কালো মেঘের ঘনঘটা
২৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৭:৫০
॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
ভূমিকম্প শেষ হলেও আতঙ্ক কাটে না। সতর্ক থাকতে হয়, আফটার শকের আশঙ্কায়। বিষয়টি শুধু প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে নয়, সমাজবিজ্ঞানেও ঘটে। ১৯৭৯ সালে ফরাসি বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও দার্শনিকরা Every revolution is followed by a reaction (প্রতিটি বিপ্লবের পরই প্রতিফলন আসে) তত্ত্বটি হাজির করেছিলেন ইতিহাস পর্যালোচনা করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অধ্যাপক ড. সলিমুল্লাহ খানের অভিমত, ‘ফ্যাসিবাদের শুধু রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পতন ঘটে না; এর শেকড় গেঁথে থাকে সংস্কৃতির গভীরে। সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোগুলোকে যদি চূর্ণ না করা হয়, তবে প্রতিবিপ্লব অবধারিত। বর্তমান সফট পাওয়ারের অপব্যবহার সেই পুরোনো ফ্যাসিবাদী কাঠামোরই পুনরুত্থানের চেষ্টা।’
বাংলাদেশে ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তি দায়িত্ব গ্রহণ করায় অনেক আফটার শক অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এবং এর পরবর্তী সময়ে জুলাই সনদ ও গণভোট নিয়ে বিএনপি সরকারের টালবাহানায় আতঙ্ক বাড়ছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান বা বিপ্লবের পর এবং দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের শেখ হাসিনা সরকারের ফ্যাসিস্ট রাজত্ব তাসের ঘরের মতো ধসে পড়েছে। এ পতন দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এক যুগান্তকারী ভূকম্পন সৃষ্টি করেছে। এই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জনগণ কেবল একজন স্বৈরাচারকেই বিদায় জানায়নি, বরং দশকব্যাপী চলা আধিপত্যবাদী কাঠামোর শেকড়েও নাড়া দিয়েছে। কিন্তু আধিপত্যবাদী ভারত এ পরিবর্তন শুরু থেকেই মেনে নিতে পারেনি। দিল্লি তার দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত মিত্রের পতনকে কেবল একটি রাজনৈতিক দল বা নেত্রীর পতন হিসেবে দেখেনি; একে নিজেদের ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত আধিপত্যের পতন হিসেবে গণ্য করেছে।
ফলে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর থেকেই শুরু হয় বহুমুখী অদৃশ্য ষড়যন্ত্র। ফ্যাসিবাদী শক্তির আন্তর্জাতিক পুনরুত্থান এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বহুমুখী প্রভাবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর আজ এক চরম সংকটের মুখে। প্রশ্ন উঠেছে— তবে কি বাংলাদেশ পুনরায় ফ্যাসিবাদের সুড়ঙ্গেই ফিরে যাচ্ছে?
ফ্যাসিবাদের সুড়ঙ্গের পথে
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গণতান্ত্রিক রাজনীতি, জুলাই সনদ এবং গণভোটের রূপায়ন কেবল চ্যালেঞ্জের মুখেই নয়, বরং এটি এক গভীর ‘প্রতিবিপ্লবের’ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশে ২০২৪-এর পটপরিবর্তন ভারতের দক্ষিণ এশীয় নীতিতে এক বিরাট বিপর্যয়। নয়াদিল্লি সবসময় চেয়েছে বাংলাদেশে তাদের অনুগত সরকার। এমন একটি অনুগত শাসনব্যবস্থা, যা তাদের নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থকে একপাক্ষিক অগ্রাধিকার দেবে। কিন্তু ছাত্র-জনতার রক্তস্নাত অভ্যুত্থান সেই সমীকরণ উল্টে দিয়েছে। ভারত কৌশলগতভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কেবল আশ্রয়ই দেয়নি, বরং তাকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ক্রমাগত অস্থিরতা তৈরির সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে। ভারতের নীতিনির্ধারক মহল ও গণমাধ্যমে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তকে ‘ইসলামীকরণ’ বা ‘অস্থির’ হিসেবে চিহ্নিত করার যে নিরন্তর চেষ্টা চলছে— এ ষড়যন্ত্রকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা মূলত প্রতিবিপ্লবকে ত্বরান্বিত করার মানসিক জমিন প্রস্তুত হিসেবে দেখছে। তারা মনে করেন, এ বয়ান তৈরির মাধ্যমে ভারত আবারও বাংলাদেশকে ফ্যাসিবাদের সুড়ঙ্গের পথেই নিয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত উদ্যোগ নিয়েছে। বয়ান তৈরির কাজে সফট পাওয়ারগুলোর তৎপরতা দেখে বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
সফট পাওয়ারের অপতৎপরতা
ড. ইউনূস সরকারের সংস্কারমূলক উদ্যোগ এবং একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির রূপরেখা যেন বর্তমান সরকার এগিয়ে নিতে না পারে, সেজন্য দিল্লি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বহুমুখী প্রেশার গ্রুপকে সক্রিয় করে তুলেছে।
সফট পাওয়ারের অপব্যবহার ও বুদ্ধিজীবী-সাংবাদিক বলয় প্রতিবিপ্লব ঘটানোর জন্য সামরিক শক্তির চেয়ে বর্তমান সময়ে ‘সফট পাওয়ার’ ব্যবহার বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ এর মাধ্যমে প্রতিফলন ঘটানো অনেক নিরাপদ। এতে জনগণের মনোজগতে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় যে, তারা পরিবর্তনের পরে কী ঘটবে, তা চিন্তা না করার সুযোগ পায় না। চলমান অবস্থাকেই স্বস্তির মনে করে। আপাতত হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে চায়। তাই বিগত স্বৈরাচারী আমলে গড়ে ওঠা সুবিধাভোগী সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সুশীল সমাজের একটি অংশ আজ সুকৌশলে দেশের অভ্যন্তরে বিভক্তির বীজ বপন করছে। দেশের মূলধারার বুদ্ধিজীবী সমাজের একটি অংশ নিরপেক্ষতার মুখোশ পরে বিপ্লবের অর্জনগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের আদর্শকে ম্লান করতে তারা বুদ্ধিবৃত্তিক বয়ান তৈরি করছে যে, ‘শৃঙ্খলা বা উন্নয়ন বেশি জরুরি’, যা মূলত ফ্যাসিবাদী দর্শনেরই পুনরুৎপাদন। তাছাড়া ‘প্রতিবেশী ভারতের সহযোগিতা ছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে টিকে থাকা অসম্ভব’— এমন বয়ানও হাজির করছে। কর্পোরেট মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি বড় নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সরকার এবং প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে অনাস্থা তৈরি করতে আংশিক বক্তব্য, বিকৃত বক্তব্য প্রচারসহ নানা অপতৎপরতা চালাচ্ছে। সফট পাওয়ারগুলোর মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী অনুষঙ্গ হলো— পত্রপত্রিকা, টেলিভিশন, সাহিত্য সংস্কৃতি। এ সফট পাওয়ার ভারতীয় অর্থে লালিত সাবেক ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠী এবং বর্তমান সরকারের একটি স্বার্থান্বেষী অংশকে ব্যবহার করে জুলাই চেতনার মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে সরকারকে।
জুলাই চেতনার মুখোমুখি সরকার
সূত্রে প্রকাশ, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দল বিএনপির ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা ‘ভারতপন্থী লবি’ বা প্রচ্ছন্ন সুবিধাভোগী গ্রুপটি দলটিকে তার ঐতিহাসিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তারেক রহমান যখন বারবার একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, আইনের শাসনভিত্তিক এবং সংস্কারমুখী বাংলাদেশের কথা বলছেন, তখন এই অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চক্রটি তাকে এবং তার দলটিকে একটি সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। বিএনপির মূল স্রোতকে গণঅভ্যুত্থানের শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার এক সুদূরপ্রসারী নকশা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য হলো— জাতীয়তাবাদী ও ফ্যাসিবাদবিরোধী মূল শক্তিগুলোকে আস্থাহীনতার সংকটে ফেলে পুনরায় ফ্যাসিবাদী শক্তির জন্য পথ সুগম করা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরীর মতে, ‘তারেক রহমান ও বিএনপিকে নিয়ে সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র চলছে। দলের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা কিছু প্রচ্ছন্ন প্রভাবশালীবলয় এবং বাইরের শক্তিগুলো চাচ্ছে বিএনপি যেন গণঅভ্যুত্থানের মূল স্পিরিট থেকে দূরে সরে যায়। যদি জাতীয়তাবাদী ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর মধ্যে ফাটল ধরায়, তবে ফ্যাসিবাদের প্রেতাত্মারা এর সম্পূর্ণ ফায়দা তুলবে।’
এছাড়া প্রতিবিপ্লবের দুঃস্বপ্নদ্রষ্টারা ইসলামপন্থীদের মাঝে সূক্ষ্মভাবে বিভেদ উসকে দিচ্ছে। বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থানে ইসলামপন্থী দলগুলো অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। বিভিন্ন ছোট-খাটো বিষয়ে মতপার্থক্যকে বাড়িয়ে দেখিয়ে একটি কৃত্রিম ধর্মীয় মেরুকরণ তৈরির চেষ্টা চলছে। এর পেছনের উদ্দেশ্য হলো— ১. গণঅভ্যুত্থানের মূল শক্তির মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি করা। ২. আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশকে একটি উগ্রবাদী রাষ্ট্র হিসেবে চিত্রিত করা, যা পরবর্তীতে যেকোনো ধরনের সামরিক বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে বৈধতা দিতে পারে। ৩. জুলাই সনদের রূপায়ন এবং গণভোটের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় এজেন্ডা থেকে জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়া।
সতর্কবার্তা
রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, প্রতিবিপ্লবীরা সফল হলে সরকার, বিরোধীদল এবং দেশ ও জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশ আবার গণতন্ত্রতান্ত্রিক ফ্যাসিজমের কবলে পড়বে। তাই এ ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক হতে হবে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইপিআরআই’র এ প্রতিবেদনে এ ব্যাপারে বাংলাদেশকে সতর্ক করা হয়েছে। এতে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের সৃষ্টির পর থেকে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও কৌশলগত প্রেক্ষাপট গঠনে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং’ (র)-এর ব্যাপক ভূমিকা পর্যালোচনা করা হয়েছে।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ‘র’ সবসময়ই একটি নির্ণায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। তাদের কর্মকাণ্ডের পরিধি ছিল বিস্তৃত— বিদ্রোহে সমর্থন জোগানো, বিরোধীদলসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোকে নিষ্ক্রিয় করা, নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলা এবং বিশেষ করে শেখ হাসিনার সরকারের আমলে ভারতের স্বার্থের অনুকূলে থাকা শাসনব্যবস্থাকে সহায়তা করা—এসবই ছিল তাদের কৌশলের অংশ।
গবেষণায় উল্লেখ আরো করা হয়েছে ‘র’-এর প্রভাব বিস্তারের পদ্ধতির মধ্যে ছিল গোপন অভিযান, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কারসাজি, বিভিন্ন গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থার সাথে আঁতাত, অপপ্রচার ও মিডিয়া প্রচারণার ব্যবহার এবং এমন সব অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত চুক্তি এগিয়ে নেওয়া, যা মূলত ভারতের পক্ষেই ছিল। যদিও এসব পদক্ষেপ দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা সহযোগিতাকে; বিশেষ করে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে জোরদার করেছিল, একইসঙ্গে তা ভারতের হস্তক্ষেপের ধারণাকে আরও বদ্ধমূল করেছে এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনকে ক্ষুণ্ন করেছে।
আইপিআরআই’র গবেষকরা মনে করেন, ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি এবং ‘ইন্ডিয়া আউট’ (ভারতবিরোধী) আন্দোলনের উত্থানের মতো সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বাংলাদেশে ভারতের প্রভাবের ক্ষেত্রে একটি বড় ধাক্কা হিসেবে এসেছে। বাংলাদেশকে বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মোকাবিলা করতে হবে।