আওয়ামী বয়ানের মোকাবিলায় বিজয় নিশান উড়বেই

হারুন ইবনে শাহাদাত
২১ আগস্ট ২০২৫ ১৪:৪২

॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
ভারতের আগ্রাসী উগ্র হিন্দুত্ববাদী শাসকগোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে মিথ্যা বয়ানের বিভ্রান্তির চক্রে ফেলে এ উপমহাদেশের মুসলমানদের মধ্যে বিভেদের জাল বিস্তার করে রেখেছে। সর্বশেষ এ চক্রান্তের শিকার হয়েছেন বাংলাদেশের মুসলমানরা। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর থেকেই চলছে উপমহাদেশের মুসলিমপ্রধান অঞ্চলগুলো হয় দখল, নয়তো দুর্বল করে রাখার ভারতীয় অপরাজনীতি। তবে আশার দিক হলো, বাংলাদেশ নামের এ ভূখণ্ডের একদল মানুষ বার বার তাদের সেই ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করছে বলেই ভারত চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে সফল হচ্ছে না। ১৯৭১ সালে এ অঞ্চলের মুসলমানদের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষাকে পুঁজি করে তারা নীলনকশা চূড়ান্ত করেছিলো। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনীর প্রধান জেনারেল বঙ্গবীর মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানীকে (বীর-উত্তম) মাইনাস করে ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের হাতে পাকসেনাদের আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করলেও দেশটি গ্রাস করতে পারেনি। মাত্র চার মাসের মধ্যেই ভারত সরকার ১৯৭২ সালের ১২ মার্চ সেনা প্রত্যাহারে বাধ্য হয়। রঙিন চোখের বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করলেও এর প্রকৃত কারণ হলো, কয়েক মাসেই ভারত বুঝতে পেরেছিলো- বাংলাদেশ দখলে রাখার লোভ করলে ভারতের অখণ্ডতা বিপন্ন হবে। বাংলাদেশের মেজর (অব.) জলিলের মতো সাহসী দেশপ্রেমিক সাবেক সেনাসদস্যরা স্বাধীনতার প্রশ্নে আপস করবেন না। তাছাড়া ভারতের বিরুদ্ধে যারা ২৬ মার্চের পর থেকে নিয়ে ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে, সেই সাহসী দেশপ্রেমিক তরুণরা যুদ্ধের মাঠ থেকে এত সহজে প্রস্থান করবে না। পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করলেও তাদের অস্তিত্ব ভারতীয় বাহিনীর জন্য ছিল আতঙ্ক। আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী বর্তমান ডেইলি স্টার পত্রিকার সম্পাদক মাহফুজ আনামের বাবা প্রখ্যাত লেখক আবুল মনসুর আহমদ পর্দার আড়ালে থেকে মুসলিম স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার কারিগর হিসেবে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করছিলেন বলে এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন সাংবাদিক ও লেখক মাহবুবুল হক।
ভারতের এ আতঙ্কের কথা জেনেই ইতালির প্রখ্যাত মহিলা সাংবাদিক ওরিয়ানা ফ্যালাচি বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সেনা প্রত্যাহারের মাত্র এক মাস আগে ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এক সাক্ষাৎকারে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘মিসেস গান্ধী আপনার বিজয়ের বিপদ পশ্চিমবঙ্গ এখন স্বাধীনতার কথা বলছে।’ (সূত্র: রহঃবৎারবি ডরঃয ঐরংঃড়ৎু)। তাই তৎকালীন প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ভারত বাংলাদেশে তাদের আগ্রাসন অব্যাহত রাখতে ভিন্ন নীলনকশা নিয়ে মাঠে নামে।
এ নীলনকশার অংশ হিসেবে তারা তাদের সমর্থক সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়াকে মাঠে মানায়। শুরু করে বয়ান তৈরির যুদ্ধ। বিভ্রান্তির জালে ফেলে বাংলাদেশের তরুণদের মাঝে প্রচার করে করতে থাকে নানা মিথ্যা কল্পকাহিনী। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তৈরি এসব বয়ানে ভয়াবহ মিথ্যাচার ছড়িয়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দুটি দেশের মধ্যে ঘৃণার বিষ ছড়ায়। কিন্তু ২০২৪ এর জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সেই বিষ বুমেরাং হয়ে তাদের দিকেই ফিরে গেছে। ভারতীয় আধিপত্যবাদী শক্তির বিশ্বস্ত ও অনুগত আওয়ামী লীগ ও তাদের দোসররা পরাজিত হয়ে তাদের প্রভুর দেশে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। ওরা বার বার পরাজিত হয়ে ভারত আশ্রয় নেয়, সেখানে বসে মিথ্যা বয়ানের পাহাড় গড়ে দেশের মানুষ ও বিদেশিদের বিভ্রান্ত করে নানা ছলে দেশে ফিরে ফ্যাসিজম কায়েম করে। ১৯৭১ এও তারা মুক্তিযুদ্ধকে সীমান্তের ওপরে নিয়ে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল। আহমদ ছফার ভাষায়, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পায়ে হেঁটে সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয় ভিক্ষা করতে ভারতে চলে যেতে বাধ্য হল।’ ‘যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা’র পরিণতি দাঁড়াল এই। কিন্তু শেষ নয়, এখানেই শুরু। (সূত্র: বেহাত বিপ্লব ১৯৭১, আহমদ ছফার মহাফেজখানা-১, সলিমুল্লাহ খান সম্পাদিত)। মুক্তিযুদ্ধ পায়ে হেঁটে ভারতে গিয়ে কী বয়ান নিয়ে ফিরেছে, সেই গোমর সম্প্রতি ফাঁস করেছেন প্রবাসী লেখক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় ডা. পিনাকী ভট্টাচার্য।
সেই গোমর: ৩০ লাখ নয়, মাত্র ২ হাজার
গত রবিবার (১৭ আগস্ট) নিজের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে পিনাকী ভট্টাচার্য তথ্য-প্রমাণসহ তুলে ধরে বলেন, মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা নব্যস্বাধীন বাংলাদেশের পুলিশের অনুসন্ধানী রিপোর্ট অনুসারে মাত্র ২ হাজার। পিনাকী ভট্টাচার্য আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কয়েকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তুলে ধরলেন, মাত্র তিনটি ডিভিশন ব্যবহার করে ৩০ লাখ মেরে ফেলা অসম্ভব বলে প্রমাণ করেছেন। কিন্তু এতদিন বিষয়টি চাপা পড়েছিল। কারণ আওয়ামী লীগ বাম ও ভারতীয় মিডিয়ার মিথ্যা তথ্যের বিরুদ্ধে তখন মুখ খোলার সুযোগ ছিল না। এ কথা যে মিথ্যা নয়- এর প্রমাণ সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে এ ব্যাপারে একটা বক্তব্য দিয়েছিলেন। সেটা শুনে আওয়ামী লীগ আর সিপিবি-বামদের মাথা খারাপ হয়ে গেছিল। চিল্লাপাল্লা শুরু করছিল। পারলে ওইদিনই খালেদা জিয়াকে জেলে নিয়ে যায়। খালেদা জিয়া বলছিলেন যে, মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে।
পিনাকী আরো উল্লেখ করেছেন, এখনো অনেকেই বলে; এমনকি যারা আওয়ামী লীগ তারাও বলে যে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শেষে শেখ মুজিব যখন ১০ জানুয়ারি ৯ মাস পশ্চিম পাকিস্তানে থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসে, তখন সে এক বিদেশি সাংবাদিককে নিহতের সংখ্যা তিন লাখ বলতে গিয়ে ইংরেজিতে ভুলে তিন মিলিয়ন বলে। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, এভাবেই জোর করে আওয়ামী লীগ, বাম ও ভারত ৩০ লাখের বয়ান ফেরি করে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
অথচ স্বাধীনতার পর একটি রিপোর্টে সংখ্যা বেরিয়ে আসে, ৩ লাখ, ৩০ হাজার বা ১০ হাজার নয়, মাত্র ২ হাজার। পুলিশের কাছে মাত্র ২ হাজার মানুষ নিখোঁজ থাকার অভিযোগ জমা পড়েছিল। বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান ও তদন্ত করলে প্রকৃত সংখ্যা কয়েক হাজারে নেমে আসবে বলে মনে করেন পিনাকী। ৩০ লাখ যেকোনো পরিসংখ্যানভিত্তিক তথ্য নয়, তা উঠে এসেছে ওরিয়ানা ফ্যালাচিকে দেয়া ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর এক সাক্ষাৎকারে। তিনি ওরিয়ানা ফ্যালাচির এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, ‘… অপরপক্ষের ১০ লাখ মানুষ হত্যার তুলনায় এটি খুবই কম।’ (সূত্র: রহঃবৎারবি ডরঃয ঐরংঃড়ৎু)। ওরিয়ানা ফ্যালাচি স্বাধীন দেশে মুজিবের সমর্থকদের হত্যা-সন্ত্রাস সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি এ উত্তর দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন, পাকিস্তানি বাহিনী ১০ লাখ মানুষ হত্যা করেছে। এতে মনে হচ্ছে যার মনে যা হয়েছে, তাই বলেছে, তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন মনে করেনি। শুধু নিহতের সংখ্যা নিয়ে নয়, মুক্তিযুদ্ধের সময় এক কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল, এটাও মিথ্যা কথা। তথ্য-প্রমাণ দিয়ে তিনি দাবি করেন, সে সময় ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল ৯ হাজার মানুষ। অথচ শেখ হাসিনার পতনের পর লাখ খানেক মানুষ ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। ১৯৭১ সালে এত মানুষ ভারতে আশ্রয় নেয়নি।
৩০ লাখের তেলেসমাতি
এখন প্রশ্ন হলো- ত্রিশ লাখের তেলেসমাতির রহস্য কী? এ প্রসঙ্গে পিনাকী বলেন, ‘সে সময় শেখ মুজিব এক বিদেশি সাংবাদিককে শহীদের সংখ্যা তিন লাখ বলতে গিয়ে তিন মিলিয়ন বলে ফেলেন। এরপর সংবাদমাধ্যমে কপি-পেস্ট হতে হতে সেটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। তিন লাখ সংখ্যাটাই-বা কোন সার্ভের ভিত্তিতে পেয়েছে। এ নিয়ে কোনো জবাব পাবেন না।’ এসব ভারতীয় প্রোপাগান্ডা বলে উল্লেখ করেন তিনি। পিনাকী ভিডিওটিতে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে ৩০ লাখ (৩ মিলিয়ন) শহীদের সংখ্যাকে ‘অত্যন্ত অতিরঞ্জিত’ এবং ‘একটি মনগড়া’ বলে অভিহিত করেন। তিনি এ সংখ্যার উৎপত্তির জন্য শেখ মুজিবুর রহমানের ভুলকে দায়ী করেছেন। তিনি দাবি করেন, শেখ মুজিব ভুল করে একজন বিদেশি সাংবাদিককে ‘৩ লাখ’ (৩০০,০০০) এর পরিবর্তে ‘৩ মিলিয়ন’ বলেছিলেন। তিনি দ্য গার্ডিয়ানে আমেরিকান সাংবাদিক উইলিয়াম ড্রামন্ডের একটি প্রতিবেদনেরও উদ্ধৃতি দিয়েছেন, যেখানে বলা হয়েছে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে মৃত্যুর প্রায় ২,০০০ অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে দায়ের করা হয়েছিল।
পিনাকী বলেন, এই অতিরঞ্জিত সংখ্যা প্রচারের উদ্দেশ্য ছিল উপমহাদেশের মুসলমানদের মধ্যে ঘৃণা জাগানো এবং ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে বাধা দেওয়া। তিনি দাবি করেন, এ মিথ্যা বর্ণনাটি আওয়ামী লীগ তার রাজনৈতিক ক্ষমতা বজায় রাখার জন্য একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। ভিডিওটিতে পিনাকী সম্মানিত সামরিক ও শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্বচ্ছ, আন্তর্জাতিক কমিশনের প্রস্তাব করেছেন; যাতে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণের জন্য একটি বিস্তৃত মাঠ জরিপ পরিচালনা করা হয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এ ধরনের তদন্ত ‘ভারতীয়-আওয়ামী বয়ান’ উন্মোচিত করবে এবং সত্যের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের একটি নতুন ইতিহাসের দিকে পরিচালিত করবে। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, পিনাকী ভট্টাচার্য যেসব তথ্যসূত্র উল্লেখ করেছেন, তা খুবই নির্ভরযোগ ও শক্তিশালী। তাই বিষয়টির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।
কী সেই শক্তিশালী তথ্য সূত্র
পিনাকী ভট্টার্যের দেয়া রেফারেন্সগুলো হলো- ৭১ সাল নিয়ে সবচেয়ে বেশি স্কলারলি বই হলো, লিসন আর রোজের লেখা বই ‘ওয়ার এন্ড সেশন পাকিস্তান, ইন্ডিয়া এন্ড দ্য ক্রিয়েশন অফ বাংলাদেশ’। ১৯৯১ সালে পাবলিশ হয় বইটা। এখানে দুইজন লেখক এ বইতে দেশগুলার সমস্ত অফিসিয়াল ডকুমেন্ট রিভিউ করছেন এবং তিন দেশের ৭২ সালে ভূমিকা রাখা সব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ইনপার্সন সামনা-সামনি সাক্ষাৎকার নিছেন। এ সমস্ত তথ্য-প্রমাণ তারা বিশ্লেষণ করে এ বইটা লিখছেন। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রামাণ্য বই। এই বইয়ের লেখকরা ৭১ সালে বাংলাদেশের যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ করা দুইজন অত্যন্ত সিনিয়র ভারতীয়ের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। যেখানে তাদের জিজ্ঞেস করা হয় ৭১ সালে নিহত বাঙালির সংখ্যা কত? একজন ভারতীয় উত্তর দেয়, ৩ লাখ। পিনাকী মনে করেন, লেখকদের কাছে ৩০ লাখের মতো অবাস্তব ভাষ্য করা একটা সংখ্যা বেচা যাবে না বলেই এ সংখ্যা বলেছে। পিনাকী বলেন, মজার ব্যাপার হচ্ছে ওই ভারতীয় যখন ৩ লাখ বলে তার পাশে বসে তাকায় থাকা আরেকজন ভারতীয় তার দিকে কটমট করে তাকিয়ে সংখ্যা বাড়াও এটা বোঝানোর জন্য। এরপর প্রথম ভারতীয় এক ধাক্কায় তার সংখ্যা বাড়িয়ে ৫ লাখ বলে ফেলে।
১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর বিলাতের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় একটা আর্টিকেল প্রকাশিত হয়। ‘বিগ ব্রাদার গোস টু ওয়ার’ এর লেখক শাস্তিব্রত একজন ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ভারতীয় বাঙালি সাংবাদিক, যিনি ত্রিপুরায় ভারতীয় ট্রেনিংশিপ ঘুরে দেখে এসে সেখানে মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিং নিয়ে একটা রিপোর্ট করেন। রিপোর্টে এটাও লেখা আছে, এই রিপোর্ট যদি ভারত থেকে করতো তাকে ভারতে গ্রেপ্তার করতো। উনি সেপ্টেম্বর মাসে আগরতলায় একটা ক্যাম্পে মুক্তিবাহিনীর ভলান্টিয়ারদের সাথে কথা বলে জানতে পারেন, সেখানে ২০০ জনের ভলান্টিয়ারদের মধ্যে মাত্র ছয়জনকে সামান্য কিছু ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে। মাত্র তিনজন কোন একটা অপারেশনে অংশ নিছে। সব অপারেশনে যেমন ব্রিজ ধ্বংস করে এরকম কাজে ইন্ডিয়ানরা কিন্তু নিজে করতো। মুক্তিবাহিনীর নিজেদের সদস্যদের মতে তারা বড়যোদ্ধা একটা গ্রেনেড নিক্ষেপ করছে।
বিখ্যাত আমেরিকান সাংবাদিক উইলিয়াম ড্রাম ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া বার্কলের প্রফেসর। ৭২ সালের ৬ জুন বিলাতের গার্ডিয়ান পত্রিকা ঢাকা থেকে পাঠানো উনার সেই রিপোর্টটা ছাপে। যুদ্ধের পর বাংলাদেশের গ্রাম পর্যায়ে অসংখ্যবার ভ্রমণ কইরা গ্রামের মানুষজনের সাথে এই ব্যাপারে কথা বলেন। এছাড়া সরকারি বিভিন্ন মানুষের সাথেও ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেন। উনি লিখছেন ইংরেজিতে ‘মাই জাজমেন্ট বেসড অন নিউমেরাস স্ক্রিপউন্ড বাংলাদেশ এন্ড এক্সটেন্সিভ ডিসকাশন উইথ মেনি পিপল ভিলেজ লেভেল এ্যাজ ওয়েল ইন গভমেন্ট থ্রি মিলিয়ন ডেথ ফিগার ইজ এক্সাজারেশন সো গ্রস টুবি’। তার মানে উনি বলতেছেন যে, আমি বিভিন্ন সরকারি লোক এবং গ্রামের লোকদের সাথে আলাপ-শালাপ কইরা যেটা বুঝতে পারছি যে এই ৩০ লাখ নিহতের সংখ্যা এত বেশি বাড়িয়ে বলা, যেটা একটা অসম্ভব এবং ভুয়া একটা সংখ্যা। এরপরে উনি মুজিবের করা নিহতের সংখ্যা নিয়া একটা সার্ভের কথা প্রকাশ করেন। মুজিব ৭২ সালে দেশে ফিরে এসে ৩০ লাখ নিহত বলার পর একটা সরকারি উদ্যোগ নিয়েছিলেন নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা বের করার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেশের তৎকালীন পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেলকে দায়িত্ব দেওয়া হয় যে প্রত্যেক থানায় পুলিশের মাধ্যমে একটা রিপোর্ট পাঠাইতে ওই থানায় ৯ মাসে পাকিস্তান আর্মির হাতে নিহত মানুষের সংখ্যা কত এবং সেগুলো যোগ করে কত আসে। মুজিব সেই রিপোর্ট পাওয়ার পর সংখ্যা দেখে স্বাভাবিকভাবেই সেটাকে ধামাচাপা দেয়। উইলিয়াম ড্রাম একদম সরকারের ভেতর থেকে সেই রিপোর্ট দেখে সে সংখ্যা প্রকাশ করে। সংখ্যাটা মাত্র ২ হাজার।
আওয়ামী ও ভারতীয় বয়ানের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ যুক্তি
ভারতীয় মিডিয়া ও আওয়ামী লীগের মিথ্যাচার বিগত ২০২৪-এর জুলাই-আগস্ট বিপ্লব যারা দেখেছেন, তাদের কাছে ব্যাখ্যার প্রয়োজন। গত ৬ আগস্ট বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ এদিন সাক্ষ্য দেন দুই প্রত্যক্ষদর্শী। তারা হলেন- বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রিনা মুরমু এবং এনটিভির রংপুর প্রতিনিধি একেএম মঈনুল হক। তারা ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই সংঘটিত আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের আগের ও পরের পরিস্থিতি আদালতের সামনে তুলে ধরেন। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আসামিপক্ষের রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন দুই সাক্ষীকে জেরা করেন। সাংবাদিক মঈনুল হককে জেরা করতে গিয়ে হাসিনার আইনজীবী আমির হোসেন দাবি করেন, আবু সাঈদের ওপর হামলার যে ভিডিও ফুটেজ রয়েছে, তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। তবে মঈনুল হক এ দাবি অস্বীকার করে জানান, ফুটেজটি তিনি নিজেই ধারণ করেছেন এবং সেটি সম্পূর্ণ সত্য।’
এ ঘটনা ঘটেছে প্রকাশ্য দিবালোকে হাজার হাজার মানুষের সামনে। রক্তের চিহ্ন এখনো মুছে যায়নি। সেই ঘটনা নিয়ে যারা এমন মিথ্যাচার করতে পারে। তাদের বিশ্বাস করা মানে প্রতারিত হওয়া। যে প্রতারণার ধূম্রজালে এ দেশের মানুষ দীর্ঘ ৫৪ বছর ধরে ঘুরপাক খাচ্ছে। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, এবার সময় এসেছে সত্য প্রকাশ করে আওয়ামী লীগ বাম ও ভারতীয় বয়ান ছুড়ে ফেলে দিয়ে প্রকৃত সত্য জাতিকে জানানোর।
বাস্তবতার আলোকে বিবেকের জাগরণ
দলান্ধ না হয়ে বাস্তবতার আলোকে বিবেক জাগ্রত করে পৃথিবীর ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারতের ফ্যাক্টরিতে আওয়ামী বাম বয়ান আসলে মিথ্যার ফানুস ছাড়া কিছু নয়। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে ইস্টান ফ্রন্টে পাকিস্তান আর্মির অর্ডার অব ব্যাটেল কী ছিল। অর্ডার অব ব্যাটেল হইতেছে একটা যুদ্ধে দুই পক্ষের মধ্যে কার কয়টা ইউনিট অংশ নিয়েছে, কোন ইউনিট কী রকম, সেটার একটা লিস্ট তালিকা আর কী। যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ১৯৪১ সালে জার্মানি যখন সোভিয়েত ইউনিয়নে হামলা করে সেটার নাম দিছিল অপারেশন বারবার। এ অপারেশন বারবার ছিল ব্যাপক একটা অভিযান।
মিলিটারি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অভিযানগুলোর মধ্যে একটা। সেখানে জার্মানপক্ষে ১৪১টা ডিভিশন অংশ নেয়। সোভিয়েতপক্ষে জার্মানির এস্টিমেট ছিল ২১৪টা ডিভিশন। একটা ডিভিশন প্রায় ১৫ থেকে ১৬ হাজার সৈন্য থাকে। ৭১ সালে ইস্টারন ফ্রন্টে পাকিস্তান আর্মির অর্ডার অব ব্যাটল ছিল তিনটা মাত্র- ১৪ ডিভিশন, ১৬ ডিভিশন আর ৯ ডিভিশন। ১৪ ডিভিশন আগে থেকেই ছিল। মার্চের শেষ দিকে এপ্রিল মাসে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অতিরিক্ত ১৬ আর ৯ ডিভিশন আসে।
জার্মানরা জাতি হিসেবে হাইলি এফিশিয়েন্ট জাতি। জার্মানি তখন প্রথম বিশ্বের একটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল দেশ ছিল যাদের লজিস্টিক্যাল ক্যাপাবিলিটি ট্রিমেন্ডাস ছিল। তাও এত এফিশিয়েন্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল একটা জাতি পাঁচ বছরে শত শত ডিভিশন সৈন্য আর তাদের ট্রিমেন্ডাস ইন্ডাস্ট্রিয়াল লজিস্টিক্স ক্যাপাসিটি ব্যবহার করে সারা ইউরোপ খুঁজে খুঁজে মাত্র ৬০ লাখ ইহুদি মারতে পারলো আর পাকিস্তানের মতো একটা তৃতীয় বিশ্বের দেশ মাত্র ৯ মাসের কাউন্টার ইনসার্জেন্সি অপারেশনে মাত্র তিনটা ডিভিশন ব্যবহার কইরা কোন বিশাল বিশাল গ্যাস চেম্বার ইন্ডাস্ট্রিয়াল চুল্লি ব্যবহার না কইরা ৩০ লাখ লোক মেরে ফেলা যুক্তিতে টিকে না।
পিনাকী বলেন, ২০২৩ সালে গাজার যুদ্ধে ইসরাইল প্রায় দুই বছর ধরে গাজার উপরে ব্যাপক এরিয়াল বোম্বিং করছে। গ্যাস চেম্বারের পর এরিয়াল বোম্মিং হচ্ছে সবচেয়ে বড় এফিশিয়েন্ট মেথড অব জেনোসাইড। যুদ্ধবিমান থেকে ১০০০ বা ২০০০ পাউন্ডের একটা বোমা একটা ঘন বসতিপূর্ণ এলাকায় ফেললে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। অসংখ্য মানুষ হতাহত হয়। এরপরও গাজার হেলথ মিনিস্ট্রির হিসেবে গাজায় দুই বছরে নিহতের সংখ্যা ৭০০০০-এর মতো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে ব্লাডিয়েস্ট রক্তাক্ত যুদ্ধ ছিল ফ্রান্সে ভারডুনের যুদ্ধ। এই যুদ্ধ ১৯১৬ সালের ১০ মাস ধরে সংঘটিত হয়। ১০ মাস ধরে ১২ লাখ জার্মান আর ১১ লাখ ফরাসি সৈন্য রিলেটিভলি একটা অত্যন্ত ছোট এলাকায় জড় হয়ে ক্রমাগত আক্রমণ-প্রতি আক্রমণ করতে থাকে। দুই দেশই শিল্পোন্নত। প্রথম বিশ্বের দেশ। বিশাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল আর লজিস্টিক্যাল ক্যাপাসিটি। ভারডুনে জার্মানরা প্রথম দিন ফরাসি পজিশনে ১০ লাখ আর্টিলারি শেল নিক্ষেপ করছিল। একদিনে পুরা যুদ্ধে দুই পক্ষ মিলে চার থেকে পাঁচ কোটি খালি আর্টিলারি শেল নিক্ষেপ করছে। কত কোটি কোটি রাউন্ড রাইফেল আর মেশিনগান গুলি খরচ করছে, সেটা তো হিসাবই নাই। ভারডুনে যুদ্ধে জার্মান সৈন্য ক্যাজুয়ালটি বা নিহত হইছে দেড় লাখ, ফরাসি হতাহতের সংখ্যা দেড় লাখের মতো, সেখানে পাকিস্তান পুরা ৯ মাসের কাউন্টার ইনসার্জেন্সি অপারেশনে কোথাও কোনো ধরনের এরিয়াল বোম্বিং না কইরা ৩০ লাখ বা তিন লাখ মাইরা ফেলল? এটা মূর্খ প্রগতিশীলদের বয়ান বলে মনে করেন পিনাকী।
তিনি মনে করেন, ‘৭১ সালে জীবিত প্রাপ্তবয়স্ক বহু মানুষ এখনো জীবিত আছে। এরকম রেড প্রত্যেক গ্রামে তো হয় নাই। দেশে ৬৮ হাজার গ্রামের মধ্যে অতি অল্পসংখ্যক গ্রামেই হয়েছে। তার ওপরে এক গ্রামে বড়জোর একবার কি দুইবার এরকম রেড হয়েছে। দিন সময় সপ্তাহ অনুযায়ী পুরা ৯ মাসের ঘটনাকে রিকনস্ট্রাক্ট করা এভাবে সম্ভব। এটা করা হইলে কমন সেন্সর ইনভেস্টিগেটিভ সব রিপোর্ট অনুসারে পাকিস্তান আর্মির কাউন্টার ইনসার্জেন্সির আসলে নিহতের সংখ্যা কয়েক হাজারে নেমে আসবে। এরপর সেই তদন্ত খালি বাঙালি না। ভারতীয় আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হাতে যত অবাঙালি মুসলমান মারা গেছে, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে সেটাও বের করতে হবে। দুইটা সংখ্যায় কম্পেয়ার করে ঠিক করা হবে। এ তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কেউ কারো কাছে ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।’ ওরা কথায় কথায় দেশ ছাড়ার কথা বলে, আসলে দেশটার আসল মালিক কারা? কার বাবার?
দেশ কারো বাবার না
উগ্র হিন্দুত্ববাদী ভারতীদের বয়ানে বার বার সঙ্কটে পড়েছে বর্তমান বাংলাদেশ নামের এ ভূখণ্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানরা। ঐতিহাসিক ভিত্তিহীন ও শিকড়ছেঁড়া তথ্য দিয়ে তারা এদেশের মুসলমানদের বহিরাগত প্রমাণ এবং বিভেদ সৃষ্টি করতে সদা তৎপর। অথচ শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা হিন্দুস্থানের আদি অধিবাসী মুসলমানরা। তাদের পূর্বপুরুষের নামেই হিন্দুস্থান ও বাংলাদেশের নামকরণ হয়েছে। প্রাচীন ইতিহাস গ্রন্থ ‘রিয়াজ-উস-সালাতিন’-এ এ বিষয়ে পরিষ্কার উল্লেখ করা হয়েছে, ‘ঐতিহাসিক ইবনু খালদুনের মতে, আদম (আ.)-এর দশম অধস্তন পুরুষ নূহ (আ.)। নূহ (আ.)-এর চার পুত্র : সাম, হাম, ইয়াফিছ ও ইয়াম অথবা কেনআন। হামের পুত্রগণ : হিন্দ, সিন্ধ, হাবাস, জানায, বার্বার, নিউবাহ। হিন্দের পুত্রগণ : (ক) বঙ্গ (বঙ্গ থেকে বঙ্গদেশ/বাংলাদেশ), (খ) পুরব, (গ) দখিন, (ঘ) নাহরাওয়াল। মহাপ্লাবনের পর নূহ (আ.)-এর বংশধররাই নতুনভাবে পৃথিবী সাজিয়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাস রচনার পথিকৃৎ গোলাম হোসায়ন জইদপুরি ১৭৬৬-১৭৮৮ সালে রচনা করেন ফারসি গ্রন্থ ‘রিয়াজ উস সালাতিন’। তিনি নূহ (আ.)-এর সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাসের একটা সম্পর্কের বিষয় উত্থাপন করেছেন। [সূত্র : ড. মোহাম্মদ হাননান : বাঙালির ইতিহাস (প্রাচীন যুগ থেকে ১৯৭৪), আগামী প্রকাশনী, ৩৬, বাংলাবাজার ঢাকা-১১০০, প্রথম বর্ধিত সংস্করণ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, পৃষ্ঠা ২৮]।
এদেশ শুধু নয়, উপমহাদেশের আদি ভূমিপুত্র মুসলমানরা। তাদের দেশ ছাড়ার হুমকি দেয়া ইতিহাসের সাথে প্রতারণা বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা। তাই আসুন, ভারতের তৈরি আওয়ামী বাম বয়ান জয় বাংলা করে ২০২৪-এর চেতনায় বিজয় নিশান উড়াই।