মাহে রবিউস সানি : কুরআন-সুন্নাহর আলোকে আমল
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:০০
॥ ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ ॥
হিজরি বর্ষপঞ্জির চতুর্থ মাস হলো রবিউস সানি। ‘রবিউস সানি’ অর্থ দ্বিতীয় বসন্ত। চান্দ্রবর্ষের মাসগুলো চাঁদের গতির সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির তুলনায় প্রতি বছর এ মাসের সময় কিছুটা এগিয়ে আসে। ইসলামে কোনো মাসের বিশেষ ফজিলত নির্ধারণের ক্ষেত্রে কুরআন ও নির্ভরযোগ্য হাদিসের দলিলই মূল ভিত্তি। রবিউস সানির প্রতিটি দিন বা নির্দিষ্ট কোনো দিনকে বিশেষ ইবাদতের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে— এমন সহিহ দলিল পাওয়া যায় না। তবে বছরের প্রতিটি দিনই একজন মুমিনের জন্য ইবাদত, তওবা, দোয়া ও সৎকর্মের সুযোগ।
সময়ের মূল্য ও আত্মশুদ্ধি : আল্লাহ তায়ালা সূরা আল-আসরে সময়ের শপথ করে মানুষের ক্ষতির কথা উল্লেখ করেছেন। তবে ঈমানদার, সৎকর্মশীল এবং সত্য ও ধৈর্যের উপদেশদানকারীদের এ ক্ষতি থেকে মুক্ত বলা হয়েছে। (সূরা আল-আসর : ১-৩)। তাই নতুন একটি মাস শুরু হওয়া একজন মুসলমানের জন্য আত্মসমালোচনারও সুযোগ। গত সময়ের আমল কেমন হয়েছে, নামাজে কতটা যত্নশীল ছিলাম, কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন, মানুষের হক আদায় করেছি কি না— এসব বিষয়ে নিজেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
নামাজ হোক প্রথম অঙ্গীকার
মুমিনের জীবনে ফরজ নামাজের গুরুত্ব সর্বাধিক। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ মুমিনদের ওপর নির্দিষ্ট সময়ের ফরজ।’ (সূরা আন-নিসা : ১০৩)। রবিউস সানির জন্য আলাদা কোনো ফরজ বা বিশেষ নামাজের বিধান নেই। তাই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাসময়ে আদায়, সম্ভব হলে জামাতে অংশগ্রহণ এবং নামাজে খুসু-খুজু অর্জনের চেষ্টা করাই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য। আল্লাহ আরও বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সূরা আল-আনকাবুত : ৪৫)।
কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা
কুরআন মানুষের জন্য হেদায়াতের গ্রন্থ। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই এই কুরআন এমন পথ দেখায়, যা সবচেয়ে সরল।’ (সূরা আল-ইসরা : ৯)। তাই এ মাসে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় কুরআন তিলাওয়াতের অভ্যাস করা যেতে পারে। পাশাপাশি আয়াতের অর্থ বোঝা ও সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনার চেষ্টা করা জরুরি।
রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা অল্প। (সহিহ বুখারি; সহিহ মুসলিম)।
তওবা ও আত্মশুদ্ধি : মানুষ ভুল করে। কিন্তু ভুলের পর আল্লাহর দিকে ফিরে আসাই মুমিনের বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আল্লাহর রহমত থেকে তোমরা নিরাশ হয়ো না।’ (সূরা আয-যুমার : ৫৩)। তাই রবিউস সানি মাসকে তওবা ও আত্মশুদ্ধির উপলক্ষ্য করা যেতে পারে। গুনাহ থেকে ফিরে আসা, অতীতের ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে একই ভুল না করার দৃঢ় সংকল্প নেওয়া প্রয়োজন।
দান-সদকা ও মানবকল্যাণ : ইসলাম অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে উৎসাহিত করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যা কিছু কল্যাণকর কাজে ব্যয় করো, তার প্রতিদান তোমাদের পূর্ণভাবে দেওয়া হবে।’ (সূরা আল-বাকারা : ২৭২)। দরিদ্রকে খাদ্য দেওয়া, অসুস্থের চিকিৎসায় সহযোগিতা করা, এতিমের দায়িত্ব নেওয়া, ঋণগ্রস্তকে সাহায্য করা কিংবা বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো— এসব নেক কাজ। সদকার জন্য নির্দিষ্ট কোনো মাসের অপেক্ষা করতে হয় না। তবে নতুন মাসকে কেন্দ্র করে নিয়মিত দান-সদকার অভ্যাস গড়ে তোলা নিঃসন্দেহে কল্যাণকর।
আত্মীয়তার বন্ধন দৃঢ় করা : ইসলাম আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে। (সহিহ বুখারি : ৬১৩৮)। তাই এ মাসে আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ নেওয়া, অসুস্থদের দেখতে যাওয়া, অভিমান দূর করা এবং বিপদে-আপদে স্বজনদের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
চরিত্র সংশোধন ও ইবাদত : ইবাদত শুধু নামাজ, তিলাওয়াত বা নফল আমলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ, সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ক্ষমাশীলতা ও অন্যের অধিকার রক্ষা করাও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। অন্যদিকে গীবত, অপবাদ, হিংসা, অহংকার ও মানুষের প্রতি অন্যায় থেকে বেঁচে থাকা জরুরি। আল্লাহ তায়ালা গিবত থেকে নিষেধ করেছেন। (সূরা আল-হুজুরাত : ১২)। তাই নিজের জবান, দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ সংশোধনের মাধ্যমে রবিউস সানি হতে পারে আত্মপরিবর্তনের একটি সময়।
সুন্নাহ অনুসরণই মূল লক্ষ্য : আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমাকে অনুসরণ করো; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।’ (সূরা আলে ইমরান : ৩১)। অতএব রবিউস সানি মাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে রাসূলুল্লাহ সা.-এর সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন গড়ে তোলা। সত্যবাদিতা, আমানতদারি, দয়া, ক্ষমা, প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো এবং অন্যের প্রতি উত্তম আচরণ— এসব নববী চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ দিক।
মাসটি হোক আত্মপরিবর্তনের : রবিউস সানি কোনো বিশেষ ফরজ বা আবশ্যিক আমলের মাস নয়। কিন্তু এটি একজন মুমিনের জন্য আত্মশুদ্ধির একটি সুন্দর উপলক্ষ্য হতে পারে। এই মাসে আমরা সংকল্প করতে পারি— পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো আদায় করব, প্রতিদিন কুরআন পড়ব, বেশি বেশি ইস্তেগফার করব, গীবত ও মিথ্যা থেকে দূরে থাকব, সামর্থ্যানুযায়ী সদকা করব, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখব এবং মানুষের অধিকার আদায়ে সচেতন থাকব।
পরিশেষে রবিউস সানি মাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়— মুসলমানের জীবনে সময় শুধু অতিবাহিত হওয়ার বিষয় নয়; প্রতিটি মুহূর্তই আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সুযোগ। তাই এ মাসের শিক্ষা হোক নিজের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা, ভুল থেকে ফিরে আসা এবং নেক কাজের মাধ্যমে জীবনকে আরও অর্থবহ করে তোলা। হজরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর জীবন থেকে জ্ঞানচর্চা, আল্লাহভীতি, সংযম ও নৈতিকতার শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। তাঁর স্মরণ যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আমাদের ব্যক্তিজীবনে সত্য, সততা ও উত্তম চরিত্র প্রতিষ্ঠার প্রেরণা জোগায়।
মতভিন্নতার ক্ষেত্রে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা বজায় রেখে দীনের মৌলিক শিক্ষা অনুসরণ করাই দায়িত্বশীলতার পরিচয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সঠিক জ্ঞান অর্জন, নেক আমল করার তাওফিক এবং সুন্দর চরিত্রে জীবন গড়ার সামর্থ্য দান করুন। আমিন।
লেখক : কলাম লেখক ও ইসলাম বিষয়ক গবেষক, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান : জাতীয় ইসলামী গবেষণা সেন্টার।
ইমেইল : drmazed96@gmail.com