বিদেশি পুরোনো দায় পরিশোধে নাভিশ্বাস

নতুন ঋণে ঝুঁকছে সরকার


২৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৭:৫৩

॥ উসমান ফারুক ॥

বিগত ৫৫ বছরে বাংলাদেশে বৈদেশিক ঋণের যে মোট দায় পরিশোধ করতে হয়েছে, আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যেই তার অর্ধেকেরও বেশি পরিমাণ দেনা শোধ করতে হবে। এতে ঋণ শোধ করতে গিয়ে সরকারকে আগের চেয়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ অতিরিক্ত অর্থ বাজেটে বরাদ্দ রাখতে হবে। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার শুধু অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকেই নাজুক করেনি। অপ্রয়োজনীয় ও দুর্নীতির মহোৎসব করে নেওয়া প্রকল্পগুলোয় দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি ঋণের পাহাড় গড়ে বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে গিয়েছে। বিআরটি, প্রিপেইড মিটার স্থাপনের মতো বিদেশি ঋণের প্রকল্পগুলোয় কয়েক হাজার কোটি টাকা খরচ করার পর এখন বাতিলের সিদ্ধান্তে যাচ্ছে সরকার। এর আগে দোয়েল কম্পিউটার কারখানা চালু করে তাও বাতিল করা হয়। এখন বিদেশি সেই ঋণ পরিশোধের কিস্তির অঙ্কের পরিমাণ বছর ঘুরলেই বাড়তে শুরু করেছে। সেই চাপে ৩৬ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ নিয়েও টাকার মান ডলারের বিপরীতে স্থিতিশীল হচ্ছে না। সঠিক প্রকল্প না নেওয়া, অভ্যন্তরীণ সংস্কার না করে ও প্রকল্প বাস্তবায়ন সক্ষমতা না বাড়িয়ে আওয়ামী লীগের মতো এই সরকারও সহজ সমাধানে গিয়ে ফের বিদেশি ঋণ নিতে যাচ্ছে। এবার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) আগের চেয়ে চড়া ও বেশি সুদে অর্থ দিতে চাচ্ছে। সুদহার বাড়ানোর পথে রয়েছে বিশ্বব্যাংক ও এশিয় উন্নয়ন ব্যাংকও (এডিবি)।
বিশ্লেষকরা বলছেন, তাতে অদূর ভবিষ্যতে প্রতি বছর বিদেশি ঋণ শোধ দেওয়ার পরিমাণ আরো বেড়ে যাবে। গত প্রায় এক বছর ধরেই জ্বালানি খাতের দর অস্থিতিশীল রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের যুুদ্ধের ডামাডোলে। তাতেই রিজার্ভ বাড়তি চাপে রয়েছে। এখন বিদেশি ঋণের পরিমাণ আরো বাড়লে রিজার্ভ ধরে রাখাটাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিবে। রিজার্ভের এই অস্থিতিশীলতায় টাকার মান আরো কমে যাবে। বিদেশি ঋণ শোধে ডলার কেনার খরচও বেড়ে যাবে সরকারের।
তাতে আমদানি খরচ বেড়ে গিয়ে উচ্চহারের মূল্যস্ফীতির পারদ আরো চড়বে। এর পুরো দায়ভার গিয়ে পড়বে সাধারণ জনগণের ওপর। বিশেষ করে স্বল্প ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর। আওয়ামী লীগের সময়ে অর্থনীতির এই বেসামাল ব্যবস্থাপনার খেসারত এখনো দিচ্ছে সাধারণ জনগণ। গত তিন বছরে যেখানে মজুরি বেড়েছে এক হাজার টাকা, সেখানে খরচ বেড়েছে জনপ্রতি তিন হাজার টাকা। আয়-ব্যয়ের এই বিশাল ফারাক পূূরণ করতে গিয়ে গ্রামের অর্ধেক মানুষই এখন ঋণ করে চলছে বলে রাষ্ট্রায়ত্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের গবেষণায় উঠে এসেছে।
পরামর্শ দিয়ে তারা বলছেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী স্টাইলে না গিয়ে সুশাসনে নজর দেওয়া, অভ্যন্তরীণ সংস্কার, প্রয়োজনীয় প্রকল্প নেওয়া, অপচয় বন্ধ ও দুর্নীতি বন্ধে সরকারের নজর দিয়ে আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফেরানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। বিদেশি মুদ্রা আয় হয়, শুধু এমন প্রকল্পেই বিদেশি ঋণ নেয়া। তাতে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে বাংলাদেশের।
অঙ্ক বাড়ছে ঋণের : পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ১৩৫ কোটি ১২ লাখ ডলার বিদেশি ঋণ পরিশোধ করেছে বাংলাাদেশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে তা ছিল ১২৭ কোটি ৯৯ লাখ ডলার।
সর্বশেষ তিন মাসে আসল বাবদ পরিশোধ করা হয় ৮৫ কোটি ৮৯ লাখ ডলার; সুদ বাবদ গেছে ৪৯ কোটি ২৩ লাখ ১০ হাজার ডলার। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঋণের সুদ-আসল বাবদ ৪৪৯ কোটি ৪১ লাখ ডলার পরিশোধ করেছিল সরকার। ওই অঙ্ক ছিল আগের বছরের চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪০৮ কোটি ৬৯ লাখ ডলার পরিশোধ করা হয়েছিল।
সরকারি তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেকর্ড ৪ হাজার ৪৯০ কোটি ডলার বিদেশি ঋণ পরিশোধ করেছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ রেকর্ড ১ হাজার ৩৫১ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে। ২০২৫ থেকে ২০৩০ অর্থবছরের মধ্যে বাংলাদেশকে প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের দেনা শোধ করতে হবে।
বিদেশি ঋণ পরিশোধ অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় বিষয়টি আগেই আঁচ করছিলেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বাড়তে থাকায় তা অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন তিনি। জাহিদ হোসেন বলেন, আগেই টের পাওয়া গিয়েছিল, বিদেশি ঋণ পরিশোধ বেড়ে যাবে। এখন সেটাই দেখা যাচ্ছে। মূলত বিগত সময়ে (আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে) নেওয়া বেশকিছু মেগা প্রকল্পের বড় অঙ্কের ঋণ ও বাজেট সহায়তার গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে যাওয়ায় ঋণ পরিশোধের চাপ ক্রমাগত বাড়ছে, যা আগামী বছরগুলোয় দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াতে পারে।
সরকার কেন ঋণ নিতে যাচ্ছে— এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, সরকারের এখন নগদ ডলার দরকার। রপ্তানি সেভাবে বাড়ছে না। তাই বাজেট সহায়তার দিকে বেশি জোর দিতে চাচ্ছে। কেননা প্রকল্পের মাধ্যমে বিদেশি সহায়তা নিলে প্রকল্পের কেনাকাটার সময় ডলার আসে। এতে অনেক সময় চলে যায়। আর বাজেট সহায়তার ডলার অনুমোদনের সঙ্গে সঙ্গে চলে আসে। তাই ডলারের জোগান বাড়াতে বাজেট সহায়তা নিতে চাচ্ছে।
বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ এখন ৩৬ বিলিয়ন ডলারের ওপরে। তারপরও ঋণ নিতে হলে সরকারকে কম সুদে যেতে হবে মন্তব্য করেন তিনি। জাহিদ হোসেন বলেন, বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ এখন সন্তোষজনক অবস্থায় আছে। কিন্তু আমদানি বাড়লে কিন্তু এই স্বস্তি আর থাকবে না। তাই কম সুদের বিদেশি ঋণের দিকে এখন সরকারকে জোর দিতে হবে।
সংকট ও রূপান্তরের চাপে অর্থনীতি
বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এখন অত্যন্ত সংকটপূর্ণ ও রূপান্তরকালীন অধ্যায় পার করছে। সংকট থাকলেও এই সময়ে স্থিতিশীলতার দিকে যাওয়ার চাপ তৈরি হয়েছে অর্থনীতিতে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরের প্রায় আড়াই বছর ধরে অর্থ পাচার বন্ধ করায় রিজার্ভে স্বস্তি এলেও অর্থনীতির অন্যান্য ক্ষত শুকায়নি। মুদ্রাস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি ও টাকার অবমূল্যায়ন এখনো সঙ্গী হিসেবে রয়ে গেছে। এর মাঝেই সবচেয়ে উদ্বেগজনক হয়ে দেখা দিয়েছে বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের চাপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়া। অর্থনীতির এই চাপের মুখে সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে নতুন করে ঋণ নিতে যাচ্ছে সরকার।
বিদেশনির্ভরতার পেছনে যে কারণ দায়ী
সহজলভ্য বিদেশি ঋণের ঝোক এক দিনে তৈরি হয়নি। লুটপাটের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয় বেশকিছু মেগা প্রকল্প। অভ্যন্তরীণ দিয়ে এত খরচের প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব না হওয়ায় আওয়ামী সরকারের সুবিধাভোগীরা ছুটে যায় বিদেশি ঋণে। ক্ষমতায় থাকার সময়ে ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়নের নামে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ নিয়েছে।
পদ্মা সেতু মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক লেন বৃদ্ধি, বিআরটি, এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণসহ বিভিন্ন মহাসড়ক ও অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়তে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা ও চীনের কাছে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া হয়। কোনো কারণ ছাড়াই আগাম খরচ করতে নেওয়া হয় ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি।
২০২২ সালের জুন পর্যন্ত বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৯৫ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা। এসব ঋণ পরিশোধ শুরু হয়ে গেছে এ বছর থেকে। ফলে এখন একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ আসল এবং সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। গত জুন শেষে বিদেশি ঋণের পরিমাণ বেড়ে হয় ১১৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন বা ১১ হাজার ৪৯৮ কোটি মার্কিন ডলারে। স্থানীয় মুদ্রায় তা ১৪ লাখ ১৪ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের ঋণ দাঁড়িয়েছে ৯৫ দশমিক ১০ বিলিয়ন বা ৯ হাজার ৫১০ কোটি ডলার। স্থানীয় মুদ্রায় ১১ লাখ ৬৯ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা।
পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা মেট্রোরেল, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে ঋণ পরিশোধের সময় শুরু হচেছ বছরের শেষের দিকেই। ২০২৮ সাল থেকে কেবল রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্যই বাংলাদেশকে বার্ষিক ৫০ কোটি ডলারেরও বেশি আসল শোধ করতে হবে। এ প্রকল্পে সরকারের ঋণ ১ হাজার ১৩০ কোটি ডলার।
ঋণ শোধে বৈদেশিক মুদ্রা কই
বিদেশি ঋণ পরিশোধের প্রধান উৎস হলো বৈদেশিক মুদ্রা আয়। কিন্তু বিশ্ববাজারে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, রপ্তানি বাজারের প্রধান খাত তৈরি পোশাক রপ্তানি কমে যাওয়ায় সরকারের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান খাত শুধু রেমিট্যান্স সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। কিন্তু এই রেমিট্যান্স গ্রামীণ জনপদের সংসার টিকিয়ে রাখলেও রাষ্ট্রের বিশাল খরচ সামাল দেওয়া তো দূরের কথা ধারে কাছেও নেই।
বাড়তি এই ঋণের বোঝা পরিশোধে বাংলাদেশের এখন বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ বের করতে হবে। সেটি না করতে পারলে নতুন ঋণ করে পুরোনো ঋণ পরিশোধ করতে হবে। তাতে রিজার্ভ আরো চাপে পড়বে বলে মনে করেন নলেজ হাব ইনস্টিটিউট ট্রাস্টের গবেষক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। একই সুরে কথা বলেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিড) গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, ঋণের যে অর্থ ফেরত দিচ্ছি, তা কিন্তু রাজস্ব আদায় থেকে পুরোটা আসছে না। এখনই ঋণের একটা অংশ বিদেশি আরেকটা ঋণ থেকে পরিশোধ করছি। তাতে অর্থনীতিতে আরো চাপ বাড়বে ভবিষ্যতে। দেখা যাবে, আগে ঋণের অর্থ রেখে তারপর বাকিটা প্রকলেপ খরচ করতে হবে।
ঋণ পরিশোধের চাপ বৃদ্ধির আরেক কারণ হচ্ছে সুদ হার বেড়ে যাওয়া বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ মাহফুজুল কবির। তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে সবাই ঋণের সুদহার বাড়াতে শুরু করেছে। বিশ্বব্যাংক, এডিবিও সুদহার বাড়াচ্ছে। কোনো কোনো ঋণে সুদহার দেড় শতাংশ থেকে বেড়ে সাড়ে ৩ শতাংশ হয়ে গেছে। এতে সুদ খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
বিদেশি ঋণ পরিশোধের সময়ে বাজার থেকে ডলার কিনতে হয় সরকারকে। কিন্তু গত দেড় দশকে টাকার মান পড়ে যাওয়ায় ডলার কেনার খরচও বেড়ে গেছে। সেই দিক দিয়েও টাকার অঙ্কেও বাড়ছে সরকারের বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) গবেষণা পরিচালক এম এ রাজ্জাক বলেন, গত আট থেকে ১০ বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংক কৃত্রিমভাবে টাকার মূল্যমান বাড়িয়ে রেখেছিল। আদর্শ নিয়ম হচ্ছে, বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া। সংকট তৈরির আগেই টাকার মূল্যমান কিছুটা কমানো হলে রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স বাড়ত। কিন্তু হুট করে ডলারের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এক ধাক্কায় টাকার মূল্যমান অনেক কমেছে। এতে বিদেশি ঋণে বাড়তি দায় সৃষ্টি হয়েছ।
মূল্যস্ফীতির জন্য দায়ী বিদেশি ঋণ
বাংলাদেশের চলমান উচ্চহারের মূল্যস্ফীতির জন্য অন্যতম দায়ী হচ্ছে আমদানিকৃত মূল্যস্ফীতি অর্থাৎ বিদেশি ঋণ শোধের চাপে টাকার মান কমে যাচ্ছে। এর ফলে শুরুতেই আমদানি খরচ মেটাতে বেশি দামে ডলার কিনতে হয় ব্যবসায়ীদের। অর্থনীতির ভাষায় এটাকে আমদানিকৃত মূল্যস্ফীতি বলা হয়। তাই টাকার মান কমার সরাসরি প্রভাব পড়ে আমদানি করা পণ্যের দামে। জ্বালানি তেল, ভোজ্যতেল, ডাল, মসলা, চিনি, খাদ্যপণ্য, পোশাকসহ শিল্পের কাঁচামাল থেকে শুরু করে যন্ত্রাংশ পর্যন্ত সবই আমদানি করতে হয়। এই ইমপোর্টেড ইনফ্লেশন বা আমদানিকৃত মুদ্রাস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য সংস্থার প্রায় ২৯টি প্রকল্পের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে গেলেও প্রকল্প পুরোপুরি চালু হয়নি। শাহজালাল তৃতীয় টার্মিনাল এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এর ফলে প্রকল্প থেকে সরকারের আয় না এলেও ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের দায় চাপতে যাচ্ছে। আইএমএফ বা বিদেশি ঋণ কোনো জাদুর কাঠি নয়। কোনো দেশের অর্থনীতি বিদেশি ঋণ দিয়ে মেরামত হয়নি।
সরকারকে বিদেশি ঋণ ছাড়াই বিকল্পভাবে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের কাজটি করতে হবে। ঋণ শুধু সমস্যা পেছনে ঠেলে দিয়ে একটু সময় কিনে দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। সরকার যদি ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, রাজস্ব আদায় স্বাভাবিক করা, আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণে সফল হয়, তবেই কেবল সামষ্টিক অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা পাবে। এজন্য প্রয়োজন সৎ ও দক্ষ জনবল দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন। সরকার শুধু বিদেশি ঋণ সেখানেই নিবে যে খাত থেকে রপ্তানি হয়। সেখান থেকে বিদেশি মুদ্রায় আয় হয়। তাহলেই বিদেশি ঋণ বাড়লেও বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর কোনো চাপ ফেলবে না।