জুলাই বিপ্লবের চেতনায় জাতীয় ঐকমত্য জরুরি
২৬ জুন ২০২৫ ১১:১১
॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
৩৬ জুলাই বিপ্লব হয়েছে রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে। কারণ ১৯৪৭ ও ১৯৭১-এ ইতিহাসের বাঁক বদল হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশ নামের ভূখণ্ডটি সত্যিকারের রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠেনি। রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, এর অন্যতম কারণ দেশের রাজনীতিতে সত্যিকার অর্থে জনগণের সম্পদ, জীবন ও সম্মানের নিরাপত্তা দেয়ার মতো সাহসী এবং আত্মত্যাগী ব্যক্তিত্বের সমাবেশ ঘটেনি। তাই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের অঙ্গীকার- সাম্য (ইনসাফপূর্ণ সম্পদ বণ্টন), সামজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীর ব্যবধানেও পূরণ হয়নি। অথচ এ তিন অঙ্গীকার পূরণের আশায় ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এদেশের মুক্তিপাগল মানুষ। কিন্তু ফলাফল পেয়েছেন পুরো উল্টো। বঞ্চনা ও লাঞ্ছনার বয়ানের আড়ালে একদল লোভী, দুর্বৃত্ত রাজনৈতিক দলের ব্যানারে দেশের নেতৃত্ব দখল করে। তারা দেশ ও জনগণের সেবার দায়িত্ব নয়, ক্ষমতা পায়। রাষ্ট্রীয় সম্পদ; এমনকি ভিন্নমতের জনগণের সম্পদ, জীবন ও সম্মান লুট করে নিজের ক্ষমতা প্রমাণ করাকেই তারা মনে করে রাজনীতি। অথচ রাজনীতি তাদেরই মানায়, যারা নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়নোর মতো ত্যাগী ও সাহসী। রাজনীতি, রাজনৈতিক দল দুর্বৃত্তদের দখলে চলে যাওয়ার পর রাষ্ট্রটাই যখন তাদের দখলে চলে যায়, তখন মানবতা এবং দেশের পক্ষে ত্যাগী ও সাহসী মানুষ ছিটকে পড়ে। রাজনৈতিক দলে নাম লেখালে; বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের কোনো পদপদবি পাওয়া মানে এলাকার ছোট-খাটো জমিদার বনে যাওয়া। মাদক, জুয়ার ব্যবসা, চাঁদাবাজি, দখলবাজি এবং খাসজমি, হাট-বাজার, বিল-ঝিল-নদী, বালুর ব্যবসা, বাস-টেম্পুস্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণে তাকে সাহায্য করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সিভিল প্রশাসন তাদের দায়িত্ব মনে করতে থাকে। অবশ্য বিনিময়ে তারা যা পান, তাতে বেতনের টাকা শুধু সিগারেট খরচে ব্যয় করলেও ছেলে-মেয়েদের বিদেশে লেখাপড়ার খরচ দেয়ার পর ১০-১২ বাড়ি, ফ্ল্যাট ও গাড়ির মালিক হতে বেশিদিন লাগে না। নিজের এত সম্পদের খোঁজখবর রাখতে গেলে দেশ ও জনগণের জন্য ভাবার সময় কোথায়? তারা না ভাবলে বাংলাদেশ প্রকৃত রাষ্ট্রে পরিণত হবে কী করে?
ধারাবাহিক এ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের ফলে আওয়ামী লীগ নামের একটি বিষবৃক্ষের ফ্যাসিজম নামের ফল জাতিকে হজম করতে হয়েছে টানা দীর্ঘ দেড় দশক। এদেশের কিশোর-তরুণ শিক্ষার্থীরা এ বিষফলের তিক্ততা চোখ-মুখ বন্ধ করে সহ্য করেনি। তারা ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’; ‘আমরা আম-জনতা, কম বুঝি ক্ষমতা’; ‘ফাইট ফর ইওর রাইটস’; ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ‘যদি তুমি ভয় পাও, তবে তুমি শেষ, যদি তুমি রুখে দাঁড়াও, তবে তুমিই বাংলাদেশ’; ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার, কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার’; ‘বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’ ইত্যাদি স্লোগান তোলেন। রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত এবং তাদের দোসর আমলা, শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, আইনজীবীর রক্তচক্ষু এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলির ভয় জয় করে তারা একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে জীবনবাজি রেখে ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে হটিয়েছেন। হাসিনা পালিয়েছে প্রায় এক বছর। কিন্তু তাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার সংস্কার এখনো শেষ হয়নি। এখনো দূর হয়নি ফ্যাসিবাদের ছায়া এবং রাজনীতির মাঠ ছাড়েনি রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কারিগর ও লোভী লুটেরা দুর্বৃত্তরা। রাষ্ট্র সংস্কারের মাধ্যমে সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখছেন এদেশের তরুণ ছাত্র-জনতাসহ সর্বস্তরের মানুষ। এখন প্রশ্ন হলো- সংস্কার ও ফ্যাসিস্ট খুনিদের বিচার প্রক্রিয়া কি প্রত্যাশার সিঁড়ি খুঁজে পেয়েছে?
প্রত্যাশার সিঁড়ি এবং সংস্কার প্রক্রিয়া
এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সংস্কার নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম চলছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা দফায় দফায় বৈঠক করছেন। এ প্রতিবেদন যখন লেখা হচ্ছে, তখনো বৈঠক চলছে। আলী রীয়াজ বলেন, নির্বাচন ও বিচার প্রক্রিয়া সমান্তরালভাবে চলবে। তবে ঐকমত্যের জন্য দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে। আলোচনা চলাকালীন নতুন নতুন মত আসছে, ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে দলগুলোর নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আরও আলাপ প্রয়োজন। তিনি জানান, উচ্চকক্ষ গঠন, নারীদের প্রতিনিধিত্ব এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনসহ কিছু বিষয়ে এখনো ঐকমত্য হয়নি। এসব নিয়ে আগামী সপ্তাহে আবার আলোচনা হবে।
জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও নমনীয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, আপনারা আসছেন, আরেকটু আগান। তাহলে জুলাই সনদ দ্রুত করা সম্ভব। গত রোববার (২২ জুন) ঢাকার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে কমিশনের দ্বিতীয় ধাপের সংলাপের পঞ্চম দিনের সূচনা বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আলী রীয়াজ বলেন, আমরা এখানে এসেছি একটি বিশেষ ও কঠিন বাস্তবতায় ১৬ বছরের সংগ্রাম, সহস্রাধিক মানুষের আত্মত্যাগ, অনেকের নিখোঁজ হওয়া ও নিপীড়নের প্রেক্ষাপটে। রাজনৈতিক দলগুলোরও অনেক ত্যাগ রয়েছে। তাই আসুন, সবাই মিলে সমঝোতার পথে এগিয়ে যাই। দুই জোটসহ প্রায় ৩০টি দল ও জোট অংশ নেয়। এদের মধ্যে মতামতের মিল-অমিল চলছে, ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া চলছে। তবে ৩৬ জুলাই বিপ্লবে যাদের বেশি ভূমিকা ছিল, যারা রাষ্ট্র সংস্কার নয়, শুধু ক্ষমতার বদল চেয়েছে, তারাই সংস্কার প্রক্রিয়ায় বিপ্লবের চেতনার বিরোধিতা করছেন বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।
মতামতের মিল-অমিল
এ পর্যন্ত ৩২টি রাজনৈতিক দল কমিশনে কয়েক মাস ধরে বক্তব্য উপস্থাপন করেছে, আলাদা আলাদা বৈঠক করার সুযোগ পেয়েছে। তারপরও গত কয়েক দিন ধরে ব্যাপক আলোচনা, বিশ্লেষণ চলছে, কিন্তু কোনো বিষয়েই ঐকমত্য হচ্ছে না। জনগণ চায় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কার হোক। তারা এতদিন যাদের দুর্বৃত্তের কবলে থাকা প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থার সরকারের হাতে ভয়ঙ্করভাবে নির্যাতিত হতে দেখেছেন তারা যখন কার্যক্ষেত্রে সংস্কারে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে, তখন জনগণ কিছুটা হলেও আশাহত বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা। সূত্রে প্রকাশ, প্রধানমন্ত্রী পদে এক ব্যক্তির মেয়াদকাল সর্বোচ্চ ১০ বছর করার জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবের বিপক্ষে বিএনপিসহ তিনটি দল মত দিয়েছে। আর এর প্রস্তাবের পক্ষে মত দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিসহ বাকি ২৭ দল।
আলী রীয়াজ সাংবাদিকদের বলেন, ‘দীর্ঘ আলোচনা শেষে আমরা সুস্পষ্ট এক জায়গায় এসেছি। একজন ব্যক্তি ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। এরকম একটি জায়গায় আসার পরে আমরা এখনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারিনি।’ ‘আলোচনার পর তিনটি দল ভিন্নমত পোষণ করে তারা বিষয়টি পুনর্বিবেচনার কথা বলেছে। তারা তাদের দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কথা বলে আবার আলোচনার করবেন বলেছেন। তারা মনে করেন, এ বিষয়ের সাথে অন্যান্য বিষয় যুক্ত; বিশেষ করে জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল-এনসিসি গঠন ও সংসদের উচ্চকক্ষ কীভাবে গঠন হবে। ওইসব সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনার সময় তারা বিষয়টি উপস্থাপন করবেন। এখন পর্যন্ত আলোচনা করে যে জায়গায় দাঁড়িয়েছে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদকাল তিনটি দল বাদে সবাই এক জায়গায় পৌঁছেছে। আমরা আশা করি, এ বিষয়ে সবাই একমত হতে পারবে। আমরা আশা করি, সকলে এ বিষয়ে একমত পোষণ করতে পারব।’ বিপক্ষে মত দেওয়া তিনটি দল হলো- বিএনপি, জাতীয় গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম) ও বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (বিএলডিপি)।
আলী রীয়াজ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন কারণে মতপার্থক্য আছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদকাল ১০ বছরের বিষয়ে জামায়াত, এনসিপিসহ অধিকাংশ দল একমত হলেও বিএনপিসহ তিনটি দল দ্বিমত পোষণ করেছে। আমরা লিখিত প্রস্তাবে এবং আমাদের ৩১ দফার লিখিত প্রস্তাবের মধ্যে যা ছিল, সেটা আমরা পুনরায় উল্লেখ করেছি। কোনো ব্যক্তি পরপর দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবে না। এখানে মেয়াদটা নিয়ে সবসময় বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা এসেছে। সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা এককভাবে আমার দলের পক্ষ থেকে আমার নেই। যদি মেয়াদের বিষয়ে বৈঠকে একটা সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে আমাকে আমার দলীয় ফোরামে আলোচনা করতে হবে।’
জামায়াতের নায়েবে আমীর সৈয়দ ডা. আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘দুই মেয়াদের সরকার বলতে আমরা পূর্ণ মেয়াদের প্রধানমন্ত্রিত্বকেই বলেছি। সে অনুযায়ী ১০ বছরে দুই পূর্ণ মেয়াদই হয়। একই সংসদীয় মেয়াদে একাধিক জন প্রধানমন্ত্রী হতে দেখা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ক্ষমতা সীমাবদ্ধ ও দেশের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।’
এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের বিষয়ে একটা ঐকমত্য ছিল যে, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদটা সীমিত করা প্রয়োজন। যদি ঐকমত্যের স্বার্থে সকলেই ১০ বছরের কথা বলে, সেক্ষেত্রে সময় নির্ধারণের জন্য এনসিপি নমনীয় থাকবে।’ এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জানা গেছে, রাজনৈতিক দলগুলোর অনুরোধে দুদিন বৈঠক মুলতবি করা হয়েছে। মুলতবির আগে প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রের মূলনীতি ও নির্বাচনী এলাকা নির্ধারণ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনায় বসে কমিশন। বৈঠকের শুরুতে আলোচিত উচ্চকক্ষ গঠন এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়াসহ কিছু বিষয় ‘অমীমাংসিত রয়েছে’।
নারী আসন ৫০ থেকে ১০০-তে উন্নীত করার ব্যাপারে সব দলই মত দিয়েছে, তবে কী প্রক্রিয়ায় এ আসন নির্বাচিত হবে, তা নিয়ে রয়ে গেছে অনৈক্য। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী সরাসরি ভোটের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে। দল দুটি বলছে, সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা বাড়ানো নিয়ে তাদের আপত্তি নেই, তবে বর্তমানে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন কঠিন। তাদের মতে, এ বিষয়ে আরও সময় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াই বাস্তবসম্মত। বিপরীতে এনসিপি বলছে, সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি ভোট হওয়া উচিত।
দ্বিমত দেখা দিয়েছে সংবিধানের মূলনীতি নিয়েও
দ্বিমত দেখা দিয়েছে সংবিধানের মূলনীতি নিয়েও। বিএনপি বলছে, তারা পঞ্চদশ সংশোধনীকে মানে না এবং সংবিধানকে সংশোধন করে সেই আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে চায়, যেখানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ এবং ‘আল্লাহর ওপর বিশ্বাস’ অন্তর্ভুক্ত ছিল। দলটির দাবি, ভবিষ্যতে জনগণের ম্যান্ডেট পেলে তারা সংবিধানে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্রের মূল্যবোধ সংযুক্ত করবে। অন্যদিকে বামপন্থী দলগুলো ১৯৭২ সালের সংবিধানে বর্ণিত মূল চার নীতির পক্ষে অনড়। তাদের মতে, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ- এ মূলনীতিগুলোই রাষ্ট্রের ভিত্তি। এগুলো থেকে সরে এসে কোনো জাতীয় ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলেই তারা মনে করে। জামায়াতে ইসলামী সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের বিষয়গুলোয় একমত হলেও, তারা বিএনপির মতো পঞ্চদশ সংশোধনীর আগের অবস্থায় ফেরার পক্ষে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জানিয়েছে, তারা ১৯৭২ সালের ‘মুজিববাদী’ মূলনীতির বিরোধী। দলটির মতে, যদি ওই মূলনীতি বাদ দিয়ে রাষ্ট্রের কাঠামো নিয়ে নতুন কোনো প্রস্তাব আসে, তবে তারা তা আলোচনা করবে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব ও দলের মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, বিস্ময়কর ব্যাপার হলো সংবিধানের মূলনীতি নিয়ে আলোচনায় ’৭২-এর সংবিধানকে ভিত্তি ধরে আলোচনা করা হচ্ছে। অথচ ’৭২-এ সংবিধান যারা প্রণয়ন করেছেন, তারা পাকিস্তানের সংবিধান রচনার জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান রচনা করার জন্য তাদের ম্যান্ডেটই ছিল না। উল্লেখ্য, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে চলছে কমিশনের কাজ। কিন্তু ঐকমত্য কবে হবে, বলা মুশকিল।
যাত্রার পর ঐকমত্য কমিশন
কুরবানির ঈদের আগে প্রথম ধাপের আলোচনা শেষে দ্বিতীয় ধাপের আলোচনার জন্য ২ জুন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসেছিল ঐকমত্য কমিশন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত অক্টোবরে গঠিত ছয়টি সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন জমা পড়ে ফেব্রুয়ারি মাসে। এসব প্রতিবেদনের সুপারিশের বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৫ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
তারা সংবিধান সংস্কার কমিশন, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, সংস্কার কমিশন, পুলিশ সংস্কার কমিশন এবং জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের ১৬৬টি সুপারিশের বিষয়ে ৩৮টি রাজনৈতিক দল ও জোটের মতামত জানতে চায়- যাদের মধ্যে ৩৩টি মতামত জানায়। এরপর ২০ মার্চ থেকে ১৯ মে পর্যন্ত তাদের সঙ্গে ৪৫টি অধিবেশনের মাধ্যমে প্রথম পর্বের সংলাপ সম্পন্ন করে ঐকমত্য কমিশন। আলোচনার সুবিধার্থে কয়েকটি দলের সঙ্গে একাধিক দিনও বৈঠক চলে। আলোচনার মধ্য দিয়ে বেশকিছু বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য ও আংশিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে।
এছাড়া সংলাপে অংশ নেওয়া ৩০টি দল ও জোট কেবল ৭০ অনুচ্ছেদ শিথিলের বিষয়ে শর্তসাপেক্ষে একমত হয়েছে। তবে এখানেও দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য স্পষ্ট। জামায়াতের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অর্থবিল ও আস্থা প্রস্তাবের বাইরে সংবিধান সংশোধনের সময়েও সংসদ সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দিতে পারবেন না। বিপরীতে বিএনপি বলেছে, যুদ্ধাবস্থায়ও সংসদ সদস্যদের দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে মতপ্রকাশের সুযোগ থাকা উচিত নয়। সংবিধান সংশোধনে সংসদের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থনের প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়েছে কয়েকটি রাজনৈতিক দল। তাদের মতে, এটি গ্রহণযোগ্য ও সময়োপযোগী একটি প্রক্রিয়া। তবে এ সুপারিশ বাস্তবায়নে উচ্চকক্ষের অস্তিত্ব জরুরি কি না- এ নিয়ে দলগুলোর মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
বিএনপি মনে করে, দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় উচ্চকক্ষ গঠনের প্রয়োজন নেই। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে সুষ্ঠু নির্বাচনে যে দলই ক্ষমতায় এসেছে, ৫০ শতাংশ ভোটও পায়নি। উচ্চকক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ৬৫-৬৬ শতাংশ ভোট প্রয়োজন, যা বাস্তবসম্মত নয়। ফলে ভবিষ্যতে সরকারি ও বিরোধীদলের ঐকমত্য ছাড়া সংবিধান সংশোধন সম্ভব হবে না। কিন্তু বাংলাদেশে এমন ঐকমত্য আরও অসম্ভব। সে কারণে আমরা ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা দেখছি না।’ অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী পুরো সংসদে আনুপাতিক নির্বাচন চাইলেও, ঐকমত্যের স্বার্থে আপাতত শুধু উচ্চকক্ষকে ভোটের ভিত্তিতে গঠনের প্রস্তাবে সম্মতি দিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে। দলটির মতে, এতে সব দলের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্তির সুযোগ তৈরি হবে, যা সংসদীয় সংস্কারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, উল্লেখিত বিষয়ের বাইরে রাজনীতিকে দুর্র্বৃত্তায়নমুক্ত এবং প্রশাসন ও সেবা কাজে গতিশীলতার জন্য সরকারি চাকরিজীবী ও অন্য পেশাজীবীদের লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির বাইরে রাখতে হবে। যারা দেশ ও জনগণের সেবায় রাজনীতি করতে চান, তাদের পেশাগত ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠার সামর্র্থ্য ও যোগ্যতা থাকতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত হবে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল-ত্যাগী নেতাদের জীবনযাপন ব্যয়ের ব্যবস্থা করা। এ বিষয়টিও সংস্কার কমিশনের রাজনৈতিক দল সংস্কারের মধ্যে রাখা জরুরি। তবেই রাজনীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার সুযোগ কমবে। ৩৬ জুলাই বিপ্লবের চেতনায় দেশ গড়ার কাজ এগিয়ে যাবে।