনের সুপারিশ কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে বা রাজনৈতিক দরকষাকষির শিকার হয়, তাহলে সংস্কার বনাম নির্বাচন দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হবে। তখন একটি অংশ নির্বাচন বর্জনের দিকে যেতে পারে, যা মেরুকরণকে সহিংস ও অনিশ্চিত পর্যায়ে ঠেলে দিতে পারে।
২. জুলাই হত্যাকাণ্ড ও গুম-নির্যাতনের বিচার প্রশ্নে অগ্রগতি
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড এবং বিগত বছরের গুম-নির্যাতনের বিচার প্রশ্নে অগ্রগতি রাজনৈতিক মেরুকরণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে। বিচার প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি হলে রাষ্ট্রের নৈতিক বৈধতা বাড়বে এবং ‘দায়মুক্তির সংস্কৃতি’ ভাঙার ইঙ্গিত পাওয়া যাবে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, তরুণ আন্দোলনকারী ও নাগরিক সমাজের একাংশ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা রাখতে পারে। কিন্তু বিচার প্রক্রিয়া যদি দীর্ঘসূত্রতা, রাজনৈতিক প্রভাব বা প্রতীকী পদক্ষেপে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে ক্ষোভ জমতে থাকবে। এ ক্ষোভ নির্বাচনবিরোধী বয়ানকে শক্তিশালী করবে এবং মেরুকরণকে নৈতিক বনাম প্রাতিষ্ঠানিক দ্বন্দ্বে রূপ দেবে।
৩. নির্বাচন কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা
নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও সক্ষমতা মেরুকরণ প্রশমিত বা তীব্র- দুই দিকেই ভূমিকা রাখতে পারে। একটি গ্রহণযোগ্য, স্বচ্ছ ও কার্যকর নির্বাচন কমিশন থাকলে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তিগুলো অন্তত নির্বাচনী মাঠে লড়াইয়ে সম্মত হতে পারে। এতে মেরুকরণ রাজপথ থেকে ব্যালট বাক্সে স্থানান্তরিত হবে। কিন্তু কমিশনের ওপর যদি আস্থার সংকট থাকে- নিয়োগ প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বা ভোট ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে- তাহলে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অবিশ্বাস বাড়বে। তখন ‘নির্বাচন মানি না’ বনাম ‘নির্বাচনই একমাত্র পথ’- এ দ্বন্দ্ব তীব্র হবে।
৪. আন্তর্জাতিক শক্তির অবস্থান : মেরুকরণের বহির্মাত্রিক চালিকাশক্তি
আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ নির্ধারণে আন্তর্জাতিক শক্তির অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু জটিল ভূমিকা পালন করবে। বিশেষ করে ভারত ও পশ্চিমা ব্লক- যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও তাদের মিত্রদের নীতি ও বার্তা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশের নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক নজরদারির মধ্যে থাকায়, এবারও এই শক্তিগুলোর অবস্থান রাজনৈতিক পক্ষগুলোর কৌশল নির্ধারণে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠছে।
একদিকে যদি আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো নির্বাচনকেন্দ্রিক স্থিতিশীলতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয় এবং সংস্কার ও অতীত মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্নে নীরব বা নমনীয় থাকে, তাহলে দ্রুত নির্বাচনপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলো স্পষ্টভাবে সুবিধা পাবে। এ অবস্থানে নির্বাচনকে ‘স্থিতিশীলতার সমাধান’ হিসেবে উপস্থাপন করা হবে, যেখানে সংস্কারের প্রশ্নকে গৌণ বা দীর্ঘমেয়াদি এজেন্ডা হিসেবে দেখা হবে। এতে ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলগুলো; বিশেষত যারা দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে নিজেদের বৈধতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে।
বিশেষ করে ভারতের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত সংবেদনশীল। দিল্লি ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে স্থিতিশীল, পূর্বানুমেয় ও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক সরকারকে অগ্রাধিকারের কথা বলে এলেও তারা বাংলাদেশের আর্থসামাজিক রাজনৈতিক অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। যদি ভারত নির্বাচনকে দ্রুত শেষ করার পক্ষে অবস্থান নেয় এবং সংস্কার বা বিচার প্রশ্নে প্রকাশ্য আগ্রহ না দেখায়, তাহলে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী জাতীয়তাবাদী বয়ান আরও শক্তিশালী হতে পারে। এতে রাজনৈতিক মেরুকরণ শুধু অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে সীমাবদ্ধ না থেকে আঞ্চলিক ভূরাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়বে।
অন্যদিকে যদি পশ্চিমা ব্লক মানবাধিকার, জবাবদিহি, নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং জুলাই হত্যাকাণ্ড ও গুম-নির্যাতনের বিচার প্রশ্নে সক্রিয় চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে সংস্কারপন্থী ও ছাত্র-নাগরিক শক্তিগুলো নৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন পাবে। ভিসানীতি, নির্বাচন পর্যবেক্ষণ, নিষেধাজ্ঞার ইঙ্গিত কিংবা কূটনৈতিক বিবৃতির মাধ্যমে এ চাপ রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিতে পারে। এতে নির্বাচন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় না থেকে বৈধতা ও ন্যায়ের প্রশ্নে পরিণত হবে।
তবে এ আন্তর্জাতিক ভূমিকা নিজেই একটি নতুন ধরনের মেরুকরণ তৈরি করতে পারে। একদিকে থাকবে জাতীয়তাবাদী শক্তি, যারা আন্তর্জাতিক চাপকে ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ’ হিসেবে উপস্থাপন করবে। অন্যদিকে থাকবে আন্তর্জাতিক বাস্তববাদী বা উদার গণতান্ত্রিক ধারা, যারা বৈশ্বিক মানবাধিকার মানদণ্ডকে গণতন্ত্রের অংশ হিসেবে দেখবে। এ দ্বন্দ্ব রাজনৈতিক ভাষ্যকে আরও আবেগঘন ও তীক্ষè করে তুলতে পারে।
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক শক্তির অবস্থান বাংলাদেশের নির্বাচনী মেরুকরণকে কেবল প্রভাবিতই করবে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে তার দিকনির্দেশও নির্ধারণ করবে। প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত দাঁড়াবে- আন্তর্জাতিক সমাজ কি শুধু একটি ‘স্থিতিশীল নির্বাচন’ চায়, নাকি একটি ‘বৈধ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা’ গঠনে ভূমিকা রাখতে চায়? এই প্রশ্নের উত্তরের ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ কোন পথে মোড় নেয়।
৫. তরুণ ভোটারদের সংগঠিত অংশগ্রহণ
তরুণ ও প্রথমবার ভোটারদের অংশগ্রহণই মেরুকরণের দিক নির্ধারণে সবচেয়ে অনিশ্চিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। তারা যদি সংগঠিতভাবে ভোটে অংশ নেয় এবং সংস্কার, জবাবদিহি ও নৈতিক রাজনীতির দাবিকে প্রাধান্য দেয়, তাহলে রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য হবে বয়ান বদলাতে। কিন্তু তরুণদের হতাশা ও বিচ্ছিন্নতা বাড়লে মেরুকরণ আরও এলিটকেন্দ্রিক ও সংঘাতপ্রবণ হয়ে উঠতে পারে।
এ পাঁচটি ফ্যাক্টরের পারস্পরিক ক্রিয়াই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের দিকে নিয়ে যাবে, নাকি নতুন অস্থিরতার দ্বার খুলে দেবে।
উপসংহার : সরকার বদল, না রাষ্ট্র বদল?
পরবর্তী নির্বাচনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ কে ক্ষমতায় যাবে- এ প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকবে না। মেরুকরণের মূল প্রশ্ন হবে- বাংলাদেশ কি কেবল সরকার বদলাবে, নাকি রাষ্ট্রের চরিত্রই বদলাবে?
এ দ্বন্দ্বই আগামী নির্বাচনকে সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে রাজনৈতিকভাবে অর্থবহ, জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে।