দেশটাকে রাষ্ট্র বানাতে হবে
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:৪৩
॥ মাহবুবুল হক ॥
‘দেশ’ ও ‘রাষ্ট্র’— দুটি শব্দ আমাদের দৈনন্দিন কথাবার্তায় প্রায়ই একই অর্থে ব্যবহৃত হয়। আমরা যেমন বলি ‘আমাদের প্রতিহত বাংলাদেশ’, তেমনি বলি ‘বাংলাদেশ একটি রাষ্ট্র’। সাধারণ ব্যবহারে এতে কোনো সমস্যা না থাকলেও রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক দর্শনের আলোচনায় ‘দেশ’ এবং ‘রাষ্ট্র’ একেবারে অভিন্ন ধারণা নয়। একটি ভূখণ্ড, জনগোষ্ঠী, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের সমন্বয়ে ‘দেশ’ ধারণা গড়ে উঠতে পারে; অন্যদিকে রাষ্ট্র হলো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ওপর সংগঠিত রাজনৈতিক কর্তৃত্ব, সরকার, আইন ও সার্বভৌম ক্ষমতাসম্পন্ন একটি প্রতিষ্ঠান।
একটি রাষ্ট্র কীভাবে গড়ে ওঠে, তার মৌলিক উপাদান কী, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কী ধরনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো প্রয়োজন— এসব প্রশ্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আধুনিক বিশ্বে রাষ্ট্র কেবল একটি ভূখণ্ড বা সরকার নয়; রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকত্ব, সংবিধান, আইনের শাসন, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কও গভীরভাবে যুক্ত।
‘দেশ’ শব্দটি মূলত একটি ভৌগোলিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আবেগগত ধারণা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডকে কেন্দ্র করে বসবাসকারী মানুষের ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, সামাজিক সম্পর্ক ও সামষ্টিক পরিচয় থেকে একটি দেশের ধারণা তৈরি হতে পারে।
দেশের ধারণা সবসময় রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের ওপর নির্ভরশীল নয়। কোনো জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক পরিচয় থাকতে পারে, কিন্তু তাদের নিজস্ব স্বাধীন রাষ্ট্র নাও থাকতে পারে। আবার একটি রাষ্ট্রের ভেতরে একাধিক জাতিগোষ্ঠী, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ বসবাস করতে পারে। যেমন আমাদের দেশে আছে।
অর্থাৎ ‘দেশ’ অনেক সময় মানুষের ভূমি ও জাতীয় পরিচয়ের ধারণা, আর ‘রাষ্ট্র’ হলো রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও আইনগত সংগঠনের ধারণা।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানে রাষ্ট্র বলতে সাধারণত এমন একটি রাজনৈতিক সংগঠনকে বোঝানো হয়, যার রয়েছে নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, স্থায়ী জনসংখ্যা, কার্যকর সরকার এবং সার্বভৌম ক্ষমতা।
রাষ্ট্রের ক্ষমতা শুধু প্রশাসন পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্র আইন তৈরি করে, আইন প্রয়োগ করে, বিচারব্যবস্থা পরিচালনা করে, নাগরিকের অধিকার নির্ধারণ ও সুরক্ষা করে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজস্ব পরিচয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে।
রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তার সার্বিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব। অর্থাৎ রাষ্ট্র তার ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে পারে এবং বাহ্যিকভাবে অন্য কোনো রাষ্ট্রের অধীন নয়।
দেশ ও রাষ্ট্রের পার্থক্য কয়েকটি দিক থেকে স্পষ্ট করা যায়।
প্রথমত, দেশ মূলত ভৌগোলিক ও সামাজিক ধারণা, আর রাষ্ট্র মূলত রাজনৈতিক ও আইনগত ধারণা।
দ্বিতীয়ত, একটি দেশের সঙ্গে মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আবেগগত সম্পর্ক থাকতে পারে। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এগুলোর পাশাপাশি সরকার, আইন ও সার্বভৌম রাজনৈতিক কর্তৃত্ব থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, রাষ্ট্রের জন্য নির্দিষ্ট ভূখণ্ড অপরিহার্য। সেই ভূখণ্ডের ওপর রাষ্ট্র তার আইন ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রয়োগ করে।
চতুর্থত, একটি রাষ্ট্রের স্থায়ী জনগোষ্ঠী ও সরকার থাকা প্রয়োজন। কিন্তু ‘দেশ’ শব্দটি কখনো কখনো এমন জনগোষ্ঠী বা ভূখণ্ড বোঝাতেও ব্যবহৃত হয়, যার নিজস্ব স্বাধীন সরকার নেই।
পঞ্চমত, রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে একটি রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে কাজ করে। রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন, চুক্তি করা এবং আন্তর্জাতিক সংগঠনে অংশগ্রহণ করতে পারে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রচলিত আলোচনায় রাষ্ট্রের চারটি মৌলিক উপাদানকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এগুলো হলো— জনসংখ্যা, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সরকার এবং সার্বভৌমত্ব।
১. কোনো রাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী জনগণ থাকতে হবে। মানুষ ছাড়া রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না।
জনসংখ্যার নির্দিষ্ট কোনো সর্বনিম্ন সংখ্যা রাষ্ট্র হওয়ার জন্য নির্ধারিত নেই। ছোট রাষ্ট্রেও রাষ্ট্রের পূর্ণ রাজনৈতিক কাঠামো থাকতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি স্থায়ী মানবসমাজ থাকা, যার ওপর রাষ্ট্রের আইন ও প্রশাসন কার্যকর হবে।
জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক তৈরি হয় নাগরিকত্বের মাধ্যমে। নাগরিকের অধিকার, কর্তব্য ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব— এসব বিষয় আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
২. রাষ্ট্রের একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড থাকতে হয়। সেই ভূখণ্ডের সীমানা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কর্তৃত্বের পরিধি নির্ধারণ করে।
ভূখণ্ডের মধ্যে সাধারণত স্থলভাগ, অভ্যন্তরীণ জলসীমা এবং আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত সামুদ্রিক ও আকাশসীমার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকে।
ভূখণ্ডের আকার রাষ্ট্রের মূল বৈশিষ্ট্য নয়। বড় বা ছোট— যেকোনো ভূখণ্ডে রাষ্ট্র গড়ে উঠতে পারে, যদি সেখানে কার্যকর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত থাকে।
৩. জনগণ ও ভূখণ্ড থাকলেই রাষ্ট্র সম্পূর্ণ হয় না। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য একটি সরকার প্রয়োজন।
সরকার আইন প্রণয়ন, প্রশাসন পরিচালনা, বিচারব্যবস্থার কাঠামো বজায় রাখা, কর সংগ্রহ, জনসেবা প্রদান এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো কাজ করে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— রাষ্ট্র ও সরকার এক নয়। রাষ্ট্র একটি তুলনামূলকভাবে স্থায়ী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান; সরকার হলো রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দিষ্ট ব্যবস্থা। সরকার পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব শেষ হয় না।
৪. রাষ্ট্রের চতুর্থ মৌলিক উপাদান হলো সার্বভৌমত্ব। এর অর্থ হলো রাষ্ট্রের নিজস্ব ভূখণ্ডে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কর্তৃত্ব এবং বাহ্যিকভাবে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থাকা।
সার্বভৌমত্বের অভ্যন্তরীণ দিক হলো, রাষ্ট্র তার ভূখণ্ডের মধ্যে আইন ও প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব প্রয়োগ করবে। বাহ্যিক দিক হলো, রাষ্ট্র অন্য কোনো রাষ্ট্রের অধীন থাকবে না এবং নিজের বৈদেশিক সম্পর্ক নিজেই পরিচালনা করবে।
শুধু চারটি মৌলিক উপাদান থাকলেই একটি কার্যকর আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে ওঠে না। বাস্তবে রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল, কার্যকর ও জনগণমুখী করতে আরও অনেক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রের ক্ষমতা কীভাবে পরিচালিত হবে, সরকারের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষমতা কী, নাগরিকের অধিকার কী এবং রাষ্ট্রের মূল কাঠামো কেমন হবে— এসব নির্ধারণে সংবিধান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
একটি কার্যকর সংবিধান রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ক্ষমতার সীমা ও সম্পর্ক নির্ধারণ করতে পারে।
আইনের শাসন
রাষ্ট্রের ক্ষমতা যদি আইনের বাইরে চলে যায়, তাহলে নাগরিক অধিকার ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দুর্বল হতে পারে। তাই আধুনিক রাষ্ট্রে আইনের শাসন গুরুত্বপূর্ণ।
এর মূল ধারণা হলো— ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত থাকবে এবং আইন প্রয়োগে ন্যায্যতা ও পূর্বনির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করা হবে।
স্বাধীন ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা
রাষ্ট্রে নাগরিকদের অধিকার রক্ষা, বিরোধ নিষ্পত্তি এবং আইন ব্যাখ্যার জন্য বিচারব্যবস্থা অপরিহার্য।
বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
প্রশাসনিক কাঠামো
রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য দক্ষ প্রশাসন প্রয়োজন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, ভূমি, যোগাযোগ, অবকাঠামো, কর, সামাজিক নিরাপত্তা ও নাগরিক সেবা— এসব পরিচালনার জন্য প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান দরকার।
রাষ্ট্রের আইন যত ভালোই হোক, কার্যকর প্রশাসন না থাকলে তার বাস্তব প্রয়োগ কঠিন হয়ে পড়ে।
অর্থনৈতিক ভিত্তি
রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য একটি কার্যকর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দরকার। উৎপাদন, কর্মসংস্থান, করব্যবস্থা, ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো এবং বাণিজ্য— সবকিছু রাষ্ট্রের সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত।
অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল রাষ্ট্রের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।
নাগরিক অধিকার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ
আধুনিক রাষ্ট্রে নাগরিক শুধু রাষ্ট্রের অধীন ব্যক্তি নয়, নাগরিক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক জীবনের অংশীদারও।
মতপ্রকাশ, সংগঠন, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, ন্যায়বিচার ও আইনের সমান সুরক্ষার মতো অধিকার রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা
রাষ্ট্রকে অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা এবং বাহ্যিক নিরাপত্তার জন্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হয়। পুলিশ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ।
তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি নাগরিক অধিকার ও আইনের শাসনের ভারসাম্য রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও রাষ্ট্রের বাস্তবতা
আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব শুধু অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠান দিয়ে নির্ধারিত হয় না; আন্তর্জাতিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক আইনের আলোচনায় রাষ্ট্রের বহুল উদ্ধৃত বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে স্থায়ী জনসংখ্যা, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সরকার এবং অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের সক্ষমতা। ১৯৩৩ সালের মন্টেভিডিও কনভেনশনের আলোচনায় এসব বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কোনো রাজনৈতিক সত্তাকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে কি না— এটি পৃথক একটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিষয়। বাস্তবে রাষ্ট্রের কার্যকারিতা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, স্বীকৃতি এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক— সবকিছু মিলিয়ে রাষ্ট্রের অবস্থান গড়ে ওঠে।
রাষ্ট্র গঠনের একটি মৌলিক কাঠামো
একটি আধুনিক রাষ্ট্রের কাঠামোকে ধারাবাহিকভাবে এভাবে দেখা যায়— জনগণ/ভূখণ্ড/রাজনৈতিক কর্তৃত্ব/ সরকার/সংবিধান/আইন/বিচারব্যবস্থা/প্রশাসন/অর্থনীতি/নিরাপত্তা নাগরিক অধিকার/আন্তর্জাতিক সম্পর্ক।
অর্থাৎ শুধু একটি ভূখণ্ড দখল বা একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করলেই একটি পূর্ণাঙ্গ আধুনিক রাষ্ট্রের সব বৈশিষ্ট্য তৈরি হয় না। রাষ্ট্রকে কার্যকর করতে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, আইনি কাঠামো, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের বৈধ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হয়।
রাষ্ট্রের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হলো
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিভিন্ন মতবাদ রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছে। কেউ রাষ্ট্রের প্রধান কাজ হিসেবে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলাকে গুরুত্ব দিয়েছেন, কেউ ব্যক্তিস্বাধীনতা ও অধিকারকে, আবার আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্র নাগরিকের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সুযোগের ওপরও গুরুত্ব দেয়।
তাই বর্তমান যুগে একটি কার্যকর রাষ্ট্রের মূল্যায়নে শুধু তার সামরিক শক্তি বা ভূখণ্ডের আকার দেখা হয় না। দেখা হয়— রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জন্য কতটা নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, অধিকার, জনসেবা, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারছে।
দেশ ও রাষ্ট্র একই শব্দ নয়— যদিও দৈনন্দিন ব্যবহারে তাদের অর্থ অনেক সময় এক হয়ে যায়। দেশ মানুষের ভূখণ্ড, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি ধারণা; রাষ্ট্র হলো সেই জনগণ ও ভূখণ্ডকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ও আইনগত কর্তৃত্বের প্রতিষ্ঠান।
রাষ্ট্র গঠনের প্রচলিত মৌলিক শর্ত হলো— স্থায়ী জনসংখ্যা, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সরকার এবং সার্বভৌমত্ব। তবে আধুনিক যুগে একটি রাষ্ট্রকে কার্যকর ও স্থিতিশীল করতে এর পাশাপাশি সংবিধান, আইনের শাসন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, দক্ষ প্রশাসন, অর্থনৈতিক ভিত্তি, নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সুসংগঠিত কাঠামো প্রয়োজন।
সুতরাং রাষ্ট্র গঠন শুধু একটি সরকার প্রতিষ্ঠার বিষয় নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক, সাংবিধানিক, আইনগত, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণের প্রক্রিয়া। একটি রাষ্ট্র তখনই কার্যকর ও স্থিতিশীল হয়ে ওঠে, যখন তার প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের অধিকার রক্ষা করে, আইন কার্যকর করে, জনসেবা নিশ্চিত করে এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌম কর্তৃত্বকে সুসংগঠিতভাবে পরিচালনা করতে সক্ষম হয়।
যারা সরকার ও রাজনীতি সম্পর্কে একাডেমিক পড়াশোনা করেছেন, তারা হয়তো রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে কী ব্যবধান, তা তারা ভালোভাবে বুঝতে পারবেন। কিন্তু যারা একাডেমিক ওয়েতে পড়াশোনা করার সুযোগ পাননি তারা হয়তো পরিষ্কারভাবে দুটি বিষয় উপলব্ধি করতে পারবেন না।
সাধারণভাবে আমাদের দেশের মানুষ রাষ্ট্র ও দেশকে একই বিষয় বলে ধারণা করে থাকেন। তারা রাষ্ট্র শব্দটিকে দেশের অল্টারনেটিভ একটি শব্দ বলে ধারণা করে থাকেন। যেমন পানির অল্টারনেটিভ শব্দ হলো জল। কিন্তু বাস্তবে এই ধারণা শুধু ভুল নয় মারাত্মক ভুল। দেশ গড়তে অনেক কিছু লাগে না। কখনো কখনো সরকারও লাগে না। কিন্তু রাষ্ট্র গড়তে বহু মাল মসলার প্রয়োজন হয়।
একটি ভূখণ্ড গিফট পেলে তাকে দেশও বলা যেতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র বলা যাবে না। দেশ একদিনে পাওয়া যেতে পারে, আবার লড়াই করেও পাওয়া যেতে পারে। যেমন পাকিস্তান যখন আমরা পেয়েছিলাম, তখন অনেক কালের আলাপ আলোচনার পর একটি বিশেষ দিনে পেয়েছিলাম। আবার বাংলাদেশ পাওয়ার জন্য এর সাগর রক্ত আমাদের দিতে হয়েছিল। এখানে ভিন্নতা আছে। কিন্তু ভিন্নতা থাকলেও আমরা কোনো রেডিমেড রাষ্ট্র পাইনি। আমরা রেডিমেড দেশ পেয়েছি। সেই বিষয়টি আমাদের ভালোভাবে অনুধাবন করতে হবে। ভূ-ভারতকে ভাগ করে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল। ভূখণ্ডের সাথে সাথে দেশবাসীও ছিল। কিন্তু তাই বলে সেটা দেশ ছিল রাষ্ট্র ছিল না। রাষ্ট্র গঠনের কাজ চলতে চলতেই বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল অথবা ষড়যন্ত্র সৃষ্টি হয়েছিল। যার ফলে দেশটি রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হওয়ার আগেই ভেঙে গিয়েছিল। সেই ভাঙা দেশটির একটি অংশ নিয়ে আমরা বাংলাদেশ গড়ে ছিলাম। গত ৫৪ বছরে রাষ্ট্র গঠনের সব মাল মসলা মজুদ থাকলেও কোনো সরকার দয়া করে রাষ্ট্র গঠনের কাজটি আঞ্জাম দিতে চেষ্টা করেনি। সকল সরকারই দেশ হিসেবে এই ব-দ্বীপকে বা ভূখণ্ডটিকে বিবেচনায় রেখে যা খুশি তাই করেছে। ফলে সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে পরিগণিত বা পরিগঠিত হয়নি।
বরাবর এখানে দলীয় স্বার্থই পরিপূর্ণভাবে বিবেচিত হয়েছে। দেশবাসীকে বিভক্ত করে সরকার পরিচালনা করা হয়েছে। একতার বীজ বপন করা হয়নি।বলতে গেলে বিচ্ছিন্নতার বীজ বপন করা হয়েছে। এখানে বিভাজন ও বিভক্তি প্রতিষ্ঠিত ও কার্যকরী হয়েছে। এই যে দীর্ঘকাল ধরে আমরা দেশ হিসেবে থেকে গেলাম, এর প্রধান কারণ হলো প্রতিবেশী বৃহৎ দেশের উসকানিতে আমরা পড়ে গিয়েছিলাম। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তারা তথাকথিত সাহায্য করেছিল বলে আমরা স্বেচ্ছায় তাদের করদ রাজ্যে পরিণত হই। ২৪ এর বিপ্লবে সেটা ভেঙে ফেলা হলেও বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় তা আবার মজবুত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই মজবুতিকরণকে জাতি হিসেবে নয়, নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রতিহত করতে হবে। দেশকে অবশ্যই রাষ্ট্র বানাতে হবে। না হলে আমাদের মুক্তি নেই।