সুকান্ত ও ক্ষুধার রাজ্য
৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:৪১
॥ ফারুক হোসেন সজীব ॥
ছোট্ট বন্ধুরা, তোমরা কি কখনো এমন একটি রাজ্যের কথা কল্পনা করেছ, যেখানে প্রাসাদ আছে, রাস্তা আছে, আকাশে চাঁদ আছে অথচ অনেক মানুষের ঘরে খাবার নেই? এমন রাজ্য কোনো রূপকথার রাজ্য নয়। এমন এক কঠিন বাস্তব পৃথিবী দেখেছিলেন তরুণ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। সেই পৃথিবীর নাম তিনি কবিতার ভাষায় যেন করে তুলেছিলেন ক্ষুধার রাজ্য।
সুকান্ত ভট্টাচার্য জন্মগ্রহণ করেন ১৫ আগস্ট ১৯২৬ সালে কলকাতার কালীঘাটে, তার মাতামহের বাড়িতে। তার পৈতৃক নিবাস ছিল তৎকালীন ফরিদপুর জেলার কোটালীপাড়ার উনশিয়া গ্রামে। ছোটবেলা থেকেই বই পড়া ও লেখার প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল। কৈশোরেই তিনি কবিতা লিখতে শুরু করেন। কিন্তু তার কবিতার বিষয় শুধু ফুল, পাখি, নদী আর চাঁদের সৌন্দর্য ছিল না। চারপাশের মানুষের জীবনও তার কবিতার বড় বিষয় হয়ে উঠেছিল। সুকান্ত যখন বড় হচ্ছিলেন, তখন পৃথিবী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। বাংলায়ও নেমে এসেছিল দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষের নির্মমতা। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে অসংখ্য মানুষ খাদ্যের অভাবে কষ্ট পেয়েছিল। রাস্তায় ক্ষুধার্ত মানুষের মুখ দেখে তরুণ সুকান্ত গভীরভাবে ব্যথিত হন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ক্ষুধা শুধু পেটের কষ্ট নয়। ক্ষুধা মানুষের হাসি কেড়ে নেয়, শিশুর স্বপ্ন ছোট করে দেয়, মানুষের জীবনকে অনিশ্চিত করে তোলে। এ কারণেই তার কবিতায় বারবার ফিরে এসেছে ক্ষুধার্ত মানুষের কথা। সুকান্তের বিখ্যাত কবিতা হে মহাজীবন-এ বাস্তব জীবনের কঠিন সত্যের প্রতি তার গভীর মনোযোগ প্রকাশ পেয়েছে। তার কাছে কবিতা ছিল মানুষের জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়ার কোনো পথ নয়। বরং মানুষের কষ্টকে সামনে নিয়ে আসার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। তার বিখ্যাত রানার কবিতায় দেখা যায় এক শ্রমজীবী মানুষের নিরন্তর ছুটে চলা। তার জীবন ক্লান্তিতে ভরা, তবু কাজ থামে না। এই রানার যেন অসংখ্য পরিশ্রমী মানুষের প্রতিচ্ছবি।
আবার আঠারো বছর বয়স কবিতায় তিনি তরুণদের শক্তি ও স্বপ্নের কথা বলেছেন। নিজের জীবনও তখন তারুণ্যে ভরা ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, তরুণদের সাহস ও স্বপ্ন সমাজকে পরিবর্তনের পথে এগিয়ে নিতে পারে।
সুকান্তের উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ছাড়পত্র, পূর্বাভাস, ঘুম নেই, মিঠেকড়া, অভিযান ও হরতাল। তার মিঠেকড়া গ্রন্থে শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা ছড়াও রয়েছে। অর্থাৎ ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের কঠিন বাস্তবতার পাশাপাশি তিনি শিশুদের হাসি, কৌতূহল ও আনন্দের কথাও ভেবেছেন। সুকান্ত সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ছিলেন। ১৯৪৪ সালে তার সম্পাদনায় আকাল নামে একটি সংকলন প্রকাশিত হয়। তিনি ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং দৈনিক স্বাধীনতা পত্রিকার কিশোর সভা বিভাগ সম্পাদনা করেন। সুকান্তের স্বপ্নের পৃথিবীতে ক্ষুধার কোনো রাজত্ব থাকার কথা ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন এমন একটি সমাজ, যেখানে মানুষ তার পরিশ্রমের মর্যাদা পাবে, কোনো শিশু খাবারের অভাবে কাঁদবে না এবং মানুষের জীবন হবে আরও সুন্দর ও ন্যায়ভিত্তিক। কিন্তু সেই স্বপ্নের পৃথিবী নিজের চোখে দেখার সময় তিনি পাননি। মাত্র বিশ বছর বয়সে, ১৩ মে ১৯৪৭ সালে যক্ষ্মায় তার মৃত্যু হয়। জীবন থেমে গেলেও তার কবিতার স্বপ্ন থামেনি। ছোট্ট বন্ধুরা, সুকান্তের ক্ষুধার রাজ্য আসলে কোনো কল্পনার রাজ্য নয়। এটি ছিল এমন এক পৃথিবীর প্রতিচ্ছবি, যেখানে মানুষ বেঁচে থাকার জন্য প্রতিদিন সংগ্রাম করে। আর তার কবিতা সেই অন্ধকারের মধ্যেও একটি নতুন সকালের স্বপ্ন দেখায়। তোমরা যখন সুকান্তের কবিতা পড়বে, তখন শুধু ছন্দ বা শব্দের সৌন্দর্য খুঁজবে না। তার ভেতরে থাকা মানুষের মুখটিও দেখতে চেষ্টা করবে। হয়তো তখন বুঝতে পারবে, একজন সত্যিকারের কবি শুধু নিজের কথা বলেন না, তিনি কথা বলেন সেসব মানুষের জন্য, যাদের কণ্ঠ অনেক সময় কেউ শুনতে পায় না।