জনগণের দুর্ভোগ ও নিজেদের ব্যর্থতাকে ঢাকতে সরকার বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে : মিয়া গোলাম পরওয়ার
১৬ আগস্ট ২০২৬ ২০:৪০
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সিন্ডিকেট করে লুটপাটের মার্কেট করে রেখেছে সরকার। এগুলো বন্ধ করে কত হাজার কোটি টাকা বাঁচানো যায়, সেদিকে সরকারের নজর নেই। তাদের নজর বিরোধীদলের আন্দোলনের দিকে। গণভোটের গণরায় কার্যকর না করে তো উপায় নেই। সেজন্য জনগণের এই দুর্ভোগ ও নিজেদের ব্যর্থতাকে ঢাকতে সরকার বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
আজ ১৬ আগস্ট রোববার সন্ধ্যা ৭টায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসন এবং জনদুর্ভোগ লাঘবে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের বক্তব্য তুলে ধরে তিনি এসব কথা বলেন। জরুরি সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন তিনি।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, হাজার হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস করা হয়েছে। সরকার ইমারজেন্সি খাতে টাকা নিয়ে সমস্যা সমাধান করতে পারে । সমস্যা সমাধানে দশ বছরের অযুহাত না দেখানোর আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, সংকট সমাধানে দীর্ঘ সময়ের কথা বলে জনগণকে শান্ত করা যাবে না। জরুরি ভিত্তিতে যেকোনো সরকার জনগণের দুর্ভোগ দূর করার জন্য অনেক পদক্ষেপ নিতে পারে। সরকার বিদ্যুতের অবৈধ লাইন বন্ধ করতে পারে, ভুতুড়ে বিল বন্ধ করতে পারে, কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ প্লান্টের ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে, এগুলো বন্ধ করুন।
বিদ্যুতের সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের বক্তব্যের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সমস্যা সমাধানের বিষয়ে তারা কেউ ১০ বছরের কেউ ২ বছরের কথা বলছেন। তাদের কথার মধ্যেই মিল নেই। এজন্য তারা আগে নিজেদের মধ্যে সালিশটা মিটিয়ে নিক। জামায়াত প্রধান বিরোধীদল হিসেবে একটি সমন্বিত প্রস্তাবনা দিয়েছে। সরকারের সক্ষমতা থাকলে তা বাস্তবায়ন করে জাতির কাছে বলুক।
গোলাম পরওয়ার বলেন, আমরা এই সরকারকে ব্যর্থ দেখতে চাই না। কারণ জ্বালানি সংকটে সরকার ব্যর্থ হলে শুধু সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হন সেই মা, যিনি সকালে চুলা জ্বালাতে পারেন না। ক্ষতিগ্রস্ত হন সেই শ্রমিক, যার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হন সেই উদ্যোক্তা, যিনি সময়মতো পণ্য তৈরি বা রফতানি করতে পারেন না। ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের অর্থনীতি। হাজার হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস হয়েছে সংসদে। এখন এগুলো খরচ করেন। ব্যর্থ সরকারগুলো সবসময় জনগণের দুর্ভোগের কথা লুকিয়ে নিজের গণবিচ্ছিন্নতা থেকে বাঁচতে ননইস্যুকে সামনে এনে বিরোধীদলের উপর চাপিয়ে দিতে চায়।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম, সাবেক এমপি ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা আবদুল হালিম, মাওলানা মুহাম্মদ শাহজাহান, এডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এমপি, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মুহাম্মদ জাহিদুর রহমান ও কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন এমপি।
জামায়াতের লিখিত বক্তব্য নিম্নরূপ
আজ আপনাদের সামনে বিদুৎ, জ্বালানি ও গ্যাস সংকট নিয়ে কথা বলতে এসেছি। গত ১৫ আগস্ট মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের চলমান বিদুৎ, জ্বালানি সংকট প্রসঙ্গে বিরোধী দলগুলোর কাছে একটি কার্যকর পরিকল্পনা চেয়েছেন। আমরা তাঁর এই আহ্বানকে ইতিবাচকভাবেই দেখতে চাই। তবে শুরুতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, আমাদের পরিকল্পনা নতুন নয়। সেটি গত তিন মাস ধরেই সরকারের টেবিলে রয়েছে। এদিকে বিদ্যুতের ভূতুড়ে বিলের কারণে বিদ্যুৎ গ্রাহকদের ভোগান্তি এখনও চলছে, যা সরকার নিরসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েও কোনো সুফল আনতে পারেনি।
তিনি বলেন, ঠিক ২১ মে ২০২৬ তারিখে জাতীয় সংসদের জ্বালানি সংকটসংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্যরা লিখিতভাবে ১০ দফা সুপারিশ জমা দিয়েছিলেন। ওই কমিটিতে বিরোধী দলের পাঁচজন সদস্য ছিলেন, যাদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর তিনজন সদস্যও ছিলেন। তারা দুটি বৈঠকে অংশ নিয়েছেন, প্রশ্ন তুলেছেন এবং সংকট মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছেন। পরবর্তীতে ৭ জুন মাননীয় জ্বালানিমন্ত্রী নিজেই সেই প্রতিবেদন জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেন। দেশ রূপান্তর, প্রথম আলো, বাংলা ট্রিবিউনসহ বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমেও বিরোধী দলের সেই ১০ দফা সুপারিশ প্রকাশিত হয়েছে।
সেই প্রস্তাবগুলো ছিল একেবারেই বাস্তবভিত্তিক। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে বিদ্যমান কূপে ওয়ার্কওভার, ভোলা, জামালপুর ও জকিগঞ্জের গ্যাসকে জাতীয় ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ, স্থলভাগ ও সমুদ্রভাগে অনুসন্ধান জোরদার, স্থাপিত এসপিএম দ্রুত চালু করা, ডিপো থেকে গ্রাহক পর্যায় পর্যন্ত ডিজিটাল মনিটরিং, কার্যকর নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে রুফটপ সোলার সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চাহিদা নিরূপণে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করা।
সুতরাং আজকের মূল প্রশ্নটি পরিকল্পনা আছে কি নেই, সেটি নয়। মূল প্রশ্ন হলো, ২১ মে থেকে সরকারের হাতে থাকা এই পরিকল্পনার কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে, কোন সুপারিশে কাজ শুরু হয়েছে এবং কোনগুলো এখনো কাগজেই পড়ে আছে। আজ আমরা সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর চাই এবং একই সঙ্গে দেখাতে চাই, দেশের এই সংকট মোকাবিলায় বিরোধী দল শুধু সমালোচনা করেনি, বরং সময়মতো দায়িত্বশীল ও বাস্তবসম্মত বিকল্পও দিয়েছে। বিগত ১৪ আগস্ট ২০২৬ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এমপি এ সংকট নিরসনে জাতীয় সংসদের জরুরি অধিবেশন আহ্বান করতে মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি দিয়েছেন, যার কপি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও দেওয়া হয়েছে।
• ৩ মাস আগে যে পরিকল্পনা দেয়া হয়েছিল তার অগ্রগতি কতটুকু হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর পরিষ্কার করতে হবে।
• এই সংকট সমাধানের লক্ষ্যে বিরোধীদলীয় নেতার পক্ষ থেকে জরুরি সংসদীয় অধিবেশন আহ্বানের যে দাবি জানানো হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায়নি।
• দেশ কারো একার নয়, দেশ সবার।
প্রথম কথা,
আমাদের পরিকল্পনা নতুন নয়, প্রায় তিন মাস ধরে সরকারের কাছেই আছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে পরিকল্পনা নিয়ে জনগণের সামনে আসতে বলেছেন। আমরা বিনয়ের সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জাতীয় সংসদে গঠিত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্যরা ২১ মে ২০২৬ তারিখেই লিখিতভাবে ১০ দফা সুপারিশ জমা দিয়েছেন। সরকারি ও বিরোধী দলের পাঁচজন করে সদস্য নিয়ে ওই বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ৭ জুন সেই প্রতিবেদন জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হয়। কমিটির নিজস্ব ১২ দফার পাশাপাশি বিরোধী দলের ১০ দফা সুপারিশও প্রতিবেদনের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত ছিল। অর্থাৎ আমাদের পরিকল্পনা কোনো গোপন দলিল নয়। এটি সংসদের নথিতে রয়েছে। সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে। ইতিপূর্বে, গত ৮ আগস্ট জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিদ্যমান সংকট নিরসনে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব-সম্বলিত বক্তব্য পেশ করেছিলাম।
সেই ১০ দফায় আমরা কী বলেছিলাম?
আমরা বলেছিলাম, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে হবে। দ্রুত ফলদায়ক কূপগুলোতে ওয়ার্কওভার করতে হবে। ভোলা, জামালপুর ও জকিগঞ্জের গ্যাস অবকাঠামো উন্নত করতে হবে। স্থল ও সমুদ্রভাগে নতুন অনুসন্ধান বাড়াতে হবে। বাপেক্সের সক্ষমতা শক্তিশালী করতে হবে।
আমরা সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং দ্রুত কার্যকর করার কথা বলেছি। জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় ডিজিটাল পর্যবেক্ষণের কথা বলেছি। সৌরবিদ্যুৎ বাড়ানোর কথা বলেছি। ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চাহিদা নির্ধারণে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের দিয়ে সমীক্ষার প্রস্তাব দিয়েছি।
তাই আজ আমাদের প্রশ্ন খুবই সরল। পরিকল্পনা যখন ২১ মে থেকেই সরকারের কাছে আছে, তাহলে গত প্রায় তিন মাসে সেই পরিকল্পনার কোনটি বাস্তবায়িত হয়েছে? কোনটির কাজ শুরু হয়েছে? কোনটি গ্রহণ করা হয়নি? আর গ্রহণ করা না হলে কেন হয়নি? আমরা নতুন কোনো কাগজ জমা দেওয়ার প্রতিযোগিতা চাই না। আমরা ইতোমধ্যে জমা দেওয়া পরিকল্পনার বাস্তবায়ন দেখতে চাই।
দ্বিতীয় কথা,
হারিকেনের সামনে ফ্যান চলার ছবি দিয়ে দেশের জ্বালানি সংকটের বাস্তবতা খণ্ডন করা যায় না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একটি প্রতিবাদের ছবি নিয়ে কথা বলেছেন। সামনে হারিকেন, পেছনে ফ্যান, এটিকে তিনি হঠকারিতার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আমরা মনে করি, একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে একটি জায়গায় ফ্যান চলছিল কি চলছিল না—এটি দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি মূল্যায়নের মানদণ্ড হতে পারে না। হারিকেন একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদের প্রতীক হতে পারে। তার জবাব হওয়া উচিত তথ্য দিয়ে।
দেশে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। জুলাইয়ে একটি এফএসআরইউ বন্ধ হওয়ার পর দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। আমাদের আগের নথিতে গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট এবং সরবরাহ প্রায় ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে থাকার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। অতএব একজন মানুষ যখন গ্যাস চান, তিনি অরাজকতা চান না। একজন শ্রমিক যখন কারখানা চালু রাখার দাবি করেন, তিনি ষড়যন্ত্র করেন না। একজন উদ্যোক্তা যখন নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি চান, তিনি সরকারের শত্রু নন। মানুষ চুলায় গ্যাস চায়, কারখানায় উৎপাদন চায়, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ চায়। এ দাবির জবাব রাজনৈতিক ব্যঙ্গ দিয়ে নয়, কার্যকর সমাধান দিয়ে দেওয়া উচিত।
তৃতীয় কথা,
তৃতীয় এফএসআরইউ প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু শুধু একটি নতুন এফএসআরইউ দিয়েই গ্যাস সংকটের সমাধান হবে না। আমরা নতুন এফএসআরইউ নির্মাণের বিরোধিতা করছি না। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন হলে আমদানিকৃত এলএনজি গ্রহণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কিন্তু একটি মৌলিক সত্য জনগণকে বলতে হবে। এফএসআরইউ নিজে গ্যাস উৎপাদন করে না। এফএসআরইউ চালাতে এলএনজি আমদানি করতে হবে। সেই এলএনজি কিনতে বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন। এলএনজি পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করার পর সেটি জাতীয় গ্রিডে পাঠাতে পর্যাপ্ত পাইপলাইন প্রয়োজন।
আরেকটি বড় প্রশ্ন অর্থের। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয় এবং প্রায় ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা সরকারি ভর্তুকির তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। সুতরাং তৃতীয় এফএসআরইউ নির্মাণ করুন। প্রয়োজন হলে আমরা সমর্থন করব।
কিন্তু একই সঙ্গে বলতে হবে, এলএনজি কোথা থেকে আসবে? কত দামে আসবে? দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি কী হবে? পাইপলাইন কখন হবে? দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কত বাড়বে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া শুধু একটি নতুন ভাসমান টার্মিনালকে পুরো সংকটের সমাধান হিসেবে দেখানো বাস্তবসম্মত হবে না।
চতুর্থ কথা,
আমরা বলছি, ৯০ দিনে কী করা সম্ভব। আমরা জনগণকে অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দিতে চাই না। তিন মাসে সমুদ্রের নতুন গ্যাস অনুসন্ধানের ফল পাওয়া সম্ভব নয়। তিন মাসে একটি বড় নতুন পাইপলাইন নির্মাণ করা সম্ভব নয়। তিন মাসে ইস্টার্ন রিফাইনারি-২ সম্পূর্ণ বাস্তবায়নও সম্ভব নয়। যেই এসবের প্রতিশ্রুতি দিক না কেন সেটি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না। আমাদের নিজস্ব পরিকল্পনাতেও এ সীমাবদ্ধতা স্পষ্টভাবে স্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু ৯০ দিনে অন্তত ছয়টি দৃশ্যমান কাজ করা সম্ভব।
১. দ্রুত ফলদায়ক গ্যাসকূপে ওয়ার্কওভার: প্রথম ১৫ দিনের মধ্যে পেট্রোবাংলা ও বাপেক্স দ্রুত ফলদায়ক ওয়ার্কওভারযোগ্য কূপের অগ্রাধিকার তালিকা প্রকাশ করুক। ৩০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় অনুমোদন শেষ করা হোক। ৯০ দিনের মধ্যে প্রথম কয়েকটি কূপের কাজ সম্পন্ন না হলেও শুরু করে জনগণকে জানানো হোক—কত মিলিয়ন ঘনফুট নতুন গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার স্মভাবনা হলো।
২. বন্ধ ও কম উৎপাদনশীল কূপের হিসাব প্রকাশ: দেশে কতটি কূপ কারিগরি সমস্যায় বন্ধ রয়েছে, কোনটি সংস্কার করলে আবার উৎপাদনে আনা যাবে, ৩০ দিনের মধ্যে তার পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করা হোক। এগুলো জনগণের সম্পদ। জনগণের সেই হিসাব জানার অধিকার রয়েছে।
৩. ভোলার গ্যাস ব্যবহারে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা বাড়ানো: ভোলায় গ্যাস রয়েছে, কিন্তু মূল ভূখণ্ডে আনার প্রয়োজনীয় স্থায়ী পাইপলাইন নেই। পাইপলাইন তিন মাসে হবে না। কিন্তু সিএনজি বা এলএনজি আকারে পরিবহনের বিদ্যমান ব্যবস্থা আরও কার্যকর ও বিস্তৃত করা যায়। এটি স্থায়ী সমাধান নয়, কিন্তু সংকটের সময়ে একটি অন্তর্বর্তী সেতু হতে পারে।
৪. সিস্টেম লস ও অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা: প্রতিটি বিতরণ কোম্পানির জন্য ৯০ দিনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হোক। প্রতি সপ্তাহে কতটি অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলো, কত গ্যাস সাশ্রয় হলো সে তথ্য প্রকাশ করা হোক।
৫. গ্যাস বণ্টনের প্রকাশ্য সময়সূচি: ঘাটতি যদি থাকে, সেটি লুকিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই। কোন সময়ে কোন খাত গ্যাস পাবে, শিল্প, বিদ্যুৎ, সার ও আবাসিক খাতের জন্য যতটা সম্ভব পূর্বঘোষিত সময়সূচি প্রকাশ করা হোক। একজন গৃহিণী যেন জানতে পারেন কখন চুলা জ্বলবে। একজন শিল্পোদ্যোক্তা যেন জানতে পারেন কখন উৎপাদনের পরিকল্পনা করবেন।
৬. এসপিএম ও ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ দ্রুত কার্যকর করা: যে অবকাঠামো ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে, সেগুলো ফেলে রেখে নতুন প্রকল্পের ঘোষণা দিয়ে লাভ নেই। সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং দ্রুত কার্যকর করতে হবে এবং ডিপো থেকে গ্রাহক পর্যায় পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহে ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক জট ভাঙতে হবে। আমাদের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, বাংলাদেশে শুধু পরিকল্পনার অভাব নেই, বাস্তবায়নের গতিরও সমস্যা রয়েছে। একটি কূপে কাজ করার সিদ্ধান্ত থেকে বাস্তবে কাজ শুরু করতে নানা স্তরের অনুমোদন, সংশোধন, দরপত্র ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অতিক্রম করতে হয়।
জামায়াতের চারটি প্রশাসনিক সংস্কারের প্রস্তাব
প্রথমত,
দেশের এই ক্রান্তিকালে সকল স্টেক হোল্ডারদের নিয়ে National Emergency Energy Cell গঠন করা হোক। নির্দিষ্ট আর্থিক সীমার মধ্যে জরুরি ওয়ার্কওভার ও সংস্কারকাজের অনুমোদনক্ষমতা পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের পরিচালনা পর্ষদে দেওয়ার বিষয় বিবেচনা করা হোক।
দ্বিতীয়ত, রুপপুর বেস লোড প্লান্ট উৎপাদন এ আসলে কখন আসবে এবং এর ট্যারিফ কি হবে সেইটা দেশের জনগন জানতে চাই ।
তৃতীয়ত, জরুরি দরপত্র মূল্যায়নের জন্য স্থায়ী মূল্যায়ন ব্যবস্থা তৈরি করা হোক।
চতুর্থত, অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোর জন্য একক তদারকি ব্যবস্থা করা হোক এবং কোন ফাইল কোথায় কত দিন আটকে আছে, সেই তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হোক।
চিটাগং এর মহেশাখালিতে এবং পটুয়াখালির পায়রাতে টারমিনাল করে কথা ছিল সেইটার আসলে কি হয়েছে আমরা কেওই জানিনা এবং খুলনার খালিশপুরে রুপসা ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি তেরি হয়ে বসে থাকলেও আজো অব্ধি কমারশিয়াল উৎপাদন এ যেতে পারেনি ।
প্রধানমন্ত্রীর চ্যালেঞ্জের জবাবে আমাদের প্রস্তাব
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি বলেছেন পরিকল্পনা দিন। আমরা বলছি, পরিকল্পনা ২১ মে থেকেই সরকারের কাছে আছে। আপনি বলেছেন, ভালো পরিকল্পনা হলে বাস্তবায়ন করবেন। আমরা বলছি, বিরোধী দলের ১০ দফা এবং সংসদীয় বিশেষ কমিটির ১২ দফাকে সামনে রেখে আজ থেকেই একটি যৌথ বাস্তবায়ন কাঠামো তৈরি করুন। সরকার, বিরোধী দল, পেট্রোবাংলা, বাপেক্স, বিপিডিবি, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী ও স্বাধীন জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে নিয়মিত পর্যালোচনার ব্যবস্থা করুন। এবং আজ থেকে ৯০ দিন পর জাতীয় সংসদে অগ্রগতি প্রতিবেদন দিন। কোন সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়েছে, কোনটি হয়নি, কত গ্যাস বেড়েছে, কত সিস্টেম লস কমেছে, কত অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে জনগণ সেই হিসাব দেখুক। আমাদের প্রস্তুত করা খসড়ায়ও ৯০ দিন পর অগ্রগতি প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন এবং বিরোধী দলের সদস্যসহ বিশেষ কমিটির মাধ্যমে নিয়মিত পর্যালোচনার প্রস্তাব রয়েছে।
শেষ কথা
সম্মানিত সাংবাদিকবৃন্দ,
আমরা এই সরকারকে ব্যর্থ দেখতে চাই না। কারণ জ্বালানি সংকটে সরকার ব্যর্থ হলে শুধু সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হন সেই মা, যিনি সকালে চুলা জ্বালাতে পারেন না। ক্ষতিগ্রস্ত হন সেই শ্রমিক, যার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হন সেই উদ্যোক্তা, যিনি সময়মতো পণ্য তৈরি বা রপ্তানি করতে পারেন না। ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের অর্থনীতি। তাই রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকুক। সমালোচনা থাকুক। কিন্তু জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে আমাদের প্রতিযোগিতা হোক, কে বেশি কার্যকর সমাধান দিতে পারে, কে বেশি স্বচ্ছ থাকতে পারে, কে জনগণের কাছে বেশি জবাবদিহি করতে পারে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কে আমরা বলতে চাই, আমাদের পরিকল্পনা আপনার সরকারের কাছেই আছে। আজ আবারও আমরা সেটি সামনে রাখলাম। এখন প্রশ্ন একটাই, বাস্তবায়ন শুরু হবে, নাকি আবার নতুন পরিকল্পনা ও নতুন কমিটির অপেক্ষায় থাকতে হবে? আমরা ৯০ দিন পর হিসাব চাইব। সরকারকে বিব্রত করার জন্য নয়। দেশের মানুষের পক্ষে। আর দেশের স্বার্থে সরকার যদি কোনো কার্যকর, স্বচ্ছ ও বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ নেয়, দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসেবে আমরা সহযোগিতা করব।
ধন্যবাদ সবাইকে।