জুলাই বিপ্লবের স্বপ্ন ছিল সংবিধান ও রাষ্ট্রকাঠামোর মৌলিক পরিবর্তন করে জনআকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ নির্মাণ : গোলাম পরওয়ার
১১ অক্টোবর ২০২৬ ২০:২৭
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল এবং সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, জুলাই বিপ্লবের স্বপ্ন ছিল একটি বৈষম্যহীন ও মানবিক, দলীয়করণমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত, ভিন্নমতের উপর দমনপীড়নমুক্ত এবং বিদ্যমান সংবিধান ও রাষ্ট্রকাঠামোকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করে জনআকাঙ্ক্ষার একটি বাংলাদেশ নির্মাণ করা। সেই লক্ষ্যে গণভোট হয়েছে।
তিনি বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে ৬টি মৌলিক বিষয়ে সংস্কারের জন্য দীর্ঘ ৯ মাস ৩৩টি রাজনৈতিক দল ৭২টি বৈঠক করে ৮৪টি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিলাম এবং ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছিলাম।
আগামী ৩১ অক্টোবর ঢাকা-খুলনা-যশোর-ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া রুটে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ উপলক্ষে রোববার ১১ অক্টোবর বেলা ২টায় যশোর প্রেস ক্লাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর যশোর-কুষ্টিয়া ও ফরিদপুর অঞ্চলের এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
গোলাম পরওয়ার বলেন, আগামী ৩১ অক্টোবর শনিবার গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, প্রশাসনের সর্বস্তরে সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধের দাবিতে ঢাকা-খুলনা-যশোর-ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া রুটে লংমার্চ অনুষ্ঠিত হবে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরা জামায়াতে ইসলামী উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি, গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কারের আইনি যে কাঠামো অনুমোদিত হয়েছে সেটি হলো সংবিধান সংস্কার পরিষদ নামে একটি সাংবিধানিক কাউন্সিল হবে। গণভোটে ৮৪টি সংস্কারের সামারাইজ করে চারটি বিষয়ে রায় চাওয়া হলে প্রায় ৭০ ভাগ জনগণ হ্যাঁ-তে রায় দিয়েছে। কিন্তু ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদিত সংস্কারের আইনি পদ্ধতি উপেক্ষা করে সমস্ত দলকে বাদ দিয়ে একদলীয় কায়দায় বিরোধীদল উপেক্ষা করে সংবিধান সংস্কার না করে নিজেদের মতো সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। আমাদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সরকারের এই উদ্যোগকে প্রত্যাখান করেছেন। কারণ এই পদ্ধতিতে সংবিধান সংশোধনের কথা গণভোটে হয়নি। নির্বাচিত এমপিদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ হবে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, আমাদের সাত দফা দাবির প্রথম দফা হলো যে, কোনো সংশোধন নয়, গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদিত আইনি পদ্ধতিতেই সংবিধান সংস্কার করতে হবে। এটাই মূলত আইন। এটা না মানার অর্থই হলো জনগণের আস্থার সাথে গাদ্দারি করা, বিশ্বাসঘাতকতা করা, দ্বিচারিতা করা, বিশ্বাসভঙ্গ করা।
সরকারকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, এতবড় রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের পর গণভোটের রায়কে আপনি উপেক্ষা করবেন? শত শত জুলাই যোদ্ধা এখনো শরীরে বুলেটের স্প্লিন্টার নিয়ে দিনাতিপাত করছে। প্রায় ১৪০০ মানুষ প্রাণ দিয়েছে, চোখ হারিয়েছে, পঙ্গু হয়েছে, আহত হয়েছে এই দেশটাকে বদলে দেবার জন্য। এই জন্যই আমরা লংমার্চের আয়োজন করেছি।
গোলাম পরওয়ার বলেন, অধিবেশনের প্রথম ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের বৈঠক ডাকার কথা ছিল, সরকার তা ডাকেনি। ১৮০ দিনের মধ্যে সংস্কার শেষ করতে হবে। এই অক্টোবরে সেই সময় শেষ হয়ে যাবে। সব শেষ হয়ে যাবে, অথচ ৭০ শতাংশ জনগণের রায়ের ব্যাপারে বিরোধীদল কথা বলবে না?
তিনি বলেন, আমাদের লংমার্চ হচ্ছে নিয়মতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি। এটার মাধ্যমে আমরা জনমতকে জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষে সংগঠিত করতে চাই। সরকার যে বিশ্বাসভঙ্গ করেছে তা জনগণকে আমরা জানাতে চাই। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যুৎ জ্বালানি, গ্যাস, সার, সংকট দূর করতে হবে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, বিএনপির স্লোগান সবার আগে বাংলাদেশ। এখন দেখছি সবার আগে বিএনপি। চাকরির নিয়োগে ছাত্রদলকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। মেধার মূল্য নাই। হাট কমিটি, স্কুল কমিটি, বাজার কমিটি থেকে শুরু করে ইমাম মোয়াজ্জিনের বেতনের ক্ষেত্রেও দলীয়করণ করা হচ্ছে। সব কমিটিতে দলীয় লোক বসানো হচ্ছে। কৃষক কার্ড ফ্যামিলি কার্ডের তালিকা করা এবং তার সুপারভাইজারি করা- সব জায়গায় দলীয় লোক বসানো হচ্ছে। দলীয়করণে গোটা দেশ এখন জিম্মি। সরকারের সংকীর্ণ দলীয়করণ পরিহার করতে হবে। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি দেদারসে চলছে- এসব বন্ধ করতে হবে। আগের সরকারের শুধু নামটা পাল্টে গেছে- চরিত্র আচরণ সব একই। ট্রাক স্ট্যান্ড, বেবি স্ট্যান্ড, বালুর ঘাট, নদীর ঘাটে সমানতালে চাঁদাবাজি চলমান।
তিনি বলেন, জুলাই গণহত্যার সাথে জড়িত কিছুলোকের বিচার হয়েছে, কিন্তু তা এখনো কার্যকর হয়নি। কিছুলোক পালিয়ে গেছে। তাদের গ্রেফতার ও বিচার করতে হবে। আমরা দেখতে পাচ্ছি ফ্যাসিস্টদের অনেকেই জেল থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন। তারা ধীরে ধীরে রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছেন, আবির্ভূত হচ্ছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি দল মিছিল করছে, আর সরকারের গোয়েন্দারা জানে না- তা হতে পারে না।
সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। কর্মসূচি দিচ্ছি। লংমার্চের মাধ্যমে সরকারের বোধোদয় হবে বলে আশা করি আমরা। সরকার সঠিক পথে ফিরে আসুক। গণবিরোধী ভূমিকার অপরিণামদর্শী চিন্তা থেকে তারা ফিরে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, বিগত দিনে ১১ দলীয় জোট দুটি লংমার্চ সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এবারের লংমার্চও একইভাবে শান্তিপূর্ণ থাকবে। লংমার্চের কারণে সাময়িক যাতায়াত ও চলাচলে যে ভোগান্তি হতে পারে, সে জন্য এই অঞ্চলের ব্যবসায়ী, পথচারীসহ সর্বস্তরের মানুষের কাছে অগ্রিম দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, আগামী ৩১ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা-কুষ্টিয়া অভিমুখের লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশ জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে সকাল ৭টায় অনুষ্ঠিত হবে, ইনশাআল্লাহ। এতে ১১ দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখবেন। এদিন প্রায় ১ হাজার গাড়ির এক বিশাল বহর নিয়ে লংমার্চ সকাল ৮টায় মাওয়া সড়ক হয়ে পদ্মাসেতু পার হয়ে শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ভাঙ্গা (ফরিদপুর), গোপালগঞ্জ, ফকিরহাট(বাগেরহাট), রূপসা ব্রিজ হয়ে খুলনা। অতঃপর যশোর ও ঝিনাইদহ হয়ে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ মাঠের সমাপনী সমাবেশে যোগ দেবে লংমার্চের বহর। প্রায় ১২ ঘণ্টার দীর্ঘ এই পথযাত্রায় মিডিয়াকর্মী, চিকিৎসক, শিল্পী ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সদস্যরা অংশ নেবেন।
পথে শরীয়তপুরের জাজিরার নাওডোবা (সকাল ৯টা); বাগেরহাটের ফকিরহাটের কাঁটাখালীর মোড় (সকাল ১১টা); খুলনা মহানগরীর বাবরী চত্বর (বেলা ১২:৩০) ও ফুলতলার বাসস্টান্ডের স্বাধীনতা চত্বর (দুপুর ২টা); যশোরের মুড়লীর মোড় (বিকেল ৩:৩০); ঝিনাইদহের বাস টার্মিনাল (বিকেল ৫টায়) পথসভা অনুষ্ঠিত হবে। সবশেষে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ মাঠে সমাপনী সমাবেশে রাত সাড়ে ৮টায় যোগ দেবে লংমার্চের বহর।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম ও প্রচার মিডিয়া সেক্রেটারি এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের; কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ মো. ইজ্জত উল্লাহ এমপি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও যশোর-কুষ্টিয়া অঞ্চল পরিচালক জনাব মোবারক হোসাইন; বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি এডভোকেট আতিকুর রহমান, যশোর জেলা জামায়াতের আমীর গোলাম রসূল এমপি এবং মোক্তার আলী এমপিসহ ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জসহ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর জামায়াতের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতারা।
সংবাদ সম্মেলন শেষে প্রেস ক্লাব শহীদ সাংবাদিক শামসুর রহমান অডিটোরিয়ামে খুলনা বিভাগের সকল এমপি এবং জেলা নেতৃবৃন্দদের নিয়ে লংমার্চের প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়।