বোরকা, নিকাব ও হিজাব বিতর্ক : মেলোনির ইতালি কোন পথে
৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৮:২৯
॥ সুমন মাহমুদ ॥
ইউরোপের রাজনীতিতে মুসলিম নারীর পোশাক আবারও বড় বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে। এবার নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে ইতালি। গত ২০ সেপ্টেম্বর ক্ষমতাসীন দল ব্রাদার্স অব ইতালির (ফ্রাতেল্লি দ’ইতালিয়া) যুব সংগঠনের অনুষ্ঠান ‘ফেনিক্স’-এ প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ঘোষণা দেন, সরকার স্কুলে বুরকা ও নিকাব নিষিদ্ধ করতে আইন আনছে। তিনি বলেন, ‘স্কুলে যেতে হবে মুখ খোলা রেখে। প্রকৃত বা কল্পিত কোনো ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে ইতালিতে কেউ ঠিক করে দিতে পারে না যে একজন তরুণীকে নিজেকে আড়াল করে রাখতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, নারী ও পুরুষের সমতা নিয়ে কোনো আপস নেই। (আনসা, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬)।
একই বক্তৃতায় মেলোনি আরও দুটি ঘোষণা দেন। প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে বিদেশি শিক্ষার্থীর একটি সর্বোচ্চ সীমা আইন করে বেঁধে দেওয়া হবে। আর যেসব বিদেশি শিক্ষার্থী সমাজে মিশে যেতে গুরুতর সমস্যায় পড়ছে, তাদের মা-বাবাকে ইতালীয় ভাষা শিখতে হবে। মেলোনির ভাষায়, ‘ইতালীয় শিশুরা সংখ্যালঘু হয়ে গেছে বলে ক্লাসের এক কোণে কোণঠাসা বোধ করবে, এটা হতে পারে না’। (আনসা, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬)। শ্রেণিপ্রতি সর্বোচ্চ কতজন বিদেশি শিক্ষার্থী থাকতে পারবে, সে সংখ্যা তিনি জানাননি। (রয়টার্স, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬)।
সরকারি সূত্রের বরাতে স্কাই টিজি২৪ জানিয়েছে, এসব ব্যবস্থা একটি ডিক্রি আইন হিসেবে বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভায় তোলা হতে পারে। শিক্ষামন্ত্রী জুজেপ্পে ভালদিতারা বলেছেন, সীমাটি মূলত নতুন আসা এবং ইতালীয় ভাষা না জানা বিদেশি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। যারা কিন্ডারগার্টেন পেরিয়ে প্রথম শ্রেণিতে উঠছে, কিংবা কয়েক বছর সফলভাবে ইতালির স্কুলে পড়েছে, তারা এর বাইরে থাকবে। তার হিসাবে, যেসব ক্লাসে ভাষা না জানা নতুন আসা বিদেশি শিক্ষার্থী ২০ শতাংশের বেশি, এমন ক্লাসের সংখ্যা এক হাজারের সামান্য কম, যার বেশিরভাগই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। (স্কাই টিজি২৪, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬)।
আসলে কী নিষিদ্ধ হচ্ছে
ঘোষণাটি প্রচারিত হওয়ার পর আমার কাছে প্রথম যে প্রশ্ন সামনে এসেছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: মেলোনি ঠিক কী নিষিদ্ধ করতে চান, বুরকা ও নিকাব, নাকি হিজাবও?
আমার কাছে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য বলছে, প্রস্তাবটি মুখ ঢাকা পোশাক নিয়ে। ইতালির অ্যাডনক্রোনোস, ফ্যানপেজ ও ইল সোলে ২৪ ও-রের প্রতিবেদনে ‘বুরকা ও নিকাব’ শব্দ দুটিই এসেছে। (অ্যাডনক্রোনোস, ফ্যানপেজ ও ইল সোলে ২৪ ওরে, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬)। ইউরোনিউজ ও রয়টার্সও প্রস্তাবটিকে বুরকা ও নিকাব নিষিদ্ধকরণ হিসেবে বর্ণনা করেছে; রয়টার্সের প্রতিবেদনে হিজাব নিষিদ্ধের কোনো উল্লেখ নেই। (ইউরোনিউজ ও রয়টার্স, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬)। মেলোনির নিজের কথা, ‘স্কুলে যেতে হবে মুখ খোলা রেখে’, সেটিও মুখ ঢাকার প্রশ্নের দিকেই ইঙ্গিত করে। দুই দিন পর সরকারের প্রস্তুতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও কেবল বুরকা ও নিকাবের কথা বলা হয়েছে। (স্কাই টিজি২৪, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬)।
তবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কোনো কোনো শিরোনামে ‘ভেইল’ বা ‘মাথা ঢাকার পোশাক’ জাতীয় বিস্তৃত শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যা বিভ্রান্তি বাড়িয়েছে। তাই আইনের চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশের আগে ‘ইতালিতে হিজাব নিষিদ্ধ’ এমন শিরোনাম তথ্যগতভাবে সঠিক নয় বলে মনে করি।
হিজাব, নিকাব ও বুরকা এক নয়
হিজাব বলতে সাধারণত মাথা ও চুল ঢাকার কাপড় বোঝায়, যেখানে মুখ খোলা থাকে। মুসলিম নারীদের মধ্যে এটিই সবচেয়ে প্রচলিত। নিকাব মুখ ঢেকে রাখে, সাধারণত শুধু চোখ দুটি খোলা থাকে। আর বুরকা আরও পূর্ণাঙ্গ আবরণ, যাতে মাথা, মুখ ও শরীর ঢাকা থাকে এবং চোখের সামনে সাধারণত জালির মতো অংশ থাকে।
এই পার্থক্য রাজনৈতিক বিতর্কে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মুখ ঢাকার বিষয়টি কোনো কোনো দেশের রাষ্ট্র নিরাপত্তা, পরিচয় শনাক্তকরণ ও সরাসরি যোগাযোগের যুক্তিতে আলাদাভাবে বিবেচনা করতে পারে। কিন্তু মুখ খোলা রেখে মাথায় স্কার্ফ পরা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রশ্ন।
ইসলামে নিকাবের অবস্থান
নারীর মুখ ঢাকা বা নিকাব পরা বাধ্যতামূলক কি না, এ নিয়ে ইসলামী ফিকহে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। মিশরের দারুল ইফতার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অধিকাংশ ফকিহ নারীর মুখ ও হাত খোলা রাখা বৈধ মনে করেছেন এবং নিকাবকে ফরজ গণ্য করেননি। প্রতিষ্ঠানটি হানাফি, মালিকি ও শাফেয়ি মাজহাবের প্রধান অবস্থানও তুলে ধরেছে। (দারুল ইফতা আল মিসরিয়্যা)।
অর্থাৎ নিকাবকে ইসলামের বাইরের কিছু বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি একে সব মুসলিম নারীর জন্য সর্বসম্মত ফরজ বলাও সঠিক নয়। মাথা ও শরীর ঢাকার বিধান ইসলামী ফিকহে অনেক বেশি প্রতিষ্ঠিত, যদিও এর ধরন ও সীমা নিয়ে মাজহাবগুলোর মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে। তাই ইতালির আইন নিয়ে আলোচনায় ‘নিকাব মানেই ইসলাম’ অথবা ‘নিকাব ইসলামের অংশই নয়’, দুই বিষয়কে এড়িয়ে চলা উচিত।
সরকারের যুক্তি, বিরোধীদের আপত্তি
মেলোনি তার ঘোষণাকে সামাজিক একীভূতকরণ, ইতালীয় ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিতি এবং নারী ও পুরুষের সমতার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এর আগে আগস্টের শুরুতে শিক্ষামন্ত্রী ভালদিতারা স্কুলে বুরকা নিষিদ্ধের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছিলেন, এর উদ্দেশ্য নারীর মর্যাদা এবং নারী ও পুরুষের সমতার মূল্যবোধ পুনর্ব্যক্ত করা। তখন বিরোধীদল ডেমোক্রেটিক পার্টি ও শ্রমিক সংগঠন সিজিআইএল অভিযোগ করেছিল, এই প্রস্তাব একীভূতকরণ নয়, বরং আত্তীকরণের পথে হাঁটছে। ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেটর সিমোনা মালপেৎসি প্রশ্ন তোলেন, এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা যেখানে খুবই কম, সেখানে এই নিষেধাজ্ঞা স্কুলের আসল প্রয়োজন মেটায় কি না। (আনসা, ১ আগস্ট ২০২৬)।
মেলোনির ঘোষণার পরদিনই ইতালির প্রেসিডেন্ট সের্জো মাত্তারেল্লা আমাত্রিচে শহরে নতুন শিক্ষাবর্ষের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেন, অভিবাসী ও তাদের সন্তানদের জন্য স্কুলই একীভূতকরণের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম। স্কুলের দায়িত্ব বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠী বা ঘেটো তৈরি ঠেকানো এবং দেয়াল তুলতে না দেওয়া। তিনি সংবিধানের ৩৪ অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে মনে করিয়ে দেন, স্কুল সবার জন্য উন্মুক্ত। (আনসা, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬)।
ফলে বিতর্কটি শুধু হিজাব বা বুরকার নয়। মৌলিক প্রশ্ন হলো, একীভূতকরণ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র কি নির্দিষ্ট ধর্মীয় পোশাক নিয়ন্ত্রণ করবে, নাকি এর প্রকৃত পথ শিক্ষা, ভাষা, সামাজিক অংশগ্রহণ ও পারস্পরিক আস্থা?
ইউরোপে ইতালি একা নয়
ফ্রান্স ২০১০ সালের আইনে জনপরিসরে মুখ ঢেকে রাখা পোশাক নিষিদ্ধ করেছে। আইনটিতে কোনো ধর্মের নাম নেই; সাধারণভাবে জনসমক্ষে মুখ আড়াল করাই নিষিদ্ধ (লেজিফ্রঁস, আইন নম্বর ২০১০-১১৯২)। অস্ট্রিয়া ২০১৭ সাল থেকে জনপরিসর ও সরকারি ভবনে এমনভাবে মুখ ঢাকা নিষিদ্ধ করেছে, যাতে চেহারা শনাক্ত করা না যায়; স্কুলও এর আওতায় পড়ে (অস্ট্রিয়া সরকারের তথ্য পোর্টাল)। নেদারল্যান্ডস ২০১৯ সাল থেকে আংশিক নিষেধাজ্ঞা চালু করেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি ভবন, স্বাস্থ্যসেবা ও গণপরিবহনে পুরো মুখ ঢাকা বা শুধু চোখ খোলা রাখে এমন পোশাক নিষিদ্ধ, তবে সাধারণ হেডস্কার্ফ বা হিজাব এর আওতার বাইরে (নেদারল্যান্ডস সরকারের ওয়েবসাইট)। জার্মানিতে বিভিন্ন রাজ্য ও পেশাভিত্তিক বিধিনিষেধ নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক থাকলেও ফ্রান্সের মতো দেশজুড়ে সাধারণ কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
অস্ট্রিয়ার সাম্প্রতিক পদক্ষেপ অবশ্য আরও এক ধাপ এগিয়ে। গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে সেখানে ১৪ বছরের কম বয়সী মেয়েদের জন্য স্কুলে মুসলিম হেডস্কার্ফ নিষিদ্ধ হয়েছে। নিয়ম না মানলে প্রথমে আলোচনা, পরে ১৫০ থেকে ৮০০ ইউরো পর্যন্ত জরিমানার বিধান আছে। ৯ থেকে ১২ বছর বয়সী কয়েকজন ছাত্রী ও তাদের মা-বাবা আইনটিকে সাংবিধানিক আদালতে চ্যালেঞ্জ করেছেন, আর আদালত জানিয়েছে ২০২৭ সালের প্রথমার্ধে রায় দেবে। উল্লেখ্য, ২০২০ সালে একই আদালত ১০ বছরের কম বয়সীদের জন্য হেডস্কার্ফ নিষেধাজ্ঞা বাতিল করে বলেছিল, এটি মুসলমানদের প্রতি বৈষম্যমূলক এবং রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির পরিপন্থী। (রয়টার্স, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬)।
অর্থাৎ অস্ট্রিয়ার নতুন আইন সরাসরি হিজাবের সঙ্গে সম্পর্কিত, আর ইতালির ঘোষিত প্রস্তাব এখন পর্যন্ত মুখ ঢাকা পোশাক নিয়ে। তবে ‘ইতালিতে বুরকা নিষিদ্ধ’ এমন একটি সাধারণ বাক্যে পুরো ইউরোপের বাস্তবতা ধরা যায় না।
ইতালিতে মুসলমান কত
এ প্রশ্নে সংখ্যার সতর্ক ব্যবহার জরুরি। ফাউন্ডেশন ইসমুর হিসাবে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি ইতালিতে বসবাসরত বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে মুসলমান প্রায় ১৭ লাখ, যা বিদেশি বাসিন্দাদের ৩০ শতাংশের বেশি। আমার আমার গবেষণায় সেই সংখ্যা প্রায় তিনগুণ। কারণ ইতালির আদম-শুমারিতে পরিচয় যাচাইকে সাম্প্রদায়িক হিসেবে আলাদা করা হয়না। খ্রিষ্টানদের বিভিন্ন সম্প্রদায়কে আলাদা ধরলে মুসলমানরাই বিদেশিদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ধর্মীয় গোষ্ঠী। জাতীয়তা অনুযায়ী মরক্কোর মানুষ ৪ লাখের কিছু বেশি, বাংলাদেশি প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার, পাকিস্তানি প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার এবং আলবেনীয় দেড় লাখের কিছু বেশি। বাংলাদেশি ও পাকিস্তানিদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। (ইসমু, জুলাই ২০২৫)। ইতালির স্কুলে বিদেশি নাগরিক শিক্ষার্থী মোট শিক্ষার্থীর ১১ দশমিক ৬ শতাংশ। (ইসমুর তথ্য, রয়টার্সে উদ্ধৃত, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬)।
ইসমুর এই হিসাবে ইতালীয় নাগরিকত্ব পাওয়া মুসলমানরা নেই। তাদের যোগ করলে মোট সংখ্যা বাড়বে। কারণ আমার তথ্য মতে (বই-ইতালিতে ইসলাম ও মুসলিম) ইতালিয়ানদের মধ্যে ইসলাম গ্রহণ করার সংখ্যাও প্রায় দুই লাখ। সমাজবিজ্ঞানী ফাব্রিৎসিও চোক্কার তথ্যানুযায়ী, ২০২১ সালের শুরুতে ইতালিতে মোট মুসলমান ছিল প্রায় ২৭ লাখ ৫৩ হাজার, যা দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। এর মধ্যে প্রায় ১২ লাখ ২০ হাজার ইতালীয় নাগরিক (লেনিউস, চোক্কার গবেষণার ভিত্তিতে)। বাস্তবসম্মত হিসাবে বলা যায়, ইতালির মুসলিম জনগোষ্ঠী ৫০ লাখের কাছাকাছি বা আরও বেশি এবং তাদের একটি ক্রমবর্ধমান অংশ ইতালীয় নাগরিক ও ইতালিতে বেড়ে ওঠা দ্বিতীয় প্রজন্ম।
যদিও এই জনগোষ্ঠী কোনো একক জাতির নয়। মরক্কো, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আলবেনিয়া, সেনেগাল, মিশর, তিউনিসিয়াসহ বহু দেশের মানুষ মিলে এটি একটি বহুস্তরের সমাজ। তাদের ধর্মচর্চা, ভাষা, রাজনৈতিক চিন্তা ও সামাজিক অগ্রাধিকারও ভিন্ন ভিন্ন।
প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন
ইতালির মুসলিম সমাজ সংগঠনহীন নয়। ১৯৯০ সাল থেকে কাজ করছে ইতালির ইসলামী সম্প্রদায়সমূহের ইউনিয়ন বা ইউসিওআইআই (ইউসিওআইআইয়ের ওয়েবসাইট)। ইতালীয় ইসলামী ধর্মীয় সম্প্রদায় বা কোরেইস নিজেকে ইতালীয় মুসলমানদের ধর্মীয় ও আন্তঃধর্মীয় সংলাপের প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচয় দেয় (কোরেইসের ওয়েবসাইট)। তবে ইতালির সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্র বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে ‘ইনতেসা’ নামে যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি করে, ইসলামী কোনো সংগঠনের সঙ্গে তেমন চুক্তি এখনো হয়নি। এখানেই মুলত বড় দূরত্বটা।
তাই মূল প্রশ্নটি সংগঠনের অস্তিত্ব নিয়ে নয়, বরং এত বৈচিত্র্যময় একটি সমাজকে প্রতিনিধিত্ব করার মতো সর্বজনগ্রাহ্য ও শক্তিশালী মঞ্চ আছে কি না, তা নিয়ে। বাংলাদেশি, পাকিস্তানি, মরক্কান, আলবেনীয়, আরব ও আফ্রিকান মুসলমানদের অভিজ্ঞতা এক নয়। কেউ প্রথম প্রজন্মের অভিবাসী, কেউ ইতালিতেই জন্মেছেন; কেউ ব্যবসায়ী, কেউ শিক্ষার্থী, কেউ পেশাজীবী। ভবিষ্যতের জন্য শুধু মসজিদকেন্দ্রিক সংগঠন যথেষ্ট হবে না। প্রয়োজন একটি বৃহত্তর নাগরিক মঞ্চ, যেখানে ইতালিতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা আলেমদের পাশাপাশি নারী, আইনজীবী, শিক্ষক, চিকিৎসক, গবেষক, ব্যবসায়ী ও তরুণদের প্রতিনিধিত্ব থাকবে।
মেলোনি ও মুসোলিনির উত্তরাধিকার
মেলোনির দল ব্রাদার্স অব ইতালি সরাসরি মুসোলিনির দলটির শিকড় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গঠিত ইতালিয়ান সোশ্যাল মুভমেন্ট বা এমএসআইয়ে, যা নব্য ফ্যাসিবাদী ধারার সঙ্গে যুক্ত ছিল। আবার মেলোনি নিজে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দলকে ফ্যাসিবাদ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন। ২০২৪ সালে তিনি বলেছিলেন, দলে ফ্যাসিবাদের প্রতি মোহ, বর্ণবাদ বা ইহুদিবিদ্বেষের কোনো জায়গা নেই। (রয়টার্স, ২ জুলাই ২০২৪)। বরং বলা যায়, দলটির ঐতিহাসিক শিকড় যুদ্ধোত্তর নব্য ফ্যাসিবাদী ধারায় হলেও মেলোনি নিজেকে মূলধারার রক্ষণশীল নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। তবে জাতীয় পরিচয়, অভিবাসন ও ঐতিহ্যগত মূল্যবোধ নিয়ে তাঁর রাজনীতি ইতালির পুরোনো ডানপন্থী ধারার সঙ্গে ধারাবাহিকতার বিতর্ককে বারবার সামনে নিয়ে আসছে।
কেন এখন এই সিদ্ধান্ত
কোনো একক উদ্দেশ্য ধরে নেওয়া ঠিক হবে না, তবে প্রেক্ষাপট গুরুত্বপূর্ণ। ঘোষণাটি এসেছে দলের যুব সংগঠনের মঞ্চ থেকে এবং তাতে পোশাকের পাশাপাশি বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা সীমিত করা ও অভিভাবকদের ভাষা শেখার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। ২০২৭ সালে ইতালির পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা, আর অভিবাসন সেখানে বড় ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। ফলে বিষয়টি অভিবাসন, জাতীয় পরিচয়, সামাজিক একীভূতকরণ, শিক্ষা এবং নারী ও পুরুষের সমতা, এই পাঁচটি প্রশ্নের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছে।
মুসলিম সমাজের করণীয়
এ মুহূর্তে আবেগের চেয়ে কৌশল বেশি জরুরি। প্রথম কাজ আইনের চূড়ান্ত ভাষার জন্য অপেক্ষা করা। আইন যদি কেবল মুখ ঢাকা পোশাক নিষিদ্ধ করে, তবে একে হিজাব নিষেধাজ্ঞা হিসেবে প্রচার করা ঠিক হবে না। আর ভবিষ্যতে কোনো আইন যদি সত্যিই মুখ খোলা রেখে মাথায় স্কার্ফ পরা নিষিদ্ধ করতে চায়, সেটি হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন আইনি ও সাংবিধানিক প্রশ্ন।
দ্বিতীয়ত, আইনের সঙ্গে সংঘাতে না গিয়ে আইনি ও সাংবিধানিক পথ ব্যবহার করতে হবে। কোনো নিষেধাজ্ঞার সাংবিধানিক ভিত্তি কী, তা প্রয়োজনের তুলনায় আনুপাতিক কি না, সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য কি না— এসব প্রশ্ন আদালতে ও জনপরিসরে তোলা যায়। অস্ট্রিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, আদালতের পথ অকার্যকর নয়।
তৃতীয়ত, ইতালীয় সমাজের বৃহত্তর অংশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম, স্থানীয় প্রশাসন ও নাগরিক সমাজে ইতালীয় ভাষায় নিজেদের বক্তব্য পৌঁছে দিতে হবে। চতুর্থত, মুসলিম নারীদের কণ্ঠ সামনে আনতে হবে। নিকাব বা হিজাব নিয়ে পুরুষ আলেম ও রাজনীতিকদের তর্ক যত শোনা যায়, সংশ্লিষ্ট নারীদের নিজের অভিজ্ঞতা ও মতামত তত শোনা যায় না, অথচ প্রশ্নটি তাঁদের পোশাক ও ব্যক্তিস্বাধীনতা নিয়েই।
দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বড় কাজ রাজনৈতিক অংশগ্রহণ। ইতালিতে জন্ম নেওয়া, ইতালীয় ভাষায় শিক্ষিত ও নাগরিকত্বপ্রাপ্ত মুসলমানদের স্থানীয় রাজনীতি, পেশাজীবী সংগঠন, শিক্ষা, গণমাধ্যম ও জাতীয় রাজনীতিতে এগিয়ে আসতে হবে। এটি কোনো বিশেষ সুবিধা চাওয়া নয়, বরং গণতান্ত্রিক সমাজে প্রতিনিধিত্বের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
লড়াইটা পোশাকের চেয়ে বড়
মেলোনির ঘোষণাকে শুধু ‘বোরকা নিষিদ্ধ’ হিসেবে দেখলে ঘটনার অর্ধেকই চোখে পড়বে। আসল প্রশ্ন হলো, ইউরোপের বহুত্ববাদী গণতন্ত্রে একজন মুসলিম নাগরিক নিজের ধর্মীয় পরিচয় কতটা ধরে রাখতে পারবেন এবং একই সঙ্গে রাষ্ট্রের নাগরিক পরিচয়ের সঙ্গে কতটা যুক্ত হবেন। এটি শুধু মুসলমানদের প্রশ্ন নয়, ইউরোপীয় গণতন্ত্রেরও প্রশ্ন।
নিরাপত্তা বা সামাজিক যোগাযোগের যুক্তিতে রাষ্ট্র যদি মুখ খোলা রাখার নিয়ম করে, তবে সেই যুক্তিকে প্রমাণ, আনুপাতিকতা ও সমান প্রয়োগের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। আবার মুসলিম সমাজকেও বুঝতে হবে, শুধু ধর্মীয় অধিকারের দাবি তুললেই নাগরিক প্রভাব তৈরি হয় না। ভাষা, শিক্ষা, অর্থনীতি, পেশাজীবী নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণই দীর্ঘমেয়াদি শক্তির ভিত্তি।
ইতালির মুসলমানদের সামনে তাই দুটি পথ একসঙ্গে খোলা। একটি হলো আইনকে সম্মান করে আইনি ও গণতান্ত্রিক পথে নিজেদের অধিকার রক্ষা করা। অন্যটি হলো নিজেদের সমাজকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে ইতালির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় মুসলমানরা শুধু আলোচনার বিষয় না থেকে আলোচনার অংশীদার হন। একটি পোশাকের আইন একদিন বদলাতে পারে, কিন্তু একটি সমাজের রাজনৈতিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা গড়ে উঠতে সময় লাগে। সেই সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত যেকোনো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রকৃত নাগরিক শক্তি।
লেখক : গবেষক এবং ‘ইতালিতে ইসলাম ও মুসলিম’ গ্রন্থের লেখক।