সরকারের ৬ মাসের মূল্যায়ন জামায়াতের

ফ্যাসিবাদের পথে হেঁটে মোটাদাগে ব্যর্থ হচ্ছে সরকার –মিয়া গোলাম পরওয়ার


২০ আগস্ট ২০২৬ ১০:২১

স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, জুলাই সনদের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হয়েছে। সরকার গণভোটের রায় কার্যকর করেনি, বরং প্রত্যাখ্যান করেছে। এটি সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। গণভোট নিয়ে সরকারের এমন অবস্থানে জাতি ও গোটা বিশ্ব বিস্মিত। সরকার গঠনের পর ছয় মাসের কার্যক্রম ও গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না করে বিএনপি ফ্যাসিস্টের পথে হাঁটছে।
গত ১৮ আগস্ট মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় রাজধানীর মগবাজারস্থ আল-ফালাহ মিলনায়তনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ‘বিএনপি সরকারের ৬ মাসের মূল্যায়ন’ নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি, জাতীয় সংসদের হুইপ সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ (সাবেক এমপি) ও মাওলানা আবদুল হালিম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এমপি, আবদুর রব ও এডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মুহাম্মদ জাহিদুর রহমান, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের প্রচার সেক্রেটারি আতাউর রহমান সরকার প্রমুখ।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সমাধানে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের ৪০ শতাংশ উৎপাদন কমে গেছে। প্রায় ২০ হাজার শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। সমস্যা সমাধানে বিরোধীদল সরকারকে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা দিলেও তা বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেয়নি তারা।
তিনি বলেন, সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় দলীয় লোক নিয়োগ করছে। সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদগুলোয় সরকারি আমলা যারা প্রশাসনের দায়িত্বে ছিলেনÑ তাদের সরিয়ে দলীয় লোক নিয়োগ দিয়েছে। অথচ সরকারের উচিত ছিল নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়িত্বে বসানো। তারা দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় দলীয় ভিসি নিয়োগ করেছে।
তিনি আরও বলেন, সরকারি চাকরিতে যোগদানের জন্য এখন আর যোগ্যতা, মেধা, পরীক্ষা আর ভাইভার দরকার হয় না, বিএনপি করলেই যোগ্যতা। সরকারি অফিসগুলো যেন এখন বিএনপি নেতাকর্মীদের পুনর্বাসনের কেন্দ্র হয়েছে। ক্যাম্পাসগুলোয় শৃঙ্খলা আনতে পারছে না সরকার। কারণ দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া ভিসিরা নগ্নভাবে ছাত্রদলকে সমর্থন দিচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনে সরকার চরম নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। ফলে ক্যাম্পাসগুলোয় ছাত্রদল ক্রমেই সহিংস হয়ে উঠছে।
তিনি আরও বলেন, গত ছয় মাসের অর্থনৈতিক সূচক, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের বর্তমান পরিস্থিতি এবং সামগ্রিক অর্থনীতির চালচিত্র বিশ্লেষণ করে বিএনপি সরকারের মেয়াদের প্রধান অর্থনৈতিক সংকট ও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার সংকট, ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট ও খেলাপি ঋণ, বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা, রাজস্ব ঘাটতি ও ব্যাংক নির্ভর ঋণ গ্রহণ, ডলারের বিনিময় হার এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও পণ্যের দামের অস্থিরতার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ধারাবাহিক চাপ অব্যাহত রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ ও রফতানি কমছে এবং প্রবৃদ্ধি তলানিতে নেমেছে।
তিনি বলেন, বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কমেনি; বরং চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেট, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিত্যপণ্য ও ভোগপণ্যের দাম বেড়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ। দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ এখন খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায়। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখার ষড়যন্ত্র চলছে। নির্বাচন কমিশন এ-সংক্রান্ত একটি বিধি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কথা জানিয়েছে। আইন পাস করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি নির্দেশনা জারির জন্য কোনো কোনো জায়গা থেকে সরকারকে চাপ দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। চাকরিবিধি মেনে রাজনীতি করার প্রত্যেক নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের রাজনীতি করতে না দেয়ার মতো আইন বা বিধি সরাসরি সংবিধানবিরোধী।
তিনি বলেন, বিরোধীদলের এমপিদের ওপর সরকারদলীয় সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিদের বসিয়ে দেয়া হয়েছে তদারকির জন্য। এটি সংবিধানবিরোধী কাজ। বিরোধীদলের সংসদ সদস্যরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত। তাদের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে না। সরকারদলীয় নারী এমপি যারা সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দা নন, তারা নির্বাচিত এমপিদের কাজে হস্তক্ষেপ করছেন এটি সংবিধান বিরোধী এবং এমপিদের অধিকারের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ।
গোলাম পরওয়ার বলেন, জনপ্রশাসনে সৎ মানুষ যারা সরকারের মতাদর্শের অনুসারী নন, তাদের ওএসডি করা হচ্ছে, পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে না ও অহেতুক বদলি করা হচ্ছে। সরকার ফ্যাসিবাদী আমলের পথে হাঁটছে। সরকারি প্রশ্রয়ে ফ্যাসিবাদের অনুসারী আমলাদের পদায়ন হচ্ছে, প্রমোশন পাচ্ছেন। তাদের ছত্রছায়ায় বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগ রাজনীতি করার সুযোগ পাচ্ছে।
সরকারের ইতিবাচক দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, রিজার্ভের দৃশ্যমান স্থিতিশীলতার পিছনে সম্পূর্ণ প্রবাসীদের হাড়, রক্ত ও ঘাম ঝড়িয়ে দেশে পাঠানো রেমিট্যান্সের অবদান। এতে সরকারের কোনো কৃতিত্ব নেই। সরকারের সব বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ে শুধু ব্যর্থতার চিত্র দেখা যাচ্ছে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, আমরা চাই না সরকার ব্যর্থ হোক। তবে সরকারের জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিরোধীদল সংসদে ও রাজপথে সোচ্চার, সরব থাকবে। সংসদ ও সংসদের বাইরে আমরা দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করব। আমরা এভাবে সরকারকে সহযোগিতা করতে চাই। আমরা হরতাল কিংবা জ্বালাও-পোড়াওয়ের পথে হাঁটছি না। এটিই সরকারের প্রতি আমাদের সহযোগিতা।
তিনি আরও বলেন, গণভোটের গণরায় না মানার বিষয়ে জনগণের কাছে সরকারকে জবাব দিতে হবে। কিছু কিছু মিডিয়া এক ধরনের তোষণ নীতির মধ্যে রয়েছে। বর্তমানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নেই, এজন্য সত্য লিখতে পারছে না। মিডিয়া সত্য তুলে ধরবে, এটি আমাদের প্রত্যাশা। মোটাদাগে বলতে গেলে বিএনপি সরকার ফ্যাসিস্টের পথে হাঁটছে।
লিখিত বক্তব্য শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর এখন পর্যন্ত আমাদের ৬ জন ভাইকে হত্যা করে শহীদ করা হয়েছে। আমাদের এমপিদের ওপর হামলা চালাচ্ছে সরকারি দলের নেতাকর্মীরা। হেলমেট পড়ে ফ্যাসিবাদী কায়দায় হামলা চালানো হচ্ছে। আমরা রাজনীতিতে সংঘাত চাই না। দেশকে শান্তির দিকে নিতে চাই। আমাদের নেতাকর্মীদের ধৈর্যধারণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তবে সরকার ফ্যাসিবাদের পথে হেঁটে মোটাদাগে ব্যর্থ হচ্ছে। আমরা সরকারের ৬ মাসের কাজের মূল্যায়ন করলাম। সরকারের চূড়ান্ত সফলতা ব্যর্থতার ৫ বছর পর নির্ণয় করব। তবে তারা যে জনগণকে দেয়া ওয়াদা থেকে সরে যাচ্ছে বিরোধীদল হিসেবে তা আমরা সংসদে ও সংসদের বাইরে বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি।