সংকটে স্বাস্থ্য খাত : চরম ভোগান্তিতে মানুষ


১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২০:৩২

দুর্নীতি, দলীয়করণ, অনিয়ম চরমে
হাম-ডেঙ্গুতে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা
সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা, রাষ্ট্রীয় সহায়তা এবং সেবার মানোন্নয়নের সুপারিশ

॥ সাইদুর রহমান রুমী ॥
কিছুতেই কাটছে না দেশীয় চিকিৎসায় আস্থার সংকট। দুর্নীতি, দলীয়করণ, অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনার সুযোগে সাধারণ মানুষকে সর্বস্বান্ত করে দেশে গড়ে উঠেছে জমজমাট বেসরকারি এক স্বাস্থ্য ব্যবসা। স্বাস্থ্য খাতে সরকারের বরাদ্দকৃত শত শত কোটি টাকা শুধু কেনাকাটা, জনবল আর বড় বড় নান্দনিক হাসপাতাল ভবনে যেন সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক ডেঙ্গু ও হাম চিকিৎসায় চরম সংকট আর জটিল রোগগুলোয় দিনের পর দিন ভোগান্তি যেন সাধারণ মানুষের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংকটে স্বাস্থ্য খাত : চরম ভোগান্তিতে মানুষ
২০২৬ সালের সাম্প্রতিক সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ন্যূনতম মানদণ্ড বজায় রাখার জন্য ৫৮,৫৯৮ জন চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে, যেখানে প্রয়োজনীয় ৮৮,৯০৯ জনের বিপরীতে নিয়োজিত আছেন মাত্র ৩০,৩১১ জন। গ্রামীণ এবং প্রান্তিক অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোয় চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের এই তীব্র সংকটের কারণে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। কোথাও নেই পর্যাপ্ত মনিটরিং এবং ব্যবস্থাপনা। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক প্রণীত স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন রিপোর্টের একটি প্রস্তাবও বাস্তবায়ন করেনি বর্তমান সরকার, বরং সেগুলোর কোনোটিই আমলেও নেওয়া হয়নি।
স্বাস্থ্য খাতের বেশিরভাগ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয় মূলত স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচির মাধ্যমে। ১৯৯৮ সালে সরকার স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি (সেক্টর প্রোগ্রাম নামে পরিচিত) শুরু করেছিল। পাঁচ বছর মেয়াদি অপারেশন প্ল্যানের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে সেক্টর কর্মসূচি বাস্তবায়িত হতো। অপারেশন প্ল্যানগুলো রাজস্ব খাত ও দাতাগোষ্ঠীর অর্থায়নে পরিচালিত হতো। কার্যক্রম পরিচালনায় স্বাস্থ্য বিভাগের নিজস্ব জনবলের পাশাপাশি ছিল চুক্তিভিত্তিক জনবল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের স্বাস্থ্য খাতে বিস্তর পরিবর্তন আনতে পাঁচটি সেক্টর কর্মসূচি পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু চারটি কর্মসূচি সম্পন্নের পর পঞ্চমটি অনুমোদনের আগেই সরকার পরিবর্তন ঘটে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নিয়েই ওপি (অপারেশনাল প্ল্যান) বাতিল করে দেয়। এতে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সরকার পরিচালিত বিভিন্ন কর্মসূচি (সংক্রামক, অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ) বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে প্রান্তিক পর্যায় থেকে শুরু করে সব পর্যায়ের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। স্থবির হয়ে আছে অনেক জরুরি সেবা। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সরকারি হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সের তেল, চালকের বেতন; এমনকি কর্মকর্তাদের গাড়ির তেলসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এছাড়া এসব কর্মসূচিতে প্রায় ২৫ হাজার চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োজিত ছিলেন, যারা বিনা বেতনে পরিবার-পরিজন নিয়ে অনিশ্চিত জীবনযাপন করছেন।
একইভাবে কমিউনিটি ক্লিনিক, এমবিডিসি, এইডস/এসটিডিসহ অপারেশনাল প্ল্যানে থাকা অন্যান্য প্রকল্পের রাজস্ব নয় এমন জনবলের দেড় বছরের বেশি সময় ধরে বেতন বন্ধ রয়েছে। অল্টারনেটিভ মেডিকেল কেয়ার (এএমসি) প্রকল্পে নিয়োগপ্রাপ্ত দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সরকারি হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ এবং সরকারি ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজে কর্মরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বেতন বন্ধ রয়েছে, যা স্বাস্থ্য সেক্টরে এক চরম ভোগান্তি তৈরি করেছে। যদিও এগুলো চালু করার বিষয়ে নানা ধরনের আলোচনা হচ্ছে।
অন্যদিকে পুরো দেশের নারী ও শিশুদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতে টিকাদান কর্মসূচিতেও চলছে অচলাবস্থা। জন্ম-মৃত্যুনিবন্ধন, গর্ভবতী মা সেবা, যক্ষ্মা রোগী শনাক্তকরণ, ডটস পদ্ধতিতে ওষুধ সেবন তত্ত্বাবধান, শিশুদের কৃমিনাশক সেবন করানো, ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইন, কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়তা ইত্যাদি দায়িত্ব পালন করেন স্বাস্থ্য সহকারী, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও স্বাস্থ্য পরিদর্শকরা। মাসভিত্তিক মাত্র ৬০০ টাকা ভ্রমণ ভাতা এবং ৯ হাজার ৭০০ টাকা মোট বেতনে তারা এসব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন তারা। কিন্তু নিয়োগবিধি সংশোধন, বেতন বৈষম্য নিরসন ও টেকনিক্যাল পদমর্যাদাসহ নানা বিষয়ে রয়েছে এ সেক্টরে বৈষম্য। সব মিলিয়ে দেশের স্বাস্থ্য সেক্টরে চলছে চরম নৈরাজ্য ও অব্যবস্থাপনা।
সামগ্রিক বিষয়ে কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের চেয়ারম্যান প্রফেসর ডা. জাকির হোসেন বলেন, বর্তমানে দেশের স্বাস্থ্য খাত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। অর্বাচীনের মতো ওপি বাতিল করা হয়েছে, আবার কোনো প্রকল্পও অনুমোদন বা গৃহীত হয়নি। এতে দেশের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ওষুধের ঘাটতি দেখা দিয়েছে, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনা ও প্রতিস্থাপন হয়নি, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীদের প্রশিক্ষণ প্রলম্বিত হয়েছে বা হয়নি। সব মিলিয়ে স্বাস্থ্য খাত এক প্রকার স্থবির হয়ে পড়েছে।
স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে ব্যাপক দলীয়করণ এবং দুর্নীতি
আওয়ামী লীগের বিগত সময়ে স্বাস্থ্যসেবা সেক্টর নিয়ন্ত্রণ ছিল দলীয় মাফিয়া আর স্বাচিবের নেতাদের। বর্তমান সময়েও প্রায়ই চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। বর্তমানে নেতৃত্বে চলে আসছে সরকার দলীয় চিকিৎসক নেতা ও ড্যাব নেতৃত্বের।
সার্বিক অবস্থা নিয়ে বিশিষ্ট স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ও লেখক ডা. রুবাইউল মোরশেদ বলেন, বাংলাদেশে প্রতিভাবান চিকিৎসক, দক্ষ সার্জন, নিবেদিতপ্রাণ নার্স, যোগ্য বিজ্ঞানী বা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীর কোনো অভাব নেই। দেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রতিভার অভাব নয়— এটি হলো এমন একটি স্বাস্থ্যসেবা ইকোসিস্টেম তৈরি করা, যেখানে সে প্রতিভা বিকশিত হতে পারে, যা সুশাসন, পেশাদার হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, আধুনিক অবকাঠামো, জবাবদিহি, সহানুভূতিশীল সেবা এবং সর্বোপরি জনসাধারণের আস্থা দ্বারা সমর্থিত হবে। এ ভিত্তিগুলো শক্তিশালী না করা হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে না এবং বিদেশে চিকিৎসা নেয়া রোগীদের অবিরাম স্রোত কমার সম্ভাবনা কম।
হাম-ডেঙ্গু চিকিৎসা ব্যবস্থায় ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে হাম ও ডেঙ্গু রোগ ব্যবস্থায় চরম সংকটে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চরম দৈন্যদশা ফুটে উঠেছে। এর ফলে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো ব্যাপকভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী, দেশজুড়ে এই দুই রোগ প্রকট আকার ধারণ করায় হাসপাতালগুলোয় শয্যা সংকট, চিকিৎসাসামগ্রীর অভাব এবং টিকাদানের ঘাটতির মতো নানাবিধ দৈন্যদশা প্রকট হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাস থেকে এ পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মৃতের সংখ্যা ১,০৩০ জন ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি’র তথ্যমতে, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি।
দেশে গত ১৩ সেপ্টেম্বর রোববার ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরো ৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর একই সময়ে হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ১,১৭৭ শিশু এবং হাম শনাক্ত হয়েছে ৫৫ জনের। তাতে সব মিলিয়ে হামের নতুন রোগী পাওয়া গেল ১,২৩২ শিশু। এই নিয়ে সরকারি হিসেবে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত মোট মারা গেছে ১,০৩৩ শিশু। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ১০০ শিশুর। বাকি ৯৩৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গে। আর এখন পর্যন্ত মোট আক্রান্ত হয়েছে এক লাখ ৯২ হাজার ৮৪৪ শিশু।
গত ১৫ মার্চ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত সন্দেহজনক হামের উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে এক লাখ ৭২ হাজার ৭২০ শিশু। এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হামের রোগী পাওয়া গেছে ২০ হাজার ১২৪ শিশু। আর এই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক লাখ ৫২ হাজার ১১৭ শিশু। হাম থেকে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন এক লাখ ৪৬ হাজার ৪০০শিশু।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৮ শিশুর মধ্যে ঢাকা বিভাগের ৪ জন এবং সিলেটের ৪ জন রয়েছে। আর একই সময়ে ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ৪২৪ জন হাম উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামের রোগী পাওয়া গেছে ৫০ জন।
একইভাবে ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি হাসপাতালে রোগীর উপচেপড়া ভিড় লক্ষ করা যাচ্ছে। বৃষ্টির মৌসুমের সাথে সাথে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। প্রতিদিন হাজারেরও বেশি নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন।
দেশে গত ১৩ সেপ্টেম্বর রোববার ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরো ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর একই সময়ে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ৭৩৩ জন, যা চলতি বছরে একদিনে সর্বোচ্চ আক্রান্তের রেকর্ড। সব মিলিয়ে চলতি মাসে মোট মৃত্যু হয়েছে ৬০ জনের এবং মোট আক্রান্ত হয়েছে ১৭ হাজার ৭২৪ জন।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুম থেকে এ তথ্য জানানো হয়। বলা হয়, রোববার সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বরিশাল বিভাগে ১৯১ জন, চট্টগ্রামে ১৯১ জন, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৩৮৮ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৭০ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৪৩ জন, খুলনায় ৩০২ জন, ময়মনসিংহে ১১০ জন, রাজশাহী ১৪৫ জন, রংপুরে ৮৬ জন এবং সিলেটে ৭ জন ভর্তি হয়েছেন। এই সময়ে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছে এক হাজার ২৮২ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ৫৭০ জনে। আর এ বছরে মোট মৃত্যু হয়েছে ১৫৭ জনের। মৃতদের মধ্যে জানুয়ারিতে ২ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২ জন, মে মাসে একজন, জুনে ১৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন এবং আগস্টে ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু মোট আক্রান্তের মধ্যে ৬২. ৫% পুরুষ এবং ৩৭.৫ শতাংশ নারী।
ক্যান্সার, হার্ট, কিডনিসহ জটিল রোগগুলোর বিশেষায়িত চিকিৎসায় চরম ভোগান্তি
দেশে উদ্বেগজনক হারে ক্যান্সার, হার্ট, কিডনিসহ জটিল রোগীর সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে বিশেষায়িত চিকিৎসায় চরম ঘাটতি বিরাজ করছে। এসব রোগগুলোর বিশেষায়িত চিকিৎসায় সাধারণ মানুষের চরম ভোগান্তি এবং আর্থিক নিঃস্বতা এখন দেশের অন্যতম বড় স্বাস্থ্য সংকট। চিকিৎসা ব্যবস্থার অতিমাত্রায় রাজধানীকেন্দ্রিকতা, শয্যা ও দক্ষ জনবলের তীব্র সংকট এবং উচ্চ ব্যয় এই ভোগান্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষায়িত চিকিৎসা সুবিধা না থাকায় প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ঢাকায় আসতে হয়। ফলে পথেই অনেক রোগীর অবস্থার অবনতি ঘটে। এছাড়া সরকারি বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোয় রোগীর তুলনায় শয্যা ও যন্ত্রপাতি খুবই সীমিত। এছাড়া ক্যান্সার চিকিৎসার প্রধান মাধ্যম রেডিওথেরাপি বা কেমোথেরাপির জন্য সিরিয়াল পেতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। অনেক সময় জরুরি মেশিনগুলো নষ্ট থাকায় চিকিৎসা পুরোপুরি বন্ধ থাকে। ক্যান্সার ও কিডনি ডায়ালাইসিসের মতো চিকিৎসা অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি এবং ব্যয়বহুল। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে গিয়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো জমিজমা বা সম্বল বিক্রি করে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে বাংলাদেশের মতো স্বপ্লোন্নত দেশগুলোয় স্বাস্থ্য ব্যয় নিজের পকেট থেকে মেটাতে গিয়ে প্রতি বছর বিশ্বে ৫২ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়ে পড়ছে। আর বড় ধরনের আকস্মিক স্বাস্থ্য ব্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছে সোয়া দুই কোটি মানুষ। বর্তমানে স্বাস্থ্য খাতের মোট ব্যয়ের ৬৭ শতাংশ ব্যক্তি নিজের পকেট থেকে বহন করে। ব্যক্তির এই ব্যয়ের ৬১ শতাংশ যায় শুধু ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী ক্রয়ে। জনগণ ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়ছে। গরু, ছাগল, জমিজমা বিক্রি করে চিকিৎসা খরচ মেটাচ্ছে মানুষ। দরিদ্র বা মধ্যবিত্ত মানুষ চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রাখছে, সাধারণ রোগ জটিল রোগে পরিণত হচ্ছে, অ্যান্টি মাইক্রোবিয়াল রেসিসটেন্সের জন্ম দিচ্ছে, অভুক্ত থেকে অপুষ্টিতে আক্রান্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বিশাল অসমতা সৃষ্টি হচ্ছে। তার ওপর ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি আর দলীয় করনে সরকারি সামান্য বরাদ্দও মানুষ ঠিকমতো পায় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের এবং অ্যালায়েন্স ফর হেলথ রিফর্মস’র আহ্বায়ক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ জানান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের শক্তিশালী সেল গঠন করা আবশ্যক। এখন সময় এমন একটি কৌশল গ্রহণের, যেখানে তাৎক্ষণিক ফলাফল এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন— উভয়ই সমান গুরুত্ব পায়। সরকার যদি এই দুদিকেই সমানভাবে অগ্রসর হতে পারে, তবে স্বাস্থ্য খাতে একটি কার্যকর ও স্থায়ী পরিবর্তন নিশ্চিত করা সম্ভব।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা. শাহিনুল আলম বলেন, আমাদের দেশে বেশিরভাগ মানুষ ঋণের ওপর নির্ভর হয়ে চিকিৎসা করেন। পরে সেই ঋণ শোধ করতে জমিজমা বিক্রি করতেও বাধ্য হন অনেকে। এটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সাধারণ মানুষের প্রতি অবহেলা স্পষ্ট করে। স্বাস্থ্য খাতে আর্থিক চাপের কারণে মানুষের জীবনযাত্রা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে। ঋণ নিয়ে চিকিৎসা করলেও অনেক সময় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়া যায় না, আর দীর্ঘমেয়াদে চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে মৌলিক চাহিদা থেকেও বঞ্চিত হতে হয়।
বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, স্বাস্থ্য খাতে আর্থিক চাপ মোকাবিলায় সঠিক স্বাস্থ্যবিমা, রাষ্ট্রীয় সহায়তা, সেবার মানোন্নয়ন ও সংস্কার জরুরি। উচ্চ আউট অব পকেট ব্যয় সাধারণ মানুষকে বিপদে ফেলছে, আর বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতায় সেবাসুলভ ও সহজলভ্য করা অতীব জরুরি।