পুষ্টির অন্তরায় খাদ্যে ভেজাল
৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:২৪
॥ ড. উম্মে নাজিয়া ॥
খাবারে ভেজাল আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য একটি নীরব ঘাতক, যা অতিরিক্ত মুনাফালোভী কৃষক, মজুদদার এবং ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে খাবারে ক্ষতিকর রাসায়নিক বা উপাদান মেশানোর ফলে ঘটে। মানুষের মৌলিক চাহিদার খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। এর মধ্যে খাদ্য একটি প্রধান ও অন্যতম মৌলিক চাহিদা। জীবন ধারণের জন্য প্রতিটি মানুষের প্রয়োজন বিশুদ্ধ ও পুষ্টিকর খাদ্য। আর এ বিশুদ্ধ খাদ্য সুস্থ ও সমৃদ্ধশালী জাতি গঠনে একান্ত অপরিহার্য। কিন্তু বাংলাদেশে বিশুদ্ধ খাবার প্রাপ্তি কঠিন করে ফেলছে কিছু বিবেকহীন মানুষ। মানুষ তার কঠোর পরিশ্রমের অর্জিত অর্থ দিয়ে খাদ্য কিনে প্রতারিত হচ্ছে। ভেজাল খাবার খেয়ে মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়েছে। এরকম অবস্থার সম্মুখীন আমরা সবাই। খাদ্যে ভেজাজ ইচ্ছাকৃত, অনিচ্ছাকৃতভাবে বা ঘটনাক্রমে বিভিন্নভাবেই হয়ে থাকে। যেমন— নোংরাভাবে গুদামজাত করার ফলে পোকার লার্ভা ইঁদুর/তেলাপোকার পায়খানা, মেঝের ময়লা-আবর্জনা মিশে থাকে। কৃষকদের ব্যবহৃত পেস্টিসাইড থেকে ভারী ধাতু, সসিা, পানি থেকে আর্সেনিক, প্যাকেজিংয়ের দ্রব্যাদির অংশবিশেষ (যেমন— পলিথিলিন, পলিভিনাইল ক্লোরাইড ইত্যাদি) মিশে খাবার বিষাক্ত হয়। খাদ্যদ্রব্যে যে সকল রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো হয়, অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুরা এসব খেলে দ্রুত তাদের আচরণ পরিবর্তন হয়ে যায়; যেমন— লেখাপড়ায় অমনোযোগ, ক্রিমিনাল আচরণ, নেশার প্রতি আসক্তি, আলঝেইমার রোগ ইত্যাদি।
ব্যবসায়ীরা ইচ্ছা করেই সবচেয়ে বেশি ভেজাল মিশ্রিত করে; যেমন— সরিষা তেলের ঝাঁজ বাড়াতে অনেক সময় পেঁপে বীজ আর আর্জোমোন বীজ মেশানো হয়। এ ধরনের ভেজাল সরিষার তেল খেলে চোখের কঠিন গ্লোকুমা, এপিডেমিক বা ড্রপসি শোথ ও ফুলে যেতে পারে।
পনির, দুধ ও কনডেন্সড মিল্কে অনেক সময় অতিরিক্ত পানি স্টার্চ মেশানো থাকে, ফলে হজমে ব্যাঘাত ঘটে। আইসক্রিম তৈরিতে পেপারোনিল, ইথাইল, এসিটেট, বিউটারালডিহাইড, নাইট্রেট, এবং ওয়াশিং পাউডার মেশানো থাকে। কফি পাউডারে তেঁতুলের বিচি ও চিকোরি পাউডার মেশানো থাকে। এগুলো ডায়রিয়া, হজম সমস্যা ও জয়েন্ট ব্যাথার জন্য দায়ী। আচার এবং ক্যানজাত সবজি সবুজ করার জন্য কপার মেশানো হয়। কনফেকশনারিতে ক্রোম ইয়েলো, প্রুসিয়ান কপার ও আর্সেনিক যৌগ মেশানো হয়।
বাটারে প্রচুর ওলিগোমার্গারিন যোগ করা হয়, যা গরুর চর্বি থেকে তৈরি। ক্রিমের সাথে জিলাটিন মেশানো হয় ও প্রিজারভেটিভ হিসেবে ফরমালডিহাইড যোগ করা হয়। জুতার আঠা, পাম তেল, সয়াবিন, আলু, কৃত্রিম রং দিয়ে ঘি তৈরি হচ্ছে। দই তৈরির সময় টিস্যু পেপার যোগ করা হয় একে ঘন করার জন্য।
সয়াবিন তেল দীর্ঘদিন রাখার জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মেশানো থাকে। পাউরুটি যত নরম তত বেশি রাসায়নিক দ্রব্য মেশানো থাকে। আকর্ষণীয় চিপসে ক্ষতিকর ট্রান্সফ্যাট, অন্যান্য ক্ষতিকর দ্রব্য এবং প্রচুর লবণ দেওয়া থাকে যা খেলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি হয়ে থাকে।
মরিচের গুঁড়া বেশি লাল করার জন্য সুদান ডাই ও ইটের গুঁড়া দেওয়া হয়। কখনো এতে লাল রং ও কাঠের গুঁড়া মেশানো থাকে। নিম্নমানের পচা মরিচ, মরিচের ডাঁটাসহ পিষে সঙ্গে লাল রং দেওয়া হয়। এসব অপদ্রব্য ফুসফুস, কিডনি ও হার্টে এবং পাকস্থলি নষ্ট করে।
যেকোনো গাছের পাতা গুঁড়া করে পিকরিক এসিড দিলে লাল রং হয়ে থাকে। অনেকে পিকরিক এসিড দিয়ে মেহেদি তৈরি করে, এই মেহেদি বেশি ব্যবহার করলে স্কিনে ক্যান্সার হয়। আজকাল খাবারকে আকর্ষণীয় করার জন্য স্বাদ লবণ (টেস্টিং সল্ট) ব্যবহার খুবই বেড়েছে। স্বাদ লবণ বেশি খেলে বাচ্চাদের আচরণ পরিবর্তিত হয়ে যায়।
সুজিকে ভারী করার জন্য লৌহ চূর্ণ দেয়া হয়। আয়রণ ট্যাবলেটেও লৌহ চূর্ণ দেয়া হয়। সাগুদানার মধ্যে ট্যালকম পাউডার যোগ করা হয়। মসুর ডালকে বেশি লাল বানাতে লেড ক্রোমেট দেওয়া হয়।
ঘি-মাখনের মধ্যে ডালডা মেশানো থাকে। ছানার পানির সাথে শ্যাম্পু এবং রাসায়নিক মিশিয়ে নকল দুধ তৈরি করা হয়। কাঁচামরিচ এবং সবুজ শাকসবজি বাসি হয়ে গেলে ম্যালাকাইট গ্রিন দিয়ে দ্রবণ তৈরি করে তাতে সবজি ডুবালে আবার সবুজ হয়ে ওঠে। ম্যালাকাইট গ্রিন দীর্ঘদিন খেলে ক্যান্সার হতে পারে।
চা পাতার মধ্যে শুকনা পাতা এবং কৃত্রিম রং ব্যবহার করা হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি। কনডেন্স মিল্ক মেয়াদোত্তীর্ণ গুঁড়া দুধ, নিম্নমানের ডালডা এবং চিনি দিয়ে তৈরি করা হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধে ভারী ধাতু থাকে যা ক্যান্সার সৃষ্টি করি। হলুদে স্টার্চ, রঙিন চকের গুঁড়া, মেটানিল ইয়েলো যোগ করা হয়, যা নার্ভাস সিস্টেম ও লিভারের জন্য ক্ষতিকর। কার্সিনোজেনিক এবং হজমের সমস্যা করে। লবণে সাধারণ পাউডার, আয়োডিন লবণে সাধারণ লবণ মেশানো হয়।
টমেটোতে হরমোন, ক্যামিক্যালস দিয়ে কাঁচা টমেটো পাকানো হয়, রান্না করলে শক্ত হয়ে থাকে। আম, কলা কার্বাইড দিয়ে পাকানো হয় যা খুবই বিষাক্ত। আম কলা গাছে ফরমালিন স্প্রে করা হয়, যাতে দীর্ঘদিন ভালো থাকে এবং সহজে পচে না।
বেগুনের জমিতে একদিন পর পর ককটেল (৩-৪ রকম কীটনাশক মিশিয়ে স্প্রে করা হয়)। করলা, পটল ইত্যাদিতেও মারাত্মক কীটনাশক দেওয়া হয়। এমনকি লালশাক, পুঁইশাক, কচুশাকও বাদ যায় না। সবজিতে এবং ফলে প্রচুর হরমোন স্প্রে করা হয়। তরমুজকে বেশি লাল দেখানোর জন্য সুদান ডাই/লাল রং ব্যবহার করা হয়। শুঁটকি মাছ যাতে নষ্ট না হয় বা পোকা না ধরে, সেজন্য এতে প্রচুর কীটনাশক দেওয়া হয়। যেমন— সবিক্রন, লিডার, মাপন, এডমিয়ার ইত্যাদি। শুঁককি মাছে ফরমালিন ছাড়াও ডিডিটি থাকে, যা সাধারণ তাপমাত্রায় রান্না করলেও গুণাবলি নষ্ট হয় না।
দুধ এবং দুগ্ধজাত পণ্য খুব সহজেই জীবাণু দ্বারা সংক্রামিত হয়ে থাকে। এজন্য দুধে ফরমালিন মেশানো হয়। স্কোয়াস ও জুস এগুলো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। স্কোয়াস বেশি খেলে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পটেটো চিপসে ওলেস্ট্রা নামক কৃত্রিম চর্বি দেওয়া হয়, যা বাচ্চারা খুব পছন্দ করে। কিন্তু ওলেস্ট্রা পাকস্থলি হজম এবং শোষণ করতে পারে না, ফলে পেটে অস্বাভাবিক গোলমাল দেখা যায়।
গুড়ে জীবাণুনাশক ফিটকিরি দেওয়া হয়। চাল ধবধবে সাদা ও চিকন করার জন্য ইউরিয়া ও টিএসপি সার দেওয়া হয়। মেশিনে চাল কেটে পালিশ করে চিকন করা হয়, যার ফলে এর পুষ্টিগুণ কমে যায়। লিচু অতিরিক্ত লাল করার জন্য কৃত্রিম ডাই (রং) দেওয়া হয়।
যেসব খাবার বেশি তামাত্রায় ভাজা হয়, সেগুলো অতিরিক্ত খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। যেমন— চানাচুর ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপে ভাজা হয়। একই তেলে বারবার খাবার ভাজলে এর গুণাবলি নষ্ট হয়ে যায়। দীর্ঘদিন এই তেলে ভাজা খাবার খেলে শরীরের ক্যান্সার কোষ সক্রিয় হয়ে ওঠে। গর্ভবতী মা এসব খাবার খেলে গর্ভস্থ শিশু ডিসেবলড (প্রতিবন্ধী) বা অটিজম আক্রান্ত হতে পারে। দেশে ৫০ জন বাচ্চার মধ্যে একজন অটিস্টিক শিশু জন্মায়।
মাছ, দুধ, মাংস ও ফল দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করে রাখার জন্য ফরমালিন দেওয়া হয়। লবঙ্গ, এলাচ, তেল বের করে নিয়ে ট্যালকম পাউডার যোগ করা হয়। দারুচিনির সাথে অন্য গাছের ডাল মেশানো হয়। গোলমরিচের সঙ্গে শুকনো পেঁপে বীজ মেশানো থাকে। নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধে ভারী ধাতু থাকে, যা ক্যান্সার সৃষ্টি করে।
কারখানায় ফাঙ্গিসাইড এবং ব্যাকটেরিওসাইড হিসেবে ফরমালিন ব্যবহার করা হয়। এই কঠিন একটি রাসায়নিক দ্রব্যকে খাবারে ব্যবহার করা হয়। খাবারকে দীর্ঘদিন পচনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ফরমালিন ব্যবহার করা হয়। মাছে এর ব্যাপক প্রয়োগ দেখা যায়। এছাড়া ফলমূলে ফরমালিন ব্যবহৃত হয়, আম গাছে ফরমালিন স্প্রে করে দেওয়া হয় যাতে আম দীর্ঘদিন ভালো থাকে।
খাদ্যে ফরমালিন বেশি মাত্রায় থাকলে নাক-চোখ জ্বলে, দুর্বল লাগে এবং মাথা ব্যথা হয়। অপুষ্টিকর ও বিষাক্ত এই সব খাবার সব বয়সের মানুষের জন্যই ক্ষতিকর। বিশেষ করে শিশুরা পেটের গোলযোগ, ক্ষুধামন্দা, খিটখিটে মেজাজ ও ওজনহীনতাসহ নানা জটিল ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। প্রতি বছর আমাদের দেশের লাখ লাখ মানুষ; বিশেষ করে শিশুরা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়, যার অন্যতম কারণ দূষিত খাবার। ভেজাল খাবার, পচা-বাসি ও দূষিত বস্তু দিয়ে তৈরি করা খাবার স্বাস্থ্যের ওপর তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
তাৎক্ষণিক ক্ষতির মধ্যে আছে : ডায়রিয়া, বমি, পেটব্যথা ও বদহজম হয়। খাদ্য বিষক্রিয়া ফুড পয়জনিংয়ের ঝুঁকি।
দীর্ঘমেয়াদি ও মারাত্মক ক্ষতি : লিভার, কিডনি, হৃৎপিণ্ড ও অস্থিমজ্জার স্থায়ী ক্ষতি হয়। ভেজাল রাসায়নিক ও কীটনাশক শরীরে ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়, ফলে সহজে নানা রোগ আক্রমণ করে। খাবার ভেজাল থেকে সতর্ক হওয়ার এখনই সময়।
তাহলে ভাবছেন খাবোটা কি? এ প্রশ্ন এখন আমাদের সবার জন্য প্রয়োজন সম্মলিত প্রচেষ্টা। উৎপাদক থেকে ভোক্তা সকলকেই ভেজাল বন্ধের জন্য এক সাথে কাজ করতে হবে। আর যতটা সম্ভব নিজের একখণ্ড জমি, বারান্দা, টব, ছাদ সব জায়গায় কিছু না কিছু চাষ করার অভ্যাস গড়ে তুলুন।