তার্কিশ টিভি সিরিয়াল: পায়িতাথ আবদুল হামিদ
১৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৪:৩৪
পেশাগত প্রয়োজনে অনেক কিছুই পড়তে হয়। দেখতেও হয়। বেশ কিছুদিন ধরে তুর্কি সিরিয়াল পায়িতাথ আবদুল হামিদ দেখছি। আগেও একবার শেষ করেছি। আবারও দেখছি।
আবদুল হামিদ দ্বিতীয় ছিলেন উসমানি ৩৪তম সুলতান। তিনি শেষ স্বাধীন উসমানি সুলতান ও খলিফা। পিতা সুলতান আবদুল মজিদ। তার মাতা ছিলেন ভিরজিনিয়া, একজন সার্কাসিয়ান নারী, যার আসল নাম তিরিমুজগান কাদন। তার মায়ের মৃত্যুর পর তিনি তার পিতার আরেক স্ত্রী পেরেসতু কাদনের দত্তক পূত্র হন। পরবর্তিতে তিনি ৩১ আগস্ট ১৮৭৬ থেকে ২৭ এপ্রিল ১৯০৯ সাল পর্যন্ত উসমানীয় সাম্রাজ্যের সুলতান ও ভঙ্গুর রাজ্যের উপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগকারী শেষ সুলতান ছিলেন। উসমানীয় সাম্রাজ্যে তিনি যে সময়কাল জুড়ে রাজত্ব করেছেন তা হামিদীয় যুগ নামে পরিচিত। ১৯১৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি টানা কয়েক বছর নির্বাসিত জীবনের বঞ্চনা থেকে চির বিদায় নেন পশ্চিমা ষড়যন্ত্রের কাছে পরাজিত ভাগ্যহত এই সুলতান। সুলতান আব্দুল হামিদ ১৮৪২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তোপকাপি [চিরাগান] প্রাসাদে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। নানা ষড়যন্ত্রে জর্জরিত অবস্থায় ৭৫ বছর বয়সে বেইলারবেয়ি প্রাসাদে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তুরস্কের ইস্তাম্বুলের ফাতিহ এলাকায় তাকে সমাহিত করা হয়।
সেরদার আকার পরিচালিত পাঁচটি সিজনে ১৫৪ পর্বে টিআরটি টিভিতে প্রচারিত পায়িতাথ আবদুল হামিদ সিরিজটি না দেখলে বিশ্ব ইতিহাসের অনেক কিছুই মিস করতাম। সেই সাথে বর্তমান বিশ্ব কারা চালায়, কীভাবে চালায় এবং ভবিষ্যতে কারা বিশ্বে নেতৃত্ব দিবে তারও একটা ধারণা পাওয়া যাবে এই সিরিজটি দেখার পর।
গল্পটা শুরু হয় ১৮৯৬ সালের একটি দিন দিয়ে। সেদিন সুলতান আব্দুল হামিদের সিংহাসন আহরণের ২০ বছর পূর্তি উদযাপন হচ্ছে। ইস্তাম্বুলের ইলদিজ প্রাসাদে তার পাশারা আর হেরেমের নারীরা এ উপলক্ষে তাকে সন্মাননা জানাচ্ছেন।
ঠিক একই সময়ে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনাতে থিওডোর হারজেল নীলনদ থেকে ইউফ্রেতিস পর্যন্ত এবং উসমানীয়দের ভূখণ্ড জেরুজালেমকে রাজধানী করে ইজরায়েল নামক একটি দেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে তার অসুস্থ বাবার সাথে তর্ক করছে। থিওডোর হারজেল তার বাবাকে বন্দী করে রেখেছে। ছেলের এই দুরভিসন্ধিকে বাবা প্রত্যাখ্যান করছেন। ইহুদিদের ধর্মভিত্তিক একটি রাষ্ট্র গঠনের চিন্তা যে ইহুদিদের ঈশ্বর জিহোভার ওয়াদা না সেইটাই ছেলে থিওডোর হারজেলকে বুঝাচ্ছেন তার পিতা। কিন্তু থিওডোর হারজেল বলছে, জেরুজালেম একটি স্বাধীন ইহুদি রাষ্ট্র হবে, যেখানে ইসার আগমন ঘটবে আর সোলায়মান নবীর থার্ড টেম্পল বা মন্দির পুনঃপ্রতিষ্ঠা হবে।
সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ মক্কায় যাওয়ার জন্য যে রেললাইন বানাচ্ছেন সেই রেলপথের নিয়ন্ত্রণ নেবে ব্রিটিশ রানীর বিশ্বস্ত থিওডোর হারজেলের লোকজন।
সুলতান আব্দুল হামিদের ছেলে আব্দুল কাদির কিছুটা পাশ্চাত্যমুখী, স্বেচ্ছাচারী আর বোকা কিসিমের। সে ইউরোপের পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রতি দারুন অনুরক্ত। প্রগতিশীল আর স্বাধীনেচতা হবার চেষ্টায় প্রাসাদের ধরাবাঁধা পিতার শাসনকে উপেক্ষা করার মানসিকতা তাকে কখনো কখনো অতি আবেগী করে তুলছে। সে পত্রিকা পড়ছে “মেছভিরিত”। যে পত্রিকায় উসমানীয়দের আলোচনা করতে গিয়ে মিথ্যা তথ্য পরিবেশন করা হয়, আর আব্দুল কাদির দারুণভাবে সেগুলোকে বিশ্বাস করে।
সুলতানের পাশদের মধ্যে তার বোন সেনিহা খাতুনের স্বামী মাহমুদ পাশা অন্যতম। সেনিহা আর আর মাহমুদ দম্পতির ছেলে সাবাহ উদ্দিন। রাজপুত্র আব্দুল কাদির এর সমবয়সী। মাহমুদ পাশা ঘরের শত্রু বিভীষণ। উসমানীয় খেলাফতকে উৎখাত করে নিজে ব্রিটিশ করদ রাজ্যের গভর্নর হবার স্বপ্নে বিভোর। ছেলে সাবাউদ্দিনও বাবার মত ক্রিমিনাল। তার কাজিন আব্দুল কাদির এর মাথা নষ্ট করে দেবার জন্য এই একজনই যথেষ্ট। বোন সেনিহা খাতুেনর অনুরোধে সুলতান, মাহমুদ পাশাকে রেলপথ প্রকল্পের কাজ তদারকির দায়িত্ব দিলেন। এতে ক্ষেপে যায় সুলতানের স্ত্রী বিদার খাতুনের ভাই মেহমুদ পাশা। সুলতান বোন না স্ত্রী – কার কথা শুনবেন এই সিদ্ধান্তের যখন মুখোমুখি হচ্ছেন ঠিক এমন সময় থিওডোর হারজেল হিরাম নামক এক খুনিকে ইস্তাম্বুলে নিয়োগ করে।
সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ ক্যাপ্টেন জালালকে ব্রিটেনের রানীর বার্মিংহাম প্রাসাদে ছদ্মবেশে একটি মিশন পরিচালনা করার জন্য পাঠিয়েছেন কয়েক বছর আগে। মিশন শেষ করে ক্যাপ্টেন জালাল ইস্তাম্বুল এসে সুলতানকে ভয়াবহ তথ্য দিলো। ইউরোপিয়ানরা এক নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার রোডম্যাপ করেছে। তারা ১৯০১ সালকে টার্গেট করেছে।
ক্যাপ্টেন জালাল সুলতান কে জানালো যে, প্রাসাদের গোপন নথি রাখার ঘরে সে দেখেছে যে:
এটা ১৮৯৬ সাল কিন্তু ম্যাপের সাল ১৯০১। এবং এটার উপরে লেখা – নতুন শতকের পৃথিবী। ফিলিস্তিনে একটি নতুন ইসরাইল রাষ্ট্র, বুলগেরিয়ার সীমানা ইয়েসিলকই থেকে গ্রীকরা এখানে, সমগ্র আইসল্যান্ড তাদের ক্রিট ইজমিরসহ একটি নতুন মেসোডেনিয়ন রাষ্ট্র এবং বিশাল সাইবেরিয়া এইখানে, বসনিয়ান মুসলিমরা এই রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত। আলবেনিয়া সাইপ্রাস সরাসরি রানীর দখলে। সিরিয়ায় আরেকটি নতুন রাষ্ট্র। ইরাক তিউনিশিয়া কলোনিস আর্মেনিয়া আরি, ভান, বিটনিস, বাটুম। হিজাজ মক্কা মদিনায় একজন ব্রিটিশ সৈন্যের ছবি আঁকা আছে যে খিলাফতের পতাকা ধরে আছে। এবং ইস্তাম্বুল রাজধানী অর্থডক্স ক্রস সহ সেখানে আরেকটি রাষ্ট্র গঠন করা হবে যা তুর্কীদের জন্য। বিলজিক থেকে আমাশিয়া আঙ্কারা ত্রাবজন থাকবে বৃটিশদের নিয়ন্ত্রণে – এই হল প্ল্যান।
ব্রিটিশদের একমাত্র লক্ষ্য হলো, খেলাফতের পতাকাটাকে ধ্বংস করা বলে ক্যাপ্টেন জালাল উদ্দিনের কাছে তথ্য উপাত্ত পেলেন সুলতান আবদুল হামিদ।
এই নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার বাস্তবায়ন পরবর্তীতে ঠিকই হয়েছে। ওসমানী খেলাফত ধ্বংস করা হয়েছে। সেই ধ্বংসের করুণ কাহিনী আর আজকের নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার এই পটভূমি বুঝতে হলে পায়িতাথ আবদুল হামিদ সিরিজটি অবশ্যই দেখা দরকার।– নাজমুস সায়াদাত