অনিশ্চিত জ্বালানি নিরাপত্তা, সংকটে দেশ
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:০৬
বিদ্যুৎ-গ্যাসের অভাবে থমকে আছে শিল্প-কারখানার চাকা
॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট এখন আর শুধু গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া কিংবা বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি না থাকার সমস্যা নয়। এর প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, সার উৎপাদন, পরিবহন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে— দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ৩০ হাজার মেগাওয়াটের ওপরে, তারপরও জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে কেন? এর সরল উত্তর হলো, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যে গতিতে বেড়েছে, তার সঙ্গে দেশীয় জ্বালানি উৎপাদন বাড়েনি। বরং গত কয়েক বছরে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমেছে এবং ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্র বেড়েছে, কিন্তু সেগুলো চালানোর জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের সংকট, কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়া এবং দেশের এলএনজি অবকাঠামোর কারিগরি সীমাবদ্ধতা। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় এখন একটি বিপজ্জনক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এর মানে হচ্ছে— চাহিদা বাড়ছে, দেশীয় উৎপাদন কমছে, আমদানির প্রয়োজন বাড়ছে; কিন্তু আমদানি করা জ্বালানির দাম ও সরবরাহ দুটিই বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তাই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা।
জ্বালানি সংকটে মাঠের চিত্র : নরসিংদী পানি উন্নয়ন বোর্ড সংলগ্ন চৌয়াল শিল্প এলাকায় ছোট-বড় আড়াইশ’ শিল্পকারখানা রয়েছে। এসব কারখানার মধ্যে অন্তত ৯০ শতাংশ কারখানাই বন্ধ রয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণেই এসব কারখানা বন্ধ রয়েছে। সুতা প্রসেস করতে গড়ে ওঠা সাইজিং কারখানাগুলোর মধ্যে ৪৭ কারখানা টিকে আছে এজন্য যে, তারা কাঠ পুড়িয়ে কারখানা চালাচ্ছে। আর যারা গ্যাস ব্যবহার করে কারখানা চালাচ্ছেন এমন আড়াইশ’ কারখানার মধ্যে ৯০ শতাংশই বন্ধ প্রায়। গত ৮ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার রাতে নরসিংদী টেক্সটাইল শিল্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আসলাম ফকির এ প্রতিবেদককে এসব কথা জানান।
আসলাম ফকিরেরও রয়েছে একাধিক কারখানা। তার মধ্যে ‘ফকির সাইজিং’ নামের কারখানাটি আগস্ট মাসের বেশিরভাগ সময়ই বন্ধ ছিল গ্যাস না থাকায়। চলতি মাসের শুরুতে তিনদিন চলার পর ৮ সেপ্টেম্বর এ রিপোর্ট লেখার দিন পর্যন্ত বন্ধ রয়েছে। অর্থাৎ টেক্সটাইল শিল্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের ‘ফকির সাইজিংও’ বন্ধ। কারখানায় উৎপাদন কম হওয়ায় সংশ্লিষ্ট পণ্যের মূল্যও বেড়ে যায়। গত দুই মাস আগে ১৬০ টাকায় পাওয়া যেত এক পাউন্ট সুতা, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮০ টাকা। মানে পাউন্টে বেড়েছে ২০ টাকা। আর কাপড় তৈরির কস্টিংও বেড়েছে গজপ্রতি আড়াই টাকা। এর প্রভাবে মূল্য খুচরা ক্রেতার ওপর যথেষ্ট চাপ বাড়ছে। গ্যাস আমদানি ও নিজস্ব উৎপাদন বাড়াতে আকুতি জানিয়েছেন এই শিল্প মালিক। তার ভাষ্য, দেশ উন্নত না হওয়ার পেছনে মূল কারণ দুটি— আমাদের দেশের বেশিরভাগ রাজনীতিক ও আমলারা সৎ নন। এরা চায়না দেশ উন্নত হোক, সংকট কেটে যাক। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন আমলা ও রাজনীতিকরা সৎ হয়ে গেলেই দেশে গ্যাস-বিদ্যুৎসহ কোনো সংকটই থাকবে না।
কুইক রেন্টাল সব কেন্দ্র ও নেপাল থেকে আমদানি বন্ধ
দেশে কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো এখন বন্ধ। অতিরিক্ত ব্যয়ে এসব কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হতো। অতিরিক্ত ব্যয় কমাতে এবং নতুন সরকারের কৌশলগত কারণে এসব কুইক রেন্টাল এখন বন্ধ। দেশের গ্যাসভিত্তিক এই কুইক রেন্টাল কেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে— ১. আশুগঞ্জ ৫৩ মেগাওয়াট (ইউনাইটেড পাওয়ার), ২. ভোলা ৯৫ মেগাওয়াট (এগ্রিকো কুইক রেন্টাল), ৩. বগুড়া ২০ মেগাওয়াট (এনার্জি প্রিমা), ৪. ফেঞ্চুগঞ্জ ৪৪ মেগাওয়াট ও ৫০ মেগাওয়াট (এনার্জি প্রিমা) ও ৫. কুমারগাঁও ১০ মেগাওয়াট (দেশ কেমব্রিজ)। তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে— ১. খুলনা কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র (এগ্রিকো – ৫৫ মেগাওয়াট), ২. ভেড়ামারা ১১০ মেগাওয়াট (কোয়ান্টাম) ৩. সিদ্ধিরগঞ্জ ১০০ মেগাওয়াট (ডাচ-বাংলা), ৪. মন্টু মিয়া (পাওয়ারপ্যাক কেরানীগঞ্জ ১০০ মেগাওয়াট), ৫. মেঘনাঘাট ১০০ মেগাওয়াট (আইইএল) ও ৬. নোয়াপাড়া ৪০ মেগাওয়াট। অতিরিক্ত ব্যয়— বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ এবং বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ওপর চাপ কমাতে সরকার কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। কেননা বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও চুক্তি অনুযায়ী এসব কেন্দ্রকে বসিয়ে রেখে বিপুল পরিমাণ কেন্দ্র ভাড়া বা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হতো সরকারকে। অতিরিক্ত উৎপাদন খরচ— তেল ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক এসব রেন্টাল কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনা তুলনামূলক অনেক ব্যয়বহুল ছিল, যা সরকারের ভর্তুকির চাপ বাড়িয়ে দিয়েছিল। সরকার গত জুনের মধ্যে সব বন্ধ করে দিয়েছে। অবশ্য ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কুইক রেন্টাল ও অদক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্র ফেইজ আউট বা বন্ধের প্রস্তাবনা আওয়ামী লীগের আমলেই দিয়েছিল গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)সহ বিভিন্ন সংস্থা। এসব কুইক রেন্টাল বন্ধ হওয়ায় উৎপাদন কমেছে, সংকদ দৃশ্যমান হয়েছে। এরসঙ্গে যুক্ত হয়েছে নেপালের বন্যা ও দুর্যোগ।
নেপাল থেকে বাংলাদেশে সাধারণত বছরে পাঁচ মাস (১৫ জুন থেকে ১৫ নভেম্বর) বর্ষা মৌসুমে দৈনিক ৪০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ আমদানি করা হতো। ভারতের সঞ্চালন লাইন ও গ্রিড ব্যবহার করে এই বিদ্যুৎ বাংলাদেশে আসত। বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের মধ্যে ত্রিদেশীয় চুক্তির মাধ্যমে এটি কার্যকর হয়েছিল। কিন্তু গত ২৬ আগস্ট সেখানে প্রাকৃতি বিপর্যায় সৃষ্টির পর বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে সেখান থেকেও আমদানি বন্ধ রয়েছে। এসব নানা কারণে সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছেন।
দেশে জ্বালানি সংকটের প্রকৃত চিত্র
গত আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২ হাজার ৪২০ মিলিয়ন ঘনফুট দৈনিক (এমএমসিএফডি), যেখানে জাতীয় চাহিদা ছিল প্রায় ৩ হাজার ৮০০ এমএমসিএফডি। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় ঘাটতি ছিল প্রায় ১ হাজার ৩৮০ এমএমসিএফডি। দেশের একটি প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিকের প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। পেট্রোবাংলার ১১ আগস্টের তথ্য বিশ্লেষণ করে সেন্টার পর পলিসি ডায়ালগও (সিপিডি) দেখিয়েছে, দেশের গ্যাস উৎপাদনকারী পাঁচটি কোম্পানির কার্যকর সক্ষমতার মাত্র ৫৭ শতাংশ ব্যবহার করা হচ্ছিল। বিদ্যুৎ খাতের চাহিদার বিপরীতে বিতরণ কোম্পানিগুলো সরবরাহ করতে পেরেছিল মাত্র ২৯ শতাংশের মতো এবং সার কারখানাগুলোর প্রয়োজনের মাত্র ৩৮ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছিল। এর অর্থ হচ্ছে, সংকট শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রে নয়। শিল্প, সার ও অন্যান্য খাতও একই ঘাটতির শিকার।
এই ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বর্তমান তথ্যানুযায়ী, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর স্থাপিত সক্ষমতা ১২ হাজার ৪৭২ মেগাওয়াট, যা বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডেও (বিপিডিবি) তালিকাভুক্ত মোট সক্ষমতার ৪২.১৫ শতাংশ। একই তালিকায় কয়লাভিত্তিক সক্ষমতা ৮ হাজার ৪২৩ মেগাওয়াট এবং ফার্নেস অয়েলভিত্তিক সক্ষমতা ৫ হাজার ৬৪১ মেগাওয়াট।অর্থাৎ দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অবকাঠামো আছে, কিন্তু সেই অবকাঠামোর বড় একটি অংশ চালাতে জ্বালানি প্রয়োজন। গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র কম উৎপাদন করে; তখন তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালাতে হয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সংকট মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ঘাটতি নয়, জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি।
বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, কিন্তু জ্বালানি নেই কেন?
বাংলাদেশ গত দেড় দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দ্রুত বাড়িয়েছে। ২০০৯ সালের পর থেকে স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা কয়েক হাজার মেগাওয়াট থেকে বেড়ে ৩০ হাজার মেগাওয়াটের ওপরে উঠেছে। কিন্তু বিদ্যুতের চাহিদা সেই একই গতিতে বাড়েনি। ফলে দেশে বড় ধরনের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
জ্বালানিনীতি নিয়ে গবেষণা ও স্বাধীন আর্থিক বিশ্লেষণ প্রদানকারী একটি আন্তর্জাতিক অলাভজনক থিঙ্কট্যাঙ্ক ওহংঃরঃঁঃব ভড়ৎ ঊহবৎমু ঊপড়হড়সরপং ধহফ ঋরহধহপরধষ অহধষুংরং (ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস) বা ওঊঊঋঅ-এর হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে রিজার্ভ মার্জিন ছিল ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ। ডিরেটেড সক্ষমতা (একটি যন্ত্র সর্বোচ্চ যতটুকু লোড বা চাপ নেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। বিশেষ কিছু কারণে তার চেয়ে কম লোডে নিরাপদভাবে সেটি চালানোই হলো ডিরেটেড সক্ষমতা) হিসাব করলে তা ছিল ৫৮ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ সর্বোচ্চ চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অনেক বেশি ছিল।
কিন্তু সক্ষমতা থাকা আর বিদ্যুৎ উৎপাদন করা এক বিষয় নয়। একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ১ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন করতে সক্ষম হলেও গ্যাস বা কয়লা না থাকলে সেই কেন্দ্র থেকে ১ হাজার মেগাওয়াট পাওয়া যাবে না। আবার গ্যাসের পরিবর্তে ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করলে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। এখানেই বাংলাদেশের বিদ্যুৎ পরিকল্পনার একটি বড় দুর্বলতা সামনে আসে। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হয়েছে, কিন্তু কেন্দ্রগুলো চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন একই হারে বাড়েনি। ফলে একদিকে অনেক কেন্দ্রের সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকে; অন্যদিকে প্রয়োজনের সময় জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায়।
এই পরিস্থিতির আরেকটি আর্থিক দিকও রয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন না করলেও অনেক চুক্তির আওতায় কেন্দ্রের সক্ষমতা ধরে রাখার জন্য যে অর্থ দেওয়া হয়, সেটিই ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বা ক্যাপাসিটি চার্জ।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার ব্যয় ৭২ হাজার ৭১ কোটি টাকায় উঠেছে বলে বিপিডিবির হিসাব বিশ্লেষণ করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কেনার গড় ব্যয়ও বেড়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বেসরকারি কেন্দ্রগুলো গড়ে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় প্রায় ৯ দশমিক ৫ টাকা এবং কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো প্রায় ৫ দশমিক ৯ টাকা ক্যাপাসিটি পেমেন্ট পেয়েছে বলে জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস।
গ্যাসের সংকট কতটা?
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কয়েক বছর ধরে কমছে। ২০২৪ সালের একটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, একসময় দৈনিক ২ হাজার ৫০০ এমএমসিএফডির (গ্যাস ও জ্বালানি শিল্পে ব্যবহৃত পরিমাপের একটি একক) বেশি দেশীয় গ্যাস উৎপাদন হলেও তা প্রায় ২ হাজার এমএমসিএফডিতে নেমে আসে। পুরোনো বড় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানার উৎপাদন ২০২৬ সালের মার্চ থেকে প্রায় ৮০ এমএমসিএফডি কমেছে বলে আগস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিবিয়ানার মতো বড় ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে গেলে পুরো জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়ে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের গ্যাস সরবরাহের বড় অংশ এসেছে কয়েকটি বড় গ্যাসক্ষেত্র থেকে। এখানে আরও একটি সমস্যা রয়েছে— নতুন গ্যাস আবিষ্কার ও উৎপাদনে যায় ফ্যাসিস্ট হাসিনার সরকার। অনুসন্ধান, খনন, পরীক্ষণ, উৎপাদন ও পাইপলাইনে যুক্ত করার জন্য যথেষ্ট সময় ও বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও হাসিনা সেটি করেনি, কারণ এতে তার দলের লোকের অবৈধ আয়ে ভাটা পড়বে।
সরকার এখন এই ঘাটতি কাটাতে নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছে। পাঁচ বছরে ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে এবং ১০৬টি কূপের মধ্যে ৩০টির কাজ চলমান রয়েছে বলে সংসদে জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে বঙ্গোপসাগরের ২৬টি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। তবে এগুলো কিন্তুা দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অংশ। চলমান সংকট তাৎক্ষণিক মোকাবিলায় সরকারকে এলএনজির ওপরই ভারসা করতে হচ্ছে।
এলএনজিনির্ভরতা কেন?
বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানি শুরু হয়েছিল মূলত দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি পূরণের জন্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এটি আর সাময়িক ব্যবস্থা থাকেনি; দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার একটি স্থায়ী অংশে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ প্রায় ১০৯টি এলএনজি কার্গো আমদানি করেছে এবং এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালে ৮৬টি কার্গোর বিপরীতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৩ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এলএনজি আমদানির পরিমাণ ও ব্যয়— দুটিই উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এলএনজি কিনতে আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারে অর্থ পরিশোধ করতে হয়। ফলে গ্যাসের ঘাটতি পূরণ করতে যত বেশি এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে, তত বেশি বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হচ্ছে।
২০২৬ সালে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। কাতার ছিল বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহকারী। ২০২৫ সালে কাতার বাংলাদেশকে ৪ দশমিক ১৫ মিলিয়ন টন এলএনজি সরবরাহ করেছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের সংকটের কারণে ২০২৬ সালে কাতার থেকে বাংলাদেশের নির্ধারিত সরবরাহ অর্ধেকে নেমে আসার কথা জানায় পেট্রোবাংলা। এর ফলে বাংলাদেশকে স্পট মার্কেটে বেশি এলএনজি কিনতে হয়েছে। স্পট মার্কেটের সমস্যা হলো, এখানে দাম দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মতো স্থির থাকে না। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চে বাংলাদেশের কেনা কয়েকটি স্পট কার্গোর দাম প্রতি এমএমবিটিইউতে (এমএমবিটিইউ হলো আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ব্যবহৃত তাপ বা শক্তির পরিমাপের একটি একক। এর পূর্ণরূপ হলো ‘মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট’) ২৮.২৮ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল, যেখানে জানুয়ারিতে দাম ছিল প্রায় ১০ ডলার। এর অর্থ একই পরিমাণ গ্যাস পেতে বাংলাদেশকে কয়েক মাসের ব্যবধানে প্রায় তিনগুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।
রয়টার্সেও প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য বলছে, শুধু মার্চ ও এপ্রিলেই স্পট এলএনজির দাম বৃদ্ধির কারণে সরকারের অতিরিক্ত ভর্তুকির চাপ প্রায় ৪৫ বিলিয়ন টাকা বা ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকার কাছাকাছি হয়েছিল। এখন আবার সরবরাহের সংকটও যুক্ত হয়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে পেট্রোবাংলা নতুন সরবরাহকারী আকৃষ্ট করতে স্পট এলএনজি সরবরাহের যোগ্যতার শর্ত শিথিল করেছে। এর অর্থ সরকার দ্রুত সরবরাহকারী বাড়িয়ে বাজার থেকে কার্গো সংগ্রহ করতে চাইছে। এভাবে বারবার স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভর করলে সরকারের ওপর ব্যয়ের চাপ আরও বাড়বে।
গ্যাস সংকট ধাপে ধাপে পরিণত হয় অর্থনৈতিক সংকটে
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের ২০২৬ সালের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন সময়ে বিদ্যুৎ খাতের চাহিদা মেটাতে এলএনজি আমদানির জন্য বাংলাদেশকে প্রায় ১ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ভর্তুকি দিতে হতে পারে। অর্থাৎ একটি গ্যাস সংকট ধাপে ধাপে অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হচ্ছে। প্রথমে দেশীয় গ্যাস কমে যায়। এরপর এলএনজি আমদানি বাড়ে। আমদানির জন্য ডলার লাগে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়ে। সেই ব্যয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়ায়। সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ভর্তুকি দেয়। শেষ পর্যন্ত চাপ পড়ে রাষ্ট্রীয় অর্থের ওপর। বিদ্যুৎ খাতেও একই চিত্র। ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস বা ওঊঊঋঅ-এর হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিডিবির রাজস্ব ঘাটতি ছিল প্রায় ৫৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা এবং সরকার প্রায় ৩৮ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। এখানে ক্যাপাসিটি পেমেন্টও বড় বিষয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় ক্যাপাসিটি চার্জ ৫.২৪ টাকায় উঠেছে বলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে এই হার ছিল ২.৩৫ টাকা। অর্থাৎ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পর শুধু বিদ্যুৎ কিনলেই খরচ হচ্ছে না; কেন্দ্র সচল রাখার জন্যও বড় অঙ্কের অর্থ দিতে হচ্ছে। ফলে দেশের জ্বালানি সংকটকে শুধু সরবরাহের সংকট বলা যথেষ্ট নয়। এটি এখন বৈদেশিক মুদ্রা, ভর্তুকি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় এবং রাষ্ট্রীয় ঋণের ওপরও চাপ তৈরি করছে।
সংকটের দায় কার?
বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের সমস্যা এবং কাতারের এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এগুলোকে পুরো সংকটের দায় দিলে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতাগুলো আড়ালে থেকে যাবে। মূল সমস্যা তৈরি হয়েছে কয়েকটি সিদ্ধান্তের সম্মিলিত প্রভাবে।
প্রথমত, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে দ্রুতগতিতে, কিন্তু জ্বালানি সরবরাহের দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা একইভাবে তৈরি হয়নি। দ্বিতীয়ত, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে জানা থাকলেও নতুন অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধির গতি প্রয়োজনের তুলনায় কম ছিল। তৃতীয়ত, গ্যাসের ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানিকে ক্রমেই স্থায়ী সমাধান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে সিরিয়াস হয়নি বিগত সরকারগুলো। চতুর্থত, বিদ্যুৎ খাতে চাহিদার তুলনায় বড় সক্ষমতা তৈরি হওয়ায় ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ও ভর্তুকির চাপ বেড়েছে। পঞ্চমত, জ্বালানি ব্যবস্থায় আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে। ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস বা আইইইএফএ-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে বাংলাদেশের প্রাথমিক জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের নীতিনর্ধিারকরা ‘জ্বালানি পরিকল্পনা, অনুসন্ধান সিরিয়াস না হলে বিদ্যুৎ সক্ষমতা সম্প্রসারণ করেছে এবং আমদানিনির্ভরতা বাড়িয়েছে। এমন একজনকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, যাকে ব্যর্থতার কারণে বাদ দিয়েছিল মরহুমা প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
উত্তরণের পথ কী
বর্তমান সংকট থেকে বের হওয়ার প্রথম শর্ত হলো সমস্যাটিকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা। বাংলাদেশের সমস্যা শুধু ‘আরও গ্যাস দরকার’— এমন নয়। প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি ব্যবস্থা। স্বল্পমেয়াদে এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কাতারের সরবরাহ পরিস্থিতি অনিশ্চিত থাকায় নতুন উৎস তৈরি করতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি সরবরাহকারী ও উৎসের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, এলএনজি আমদানি বাড়িয়েই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হবে। বরং দেশীয় অনুসন্ধানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। সরকার ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে। এই পরিকল্পনার প্রতিটি ধাপের অগ্রগতি, ব্যয় এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন। বঙ্গোপসাগরের ২৬টি ব্লকে অনুসন্ধানের উদ্যোগও দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে এগিয়ে নিতে হবে।
প্রসঙ্গত, দেশের জ্বালানি সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন— দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো, এলএনজি উৎস বহুমুখী করা, বিদ্যুৎ খাতের অতিরিক্ত সক্ষমতা কমানো, ব্যয়বহুল কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়ানো এবং জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি, বাস্তবভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক পরিকল্পনা করা। তা না হলে বর্তমান সংকট সাময়িকভাবে সামাল দেওয়া গেলেও কয়েক বছর পর এ সংকট আরও বড় আকারে ফিরে আসবে।