বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগে তোষণনীতির পদক্ষেপ

আন্দোলনের মুখে সরকারের ‘ঢাকঢাক গুড়গুড়’


২০ আগস্ট ২০২৬ ০৯:৫৯

॥ আবু জায়েদ আনসারী ॥
দিনক্ষণ গুনে মূল্যায়ন শুরু হয়েছে বিএনপি সরকারের। মাত্র ৬ মাসে বিতর্ক ও সমালোচনায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে সরকার। নাগরিকদের অধিকারের সুরক্ষা ও নাগরিক সেবা, তরুণ প্রজন্মের আকাক্সক্ষা কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পারছে- এসবও তুলনামূলক পর্যালোচনা চলছে নানা মহলে। অন্তর্বর্তী সরকারের হাত থেকে ক্ষমতা গ্রহণের পর সংস্কারমূলক কাজগুলোয় হাত দেয়নি সরকার। বরং সরকার জনআকাক্সক্ষার পরিপন্থী অনেক উদ্যোগ নিয়েছে বলে অভিযোগ বিরোধী শিবির ও বিশ্লেষকদের। এসব সমালোচনার যথাযথ জবাবও যেমন পরিষ্কার নয়, তেমনি আছে লুকোচুরি, তোষণনীতি কিংবা ভিন্ন গল্পের অবতারণা। সরকারের দৃশ্যমান এমন গতিধারাকে অনেকে বলছেন ‘ঢাকঢাক গুড়গুড়’ নীতি।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও কলেজগুলোয় সরকারের শিক্ষা বিভাগের একটি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও মিছিল করেছেন শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের সূত্রপাত বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্কুল ও কলেজে শিক্ষক ও প্রভাষক নিয়োগের প্রক্রিয়া ইস্যুতে। বিদ্যমান নিয়মানুযায়ী, বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ এ কাজটি করে আসছে। ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এনটিআরসিএ প্রথমে শুধু নিবন্ধন পরীক্ষা নিত। ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে শূন্য পদের বিপরীতে নিবন্ধনধারীদের নিয়োগের সুপারিশ শুরু করে সংস্থাটি। অনেকটা সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) আদলে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় গত এক দশকে ১ লাখ ৭৭ হাজার ৫৭১ জন শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। বিদ্যমান নিয়মানুযায়ী, এনটিআরসিএ’র সুপারিশ ছাড়া এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ নেই। এ পদ্ধতির আগে ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের করুণ চিত্র সম্প্রতি গণমাধ্যমের একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, দেশের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় গণিত ও ইংরেজি পড়ানো শিক্ষকদের অধিকাংশ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক-স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী নয়। চলতি বছরের এসএসসিতে ফল বিপর্যয়ের পর এই তথ্যটি উঠে আসে। এদিকে বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্যানুযায়ী, দেশের মাধ্যমিক স্তরের বিদ্যালয়গুলোয় গণিত শিক্ষকের সংখ্যা ৬৪ হাজার ১৪৭ জন। এর মধ্যে গণিতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী আছেন মাত্র ১৩ দশমিক ২২ শতাংশ। অর্থাৎ গণিতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ছাড়াই শিক্ষার্থীদের বিষয়টি শেখাচ্ছেন ৮৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ শিক্ষক। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ার পেছনে আগের তথা ম্যানেজিং কমিটির নিয়োগ প্রক্রিয়া জড়িত। এনটিআরসিএ এই জায়গায় বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করেছে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিবন্ধনসাপেক্ষে নিয়োগ চূড়ান্ত করছে এনটিআরসিএ। এনটিআরসিএ শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে, তার জ্বলন্ত উদাহরণও রয়েছে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর জনআকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের কথা বলে বিএনপি সরকার গঠন করলেও মাত্র ৬ মাসের মাথায় ‘তাল গাছটি আমার’ নীতির পথে হাঁটা শুরু করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৩ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৪টায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সভাকক্ষে এনটিআরসিএ কর্তৃপক্ষের সাথে একটি বৈঠক করে শিক্ষামন্ত্রী ড. এহসানুল হক মিলন এমন একটি রেজ্যুলেশন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ছড়িয়ে পড়া ওই বৈঠকের কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ আইন-২০০৫’ অনুযায়ী এনটিআরসিএ’র কাজ হবে নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন করা। ২০১৫ সালের পরিপত্র অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি আর শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করবে না বলেও সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এছাড়া ১৮তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৯ হাজার ৮৪২ জনকে তাদের পছন্দ অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথাও কার্যবিবরণীতে উল্লেখ রয়েছে। এজন্য প্রয়োজনীয় পরিপত্র বা প্রজ্ঞাপন সংশোধন বা জারির কথাও বলা হয়েছে। বৈঠকে এমন সিদ্ধান্তের পর সারা দেশে শুরু হয় আন্দোলন, প্রতিক্রিয়া দেখায় প্রধান বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামী, ১১ দলের অন্যতম শরীক রাজনৈতিক দল এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজ। এই উদ্যোগকে সরকারদলীয় লোকদের সুবিধা দিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অতিমাত্রায় দলীয়করণ ও মেধাকে অবমূল্যায়ন করার একটি হীন কৌশল বলে অভিহিত করেন সচেতন নাগরিকরা। সরকার এর মাধ্যমে ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে দাবি তাদের।
ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রতিক্রিয়া
এনটিআরসিএ’র পরিবর্তে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ ছাত্রপক্ষ, ইসলামী ছাত্র আন্দোলনসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন। এছাড়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বেশিরভাগ ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ যৌথ বিবৃতিতে সরকারের এমন সিদ্ধান্তের নিন্দা জানান। তারা শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির হাতে ন্যস্ত করার সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী ও নীতিবিবর্জিত বলে অভিহিত করেন। তারা দাবি করেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ পর্যায়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা স্থানীয় ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে পুনরায় ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে নানাবিধ সংকটে জর্জরিত শিক্ষাব্যবস্থার কফিনে শেষ পেরেক ঠোকা হবে। তারা আরও বলেন, ‘এনটিআরসিএ’র বর্তমান পদ্ধতিতে দূরবর্তী কর্মস্থলে পদায়ন বা প্রশাসনিক ধীরগতির মতো কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা থাকতে পারে। এসব সমস্যার সমাধান নিয়োগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, সুনির্দিষ্ট বদলি নীতিমালা প্রণয়ন এবং মেধাক্রম অনুযায়ী দ্রুত নিয়োগের মাধ্যমে করা সম্ভব। কিন্তু তা না করে নিয়োগের মূল ক্ষমতা পুনরায় স্থানীয় ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হলে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের সুযোগ তৈরি হবে। এতে মেধাবী ও যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হবেন এবং শিক্ষাব্যবস্থার মান আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একজন অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগের ক্ষতি শুধু একজন যোগ্য প্রার্থীর অধিকার হরণে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও ভবিষ্যতের ওপর।’
গত সোমবার (১০ আগস্ট) রাতে তীব্র বৃষ্টির মধ্যেও বিক্ষোভ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নেতারা। বিক্ষোভ সমাবেশে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, এনটিআরসিএ’র পরিবর্তে ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত বাতিল না হলে জুলাই আন্দোলনের চেয়েও শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। শিক্ষার্থী ও বেকার যুবকদের স্বার্থবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া হবে না বলেও জানান তিনি। বলেন, চাকরি হতে হবে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে। কোনো ধরনের রাজনৈতিক পরিচয়, স্বজনপ্রীতি কিংবা অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ মেনে নেওয়া হবে না।
শিক্ষক নিয়োগে ম্যানেজিং কমিটির ক্ষমতা বাড়ানো হলে আবারও স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম ও অর্থের বিনিময়ে নিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি নাজমুল হাসান। একই ধরনের মত দেন বাংলাদেশ ছাত্রপক্ষের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি আকিব হাসান। তার দাবি, এনটিআরসিএ’র মাধ্যমে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগের যে প্রক্রিয়া বাতিল করে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে নিয়োগের ক্ষমতা ফিরিয়ে দিলে শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ, তদবির, রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বজনপ্রীতির সুযোগ তৈরি হবে।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়াটি এনটিআরসিএ থেকে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির হাতে দেয়ার সরকারি উদ্যোগের বিষয়ে যখন আন্দোলন চলছে, ঠিক তখন ছাত্রদল এটিকে গুজব বলে উড়িয়ে দিয়ে শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানায়। শিক্ষামন্ত্রীও তার ফেসবুক পোস্টে বিরোধী শিবিরের ওপর দায় দিয়ে এটিকে গুজব আখ্যা দেয়। অন্যদিকে বিষয়টিকে গুজব বলে আখ্যায়িত করে অপতথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির এক ফেসবুক পোস্টে বলেন, এ পর্যন্ত ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি।
শিক্ষামন্ত্রী ও ছাত্রদল বিষয়টি নিয়ে ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করলেও ফেস দ্য পিপলস’র সাংবাদিক সাইফুর সাগর আগেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এ সংক্রান্ত বৈঠকের রেজ্যুলেশন প্রকাশ করেছেন। এনটিআরসিএর একটি বিশ্বস্ত সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তারা এ বিষয়ে বিব্রত বলেও জানান। তবে কে রেজ্যুলেশনটি ফাঁস করেছেন, তা তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এনটিআরসিএ সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ আগস্টের বৈঠকে শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় থেকে এনটিআরসিএতে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। ফলে কার্যবিবরণীতে সিদ্ধান্তের কথা থাকলেও সেটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়নের পর্যায়ে যায়নি বলেই সংশ্লিষ্টরা জানান।
ম্যানেজিং কমিটির নিয়োগের ক্ষমতার স্বচ্ছতায় প্রশ্ন
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা স্থানীয় প্রভাবশালী তথা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির হাতে থাকার অভিজ্ঞতা খুব ভালো বলার সুযোগ নেই। বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে সমস্যাগুলোর সৃষ্টি হয় বলে অতীত রেকর্ড রয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় নিয়োগে স্বচ্ছতা থাকে না, দলান্ধতা থাকে, স্বার্থের দ্বন্দ্ব, শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিত হয় না, মেধাবীদের সুযোগ রুদ্ধ হয় এবং স্থানীয় সংঘাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রাজনীতিকরণ হয়। ম্যানেজিং কমিটির হাতের ক্ষমতা থাকলে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট যে আছে, তার প্রমাণ আমরা অতীতে দেখতে পেয়েছি। ২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার দারিয়াপুরে কলেজ পরিচালনা পরিষদের কমিটি গঠন নিয়ে স্থানীয় বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষে অন্তত ১৫ জন আহত হন। ২০২৫ সালের ২৩ মার্চ কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে কলেজ পরিচালনা কমিটি নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষের জেরে আশিক (১৯) নামে এক যুবক নিহত হন। উপজেলার চাতল বাগহাটা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অ্যাডহক কমিটি গঠনের জন্য সভাপতি হিসেবে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক নুরুজ্জামান চন্দন, এডভোকেট আলী হায়দার বাবলু ও বিএনপি নেতা হান্নান সরকার এই তিনজনের নাম উল্লেখ করে বোর্ডে প্রস্তাব পাঠানো নিয়ে নুরুজ্জামান চন্দন ও আলী হায়দার বাবলুর মধ্যে মতবিরোধ ছিল বলে জানা যায়। ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর রোববার বিকেলে যশোরের বেনাপোল ডিগ্রি কলেজ পরিচালনা কমিটি নিয়ে স্থানীয় বিএনপির দুই পক্ষের নেতা-কর্মীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও তিনটি ‘ককটেলের’ বিস্ফোরণ করা হয়। ২০২৫ সালের ১৫ মে পাবনার আটঘরিয়ায় একটি কলেজের অভিভাবক সদস্য পদে মনোনয়ন ফরম তোলা নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এর মধ্যে যদি আবার নিয়োগ প্রক্রিয়া ফেরে, তাহলে অবস্থা কী দাঁড়াবে তা সহজে অনুমেয়।
সরকার কী অর্জন করতে চায়
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির হাতে দেয়ার মধ্য দিয়ে সরকার কী অর্জন করতে চায়, তা স্পষ্ট নয়। এর আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি হওয়ার জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতার যে বাধ্যবাধকতা ছিল, তা বিএনপি সরকার তুলে দিয়েছে, যা নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। বিদ্যমান প্রক্রিয়ায় যথাযথ পরীক্ষার মাধ্যমে শুধুমাত্র মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এটির ব্যত্যয় হলে দলীয়করণ, অর্থের লেনদেন, স্বজনপ্রীতির ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে। এতে বিএনপি নেতাকর্মীরা কিছুটা লাভবান হলেও শিক্ষাব্যবস্থায় ধস নামবে, জাতীয়ভাবে বড় ধরনের ক্ষতি হবে, মেধাবীরা হবে বঞ্চিত, বাড়বে স্থানীয় কোন্দল ও সহিংসতা- এমন সব অভিযোগ ও সতর্কবার্তা এসেছে বিরোধী শিবির থেকে।
সরকারের ‘ঢাকঢাক গুড়গুড়’
একটি জাতির ওপর আধিপত্যবাদী শক্তি চেপে বসে শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংসের মাধ্যমে। ইতোপূর্বে বাংলাদেশ এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে। এ কথাটিই জাতিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। গত ৭ আগস্ট গাজীপুরে দলীয় বৈঠকে তিনি বলেন, আধিপত্যবাদী শক্তি জাতিকে বিভক্ত করে রেখেছে। তারা এ কাজটি করছে সংস্কৃতি ও ভাষাকে ধ্বংস করার মাধ্যমে। সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের বড় হাতিয়ার মিডিয়ার মাধ্যমে এটি করে চলেছে। একইসঙ্গে এমপিওভুক্ত শিক্ষক নিয়ে সরকারের উদ্যোগের কড়া সমালোচনা করে আসছে দলটি। দলটির শিক্ষকদের সংগঠন আদর্শ শিক্ষক পরিষদের প্রধান উপদেষ্টা ও নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি নেতাকর্মীদের সাথে বৈঠক করেছেন সরকারের এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দিকে গেলে করণীয় ঠিক করতে। বৈঠক শেষে দেয়া এক বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছেন কড়া আন্দোলনের প্রস্তুতির বিষয়ে। একইভাবে সরকার বিরোধী সব পক্ষও একই সুরে কথা বলছেন এ ইস্যুতে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকারের উচিত এনটিআরসিএর নিয়োগদানের ক্ষমতাকে কেড়ে না নিয়ে কাঠামোগত সংস্কার বা বিদ্যমান দুর্বলতা দূর করা। শিক্ষকদের নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রে দূরত্ব, শিক্ষকদের আবাসন সংকটসহ অন্য সমস্যাগুলো দূর করে মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় নিযুক্ত করা। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দক্ষ ও সুনাগরিক এবং জনসম্পদে পরিণত হবে। একইসঙ্গে শিক্ষার মানোন্নয়নে নজর দিতে শিখন পদ্ধতিরও সংস্কারের বিষয়টি ভাবা দরকার বলে মত তাদের।