মায়াকাননের মমতাময়ী রওশন সাঈদ
৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৮:২৬
॥ এডভোকেট সাবিকুন্নাহার মুন্নী ॥
কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসেন নীরবে। তাদের জীবন ও নামে হয়তো বাহ্যিক কোনো জৌলুস থাকে না, ইতিহাসের পাতায় তাদের নাম বড় অক্ষরে লেখা হয় না, তাদের কর্মের কোনো আনুষ্ঠানিক স্মারকও তৈরি হয় না। অথচ তারা চলে যাওয়ার পর আমরা বুঝতে পারি— একটি মানুষের জীবন কতগুলো মানুষের জীবনকে ছুঁয়ে যেতে পারে, কতগুলো ঘরে আলো জ্বালাতে পারে, কতগুলো হৃদয়ে বিশ্বাসের বীজ বুনে যেতে পারে। আমার মা রওশন সাঈদ ছিলেন তেমনই একজন মানুষ।
আমাদের এলাকায় সবাই তাকে আপন করে ডাকত— ‘রওশন খালাম্মা’ বলে। তিনি শুধু আমার মা ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ দাঈ, একজন সমাজসেবী, একজন শিক্ষানুরাগী, একজন সংগঠক, একজন আদর্শ স্ত্রী ও মা, একজন আত্মীয়তাপ্রেমী মানুষ এবং সর্বোপরি আত্মপ্রত্যয়ী একজন নীরব কর্মী— যিনি নিজের জীবনকে মানুষের কল্যাণ ও আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে নিবেদিত করেছিলেন।
আজ তার জীবনের দিকে ফিরে তাকালে মনে হয়, তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে যেন লুকিয়ে আছে এক একটি করে শিক্ষা। তার জীবন ছিল না কোনো একক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তিনি একইসঙ্গে ছিলেন সংসারের অভিভাবক, মানুষের আশ্রয়, শিক্ষার অনুরাগী, দাওয়াতের কর্মী এবং আল্লাহর পথে নিবেদিত এক মুমিন নারী।
শৈশবের আলো ও শিক্ষার অদম্য আকাঙ্ক্ষা
মা জন্মেছিলেন কুমিল্লার একটি ধর্মপ্রাণ মুসলিম পরিবারে। তার পিতা ছিলেন এলাকার একজন সম্মানিত ব্যক্তি এবং দীর্ঘ ২৫ বছর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন একমাত্র বোন— তাই স্বাভাবিকভাবেই ছিলেন সবার অত্যন্ত আদরের।
কিন্তু যে সময়টিতে মা বড় হয়েছেন, তখন রক্ষণশীল পরিবারে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ আজকের মতো এত সহজ ছিল না। বিশেষ করে পর্দাশীল পরিবারের মেয়েদের জন্য শিক্ষার পথ ছিল অনেকটাই সংকীর্ণ। কিন্তু মায়ের ভেতরে ছিল জ্ঞানের প্রতি এক অদম্য তৃষ্ণা।
তিনি তার ভাইদের সঙ্গে রাত জেগে পড়াশোনা করতেন। দূরের পরীক্ষাকেন্দ্রে তাকে বোরকা ও পর্দার মধ্যে গিয়ে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি তার শিক্ষার আকাঙ্ক্ষাকে থামতে দেননি।
শিক্ষার প্রতি তার এই তৃষ্ণা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ছিল। সংসারের কাজের ফাঁকে তিনি বই পড়তেন। রান্না করতে করতেও পাশে বই রাখতেন। ঘরের কাজের মধ্যেও নোট করতেন, আলোচনা শুনতেন, নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করতেন।
তার একটি অসাধারণ গুণ ছিল— তিনি কখনো মনে করতেন না যে তিনি সব জানেন। আমাদের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া মেয়েদের কাছ থেকেও তিনি তার লেখা নোট দেখে দিতে বলতেন। কোথাও ভুল হলে সংশোধন করতে বলতেন। সংগঠনের প্রবীণ খালাম্মাদের তিনি নিজের শিক্ষক মনে করতেন। এই বিনয়ই তাকে সত্যিকার অর্থে একজন আজীবন শিক্ষার্থী করে রেখেছিল।
সংসার, শ্বশুরবাড়ি ও ত্যাগের জীবন
বিয়ের পর মায়ের জীবনে যুক্ত হয় নতুন এক দায়িত্বের অধ্যায়। তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র ছেলের স্ত্রী। আমার বাবার কর্মস্থল ছিল চট্টগ্রামে এবং দাদা হাজী আলী আজগর বিদেশে থাকতেন। দাদির যেন একাকিত্ব না হয়, সেই কারণে মা প্রায় বারো বছর দাদির সাথে থেকে সংসারের দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে বাবা মোহাম্মদ আবু সাঈদ স্থায়ীভাবে ঢাকায় বদলি হলে ঢাকায় বাড়ি তৈরি করা হয় এবং দাদিকেও ঢাকায় নিয়ে আসা হয়।
এই দীর্ঘসময়ের পারিবারিক দায়িত্বের পাশাপাশি মা প্রতিটি সন্তানকে শিক্ষিত করে বড় করেছেন, সেই সময়ে সন্তানদের প্রাইভেট পড়ানোর জন্য নিজে সাথে করে শিক্ষকের কাছে নিয়ে যেতেন, নিকট ও দূরবর্তী আত্মীয়-স্বজনের দেখাশোনা করেছেন, বাড়ির মানুষজনকে সামলেছেন এবং একইসঙ্গে তার দাওয়াতি কাজের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছেন।
বাবা ছিলেন একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। গ্রামের অনেক ছেলেকে তিনি নিজ উৎ উদ্যোগে টাইপিং ও শর্টহ্যান্ড শেখার এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। ফলে আমাদের বাড়ি সবসময়ই মানুষের আনাগোনায় ব্যস্ত থাকত।
আমার মায়ের আগ্রহে চা-পান, রান্না-বান্না, অতিথি আপ্যায়ন, আত্মীয়, শিক্ষার্থী ও পরিচিত মানুষের আসা-যাওয়া— সব মিলিয়ে আমাদের বাড়িটি একটি প্রাণবন্ত মিলনকেন্দ্রে পরিণত হয়। আমাদের শৈশবের একটি বড় অংশ কেটেছে এই আনন্দমেলার আনন্দঘন পরিবেশের মাঝে।
আন্দোলনের পথে একজন নীরব অগ্রসৈনিক
ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে মায়ের সম্পৃক্ততা শুরু হয় বহু বছর আগে সত্তরের দশকের শেষভাগ ও আশির দশকের শুরুর সময় থেকে। সে সময় অনেক জায়গায় প্রকাশ্যে সাংগঠনিক কাজ করার সুযোগ সীমিত ছিল। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও মা নীরবে তার কাজ চালিয়ে গেছেন।
তিনি সংগঠনের দায়িত্বশীল কর্মী ও রুকন হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন। প্রবীণ ও দায়িত্বশীল খালাম্মাদের কাছ থেকে তিনি শিখেছেন, তাদের সঙ্গে তাফসিরে বসেছেন, তাদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন।
হাফিজা আসমা খালাম্মা, শামসুন্নাহার নিজামী খালাম্মা, রোকেয়া আনসার খালাম্মা, রাশিদা খালাম্মাসহ আরও অনেক খালাম্মার সাহচর্য তার দাওয়াতি জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
কিন্তু মা শুধু নিজে শিখে থেমে থাকেননি। তিনি শিখেছেন এবং অন্যকে শেখানোর কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন।
আমাদের বাড়িতে একটি বড় লাইব্রেরি ছিল। সেই সময়ের তুলনায় সেটি ছিল বেশ সমৃদ্ধ একটি পারিবারিক সংগ্রহশালা। সে সময়কার স্মরনীয় একটি ঘটনা—
একবার একটি স্থানীয় মাহফিলে আলোচনা রাখার পর অধ্যাপক গোলাম আজম চাচা আমাদের বাড়িতে খাবারের দাওয়াতে এসেছিলেন। আমাদের লাইব্রেরিটি দেখে তিনি খুব আনন্দিত হন। আমরা তার কাছ থেকে অটোগ্রাফ সংগ্রহ করেছিলাম। আমার বাবার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে একপর্যায়ে জানতে পারেন যে, আমার মা ইতোমধ্যে সংগঠনের রুকন হয়েছেন। অথচ বাবা তখনো রুকনিয়াতের শপথ নেননি।
তিনি বিস্মিত হয়ে রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘এ কী! আপনার আগে আপনার স্ত্রী রুকন হয়ে গেছেন? এটা তো দেখছি ঘোড়ার আগে গাড়ি! এখন আর দেরি করা চলবে না, আপনাকেও দ্রুত রুকনিয়াতের শপথ নিতে হবে।’
ঘটনাটি আজও আমাদের পরিবারের একটি স্মরণীয় স্মৃতি। এতে শুধু হাস্যরস ছিল না; এর মধ্যে মায়ের সাংগঠনিক নিষ্ঠা ও তার অগ্রসরমান মানসিকতার একটি চিত্রও যেন ফুটে উঠেছিল।
মায়াকাননের মাটি থেকে একটি দাওয়াতি পরিসর
মায়াকানন, সবুজবাগ, বাসাবো, মুগদাপাড়া কদমতলা তখন বৃহৎ একটি থানার অংশ। পরবর্তীতে প্রশাসনিকভাবে সেই বৃহৎ এলাকা আজ বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে বহু প্রশাসনিক থানা ও এলাকায় রূপান্তরিত হয়েছে। কিন্তু সেই সময় পুরো এলাকায় ইসলামী দাওয়ার কাজ বিস্তারের জন্য খুব বেশি অবকাঠামো ছিল না। আমার মা তখন মানুষের ঘরে ঘরে ইসলামের দাওয়াতি কাজে যেতে শুরু করলেন। এলাকার কোনো একটি বাড়ি ছিল না যেখানে আমার মায়ের পদগুলো পড়েনি।
দিন-রাতের হিসাব না করে তিনি মানুষের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতেন। দিন রাত পরিশ্রম করে নিজ দায়িত্বরত অ্যাওয়ার্ডের বাইরেও পুরো থানার বিভিন্ন এলাকায় পরিচিত অপরিচিত বিভিন্ন ঘরে দাওয়াত পৌঁছে দেয়া ও সাধারণ সভার আয়োজনের ঘটনা আমাদের পরিবারের স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল।
তিনি প্রতিটি মুসলিম ঘরে যেমন গেছেন, তেমনি হিন্দু, বৌদ্ধসহ এলাকার বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের ঘরেও গেছেন। উল্লেখ্য, আমাদের এলাকায় তখনকার সময়ে বাংলাদেশে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রধান মন্দির ‘ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহার’ অবস্থিত ছিল।
তার আন্তরিকতা ও সৌজন্যে আশপাশের হিন্দু পরিবারের মাসিরাও তার আয়োজিত তাফসিরে এসে বসতেন। ধর্ম ও জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করতেন।
একটি ছোট্ট ঘটনা মায়ের দাওয়াতি জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল
মায়াকানন এলাকায় এক স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তার বাগান (এলাকার দারোগা) বাড়িতে প্রথম দিকে একটি ইসলামী অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছিল। সেখানে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদেরও ব্যাপাক অংশগ্রহণ ছিল। অনুষ্ঠানের পর কর্মকর্তার স্ত্রীকে নিয়মিত সাপ্তাহিক কুরআনের তাফসিরের আয়োজন করার অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি প্রতি সপ্তাহে এমন আয়োজনের দায়িত্ব নেওয়ার অপরাগতা প্রকাশ করেছিলেন।
আমার মা তখন এক মুহূর্তও দেরি না করে বলেছিলেন, ‘আপা, আমার বাসায় করবেন। এখানে প্রতি সপ্তাহে আপনারা কুরআনের আলোচনা করতে পারেন।’
সেই একটি বাক্য যেন আমাদের ঘরের ইতিহাস বদলে দিয়েছিল।
এরপর থেকে প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার আমাদের বাড়িতে পবিত্র কুরআনের তাফসির ক্লাস শুরু হলো। বাড়ির আসবাবপত্র সরিয়ে মাঝের পর্দা সরিয়ে দুটি ঘর একত্র করা হতো। মাঝখানে পর্দা সরিয়ে তৈরি করা হতো বড় একটি হলরুম। মা নিজের উদ্যোগে পানি, শরবত, চা, নাশতা, খাবার— সবকিছুর ব্যবস্থা করতেন। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে তিনি আমন্ত্রণ জানাতেন।
ধীরে ধীরে আমাদের বাড়িটি শুধু একটি পারিবারিক বাসা রইল না; তা হয়ে উঠল, এলাকার মানুষের মিলনস্থল। সেইসাথে ছাত্র-ছাত্রী অঙ্গনেরও দাওয়াতের কেন্দ্র ভূমি এবং দীনি আলোচনার একটি পরিচিত এ প্রিয় আবাসস্থল।
এভাবে মায়াকানন থেকে দীনের কাজ ছড়িয়ে পড়ল বাসাবো, সবুজবাগ, সবুজকানন, বৌদ্ধমন্দির এলাকা, কদমতলা, কুসুমবাগ, নন্দিপাড়া, মুগদাপাড়া, মান্ডাসহ আরও বহু এলাকায়। আজ যে বিস্তৃত পরিসরে এই কাজের কথা বলা হয়, তার পেছনে মায়ের মতো কত নীরব কর্মীর শ্রম আছে— তা হয়তো কোনো ইতিহাসের কোনো পরিসংখ্যানে ধরা যাবে না।
মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানোর শিল্প
আমার মায়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার ক্ষমতা।
তিনি মানুষকে কখনো শুধু ‘দাওয়াতের লক্ষ্য’ হিসেবে দেখতেন না। মানুষকে তিনি মানুষ হিসেবেই ভালোবাসতেন।
কারো সন্তান জন্মালে তিনি উপহার হিসেবে শিশুর পোশাক নিয়ে যেতেন। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ও তিনি আমাদের দিয়ে আগে থেকেই কিছু শিশুর পোশাক কিনে রাখতেন— যাতে কোথাও কোনো দাওয়াতি পরিবারে সন্তান জন্মানোর খবর পেলেই তিনি উপহার নিয়ে যেতে পারেন। কখনো কোনো কোনো পরিবারের জন্য রান্না করে খাবার পাঠাতেন। দীনের জন্য গোটা পরিবারকে দাওয়াত করে খাওয়াতেন। কারো সঙ্গে উপহার বিনিময় করতেন। মানুষের সুখ-দুঃখ বেদনায় পাশে থাকতেন। তার দাওয়াতের ভাষা ছিল অনেক সময় কথার চেয়েও বড় সেবা ও ভালোবাসা।
তিনি বুঝতেন, মানুষের হৃদয়ের দরজা খুলতে হলে আগে সেই হৃদয়ের কাছে পৌঁছাতে হয়। (চলবে)