ইসলামপন্থি শক্তি যত শক্তিশালী হবে, রাজনীতি তত বিশুদ্ধ হবে

হারুন ইবনে শাহাদাত
১০ জুলাই ২০২৫ ১১:০৯

॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
“রাষ্ট্রনীতি এতই জটিল ও কুটিল যে, এর মর্ম ভেদ করা বড়ই কঠিন”। কারবালার ঐতিহাসিক ঘটনা অবলম্বনে মীর মশাররফ হোসেনের বিখ্যাত উপন্যাস বিষাদ সিন্ধুর এ উক্তি মহররম মাস বলেই হয়তো এ মুহূর্তে মনে পড়লো। অবশ্য এর অংশবিশেষ মাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠক্রমে “রাষ্ট্রনীতি ও স্বাধীনতা” শিরোনামেও গ্রন্থিত ছিল। ৩৬ জুলাই বা ৫ আগস্ট বিপ্লবের পর দেশে পুরোদমে সংস্কার চলছে। সংস্কারের কাটাছেঁড়ার এ পরিবর্তনপূর্ব সময়ে একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী- যাদের পরিচয় রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী তারা তাদের ক্ষুধা মেটাতে জনগণের প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় ন্যায্য হিস্যা ছিনতাইয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাদের এ ব্যস্ততার সাথে তুলনা চলে গরু মরার পর শকুনের টানাহ্ঁেচড়ার সাথে। রাজনীতি বিশ্লেষকরা অবশ্য এজন্য চিহ্নিত ঐ গোষ্ঠীকে এককভাবে দায়ী করতে চান না। কেন চান না, সেই বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ঘুরে-ফিরে আসছে, “রাষ্ট্রনীতি এতই জটিল ও কুটিল যে, এর মর্ম ভেদ করা বড়ই কঠিন”- এ অমর বাণী। কারণ রাজনীতি রাষ্ট্র পরিচলনার সাথে জড়িয়ে আছে ক্ষমতা-দাপট, অর্থ-বিত্তের প্রবল প্রভাব। কিন্তু এখানে ক্ষমতাবান মানুষটিকে হতে হবে নির্লোভ, মানবপ্রেমিক ও দেশপ্রেমের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। রাজনীতির উথাল-পাতাল সাগরে এ যুগে চলছে বিত্তবান-দুর্বৃত্তদের দাপট। এখানে নির্লোভ, মানবপ্রেমিক ও দেশপ্রেমের পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের মেরুদণ্ড সোজা করার পরিবেশ তৈরি হতে দেয়া হয়নি। স্বাধীনতার পর থেকে নিয়ে এমন গোষ্ঠীগুলো রাজনীতি, রাষ্ট্র ও সরকার নিয়ন্ত্রণ করেছে, যারা নিজেরা মানবসেবার আড়ালে নিজেদের রাজা-জমিদার ভাবতে শুরু করেন। সেই ধারাবাহিকতায় রাজনীতিতে নাম লেখিয়ে কোনো পদ-পদবি দখল করা বিত্তহীন মানুষটি হয়ে ওঠেন জমিদার। জমিদারি টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন লাঠিয়াল বাহিনী। যাদের আধুনিক নাম জঙ্গি, সন্ত্রাসী কিংবা ক্যাডার। তারা নগদ পাওনায় বিশ্বাসী।
নগদ যা পাও হাত পেতে নাও
এই যখন রাজনীতির অবস্থা, তখন ভালো মানুষ এবং আদর্শিক রাজনীতিবিদরা বড় অসহায়। তাদের সামনে লুটেরারা সরকারি জমি দখল, ভিজিএফ কার্ড, হাটের ইজারা, টোলপ্লাজার ঠিকাদারি, বালুমহাল, জলমহাল, বন, নদনদী, সাগর লুট করলেও দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ এড়াতে ভালো মানুষরা চুপচাপ ‘দাওয়াতি’ কাজ করেন। তাদের আহ্বানে সাড়া দেন নিরীহ ভদ্রলোকরা। অন্যদিকে লুটে ভাগ পাওয়ার লোভে প্রচলিত রাজনীতির মঞ্চ বড় হতে থাকে। ভাগের টাকা বাড়াতে রাস্তায়, পরিবহনে চাঁদাবাজি; এমনকি ছিনতাইকারী, চোর-ডাকাতের সংখ্যাও বাড়তে হবে। যেহেতু ওনারা রাজনীতি করে, অতএব পুলিশ কেন বোকামি করবে, ওহারাও বলেন, আমাদের হিস্যা দাও, তোমরা শান্তিতে থাকো। অশান্ত জনগণ চিল্লাতে থাক। তাতে কী? তোমাদের-আমাদের পকেট তো ভারী হচ্ছে। কবি ওমর খৈয়ামের ভাষায়, ‘দূরের বাদ্য শুনে কি লাভ/মাঝখানে তার বেজায় ফাঁক/নগদ যা পাও হাত পেতে নাও/বাকির খাতায় শূন্য থাক।’ এখানে উল্লেখ্য, পারস্যের কবি ওমর খৈয়াম একজন আল্লাহভীরু সুন্নি মুসলমান। তিনি নাস্তিক-লোভী মানুষের চরিত্র বিশ্লেষণ করেছেন ওপরের কবিতায়।
গত ৫ আগস্টের বিপ্লবের পর নব্য তরুণরা আশা জাগিয়েছে। দেশের সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সোচ্চার হচ্ছে। তাদের সাথে যোগ দিয়েছে অন্যান্য ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দল এবং আরো অনেক মানবদরদি দেশপ্রেমিক দল, নাগরিক সমাজ ও সাধারণ মানুষ। প্রতিবাদী জনতা, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং প্রশাসনের সৎ-নিষ্ঠাবান সদস্যরা নতুন সাহসে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। কারণ তাদের বিশ্বাস, এখন আর এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম শাহ আবদুল হান্নান, পুলিশ সুপার (এসপি) জসিম উদ্দীন, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপসহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিনদের মতো ফ্যাসিস্ট হাসিনার রোষে পড়ে কারো চাকরি হারানোর ভয় নেই।
রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শক্ত অবস্থান দেশের জন্য ইতিবাচক। তারা এলাকার সৎ সমাজসেবক প্রভাবশালী লোকদের হাতে হাটের ইজারা, টোলপ্লাজার ঠিকাদারি, বালুমহাল, জলমহাল, বন, নদনদী, সাগর, ভিজিএফ কার্ডসহ সরকারি সম্পদ পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেয়ার ব্যবস্থা করলে এসব ক্ষেত্রের নৈরাজ্য বন্ধ হবে। এর মানে এ নয়, তার দলের লোকদের বা দলীয়ভাবে দায়িত্ব নেয়ার কথা বলা হচ্ছে। সমাজের সচেতন অংশ এবং রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। কারণ সমাজ, রাষ্ট্রে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং রাজনীতিকে দুর্বৃত্তমুক্ত করলে শুধু জামায়াতে ইসলামী নয়, দেশ ও জনগণও লাভবান হবে। কারণ দেশে এমন লোকের অভাব নেই, যাদের প্রসঙ্গে মরমী কবি লালন বলেন, “শুনি মরিলে পাব বেহেস্তখানা, তা শুনে তো মন মানে না। বাকির লোভে নগদ পাওনা কে ছাড়ে এই ভুবনে।” এমন চরিত্রের লোকের অভাব নেই। তারা দুনিয়া ও আখিরাতের লাভের আশায় ইসলামপন্থি দলের দাওয়াতে দ্রুত সাড়া দেবে। রাজনীতির মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য দেশ ও জনগণের সেবা। ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা এ কাজ করেন আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের জন্য। পুঁজিবাদ ও সাম্যবাদের নামে যারা রাজনীতি করেন, তারা আসলে উভয়েই বস্তুবাদী। দুনিয়ার লাভের বাইরে তারা অন্য কিছু চিন্তা করতে পারে না। ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করা তাদের পক্ষে প্রায় ক্ষেত্রেই অসম্ভব। তাই তারা ইসলামপন্থি আদর্শের রাজনৈতিক দলগুলোকে কমন শত্রু মনে করে। কিন্তু কেন?
ইসলামপন্থি শক্তি যত শক্তিশালী হবে, রাজনীতি তত বিশুদ্ধ হবে
ইসলামপন্থি শক্তি যত শক্তিশালী হবে, রাজনীতি তত বিশুদ্ধ হবে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল লতিফ মাসুম সোনার বাংলাকে বলেন, ‘আমি মনে করি, যেকোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থাতেই স্বচ্ছতা জরুরি, তা ইসলামী হোক বা সাম্যবাদীই হোক। তবে হ্যাঁ, ইসলাম একটি সুমহান আদর্শ। এর রয়েছে একটি সমৃদ্ধ সোনালি ইতিহাস। এ আদর্শ যারা যথাযথভাবে অনুসরণ করেন, তারা সততা ও স্বচ্ছতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। আমি মনে করি, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এ ধারার প্রসার ও বিস্তার একটি ইতিবাচক দিক। তারা রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেলে অবশ্যই স্বচ্ছতা আসবে, ন্যায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করবে- এতে কোনো সন্দেহ নেই।’
অন্য বিশ্লেষকরাও মনে করেন, ইসলামপন্থি শক্তি যত শক্তিশালী হবে, রাজনীতি তত বিশুদ্ধ হবে। বিশুদ্ধ রাজনীতি যারা চায় না, তারা এ আদর্শিক রাজনীতির শত্রু। আদর্শিক কারণে এ শত্রুতা নয়। মূল কারণ তাদের লুটপাট, চাঁদাবাজি, দুর্নীতির অবাধ সুযোগ নষ্ট হওয়া। তাই দেখাচ্ছে বিগত দেড় দশক জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলগুলো আওয়ামী লীগের হাতে চরম নির্যাতন-নিষ্পেষণের শিকার হওয়ার পরও তাদের জন্যই পরাণ কান্দে। এ কারণে মিলেমিশে দেশ ও জনগণকে শোষণ করার অবাধ সুযোগ তারা হারাতে চায় না। এ সুযোগকেই তারা দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী ধরে জেনেছে এবং চিনেছে রাজনীতি হিসেবে। রাজনীতি পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, রাজনীতি মানে বিনা পুঁজির ব্যবসা- এ ধারণা পাল্টে যাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হলে। তাই ইসলামপন্থি দলগুলোর ঐক্যের খবরে তারা আতঙ্কিত। ৬ আগস্টের পর পরই অনেক ক্ষেত্রে লুটপাট, ব্যাংক দখল, চাঁদাবাজিতে যেভাবে কেন্দ্রীয় নেতাদের নাম পর্যন্ত শোনা যেত, এখন আর তা শোনা যাচ্ছে না। বরং উল্লেখিত অপকর্মের জন্য প্রায় প্রতিদিন দল থেকে বহিষ্কারের খবর আসছে। এতে প্রমাণ হচ্ছে ইসলামের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তি যত শক্তিশালী হবে, তাদের অপকর্ম তত কমে আসবে। কারণ জনগণ ভালো-মন্দ বুঝে তাদের পক্ষের শক্তির পক্ষেই থাকবে। তাই অন্যরা রাজনীতির মাঠে তাদের অস্তিত্ব সংকট কাটতে অপকর্ম থেকে হাত গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবে। কিন্তু লাখ টাকার প্রশ্ন- রাজনৈতিক দল চলবে কীভাবে? দল চালাতে ভোট কিনতে তো টাকা লাগে, তাহলে কি বড় বড় ব্যবসায়ীরা রাজনীতির মাঠে নামবে না।
গ্রিসে ব্যবসায়ীদের জন্য রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল
গ্রিসে ব্যবসায়ীদের জন্য রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। গ্রিসের রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা ব্যবসায়ীদের রাজনীতি নিষিদ্ধের জন্য যেসব কারণ উল্লেখ করেছিলেন, তা হলো- ১. কারণ তারা টাকা ছাড়া কিছু বুঝেন না। ২. ব্যবসায়ীরা যেখানে হাত দেন, সেখান থেকেই তারা টাকা উপার্জন করার কথা ভাবেন। যেমন- তারা হাসপাতাল তৈরি করেন টাকার জন্য, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় করেন টাকার জন্য, পত্রিকার প্রকাশ আর টিভি চ্যানেলের মালিকানা সব কিছুরই উদ্দেশ্য বাণিজ্য মানে টাকা কামানো। এ যুগে রাজনীতিতে আসলেই পান ফ্রি গাড়ি, বিলাসবহুল বাড়ি, কম দামে প্লট, বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্যসহ বিনা পুঁজিতে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা কামানোর সুযোগ।
মন্ত্রী-সংসদ সদস্যরা বৈধভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য করে সম্পদ বাড়াতে পারে কি না- এ প্রশ্নের উত্তর ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ল-এর অধ্যাপক ও সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট ড. শাহদীন মালিক সরাসরি না দিয়ে তিনি বলেন, ‘আইন বলে, মন্ত্রীরা তাঁদের বেতন-ভাতাদি ছাড়া আর কোনো উপায়-অর্জন করতে পারবেন না। কোনো বৈধ ব্যবসাও করতে পারবেন না। এটা সংবিধান নিষেধ করে দিয়েছে। সবার পুরো সংবিধান পড়া জরুরি নয়। তবে যারা সাংবিধানিক পদ পেয়ে যান, তাঁদের তো সংবিধানে লেখা শপথবাক্য পাঠ করতে হয়। সেই সঙ্গে সংবিধানে যে যেই পদ পেয়েছেন, সেই পদ বা দায়িত্ব সম্পর্কে কী বলা আছে, অন্তত সেটুকু তো পড়া উচিত।
এমনটিও না যে ওই পদগুলো সম্পর্কে সংবিধানে অনেক অনেক কথা বলা আছে। পড়তে পড়তে গুলিয়ে ফেলার ভয় নেই। যেমন অ্যাটর্নি জেনারেলের কথা বলা আছে, শুধু ৬৪ অনুচ্ছেদে। ৬৪ অনুচ্ছেদে সর্বসাকুল্যে বাক্য আছে চারটি। কঠিন বা জটিল কিছুই নেই। ৬৪টি অনুচ্ছেদে বলা আছে, বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেলের কথা। দেশের অ্যাটর্নি জেনারেল, সরকারের নয়; ঠিক যেমন প্রধান বিচারপতি। অন্যসব বিচারপতি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, কিন্তু প্রধান বিচারপতি বাংলাদেশের। অর্থাৎ শুধু সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি নন, সংবিধানবলে তিনি বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি। যা হোক, মন্ত্রীদের বৈধ আয়-উপার্জনের কথায় ফিরে আসি। আট ধরনের সাংবিধানিক পদের বেতন-ভাতাসংক্রান্ত বড় একটা অনুচ্ছেদ আছে সংবিধানে। ১৪৭ অনুচ্ছেদ। অবশ্য অ্যাটর্নি জেনারেল বা সংসদ সদস্য এ ১৪৭ অনুচ্ছেদের অন্তর্ভুক্ত নন। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, বিচারপতি, নির্বাচন কমিশন ইত্যাদি আট ধরনের পদ ১৪৭ অনুচ্ছেদের আওতায় পড়ে। পাঠক যদি শপথ নিয়ে মন্ত্রী বনে যান, তাহলে ১৪৭ অনুচ্ছেদটি আপনাকে জানতে হবে। জানাই মন্ত্রী ‘…কোনো লাভজনক পদ কিংবা বেতন-ভাতাদিযুক্ত পদ বা মর্যাদায় বহাল হইবেন না কিংবা মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যযুক্ত কোনো কোম্পানি, সমিতি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা বা পরিচালনায় কোনরূপ অংশগ্রহণ করিবেন না।’
১৪৭ অনুচ্ছেদে আরও একটু জটিল একটি বিধান আছে। আপাতত আমাদের দরকার নেই। তবে আপনি যদি সত্যি সত্যি মন্ত্রী বনে যান, তাহলে যোগাযোগ করতে পারেন, বিশদ বয়ান করা যাবে তখন। ১৪৭-এর ওপরে যতটুকু উদ্ধৃত করেছি, সেটাতেই ফিরে আসি। মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর বিকেল ৫টায় আপনার সচিবালয়ের অফিস থেকে বেরিয়ে গুলিস্তান সিনেমা হলে গিয়ে সেখানে সন্ধ্যাকালীন পার্টটাইম ম্যানেজারের পদ গ্রহণ করতে পারবেন না। কারণ ১৪৭ অনুচ্ছেদ বলছে, কোনো লাভজনক বা বেতন-ভাতাযুক্ত পদে মন্ত্রী মশাই বহাল হতে পারবেন না। দিনের বেলা বিমানের মন্ত্রী আর রাতে বিমান চালিয়ে অর্থাৎ পাইলটগিরি করে টু পাইস বাড়তি কামাবেন, সেই রাস্তা বন্ধ। মন্ত্রীর পদের পাশাপাশি অন্য কোনো পার্টটাইম চাকরি (পদ বা মর্যাদা) না হলে না-ই করলেন, তাই বলে কি মন্ত্রী থাকা অবস্থায় কোনো ব্যবসা থেকে লাভ বা আয় করতে পারবে না? অধমের কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু বাধা দিচ্ছে তো সংবিধান।’
সংসদ সদস্যদের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা তুলনামূলকভাবে একটু হালকা। নির্বাচনসংক্রান্ত আমাদের মূল আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-১৯৭২-এর ১২ ধারায় বলা আছে, কোনো সংসদ সদস্য সরকারের সঙ্গে কোনো প্রকার বস্তু বা সেবাদানের জন্য চুক্তিবদ্ধ হতে পারবেন না। অর্থাৎ সংসদ সদস্যের ঠিকাদারি ফার্ম বা কোম্পানি সরকারি রাস্তা বা ব্রিজ বানানোর কন্ট্রাক্ট বা কার্যাদেশ পেতে পারে না। অনেক অ্যাডভোকেট-সংসদ সদস্যকে গত পাঁচ বছরে দেখেছি বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ হয়ে ওকালতি করতে। অর্থাৎ আইনি সেবার বিনিময়ে সরকারি অর্থ গ্রহণ করেছেন। আইনের চোখে সংসদ সদস্য পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন। তবে মন্ত্রীরা যেরূপ সংবিধান পড়েন না, স্পিকারও সেরূপ আইন পড়েন না। কারণ সংসদ সদস্যরা যোগ্যতা হারিয়েছেন কি না, সে ব্যাপারে প্রথম পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব স্পিকারের। অন্য কারও সেই ক্ষমতা নেই। ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে সাহসও জরুরি। সম্পদের পাহাড় গড়তে কেউ দুর্নীতি করেছেন কি করেন না, সেটা বলতে পারবে দুদক। দুর্নীতি না করলেও ব্যবসা করে, বেতন-ভাতার বাইরে উপরি আয় করে মন্ত্রীরা স্পষ্টতই সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। সংবিধান লঙ্ঘনের সাজা মন্ত্রী-সংসদ সদস্যরাই নির্ধারণ করে দিয়েছেন পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে। আপনাদের সংশোধিত সংবিধানের ৭(ক) অনুচ্ছেদে। সাজার বিধানটা আছে ৭ক(৩)-এ, দয়া করে পড়ে নেবেন।’
পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, এসব বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা জরুরি। তাহলেই প্রকৃত দেশপ্রেমিক রাজনীতির প্রসার ঘটবে। রাজনীতি বিনা পুঁজির ব্যবসা এ নেতিবাচক ধারণার অবসান ঘটবে।