থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে
১ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:৫৪
॥ মুহাম্মদ আল্-হেলাল ॥
পাতানি অঞ্চলটি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়কাল থেকে একটি বাণিজ্যিক বিরতির স্থান হিসেবে পরিচিত। তবে খ্রিস্টীয় ১০-১১ শতকে আরব বণিকদের মাধ্যমে এখানে ইসলাম প্রবেশ করে। স্থানীয়রা এই বণিকদের ‘খ্যেক’ উপাধি দিয়ে থাকে, যার অর্থ অভিবাসী। অঞ্চলটির স্থানীয় জনগণ ইসলামী আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ১২-১৫ শতকে দলে দলে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আসতে থাকে। হিকায়াত পাতানি ওরফে শেখ সাইদ (পাসাই) নামে একজন বিখ্যাত ‘খ্যেক’ এখানে ইসলাম শেখানোর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। যার মাধ্যমে পাতানির রাজা ইসলাম গ্রহণ করে সুলতান ইসমাইল শাহ নামে পরিচিত হন। পরবর্তীতে পাতানি ইসলামী সালতানাত ইসলামের পথ ধরে উন্নয়নের স্বর্ণশিখরে পৌঁছায়।
পাতানি সালতানাতের স্বর্ণযুগ : প্রথমদিকে পাতানি একজন মুসলিম পুরুষ রাজার নেতৃত্বে ছিল। তখন পাতানি রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারের সঙ্গে জড়িত একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ঐ পাতানি রাজার কোনো পুরুষ সন্তান ছিল না। তার রাজকন্যাকে রাজা নির্বাচিত করা হয়। শুরু হয় গ্রিন কিং (১৫৮৪-১৬১৬ খ্রিস্টাব্দ), ব্লু কিং (১৬১৬-১৬২৪ খ্রিস্টাব্দ), পার্পল কিং (১৬২৪-১৬৩৫ খ্রিস্টাব্দ) এবং ইয়েলো কিং (১৬৩৫-১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দ) আমল। এই মুসলিম নারী শাসকদের আমলে রাজ্যটি গৌরবের অনন্য শিখরে পৌঁছায়। ১৬২৪ সালে, ব্লু কিং-এর স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন পার্পল কিং। পার্পল কিং পূর্বে পাহাং-এর সম্রাজ্ঞী ছিলেন। তার স্বামী মারা যাওয়ার পরে তিনি পাতানির কিং হন। তিনি পাতানির সবচেয়ে বিশ্বস্ত এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী কিং হিসেবে বিবেচিত। পার্পল কিং-এর সময় রাজ্যের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় পাতানির চারপাশে একটি দুর্গ নির্মাণ করা হয়েছিল। তার শাসনামল পাতানি অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করে সালতানাতের স্বর্ণযুগে পরিণত হয়। ১৪৫৭ থেকে ১৯০২ খ্রিঃ সিয়ামের দখল পূর্বপর্যন্ত পাতানি একটি স্বাধীন মালয় দারুস সালাম সালতানাত বা ইসলামী সালতানাত হিসেবে ছিল। (ফদরুল, পাতানি ইসলামী সাম্রাজ্য XIV-XVIII খ্রিষ্টাব্দ; ১৫ মে, ২০২২)।
সিয়ামের পাতানি ইসলামী সালতানাত দখল : যুক্তরাষ্ট্রের লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের একটি গবেষণা অনুযায়ী, ১৯০২ সালে পাতানির শেষ সুলতানকে ক্ষমতাচ্যুত করে সিয়াম পাতানি ইসলামী সালতানাত দখল করে। এরপর ১৯০৯ সালের অ্যাংলো-সিয়ামিজ চুক্তির মাধ্যমে সালতানাতটিকে ছয়টি অঞ্চলে ভাগ করে। এটি সিয়ামের সালতানাতের ঐক্য ভাঙার প্রচেষ্টার একটি অংশ। (The Pattani Sultanate: Islam in Southern Thailand and Its Legacy; September 13, 2025; History Rise)। পরবর্তীতে থাই সরকার পাতানি মুসলিমদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা মুছে ফেলতে অপচেষ্টা করে এবং মুসলিমদের ওপর ব্যাপক জুলুম চালায়। এই জুলুমের বিরুদ্ধে ১৯৬০-এর দশক থেকে আন্দোলন চালিয়ে আসছে পাতানি মুসলিমরা। অন্যদিকে ২০০৪ সালের অক্টোবর মাসে থাইল্যান্ডের নিরাপত্তা বাহিনী অতর্কিতভাবে ৮৫ জন মুসলিম হত্যা করে, যা মানব ইতিহাসে ‘তাক বাই হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে কলঙ্কিত। তাক ভাই হত্যাকাণ্ড পাতানি মুসলিমদের আন্দোলনে নতুন মোড় দেয়। (Gamal Khattab; Mujtama) থাইল্যান্ডের সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী ‘ডিপ সাউথ ওয়াচ’-এর মনিটরিং তথ্যানুযায়ী পাতানি মুসলিমদের স্বাধিকার আন্দোলনের ফলে ২০০৪ সালের হত্যাকাণ্ড থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত অঞ্চলটিতে ২০ হাজার ৮৪৭টি সহিংস ঘটনা এবং ৭ হাজার ২০১ জন নিহত হয়েছেন। পাতানি ইসলামী সালতানাতের মুসলিমদের এই স্বাধিকার আন্দোলন শুধুমাত্র একটি স্থানীয় সংকট নয়, বরং সমগ্র বিশ্বমানবতার জন্য একটি সংকট। সংকটটি সমাধানে পাতানি মুসলিমরা স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলনরত থাকলেও ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এক বছরের বিরতির পর থাই সরকার ও BRN; Barisan Revolusi Nasional (English: Patani Malays National Revolutionary Front) বিআরএন-এর মধ্যে শান্তি আলোচনা আবার শুরু হয়। এ সময় সংগঠনটি প্রথমবারের মতো তাদের কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক কাঠামোর একটি তুলনামূলক স্পষ্ট রূপরেখা প্রকাশ করে। এ রূপরেখায় বিআরএনের অবস্থানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিতও রয়েছে। বিআরএন এ সময় থাইল্যান্ডের ভেতরে স্বাধীনতার বিকল্প ‘স্বশাসন’ বা স্বায়ত্তশাসনের একটি কাঠামোর ইঙ্গিত দেয়।
পাতানির স্বায়ত্তশাসন : ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে স্বাধীন পাতানি বা বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে একাধিক মালয়-মুসলিম সংগঠন গড়ে ওঠে। সক্রিয় এসব সংগঠনের মধ্যে পরবর্তীকালে বিআরএন, পাতানি ইউনাইটেড লিবারেশন অর্গানাইজেশনসহ বিভিন্ন গোষ্ঠী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিআরএন দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সশস্ত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে একটি। যারা দীর্ঘদিন ধরে থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রের দাবিতে আন্দোলন করছে। অন্যদিকে উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনাও সমান্তরালভাবে চলছে। আলোচনার বিষয়ে ব্যাংককের প্রধান আলোচক, থানুত সুভর্ণানন্দা, ২০২৬ সালের আগস্টে স্থানীয় মিডিয়াকে বলেন যে আলোচনার টেবিলে ‘বিচ্ছিন্ন হওয়ার কোনো ইঙ্গিত নেই।’ একই বছর এপ্রিল মাসে নিযুক্ত থানুত বলেন, বরং সিজফায়ার জোন ও চেকপোস্ট কমানো এবং অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা যা দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করে, তা বিবেচনার মধ্যে রয়েছে। সিঙ্গাপুরের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তাবিষয়ক পর্যবেক্ষক সংস্থা আরএসআইএসের বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বিআরএন প্রথমবারের মতো তাদের কাঙ্ক্ষিত থাইল্যান্ডের ভেতরে স্বশাসন, ক্ষমতা ভাগাভাগি এবং মালয়-মুসলিম পরিচয়ের সুরক্ষার একটি কাঠামো উপস্থাপন করে। অর্থাৎ আলোচনার টেবিলে স্বাধীনতার পাশাপাশি থাইল্যান্ডের ভেতরে ব্যাপক স্বায়ত্তশাসনের ধারণাও এসেছে। এ কারণে বিআরএনের বর্তমান অবস্থান শুধু ‘স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা’ নয়। একদিকে সংগঠনের প্রতিনিধিরা স্বাধীনতার লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করছেন; অন্যদিকে শান্তি প্রক্রিয়ায় স্বায়ত্তশাসন ও ক্ষমতা ভাগাভাগির কাঠামোও আলোচনায় রয়েছে। আরএসআইএসের বিশ্লেষণ বলছে, বিআরএনের স্বশাসন প্রস্তাব শান্তি আলোচনায় একটি নতুন রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে। যদিও এর বাস্তবায়ন নির্ভর করবে ব্যাংকক কতটা রাজনৈতিক ছাড় দিতে প্রস্তুত এবং বিআরএন ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী কতটা আলোচনাভিত্তিক সমাধানে এগিয়ে আসে তার ওপর। তবে তাদের স্বায়ত্তশাসনের দাবি বাস্তবায়ন না হওয়ায় ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে পাতানি স্বাধীনতাকামী সংগঠন বিআরএনের শান্তি আলোচনাবিষয়ক প্রতিনিধি দলের মুখপাত্র নিকমাতুল্লাহ সেরি বার্তা সংস্থা এএফপিকে এ বিষয়ে এক সাক্ষাৎকার দেন। যিনি থাইল্যান্ডের দক্ষিণে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং ১৮ বছর বয়সে BRN-এ যোগদান করেছেন। এই সাক্ষাৎকারে তিনি থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে নতুন ইসলামী রাষ্ট্র ও শাসনকাঠামোর ঘোষণা দেন। যেটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
স্বাধীন ইসলামী রাষ্ট্র ও শাসনকাঠামো : ‘যতক্ষণ আমাদের লক্ষ্য অর্জন না হয়, ততক্ষণ আমরা লড়াই চালিয়ে যাব।’ BRN-এর লড়াকুগণ থাইল্যান্ডের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দক্ষিণাঞ্চলে একটি স্বাধীন ইসলামী জাতির জন্য লড়াই করছে, ‘উদ্দেশ্য একটাই, যা হল স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র’। ‘আমরা রাজনৈতিক ক্ষমতা চাই’। BRN শান্তি আলোচনার প্রতিনিধি দলের মুখপাত্র নিকমাতুল্লাহ সেরি তার এই বিরল সাক্ষাৎকারে এএফপিকে জানান। নিকমাতুল্লা বলেন, জাতিগত মালয় মুসলমানরা ভাষা এবং সংস্কৃতির দিক থেকে ‘স্পষ্ট বৈষম্যের শিকার’ হন এবং ‘কখনো নিরাপদবোধ করেন না’— মালয় মুসলিমদের নিরাপত্তা দিতে থাইল্যান্ড বৌদ্ধ সাম্প্রদায়িক সরকার অস্বীকার করে। অন্যদিকে পাতানি মুসলিমদের ব্যাংককের সঙ্গে সংকটের স্থায়ী সমাধান চায় বিআরএন। এজন্য মালেয়েশিয়ার ঐ সাক্ষাৎকারে ইসলামী রাষ্ট্র ও শাসনকাঠামোর একটি প্রস্তাব দেন বিআরএনের মুখপাত্র। প্রস্তাব অনুযায়ী— ১. ৫ থেকে ১০ বছরের একটি অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে দক্ষিণাঞ্চল পরিচালনার দায়িত্ব নিতে চায় বিআরএন। ২. এই সময়ে স্থানীয় মুসলিমদের জন্য শরিয়াহভিত্তিক পুলিশ ও আদালত ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব রয়েছে। ৩. পরবর্তীতে জনগণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অঞ্চলটির চূড়ান্ত শাসনব্যবস্থা নির্ধারণ করবে। পাতানি মুসলিমদের এই স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রের দাবি নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে অসংখ্যবার আলোচনাও হয়েছে। বিআরএন মুখপাত্র নিকমাতুল্লাহর সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য স্থানীয়দের তুমুল সমর্থনও রয়েছে।
স্থানীয়দের সমর্থন : বিআরএন মুখপাত্র নিকমাতুল্লাহ বলেন, ‘যুদ্ধ হলো শেষ আশ্রয়।’ ‘আমরা দুর্বল গোষ্ঠীকে লক্ষ করি না— আমাদের লক্ষ্য হলো সরকার।’ তিনি দাবি করেছেন যে BRN-এর প্রতি স্থানীয় মানুষের ব্যাপক সমর্থন আছে। BRNসদস্য ও স্থানীয়দের অনুদান অর্থায়নেই পরিচালিত হয়। তিনি বলেন, আমাদের অস্ত্রগুলো ‘শত্রুদের’ কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে। ‘আমরা সেগুলো বিনামূল্যে নেই, কারণ তারা এখানে এসে আমাদের ভূমিতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।’ তবে নিকমাতুল্লাহ উল্লেখ করেন, BRNএবং থাই সরকারের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনা সম্প্রতি মালয়েশিয়ার মধ্যস্থতাকারীর অনুপস্থিতির কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তিনি ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, মধ্যস্থতাকারীর অনুপস্থিতিতে BRNসম্ভবত অক্টোবর মাসে থাইল্যান্ডের সঙ্গে’ বিকল্প চ্যানেলে আলোচনায়’ যেতে পারে। যদিও এএফপিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে মালয়েশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মোহামেদ খালেদ নর্দিন বলেছেন, বিআরএন ও থাই সরকারের মধ্যে আলোচনার জন্য নতুন একজন মধ্যস্থতাকারীর নিয়োগ মালেয়েশিয়া সরকারের ‘বিবেচনার আওতায়’ আছে। তিনি বলেন কুয়ালালামপুরের অগ্রাধিকার শান্তিপূর্ণ সমাধান। মোহামেদ খালেদ উল্লেখ করেন, ‘মালয়েশিয়া থাইল্যান্ডের সার্বভৌমত্বের সম্মান করে এবং স্বীকার করে যে এর নাগরিকদের বিষয়গুলো থাইল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে।’ তিনি অশান্তির জন্য কারও দোষারোপ করতে রাজি হননি। তবে বলেছেন, মালয়েশিয়া নিজেকে ‘এমন কোনো পক্ষের আশ্রয় বা লুকানোর জায়গা হিসেবে ব্যবহার হতে দেবে না— যারা সহিংসতার দিকে যায় বা শান্তির প্রক্রিয়াকে প্রত্যাখ্যান করে।’ বিআরএন দীর্ঘমেয়াদি খেলায় রয়েছে। ‘এটি স্বল্পমেয়াদি সংগ্রাম নয়। এতে অনেক সময় লাগবে।’ উল্লেখ করে নিকমাতুল্লাহ বলেন, উভয় পক্ষের মধ্যে শান্তি আলোচনার পথও খোলা থাকবে।
শান্তি আলোচনা : থাইল্যান্ড সরকার ও বিআরএনের মধ্যে মালয়েশিয়ার মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা শুরু হয় ২০১৩ সালে। তবে কয়েক দফা আলোচনার পরও স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান হয়নি। থাইল্যান্ডের প্রধান আলোচক থানুত সুওয়ানানন্দা বলেছেন, শুধু সহিংসতা কমানোর বিনিময়ে সাময়িক ছাড় নয়, বরং সংঘাতের রাজনৈতিক মূল সমস্যাগুলো নিয়েও আলোচনা করা প্রয়োজন। থাইল্যান্ড সরকার ও বিআরএনের মধ্যে সর্বশেষ উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে। ২০২৬-এর জুলাই মাসে থাই কর্তৃপক্ষের মতে, একটি চেকপয়েন্টে গুলি এবং বোমা হামলায় পাঁচজন থাই সেনা নিহত হন এবং ছয়জন সাধারণ মানুষ আহত হন। নিকমাতুল্লা নিশ্চিত করেননি যে BRN এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল কি না; বরং তিনি বলেন, ‘আমরা উপনিবেশবাদীদের জন্য গোয়েন্দা এজেন্ট নই।’ তবে তিনি বলেন, এটি ‘সংগ্রামের পিছনের চালিকা শক্তি’। থাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে AFP-কে জানায় জুলাই ঘটনা থাইল্যান্ডের সংলাপকে ‘স্থবির’ রাখার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে তারা এই প্রক্রিয়ার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকার বিষয়টি জোর দিয়ে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে মালয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, সাম্প্রতিক আলোচনায় বিআরএন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত সামনে এনেছে। এর মধ্যে রয়েছে মালয় পরিচয় ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মর্যাদার স্বীকৃতি, সংঘাত-সংশ্লিষ্ট বন্দিদের মুক্তি এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় বিশেষ অর্থনৈতিক করিডোর (এসইসি) প্রকল্প বন্ধের দাবি। তবে কিছু অন্তরায় থাকলেও পাতানি মুসলিমদের আন্দোলন ও মুখপাত্র নিকমাতুল্লাহর সাম্প্রতিক ঘোষণা ইঙ্গিত দেয় থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে অচীরেই স্বাধীন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে।
থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলের মুসলিম-অধ্যুষিত প্রদেশ সাতুন, পাতানি, ইয়ালা ও নারাথিওয়াত— প্রায় ছয় দশক ধরে দেশটির সবচেয়ে জটিল রাজনৈতিক সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। অঞ্চলটিতে স্বাধীন ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণাও দিয়েছে প্রধান মালয়-মুসলিম সংগঠন ‘বারিসান রেভোলুসি ন্যাশনাল’ (বিআরএন)। স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা বিআরএনের ঘোষিত রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার একটি অংশ হলেও এর পথে কিছু অন্তরায় রয়েছে। প্রথমত, থাইল্যান্ডের কেন্দ্রীয় সরকার দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো বিচ্ছিন্নতাকে সহজে মেনে নেবে— এমন কোনো ইঙ্গিত বর্তমানে নেই। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও স্বাধীন পাতানি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যাপক সমর্থনের কোনো দৃশ্যমান কাঠামো আপাতত নেই। তবে দীর্ঘ সংঘাত থেকে সাধারণ মানুষ মরণপণ লড়াই করে হলেও মুক্তি পেতে চায়। অন্যদিকে ভৌগোলিকভাবে থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চল আরেকটি মুসলিম দেশ মালয়েশিয়ার উত্তরাঞ্চলে। যেটি মুসলিম বিশ্বের একটি অর্থনৈতিক পরাশক্তিও। অতীতে দেশটি স্বাধীনতাকামী সংগঠন বিআরএন এবং থাই সরকারের মধ্যে শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শক্তিশালী সংগঠন আসিয়ানের সদস্য রাষ্ট্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক পরাশক্তি মুসলিম রাষ্ট্র মালয়েশিয়া, বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়া এবং ব্রুনাই দারুস সালামের মতো প্রভাবশালী মুসলিম রাষ্ট্র। কূটনৈতিক কারণে যেকোনো বক্তব্য দিক মুসলিম ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ এ সকল আঞ্চলিক প্রভাবশালী রাষ্ট্র ও মুসলিম বিশ্বের পাতানি মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে স্বাভাবিকভাবেই সম্মতি রয়েছে। সুতরাং আঞ্চলিক মুসলিম রাষ্ট্র, মুসলিম বিশ্ব তথা আন্তর্জাতিক মহলের একটু সুদৃষ্টি পেলেই বিশ্ব মানচিত্রের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় স্বাধীন পাতানি ইসলামী সালতানাত দ্রুতই পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
তথ্যসূত্র : এএফপি, ডিপ সাউথ ওয়াচ, রয়টার্স, আল-জাজিরা, এইচআরডি নেটওয়ার্ক।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল :alhelaljudu@gmail.com