জাহান্নাম
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:০২
॥ ওবায়েদ ইবনে গনি ॥
জাহান্নাম হলো আজাব তথা শাস্তির আবাসস্থল। এটি মহান আল্লাহ তায়ালা কাফের ও পাপিষ্ঠদের জন্য আখিরাতের প্রতিদান হিসেবে তৈরি করে রেখেছেন। জাহান্নামের স্তর সাতটি। অন্যায় ও জুলুমের স্তর বিবেচনা করে অপরাধীদের পাঠিয়ে দেওয়া হবে উপযুক্ত স্থানে। টেনে নেওয়া হবে মাথার চুল ধরে। পুলসিরাতের ওপর চলতে গিয়ে জাহান্নামিরা একে একে পড়তে থাকবে ক্বারার তথা স্বীয় আবাসস্থলে।
যাদের অন্তরে বিন্দু পরিমাণ ঈমান আছে, নির্দিষ্ট পরিমাণে শাস্তি ভোগ করার পর তারা ফিরে আসবেন জান্নাতে। আর নাস্তিক, মুরতাদ কিংবা অবিশ্বাসীরা অনন্তকালের জন্য থেকে যাবে জাহান্নামেই। আল্লাহ তায়ালা আগুনের থাম দিয়ে তাদের বাসস্থানকে এমনভাবে চারদিক থেকে আবদ্ধ করে দেবেন— যেন তিনি তাদের ভুলে গেছেন। কিন্তু জাহান্নামের অভ্যন্তরে চলতে থাকবে তাদের কৃতকর্মের ফলাফল।
আল কুরআনের বিভিন্ন স্থানে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন জাহান্নামের বর্ণনা দিয়েছেন। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানি করে এবং তার সীমা অতিক্রম করে, আল্লাহ তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন। সে সেখানে চিরকাল থাকবে। তার জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি।’ (সূরা নিসা : ১৪)। মহান আল্লাহ আরো বলেন, ‘আল্লাহ জাহান্নামে মুনাফেক ও কাফেরদের একই জায়গায় সমবেত করবেন।’ (সূরা নিসা : ১৪০)। পবিত্র আল কুরআনে এসেছে, ‘যারা কুফরি করে এবং আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যাজ্ঞান করে, তারাই জাহান্নামের অধিবাসী।’ (সূরা মায়েদা : ১০)। জাহান্নামকে প্রজ্জ্বলিত অগ্নিশিখা উল্লেখ করে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কাফেরদের অভিসম্পাত করেছেন এবং তাদের জন্য প্রজ্জ্বলিত (অগ্নি) শিখা তৈরি করে রেখেছেন।’ (সূরা আহযাব : ৬৪)।
জাহান্নামকে সাকার তথা ঝলসানো আগুনের সাথে তুলনা করে মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেন, ‘যেদিন তাদের উপুড় করে টেনে নেয়া হবে সাকারে (ঝলসানীয় আগুন) এবং বলা হবে, জাহান্নামের (অগ্নি) খাদ্য আস্বাদন কর।’ (সূরা কামার : ৪৮)। জাহান্নাম হচ্ছে ‘হুতামা’ তথা পিষ্টকারী। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘কখনো না! তারা নিক্ষিপ্ত হবে হুতামায়। তুমি কি জানো হুতামা কী? এটা আল্লাহর প্রজ্বলিত আগুন (অগ্নিশিখা), যা অন্তরসমূহকে গ্রাস করে। তা তাদের বেষ্টন করে রাখবে। অতি উঁচু স্তম্ভসমূহে।’ (সূরা হুমাযাহ : ৪-৯)। জাহান্নামকে বলা হয়েছে ‘লাযা’ তথা লেলিহান অগ্নিশিখা। লাযা সম্পর্কে মহান আল্লাহপাক বলেন, ‘কখনোই নয়। নিশ্চয় এটা লেলিহান অগ্নি, যা চামড়া তুলে দেবে। সে (লেলিহান অগ্নি) সেই ব্যক্তিকে ডাকবে, যে সত্যের প্রতি পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেছিল ও বিমুখ হয়েছিল।’ (সূরা মা’আরিজ : ১৫-১৭)।
জাহান্নামের ব্যাপারে বলা হয়েছে, এটি ‘দারুল বাওয়ার’ তথা ধ্বংসের ঘর। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘তুমি কি তাদের দেখনি, যারা আল্লাহর নিয়ামতকে কুফরিতে পরিণত করেছে এবং তাদের স্বজাতিকে সম্মুখীন করেছে ধ্বংসের আলয়ে? তারা তাতে প্রবেশ করবে, সেটা কতই না মন্দ আবাস।’ (সূরা ইবরাহিম : ২৮-২৯)। পবিত্র কুরআনে জাহান্নামের পানি আর ছায়ার বর্ণনাও রয়েছে। জাহান্নামিরা পানি চাইলে দেওয়া হবে গলিত সিসা আর ছায়া হবে উত্তপ্ত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা থাকবে অতিউষ্ণ বাতাস ও গরম পানিতে। ছায়া হবে উত্তপ্ত।’ (সূরা ওয়াকিয়া : ৪২-৪৩)।
পবিত্র কুরআনের বর্ণনায় উঠে এসেছে এমন আরো বহুবিধ শাস্তির কথা। আর এসব বর্ণনার মাধ্যমে মহান আল্লাহ চেয়েছেন প্রিয় বান্দাদের সতর্ক করতে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘অবাধ্যদের জন্য রয়েছে নিকৃষ্ট বাসস্থান। তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে, তা কতই না নিকৃষ্ট স্থান। সে আস্বাদন করুক— গাসসাক্ব (পুঁজ) এবং হামিমের (গরম পানি) স্বাদ এবং একই আকৃতির আরো অনেক।’ (সূরা সোয়াদ : ৫৫-৫৮)। আয়াতে ‘একই আকৃতির আরো অনেক’ অংশের ব্যাখ্যায় মুফাসসিররা বলেন, উল্লেখিত আজাবের অনুরূপ অন্যান্য আজাব। যেমন— প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, অতিউষ্ণ বাতাস, জাক্কুম ভক্ষণ ইত্যাদি শাস্তি। (সফওয়াতুত তাফসির)।
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, ‘জাহান্নাম তার রবের কাছে অভিযোগ করল— আমার এক অংশকে অপর অংশ খেয়ে ফেলছে। তখন রাব্বে কারিম তাকে দুবার শ্বাস নেয়ার অনুমতি দিলেন। একবার গ্রীষ্মকালে, আরেকবার শীতকালে। তোমরা গরমের যেই প্রচণ্ডতা অনুভব কর— তা জাহান্নামের উত্তপ্ততা থেকে আর শীতের যে তীব্রতা অনুভব কর; তা জাহান্নামের শীতলতা (যামহারির) থেকে।’ (বুখারি ও মুসলিম)। এ হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, জাহান্নামের শাস্তিসমূহর মধ্যে শীতলতাও এক ধরনের শাস্তি। কিন্তু জান্নাতের আনন্দদায়ক অনুভূতি যেমন শোনেনি কোনো কান, দেখেনি কোনো চোখ, কল্পনা করেনি কোনো অন্তর; তেমনি জাহান্নামের শাস্তির কণা পরিমাণও দুনিয়ায় আমরা অনুভব করতে পারব না। বস্তুত জাহান্নামের শাস্তির ভয়াবহতা মানুষের ধারণার বাইরে।
অনেক সময় কেউ কেউ প্রশ্ন করেন— আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন না করার অপরাধে কাফেরদের কেন চিরকালের জন্য জাহান্নামের কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে? বিবেকের দাবি হলো, লোকটি যেহেতু দুনিয়ার জীবনে ৫০ বছরের জন্য কাফের ছিল, সেহেতু জাহান্নামেও ৫০ বছর শাস্তি ভোগ করবে এবং পরে মুক্তি লাভ করবে? অথবা এই ৫০ বছরকে ১০ গুণ করে ৫০০ বছরের শাস্তি হতে পারে; চিরকালের জন্য কেন? মূলকথা হলো, কুরআন ও হাদিসের অকাট্য প্রমাণ দ্বারা সাব্যস্ত, কাফেররা জাহান্নামে চিরকাল শাস্তি ভোগ করতে থাকবে; এর কোনো পরিসমাপ্তি হবে না। শাস্তি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সবসময় অপরাধ সংঘটিত হওয়ার মেয়াদ বিবেচনাধীন থাকে না, বরং অপরাধের মাত্রা ও পরিমাণই হয় বিবেচ্য।
মহান আল্লাহ তায়ালা কুফর ও শিরকের মতো জঘন্যতম অপরাধের জন্য কাউকে পরকালের জীবনে চিরকালের জন্য জাহান্নামের শাস্তি নির্ধারণ করতেই পারেন। আর মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সঙ্গে কুফরি করে যে অপরাধ করল, সে যেন পুরো সৃষ্টিজগতের সঙ্গে অপরাধ করল। অতএব এরকম অপরাধের সাজা চিরকাল জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করা হতেই পারে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যদি তারা (কাফেররা) পুনঃপ্রেরিত হয়, তবুও তাই করবে; যা থেকে তাদের নিষেধ করা হয়েছিল। নিশ্চয় তারা মিথ্যাবাদী।’ (সূরা আন’আম : ২৮)। তার মানে এই কাফের যদিও ৫০ বছরের জীবন পেয়ে কুফরি করেছিল, কিন্তু সর্ববিষয়ে অবগত মহান আল্লাহ জানেন, সে ৫০ নয়, ৫০০ বছরের জীবন পেলেও কুফরি ছাড়বে না। সুতরাং অপরাধটি আল্লাহর নির্ভুল জানা মতো ৫০ বছরের নয়, আজীবনের।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘বস্তুত আল্লাহ যদি তাদের মধ্যে কিছুমাত্র শুভ চিন্তা জানতেন, তবে তাদের শুনিয়ে দিতেন। আর এখনই যদি তাদের শুনিয়ে দেন, তবু তারা মুখ ঘুরিয়ে পালিয়ে যাবে।’ (সূরা আনফাল : ২৩)। সুতরাং এ শাস্তি তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনোভাবেই জুলুম নয়। আল্লাহ তায়ালা তো ওই ব্যক্তিকে পার্থিব জীবনে সুযোগ দিয়েছিলেন ফিরে আসার জন্য; কিন্তু সে ফিরে আসেনি! মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি কি তোমাদের এতটা বয়স দিইনি; যাতে যা চিন্তা করার বিষয় চিন্তা করতে পারতে? উপরন্তু তোমাদের কাছে সতর্ককারীও আগমন করেছিল। অতএব আস্বাদন কর। জালেমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই।’ (সূরা ফাতির : ৩৭)।
সর্বোপরি এ বিশ্বজাহান যেহেতু এক আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি ও মালিকানাধীন। সুতরাং আল্লাহ নিজ রাজত্ব ও মালিকানায় তাঁর ইচ্ছেমতো বিধান জারি করতে পারেন এবং মানুষের কৃতকর্মের ফলাফল অনুযায়ী যেকোনো শাস্তি নির্ধারণ করতে পারেন। এটি তাঁর অধিকার। এখানে কারো অংশীদারিত্ব নেই। পবিত্র কুরআনে এসেছে, ‘আল্লাহ কি বিচারকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম বিচারক নন?’ (সূরা ত্বিন : ৮)। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন প্রত্যেক মুসলমানকে জাহান্নামের ভয়াবহ আগুন ও কষ্টদায়ক শাস্তি থেকে মুক্তি দিন। মহান আল্লাহ মুসলিম উম্মাহকে জাহান্নামের ভয়াবহতা থেকে হেফাজত করে জান্নাত লাভে তাঁর বিধিবিধান যথাযথভাবে পালন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক।