স্মৃতির জানালায় ২৮ অক্টোবর


২৮ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:৫৩

॥ এডভোকেট সাবিকুন্নাহার মুন্নী ॥
কিছু কিছু সময় দিনক্ষণ ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে হারিয়ে গেলেও স্মৃতির পাতা থেকে কখনো মুছে যায় না। সময়ের স্রোতে বছর পেরিয়ে যায়, কিন্তু কিছু স্মৃতি রক্তাক্ত ক্ষতের মতো আজীবন বয়ে বেড়াতে হয়।
পারি না ভুলে যেতে…
স্মৃতিরা মালা গেঁথে…
হারানো সে স্মৃতিগুলো…
দোলা দিয়ে যায়…
আমারে কাঁদায়…
আমারে কাঁদায়…!
২৮ অক্টোবর ২০০৬ আমার জীবনে তেমনই এক বেদনাবিধুর, রক্তাক্ত ও অবিস্মরণীয় দিন।
আজও স্মৃতির জানালা খুললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই থমথমে সকাল, পল্টনের উত্তপ্ত রাজপথ, টেলিভিশনের পর্দায় দেখা নির্মম সহিংসতা আর প্রিয়জনদের জন্য উৎকণ্ঠায় কাটানো দীর্ঘ এক দিন।
সেদিন চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদ শেষে ক্ষমতা হস্তান্তরকে কেন্দ্র করে সারা দেশে রাজনৈতিক উত্তেজনা বিরাজ করছিল। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে সমাবেশের আয়োজন করেছিল। অন্যদিকে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার লগি-বৈঠা নিয়ে রাজপথে নামার আহ্বানকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল।
সকাল থেকেই আমার মনটা কেমন যেন অস্থির অস্থির লাগছিল। অজানা এক আশঙ্কা বারবার হৃদয়কে নাড়া দিচ্ছিল।
সকালে আমার স্বামী এডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ সমাবেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আমি তাড়াতাড়ি রুটি ও আলু ভাজি তৈরি করে ওনাকে নাশতা দিলাম। লক্ষ করলাম, তিনি সাধারণ জুতা না পরে পরছেন কেডস, যেন প্রয়োজনে দ্রুত চলতে পারেন।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘আজ এভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছ যে?’
তিনি বললেন, ‘আজকের পরিস্থিতি তো বলা যায় না। কখন কী হয়!’
কথাগুলো শুনে হঠাৎ করে বুকটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। ওনাকে মহান আল্লাহর হেফাজতে সোপর্দ করে বিদায় দিলাম।
আমার বড় সন্তান তখন মাত্র ছয় বছরের শিশু। সংসারের প্রয়োজনে কাজ সারছিলাম ঠিকই, কিন্তু মনটা কেন যেন পড়ে ছিল পল্টনের রাজপথে।
একসময় প্রয়োজনীয় কাজ সেরে মেঝের কার্পেটে জায়নামাজ বিছিয়ে টেলিভিশনটা চালু করলাম।
কিন্তু পর্দায় যা দেখলাম, তা ছিল রীতিমতো ভয়াবহ!
চারদিকে সংঘর্ষ, মানুষের ছোটাছুটি, লগি-বৈঠা নিয়ে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মহড়া ও তা দিয়ে জনসমাবেশের দিকে ছুটে চলা মানুষের ওপর পৈশাচিক আঘাত, রক্তাক্ত মানুষের আর্তনাদ। পল্টন ও আশপাশের এলাকা যেন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
বিশেষ করে শহীদ জসিমকে নির্মমভাবে পেটানোর দৃশ্য আমাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। মনে হচ্ছিল, মানুষ কীভাবে আরেকজন মানুষের প্রতি এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে! এগুলো কী মানুষ না নরপশু!
আমার স্বামী তখন সেই সমাবেশে। সঙ্গে আমার বড় বোনের দুই ছেলে— শিবিরের মহানগরী কমিটির সদস্য শামসুল আলম মাহবুব ও সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুম।
কোথায় আছে তারা? কেমন আছে? নিরাপত্তার সাথে আছে তো? আদৌ নিরাপদে ফিরতে পারবে তো? ইত্যাদি নানা আশঙ্কায় অস্থির লাগছিল।
একা একা বাসায় নিজেকে আর স্থির রাখতে পারছিলাম না। জায়নামাজে দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে লাগলাম—
‘হে আল্লাহ! বদরের প্রান্তরে তুমি যেভাবে তোমার বান্দাদের সাহায্য করেছিলে, আজও তাদের সাহায্য করো। আমার স্বামী, আমার প্রিয়জন এবং বিপদগ্রস্ত সবাইকে হেফাজত করো।’
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। এরই মধ্যে খবর পেলাম, আমার দুই ভাগিনা আহত হয়েছে। মাসুমের মাথায় ইটের আঘাত লেগেছে। সে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে।
তার বড় ভাই মাহবুবও আহত। মুখে আঘাত লেগে কয়েকটি দাঁত নড়ে গেছে। অথচ নিজের যন্ত্রণা ভুলে সে পরনের শার্ট খুলে ছিঁড়ে ছোট ভাইয়ের রক্তাক্ত মাথায় বেঁধে দিয়েছে। এরপর অন্যদের সহযোগিতায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে।
একবার ভাবুন, কী হৃদয়বিদারক সেই দৃশ্য! এক ভাই নিজে আহত হয়েও ছোট ভাইয়ের জীবন বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা করছে!
সন্ধ্যার আগে আমার স্বামীর ফোন পেলাম।
তিনি শুধু বললেন, ‘দোয়া করো। মাসুমের অবস্থা ভালো না। মাহবুবও আহত হয়েছে।’
কথাগুলো শুনে বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। সেদিনের প্রতিটি মুহূর্ত কেটেছে উৎকণ্ঠা, অশ্রু আর মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনায়।
রাতে স্বামী নিরাপদে ফিরে এলেও মাসুমের অবস্থা ছিল সংকটাপন্ন। তাকে ধানমন্ডির ইবনে সিনা হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছিল।
পরদিন হাসপাতালে ছুটে গেলাম।
মাসুমের এই করুণ অবস্থায় আমার মাকে কোনোভাবেই সান্ত্বনা দিতে পারছিলাম না। আদরের নাতির জন্য তিনি অস্থির হয়ে পড়েছিলেন। মাসুমের শৈশবের অধিকাংশ সময় কেটেছিল তার নানা-নানুর স্নেহময় আশ্রয়ে। তার মা শিক্ষকতা করতেন বলে ছোটবেলা থেকেই সে বেশিরভাগ সময় নানা-নানুর কাছেই থাকত। আমার মা তাকে পরম মমতায় কোলে-পিঠে করে বড় করেছিলেন। তাই মাসুমের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর, স্নেহ ও ভালোবাসায় জড়ানো।
যে নাতিকে তিনি ছোটবেলা থেকে বুকে আগলে রেখেছিলেন, সেই আদরের মাসুম আজ হাসপাতালের বিছানায় নিথর হয়ে শুয়ে আছে— এ দৃশ্য তিনি কীভাবে সহ্য করবেন! তার চোখের অশ্রু থামছিল না। নাতির জন্য এক অসহায় আকুতি আর বুকভরা হাহাকার তাকে যেন মুহূর্তে ভেঙে দিয়েছিল।
মায়ের সেই অসহায় মুখ, নাতির জন্য তার বুকফাটা কান্না আর আমাদের নির্বাক অপেক্ষার মুহূর্তগুলো আজও স্মৃতির জানালায় ভেসে ওঠে।
দেখলাম, আমাদের আদরের মাসুম আইসিইউতে অচেতন অবস্থায় শুয়ে আছে। মাথায় ব্যান্ডেজ, নিথর শরীর। মনে হচ্ছিল, যেন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। এই বুঝি চোখ মেলে তাকাবে, এই বুঝি কথা বলবে!
পাশেই আহত বড় ভাই মাহবুব। নিজের শরীরে আঘাতের চিহ্ন অথচ সমস্ত কষ্ট ভুলে ছোট ভাইয়ের পাশে বসে আছে।
সেই দৃশ্য আজও আমার চোখে ভাসে।
আমরা আশায় বুক বেঁধেছিলাম, মাসুম সুস্থ হয়ে আবার আমাদের মাঝে ফিরে আসবে। কিন্তু আমাদের সব আশা নিভিয়ে দিয়ে ২ নভেম্বর সে চিরবিদায় নিল (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
মাসুম ছিল স্বপ্নবাজ, সম্ভাবনাময় এক তরুণ। তার স্বপ্ন ছিল আইইএলটিএস (ওঊখঞঝ) সম্পন্ন করে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমাবে। জ্ঞান অর্জন করে নিজের জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলবে, পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করবে। কিন্তু ২৮ অক্টোবরের সেই নির্মম সহিংসতা তার সমস্ত স্বপ্নকে মুহূর্তেই চুরমার করে দিল। যে চোখে ছিল উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন, সেই চোখ চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গেল।
মাসুমের সঙ্গে শুধু একটি তরুণ প্রাণই হারিয়ে যায়নি; হারিয়ে গিয়েছিল তার অপূর্ণ স্বপ্ন, একটি পরিবারের অগণিত আশা এবং সম্ভাবনাময় এক ভবিষ্যৎ।
মাসুম ছিল অত্যন্ত সুদর্শন, প্রাণবন্ত ও স্বপ্নময় এক তরুণ। তার মুখে সবসময় লেগে থাকত এক অপূর্ব মিষ্টি হাসি, যা সহজেই যে কারো মন জয় করে নিত। তার হাসিমাখা মুখ, অমায়িক ব্যবহার আর প্রাণোচ্ছল উপস্থিতি চারপাশের মানুষকে আনন্দিত করত। ছোটবেলা থেকে যাকে কোলে-পিঠে বড় করেছি, যার মিষ্টি হাসিমাখা মুখ ছিল আমাদের পরিবারের আনন্দের উৎস, সেই প্রিয় মুখটি আর কোনো দিন দেখতে পাব না— এ সত্য মেনে নেওয়া কত কঠিন ছিল!
সেদিন শুধু আমাদের মাসুম নয়, শহীদ মুজাহিদ, জসিম, ফয়সাল, শিপনসহ আরও অনেক তরুণের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল রাজপথ। কত মায়ের বুক খালি হয়েছিল, কত পরিবার হারিয়েছিল তাদের আদরের সন্তান, ভাই কিংবা স্বামী। যে মায়েরা সন্তানদের পরম মমতায় কোলে-পিঠে মানুষ করেছেন, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন বুনেছেন, তাদের সেই স্বপ্ন সেদিন নির্মমভাবে ভেঙে গিয়েছিল।
পৃথিবীর কাছে একটি হত্যাকাণ্ড হয়তো ইতিহাসের ঘটনা; কিন্তু একজন মায়ের কাছে তা আজীবনের কান্না।
২৮ অক্টোবরের সেই সহিংসতা ও পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার ধারাবাহিকতায় দেশ এক গভীর সংকটের দিকে এগিয়ে যায়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি আসে বহুল আলোচিত ‘এক-এগারো’। এরপর দীর্ঘ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে জাতিকে অতিক্রম করতে হয়েছে এক কঠিন সময়।
কিন্তু আমার কাছে এই রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় হলো সেই অকালে ঝরে যাওয়া তরুণ প্রাণগুলো, যাদের আর কখনো ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
আজ দীর্ঘ বিশ বছর পরও সেই স্মৃতি হৃদয়ে অমলিন। শহীদ পরিবারগুলোর চোখের পানি আজও শুকায়নি। প্রিয়জন হারানোর বেদনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সুষ্ঠু ও পূর্ণাঙ্গ বিচার না পাওয়ার দীর্ঘ আক্ষেপ।
একজন আইনজীবী ও জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, রাজনৈতিক মতপার্থক্য কখনো মানুষ হত্যার বৈধতা দিতে পারে না। প্রতিটি মানুষের জীবনের মূল্য সমান এবং প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
আমরা প্রতিহিংসা চাই না; চাই সত্যের উদ্ঘাটন, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনের শাসনের ভিত্তিতে প্রকৃত অপরাধীদের বিচার।
আজও ২৮ অক্টোবর ফিরে এলে মনে পড়ে স্বামীর সেই সকালের বিদায়, টেলিভিশনের রক্তাক্ত দৃশ্য, মাহবুবের ছেঁড়া শার্টে মাসুমের মাথা বেঁধে দেওয়া, হাসপাতালের নিথর বিছানায় শুয়ে থাকা আমাদের আদরের মাসুমকে।
মনে হয়, এই তো সেদিনের কথা!
কত বছর পেরিয়ে গেল অথচ সেই দিনের বেদনা একটুও ম্লান হয়নি।
মহান রবের কাছে প্রার্থনা করি, তিনি আমাদের প্রিয় শহীদ মাসুমসহ সেদিন নিহত সবাইকে ক্ষমা করুন, তাদের শাহাদাত কবুল করুন এবং জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন। তাদের রক্তের বিনিময়ে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ যেন এমন একটি মানবিক রাষ্ট্র হয়ে ওঠে, যেখানে রাজনৈতিক মতভিন্নতা থাকবে, কিন্তু প্রতিহিংসার আগুনে আর কোনো মায়ের বুক খালি হবে না, আর কোনো পরিবারকে প্রিয়জন হারানোর এমন নির্মম বেদনা বহন করতে হবে না।
২৮ অক্টোবর তাই আমার কাছে কেবল একটি তারিখ নয়— এটি রক্তে লেখা এক ইতিহাস, স্বজন হারানোর এক অব্যক্ত বেদনা এবং ন্যায়বিচারের এক দীর্ঘ প্রতীক্ষা।
স্মৃতির জানালায় সেই দিনটি আজও জ্বলজ্বল করে— অশ্রুতে, বেদনায়, ভালোবাসায়।