এক পশুশক্তির উত্থান ও পতন


২৮ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:৫৪

॥ আরিফুল ইসলাম সোহেল ॥
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ৩৬ জুলাই এক পশুশক্তির উত্থান ও পতনের ইতিবৃত্ত নতুন জেন-জি বা প্রজন্মের জানার বিশেষ প্রয়োজনবোধ থেকেই আমার এ লেখার প্রয়াস।
পশুশক্তি : এমন এক শক্তি, যা যুক্তি, বিবেক ও মানবিকতার পরিবর্তে হিংসা, নিষ্ঠুরতা ও জোর জবরদস্তির মাধ্যমে কাজ করে এবং গণতন্ত্রকে গলাটিপে হত্যা করে, একনায়কতন্ত্রের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো জেঁকে বসে দেশ চালায় বা পেশিশক্তি দিয়ে দেশ পরিচালনা করে।
উত্থান : কোনো শক্তির উত্থিত হওয়া, প্রভাব বিস্তার করা বা ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠার মাধ্যমে জগদ্দল পাথরের মতো রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করা।
পতন : ক্ষমতা কুক্ষিগত করা স্বৈরাচার ও ফ্যাসিস্ট সেই শক্তির দুর্বল হয়ে যাওয়া, পরাজিত হওয়া বা ক্ষমতা হারানোই পতন।
উদাহরণ : কোনো দল বা গোষ্ঠী যদি মানুষের ওপর অত্যাচারের মাধ্যমে ভয় দেখিয়ে, জুলুম করে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে এবং পরে জনগণের প্রতিরোধ ও গণবিস্ফোরণের মাধ্যমে পরাজিত হয়, তাহলে তাকে রূপক অর্থে পশুশক্তির উত্থান-পতন বলা হয়।
সহজ কথায় : স্বৈরাচারী কায়দায় অন্যায়, অত্যাচার, জুলুম-নির্যাতন ও নিষ্ঠুরতায় শক্তির উত্থান এবং শেষ পর্যন্ত জনতার রুদ্ধশ্বাস ও গণবিস্ফোরণে নির্লজ্জতায় তার পরাজয় বা ক্ষমতা হারানোই পতন। তবে এককথায় যার অর্থ— মানবিকতা ও ন্যায়বিচারের বিপরীতে নিষ্ঠুর শক্তির উত্থান ও তার নির্লজ্জ করুণ পরিণতির অভিব্যক্তিই মূলত এক পশুশক্তির উত্থান ও পতন। এই লেখায় ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ৩৬ জুলাই ২০২৪-এর রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়েই আমার লেখা- এক পশুশক্তির উত্থান ও পতনের সংক্ষিপ্ত রূপই আমার পতিপাদ্য বিষয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠার নির্মমতা জাহেলি যুগের বহিঃপ্রকাশই শুধু নয়, বরং অসভ্য, বর্বরোচিত একটা কলঙ্কজনক অধ্যয় ও রক্তাক্ত খুনঝরা ইতিহাস। যে ইতিহাস ও অধ্যায় মানবতা-মনুষ্যত্ব আর মানবিকতাকে পদদলিত করে খুনি হাসিনা সরকার ক্ষমতার মসনদে থেকে অসভ্য, হিংস্র আর হায়েনার চরিত্র নিয়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ, একটি অসভ্য ও অভিশপ্ত দলে পরিণত হয়েছিল। যে চরিত্র মঙ্গলীয় শাসক চেঙ্গিস ও হালাকুখানের বর্বরতাকেও হার মানিয়েছিল। মানবতা মনুষ্যত্বকে উপেক্ষা করে জগদ্দল পাথরের মতো সাড়ে ১৫ বছর স্বৈরাচারী কায়দায় এককভাবে রাষ্ট্র ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছিল ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ। স্বৈরাচারী কায়দায় নেতৃত্বে থাকা খুনি শেখ হাসিনার সরকার চেঙ্গিস ও হালাকুখানের বাগদাদ ধ্বংসের মতোই ধ্বংশ করে দিয়েছিল এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন এই দেশটাকে। সকল ক্ষেত্রেই ধ্বংসের দারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশটা। দেশে না ছিল কোনো আইনের শাসন! না ছিল কোনো ব্যক্তি স্বাধীনতা! ছিল না মুক্ত-স্বাধীন পরিবেশ কিংবা রাজনৈতিক দলগুলোর মুক্তচিন্তা বা স্বাধীনতা। মামলা, হামলা, জুলুম, নির্যাতন ও বিরোধীদলের ওপর দমন-পীড়ন ছিল হাসিনা সরকারের একমাত্র কর্মসূচি। রাষ্ট্রীয় সম্পদের হরিলুট, ইসলামের ওপর চরম আঘাত ও ইসলামী নেতৃত্বের ওপর কঠিন খড়গহস্ত হয়ে জুলুম-নির্যাতনের পথ বেছে নিয়েছিল বর্বর আওয়ামী লীগ। ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেশপ্রেমিক, গণতন্ত্রকামী ইসলামী নেতৃবৃন্দকে রাষ্ট্রীয়ভাবে হত্যা করা ছিল আওয়ামী দূষশাসনের স্বাভাবিক চিত্র। শুধু তাই নয়; দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর চরম আঘাত হেনে নতজানু পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে দেশকে দৌলিয়াত্বের চরম সীমায় পৌঁছিয়ে দেয়া ছিল আওয়ামী লীগের স্বভাবজাত চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ। যে বহিঃপ্রকাশ দেশের ১৮ কোটি মানুষকে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত করছিল। যার ফলে এদেশের মজলুম ১৮ কোটি মানুষই সম্মিলিতভাবে বিক্ষুব্ধ হয়ে অগ্নিঝরা ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নিক্ষিপ্ত হয় পচা নর্দমায় ও ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে। এতে করে এদেশের মানুষ কিছুটা হলেও অভিশপ্ত ২৮ অক্টোবরের দাঁতভাঙা জবাব দিতে সক্ষম হয়েছে। আর কোনোদিন যেন আওয়ামী লীগের দুঃশাসন বা আমলসহ ৭৪-এর দুর্ভিক্ষ, নির্মম অভিশপ্ত ২৮ অক্টোবর, পিলখানা হত্যা, হেফাজতের শাপলা চত্বরের সমাবেশে রাতের ক্র্যাকডাউন, গুম, আয়নাঘরের নির্মমতা, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতন এবং একদলীয় শাসনব্যবস্থা আর যেন কোনোভাবেই এদেশে ফিরে না আসে, সেই প্রত্যাশাই ২৪-এর জুলাইযোদ্ধাসহ এদেশের শান্তি ও গণতন্ত্রকামী মজলুম ১৮ কোটি মানুষের একান্ত প্রত্যাশা।
ঘটনার পটভূমি : ২০০৬ সালে তৎকালীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ নিয়ে বিরোধীদল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-জামায়াত জোটের মধ্যে তীব্র সংকট, প্রতিক্রিয়া ও রাজনৈতিক বিরোধ দেখা দেয়। ২০০৬ সালের শেষ দিকে ক্ষমতা হস্তান্তর, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন এবং পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিরোধ নিয়েই তথাকথিত আওয়ামী লীগ দেশে এক ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে। রাজধানীসহ দেশব্যাপী লগি-বৈঠা নিয়ে এক সন্ত্রাসী ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েমের মাধ্যমে দেশকে এক গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন এবং সরকার কতটা নিরপেক্ষ থাকবে— এ নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বিরোধী মহাজোট ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় ঐক্যজোটের মধ্যে চরম বিরোধ আরো তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে। নির্বাচন কমিশন গঠন, ভোটার তালিকা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিরোধী পক্ষ আপত্তি জানায়। ফলে রাজনৈতিক কর্মসূচি ও পাল্টাপাল্টি অবস্থানসহ দুই জোট বা পক্ষের কর্মসূচি, মিছিল ও সমাবেশকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়তে থাকে।
যার ফলে চারদলীয় জোট সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। টানটান উত্তেজনার মাঝে বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষে কে কীভাবে দায়িত্ব নেবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। আওয়ামী লীগের বাকশালী চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ আর লগি-বৈঠার তাণ্ডবে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই ২৮ অক্টোবর ঢাকার রাজপথে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। রক্তাক্ত হয় ঢাকার রাজপথ; বিশেষ করে পল্টনসহ বায়তুল মোকাররম মসজিদ চত্বর। জিঘাংসা ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশের মফস্বল শহর থেকে শহরে। আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতি আর লগি-বৈঠায় রক্তাক্ত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র। ক্ষতবিক্ষত আর রক্তাক্ত হয় মজলুম মানবতা! লাশ হয়ে মায়ের কোলে ফেরে শিবির নেতা শহীদ মুজাহিদুল ইসলাম, শহীদ মাসুম, শহীদ শিপনসহ অনেকেই।
২৮ অক্টোবরের লোমহর্ষক ঘটনা : ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর, ক্ষমতাসীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়া এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব গ্রহণকে কেন্দ্র করে সেদিন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকার পল্টন, বায়তুল মোকাররমের আশপাশ, গুলিস্তান, শাহবাগ, মিরপুর ও যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক জোট কর্মীদের সংঘর্ষ হয়। আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী বাহিনী কোথাও লাঠিসোঁটা, ইটপাটকেল এবং আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে রক্তাক্ত ও হত্যার নেশায় মেতে ওঠে। শুধু হত্যাই নয়, মানবতা-মনুষ্যত্বকে পদদলিত করে লাশের ওপর পৈশাচিক উল্লাস আর শহীদ জসিমউদদীনের লাশের ওপর পৈশাচিক নৃত্যে মেতে ওঠে খুনি ও বর্বর আওয়ামী লীগের হায়েনার দল। এদিকে পুলিশও সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে গুলি, রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার ও পক্ষপাতিত্ব মূলক আচরণ করে সারা দেশের পরিবেশ করে তোলে আরো লোমহর্ষক ও ভয়াবহ।
লগি-বৈঠা দিয়ে হামলা ও হত্যা : আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠার হামলায় সেদিন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। শহীদের তালিকায় আসে শহীদ হাবিবুর রহমান, শহীদ আরাফাত, শহীদ রফিক, শহীদ সাদের, শহীদ ফয়সাল, শহীদ আক্কাছ, শহীদ রুহুল আমিন, শহীদ জবেদ আলী ও শহীদ শাহজাহান আলীসহ অনেকের নাম। ঐদিন আওয়ামী লীগের নির্মম লগি-বৈঠা ও লাঠি দিয়ে প্রতিপক্ষের কর্মীদের ওপর সন্ত্রাসী হামলা, হত্যা ও লাশের ওপর নির্মম নৃত্য বিশ্ববিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। থমকে গিয়েছিল মানবতা-মনুষ্যত্ব আর সভ্যতার ইতিহাস। সেদিন টিভির পর্দায় প্রচারিত ভিডিও ফুটেজ ও পত্রিকার ছবিতে রাস্তায় পড়ে থাকা ব্যক্তিদের ওপর পৈশাচিক হামলা, নির্মম হত্যা ও মৃত লাশের ওপর নগ্ন জাহিলিয়াতি নৃত্যর দৃশ্য জনমনে গভীর ক্ষোভ ও ক্ষতের সৃষ্টি করে, যা আজও কালের ইতিহাসে কালো অধ্যয় হয়ে আছে।
বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে : ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়ায় ন্যায়বিচারের দাবি আজও নীরবে কাঁদে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের ২৮ অক্টোবর এক রক্তাক্ত ও বেদনাবিধুর দিন। প্রকাশ্য রাজপথে পিটিয়ে মানুষ হত্যা, লগি-বৈঠার বির্লজ্জ তাণ্ডব এবং প্রাণহানির সেই স্মৃতি আজও গণতন্ত্রকামী মানুষের হৃদয়ের গহিনে ক্ষত হয়ে আছে।
লগি-বৈঠার নির্মম সন্ত্রাসের শিকার হওয়া অসহায় পরিবারগুলো মানবিক ও ন্যায়বিচারের প্রতীক্ষায় আজও ফুঁপিয়ে ওঠে। বোবাকান্নায় ভেঙে পড়ে স্বজনহারা পরিবারগুলো রাজপথের সেই রক্তের দাগ, শহীদের রক্তের গন্ধ এবং ইতিহাসের পাতা থেকে কি মুছে ফেলা যায়? যায় না। যে মায়ের বুক খালি হয়েছে, যে পরিবার হারিয়েছে তাদের প্রিয়জন— তাদের কান্নার জবাব কে দেবে? প্রতিহিংসা নয়, চাই সত্যের উদ্ঘাটন; অন্যায়কে আড়ালে নয়, চাই নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারসহ ইনসাফপূর্ণ আইনের প্রয়োগ।
স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আওয়ামী সন্ত্রাসের সঠিক বিচার ও বিচারের সঠিক প্রয়োগ এবং কার্যকরী পদক্ষেপ। ২৮ অক্টোবরের শিক্ষা হোক— আর পশুত্ব নয়; চাই মানবিকতা ও ইনসাফপূর্ণ রাজনৈতিকসহ অবস্থানসহ সন্ত্রাসমুক্ত একটি মানবিক বাংলাদেশ। ২৮ অক্টোবরের সহিংসতা শুধু যে একটি দিনের সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ ছিল এমনটি নয়; বরং এটি ছিল দেশকে নিয়ে গভীর এক রাজনৈতিক মহা সংকটের একটি অংশ। সেই রাজনৈতিক মহাসংকট থেকে—
১. তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে সংকট : সাবেক প্রধান বিচারপতি কে. এম. হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণের কথা থাকলেও রাজনৈতিক মতবিরোধের মধ্যে তিনি সরে দাঁড়ান।
২. রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ নিয়ে সংকট : রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু তার নিরপেক্ষতা নিয়েও বিরোধী পক্ষের আপত্তি ছিল। ফলে দেখা দেয় এক মহাসংকট।
৩. রাজনৈতিক অস্থিরতা অব্যাহত থাকার সংকট : নির্বাচন, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে বিরোধ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংকট আরো ঘনীভূত হয়।
৪. ১১ জানুয়ারি ২০০৭-এর জরুরি অবস্থা : পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে জরুরি অবস্থা জারি এবং নির্ধারিত নির্বাচন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। এই সময় থেকে বাংলাদেশে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নতুন অধ্যায় শুরু হলে দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়।
৫. ২৮ অক্টোবরের ঘটনা কী শিক্ষা দেয়?
● রাজনৈতিক মতপার্থক্য কখনোই হত্যা, নির্যাতন কিংবা প্রতিশোধের বৈধতা দিতে পারে না।
● রাজনৈতিক কর্মীদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব।
● নির্বাচনকালীন সরকারের নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থার পরিবেশ গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য।
● রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত প্রত্যেক ব্যক্তির পরিচয়, হত্যাকাণ্ডের পরিস্থিতি এবং দায়ীদের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
● বিচারহীনতা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ভবিষ্যতে একই ধরনের সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ায়।
♦ ৩৬ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সরকারের পতন : ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ৩৬ জুলাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ সোনালি অধ্যায়ের সূচনা হয়। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন পরবর্তীতে বৈষম্য, দমন-পীড়ন ও সরকারের পদত্যাগের দাবিতে দেশব্যাপী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলন দমনে সংঘর্ষ, প্রাণহানি ও ব্যাপক হতাহতের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ ও উত্তাল করে তোলে। একপর্যায়ে শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্র গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়। অবশেষে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ৩৬ জুলাই শেখ হাসিনার সরকারের নির্লজ্জ পতন ঘটে এবং তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দ্রুত ভারতের উদ্দেশে দেশত্যাগ করেন। এই গণঅভ্যুত্থানের স্মরণে (৫ আগস্টকে প্রতীকীভাবে) ‘৩৬ জুলাই’ বলা হয়। জুলাই-আগস্টের এই আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্র-জনতার সম্মিলিত প্রতিরোধ, গণতন্ত্রের আকাক্সক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের দাবির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এই পতন ও গণঅভ্যুত্থানের মাঝেই ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের লগি বৈঠা ও লাঠিয়াল বাহিনীর তথাকথিত ক্ষমতার অবসান ঘটে এবং তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে পেছনের দরজা দিয়ে দেশত্যাগ করেন। ৩৬ জুলাই কেবল একটি তারিখের প্রতীক নয়; এটি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন, আত্মত্যাগ এবং জনগণের সম্মিলিত শক্তির স্মারক। এই অভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়নে শত শত শহীদের রক্তে অর্জিত জুলাই সনদ, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি। এই দাবি পূরণ এবং লগি-বৈঠা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া শেষ না হলে, এদেশে আবার ফ্যাসিবাদের জন্ম এবং পুনরায় ফেরার আশঙ্কা আছে।
শেষ কথা : ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন একটি দিন, যা আজও রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য, স্মৃতিচারণ ও বিতর্কে ফিরে আসে। সেদিনের সহিংসতা, প্রাণহানি এবং প্রকাশ্যে মানুষকে পিটিয়ে পৈশাচিক কায়দায় হত্যার দৃশ্য দেশবাসীর মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল। ইতিহাসের প্রতি ন্যায়বিচার করতে হলে নিহতদের স্মরণ করার পাশাপাশি ঘটনার প্রতিটি দিক নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও সমসাময়িক নথি পর্যালোচনা করা এবং দায়ীদের বিষয়ে প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো জরুরি। তবেই ইনসাফপূর্ণ একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহল ও গণতন্ত্রকামী সাধারণ মানুষের দৃঢ় বিশ্বাস।
লেখক : সাহিতিক, কলামিস্ট ও সংগঠক।