৩৬ জুলাই : বিপ্লব, নাকি অভ্যুত্থান?
১৯ আগস্ট ২০২৬ ২১:১২
॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
দীর্ঘ দুই বছর কাটলেও আমরা আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ পাইনি। এখনো বলা হয়, আমরা বিপ্লক করিনি। হয়েছে অভ্যুত্থান। যদি তাই হয়ে থাকে, তবে বিপ্লবের কিছু অংশ আর অভ্যুত্থানের কিছু অংশ দিয়ে জগাখিচুড়ি করে পথ চলছে। ছাত্র-জনতার বিপ্লবের ঢল সামনে নিয়ে যদি শহীদ মিনারে আমাদের সরকার গঠিত হতো তবে এই বিপ্লব আর অভ্যুত্থানের কথা আসতো না। অভ্যুত্থান হয় গুটিকয়েক লোকের সমন্বয়ে এক রেজিমকে সরিয়ে আরেক রেজিম ক্ষমতায় আসে। জুলাই ৩৬ বিপ্লব কিন্তু ঘটেছে গোটা ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে দেশবিরোধী সকল ক্ষেত্রে ইনসাফ কায়েমের আন্দোলনে। তাই স্বৈরাচার কর্তৃক নিয়োগকৃত প্রেসিডেন্টের কাছে শপথ পড়া মোটেই যুক্তিসঙ্গত হয়নি। শুধু তাই নয়, স্বৈরাচার কর্তৃক নিয়োগকৃত প্রেসিডেন্টকে দীর্ঘদিন স্বপদে বহাল রেখে বিএনপি মারাত্মক ভুল করেছে। যদিও শেষ পর্যন্ত তাকে বিদায় দিতে বাধ্য হয়েছে। সময়ের কাজ সময়ে না করলে ক্ষতি যা হওয়ার, তা হয়েই গেছে। বর্তমান সরকার ও তার দোসররা জুলাই ৩৬ বিপ্লবে সক্রিয় ছিল না। পরে বাধ্য হয়ে এ আন্দোলনে শরিক হয়। অনেকে জেলে যায়। তার মধ্যে রুহুল কবির রিজভী অন্যতম। আমার সাথেও তার দেখা হয়েছে জেলে।
বিপ্লব ঘটানোর কয়েকদিন পূর্বে তৎকালীন বিএনপি মহাসচিব প্রকাশ্য জনসমাবেশে বলেই ফেললেন যে, ছাত্রদের আন্দোলনে আমরা নেই। রাখঢাক করে নয়, প্রকাশ্যে জনসমাবেশে তিনি বলেন, এ ছাত্র আন্দোলনে তিনি বা তারা বিপ্লবের সাথে নেই। ফল পাকলে সবাই পাকা ফলের প্রতি আগ্রহ দেখায়। বিএনপিরও সেই দশা। কীভাবে দ্রুত নির্বাচনের জন্য জুলাই সনদে প্রতারণার মাধ্যমে সই-স্বাক্ষর করল। তা তো মন্ত্রী সালাহউদ্দিন প্রকাশ্যে সংসদে বলেই দিলেন, তারা নির্বাচন দ্রুত করার জন্য জুলাই সনদে প্রকাশ্য জনসম্মুখে সই-স্বাক্ষর করেছিল। এখন তারা আর জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে চায় না। এটি প্রকাশ্যে জনগণের কাছে প্রতারণার শামিল। জনগণ নেতাদের প্রতারক হিসেবে দেখতে চায় না।
জাতীয় নির্বাচন আর গণভোট একসাথে করার ব্যাপারেও বিএনপি বলে যে, দুই ভোট একসাথে হবে। ঠিকই দুটি ভোট আমরা দিলাম এক জাতীয় সংসদের প্রার্থীদের ১টি ভোট আর জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য আরেকটি ভোট। তারেক রহমানও প্রকাশ্যে জনসভায় এ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার জন্য জনগণকে আহ্বান করেছিলেন। যথাযথভাবে ভোট পর্ব হয়ে গেল। যার যার পছন্দমতো জনগণ তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিল আর ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে জুলাই সনদের পক্ষে ভোট দিল। প্রায় ৭০%। জনগণ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে জানান দিল, জুলাই সনদের প্রতিটি পদক্ষেপ তারা কার্যকর করতে চায়। যেভাবেই হোক, সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের কারণে বিএনপি এখন আর জুলাই সনদ ও গণভোটের দাবি মানতে অস্বীকার করছে, যেটা প্রকাশ্যে জনগণের সাথে বেঈমানী ছাড়া কিছু নয়। ছাত্র-জনতা কিন্তু পূর্বের তুলনায় অনেক সচেতন, তাই তাদের এই প্রকাশ্যে বেঈমানীর খেসারত দিতে হবে। দেশের নতুন সরকারের মাত্র ৬ মাস গেল। কোনো বিভাগেই কিন্তু সুবাতাস নেই। বিশেষ করে প্রাত্যহিক প্রয়োজন বিদ্যুৎ ও গ্যাস জনগণ পাচ্ছে না। মন্ত্রীরাও কোনো আশ্বাস দিতে পারছে না। কবে বিদ্যুৎ ও গ্যাস জনগণের ব্যবহারের জন্য স্বাভাবিক হবে। এই ছয় মাসেই কিন্তু মন্ত্রী ও তাদের দোসরদের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দুর্নীতির ফিরিস্তি বেড়েই চলছে। ছোট-খাটো বদলি থেকে শুরু করে সেক্রেটারি লেভেলে; এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগ, বিদেশে দূতাবাসে লোক নিয়োগের ব্যাপারে বড় বড় পরিমাণ লেনদেন হচ্ছে; যা নাকি এখন প্রকাশ্যেই চলছে। তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
আমাদের আলোচনার বিষয় হলো বিপ্লব নাকি অভ্যুত্থান। আমি বলব, অবশ্যই জুলাই ৩৬ ছিল একটি সার্বিক বিপ্লব। আমরা মাঠে-ময়দানে ছিলাম। নারী তার কোলের শিশুকে নিয়ে বিপ্লবের মিছিলে যোগ দিয়েছে। এক নারী তো বলেই ফেলল, সামনে স্বাধীনতা, পেছনে পুলিশ- আমরা কোথায় যাব। তারা সেদিন বিপ্লবের আকাক্সক্ষায়ই মাঠে নেমেছিল বৈষম্য দূরীকরণ আর সর্বক্ষেত্রে ইনসাফ কায়েম করতে। আমরা ৬ মাসে এর বাস্তবায়ন দেখিনি। সব বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় লোক নিয়োগ, জেলা, পৌরসভায় প্রকাশসক নিয়োগ। সর্বক্ষেত্রেই দলীয় লোক নিয়োগ হচ্ছে। দেখার কেউ নেই। বিপ্লব হলে বা বিপ্লবী সরকার হলে তাদের সামনে থাকতো দেশের জনগণের স্বার্থে কাজ করা এবং সব ক্ষেত্রে ইনসাফ কায়েম করা। কিন্তু বিপ্লবী সরকার না হওয়ায় গতানুগতিকভাবে দেশ চলছে। আমরা নির্বাচিত সরকার হয়েও সর্বক্ষেত্রে পূর্বের স্বৈরাচারের দোসররা বিভিন্ন বিভাগে ওত পেতে বসে আছে। নেতা ও মন্ত্রীদের প্রশংসা করে তাদের পদে বহাল থেকে স্বৈরাচারের নেয়া পদক্ষেপের গুণাগুন গাইছে। আমরা চাই সর্বক্ষেত্রে স্বৈরাচারমুক্ত প্রশাসন এবং সর্বক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনে ন্যায়, ইনসাফভিত্তিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন। প্রয়োজনে বিরোধীদলের লোকদেরও সম্পৃক্ত করে ইনসাফভিত্তিক সমাজ গড়ার কাজ করা যা জুলাই ৩৬-এর ছাত্র-জনতার বিপ্লবে উচ্চারিত হয়েছিল। ১৮ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ। প্রায় ৭০% শিক্ষিত। তাই ধোঁকা দিয়ে দেশ চালানোর কোনো সুযোগ নেই। জবাবদিহি আনতেই হবে। যার যার কাজের জবাবদিহি করতে হবে। ভালো কাজের ফল ভালো হবে আর মন্দ কাজের তিরস্কার মেনে নিতে হবে। সাম্প্রতিককালে কয়েকটি দেশে বিপ্লব হয়েছে। যেমন সিরিয়া। মাত্র ১২ দিনের আন্দোলনের মুখে স্বৈরাচার সরকারের পতন হয়েছে। বিপ্লবী সরকার হয়েছে। তাই তো দেশ ভালো চলছে। কয়েকদিন পূর্বে নেপালে ৩৬ বছরের যুবকের নেতৃত্বে বিপ্লবী সরকার গঠন করে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা অনুযায়ী দেশ চালাচ্ছে। থাইল্যান্ডেও বিপ্লবী সরকার দেশ চালাচ্ছে। তাই ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর আকাক্সক্ষা থাকে বিপ্লবী সরকারের দাবি। এক্ষেত্রে আমরা ভুল করেছি বিপ্লবী সরকার গঠন না করে। স্বৈরাচার হাসিনার নিয়োগকৃত এস আলমের দোসর সাহাবুদ্দিনের কাছে শপথ নিয়ে বিপ্লবের আশা-লক্ষ্য চুরমার করে দিয়েছিল এই বিএনপির কিছু স্বার্থান্বেষী নেতা।
বিএনপিতে ভালো লোকের অভাব নেই। শহীদ জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়ার আদলে দেশ চালাতে পারলে এই দেশ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভালো মানুষের দেশ গড়ার। আমরা তারেক রহমানকে আহ্বান জানাব- আপনার বাবা-মায়ের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আমাদের এইমাতৃভূমিকে সঠিক পথে চালানোর ব্যবস্থা করেন।
প্রতিবেশী দেশ আমাদের পাশে কখনো বন্ধু হিসেবে দাঁড়ায়নি। ’৭১ সালে একটি মুসলিম দেশকে ভাঙার স্বার্থে তারা কাজ করেছে, যা কয়েকদিন পূর্বে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী তাদের সংসদে সরাসরি বলেছেন, তার দাদি একটি মুসলিম দেশকে ভাঙার জন্য পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা করার চেষ্টা করেছিল এবং তাদের দৃষ্টিতে সফলও হয়েছিল। কারণ পাকিস্তানিদের ফেলে যাওয়া সমস্ত সামরিক সরঞ্জাম তারা ভারতে নিয়ে গেছে। একথা বলতে গিয়ে মেজর জলিলকে গ্রেফতার হতে হয়েছে। যিনি রণাঙ্গনের যোদ্ধা ছিলেন। আমরা কখনোই দেখিনি ভারত আমাদের প্রতিবেশী, কিন্তু তাদের স্বার্থ ছাড়া আমাদের কোনো সহযোগিতা করেনি বা করবেও না। বিষয়টি আমাদের নেতারা যত দ্রুত বুঝবেন, ততই দেশের জন্য কল্যাণ হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর আমার কাছে রিস্ক মনে হয়। স্বৈরাচার হাসিনা এখনো হুঙ্কার দেয় দেশে ফিরে আসবে, যা কোনোদিনও সম্ভব হবে না। পালানোরা দেশে ফিরে এলে জনগণ তাকে গ্রহণ করবে না। গত ১৫ আগস্ট তাদের হুমকি-ধমকি কোনো কাজে আসেনি। কোথাও কোনো মিটিং-মিছিল চোখে পড়েনি। যে দেশে স্বৈরাচার হাসিনার সাথে পালিয়ে গেছে মন্ত্রী, এমপি, বিচারপতি, এলাকার স্থানীয় সরকারের নেতা ও বায়তুল মোকাররমের ঈমাম পর্যন্ত। তারা জনগণের কত ক্ষতি করেছিল যে জনগণের মুখোমুখি হওয়ার সাহস তাদের নেই।
তাই আমাদের সাহসের সাথে সরকারি দল-বিরোধীদল একসাথে স্বৈরাচার হাসিনার দোসরদের প্রশাসনে সর্বক্ষেত্র থেকে সরাতে হবে। তারা গোপনে এখনো স্বপ্ন দেখে, তাদের সেই কুখ্যাত সুদিন আবার ফিরে আসবে; যা কোনোদিনই সম্ভব নয়।
নিত্যপণ্য, জ¦ালানি, গ্যাস, নিত্যপণ্য উস্তা, পটোল, মুলা সবই ৮০ টাকার নিচে নেই। এসব সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজারের মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃত্রিম উপায়ে দাম বাড়াচ্ছে। এক্ষেত্রে বাজার মনিটরিং করা অতি প্রয়োজন। মানুষের নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যবহার্য জিনিসের দাম নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে হম্বি-তম্বি করে হুমকি দিয়ে জনগণের মন পাওয়া যাবে না। তারেক রহমানের আশপাশের লোকেরা যতই তাকে বুদ্ধি দিক, বিরোধীদলকে খাটো করতে পারলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। সেদিন ভুলে যেতে হবে। বর্তমানের বিরোধীদল অত্যন্ত ঈমানদার এবং জনবান্ধব দল। ছাত্রদের মধ্যেও ডাকসু থেকে শুরু করে চাকসু, জগসু, রাকসু, জাগসু সর্বক্ষেত্রে ইসলামী ছাত্রশিবিররর প্যানেলে জিতে তারা ছাত্রবান্ধব পরিবেশ করার চেষ্টা করছে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। হলে আদুভাইদের খাওয়া নেই, হল-বাণিজ্য নেই, গণরুম নেই। ছাত্রদের বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া, খাওয়ার মান, পড়াশোনার মান বাড়ানোর জন্য চেষ্টা করছে। আমরা আশা করি, হলগুলোয় যদি লেখাপড়ার মান ঠিক হয়ে যায়, তবে জুলাই ৩৬-এর আকাক্সক্ষার আলোকে দেশ এগিয়ে যাবে, কোনো সন্দেহ নেই। মহান আল্লাহ আমাদের কাজে বরকত দেবেন, ইনশাআল্লাহ।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : rnabi1954@gmail.com