জাতীয় সংসদে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিতে সচেষ্ট জামায়াত

হারুন ইবনে শাহাদাত
৬ আগস্ট ২০২৬ ১০:৩১

২০২৪-এর ৩৬ জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর চূড়ান্ত পরিবর্তন বা বিপ্লরের লক্ষ্যে সংগ্রাম অব্যাহত আছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধীদল হিসেবে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করছে। বিপ্লব সফল করতে জাতীয় সংসদে এবং রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ ১১ দলের নেতৃত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, জামায়াতের এমপিরা সংসদে ও বাইরে জনগণের পক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনে সচেষ্ট। তাদের ইতিবাচক ভূমিকা দেশের গণতান্ত্রিক ধারা বিকাশে ইতিবাচক, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তারা জাতীয় সংসদে সরকারের জবাবদিহী নিশ্চিতে সর্বাত্মক ভূমিকা পালন করছে।
জুলাই সনদের ভিত্তিতে রাষ্ট্র সংস্কার ও সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে বৈষম্যমুক্ত ইনসাফভিত্তিক দেশ গঠনে গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে ভোটাররা দুটি ভোট দিয়েছেন। একটি ভোট তাদের নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য; অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের পক্ষে মতামত। এতে ‘হ্যাঁ’ অর্থাৎ সংবিধান পরিবর্তনের পক্ষে শতকরা ৭০ জন মতামত দিয়েছেন। সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হওয়ার পর দুটি শপথ নেওয়ার কথা। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধীদলের সদস্যরা এ শপথ নিয়েছেন। কিন্তু বিএনপি থেকে নির্বাচিতরা নেননি। যদিও নির্বাচন-পরবর্তী প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের স্পষ্ট বিধান রয়েছে। রাষ্ট্রপতির জারিকৃত ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-এর অধীনে নির্ধারিত। এতে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী প্রতিনিধিরা প্রথমে সংসদ সদস্য (এমপি) হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন। এরপর একই শপথ অনুষ্ঠানে তারা ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে দ্বিতীয় শপথ গ্রহণ করবেন এবং শপথপত্রে স্বাক্ষর করবেন। যিনি সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করাবেন, তিনিই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শপথ পাঠ করাবেন। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংসদ সদস্যের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তাদের কাজ হবে প্রথম অধিবেশন শুরু থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে গণভোটের সিদ্ধান্ত ও জুলাই সনদের প্রস্তাবনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংবিধান সংশোধন সম্পন্ন করা। জাতীয় নির্বাচনের পর পাঁচ মাস কেটে গেছে। কিন্তু ‘হ্যাঁ’ ভোটের রায় বাস্তবায়ন হয়নি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনগণ তাদের ‘হ্যাঁ’ ভোটের রায় বাস্তবায়নে জামায়াতে ইসলামীর ঐতিহাসিক ভূমিকার পক্ষে অবস্থান নিয়ে এখনো মাঠে আছে। সংসদের ভেতরে ও বাইরে সংসদ সদস্যরা ব্যক্তিগত এবং দলীয়ভাবে ইতিবাচক কাজের মাধ্যমে জনগণের নজর কেড়েছেন।
রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, অতীতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরোধীদল মানেই ছিল সংসদ বর্জন, ধ্বংসাত্মক হরতাল, জ্বালাও-পোড়াও কিংবা শুধুই সরকারের অন্ধ বিরোধিতা। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামী সে ধারায় আমূল পরিবর্তন এনেছে। গঠনমূলক সমালোচনা, ছায়া বাজেট উপস্থাপন, সংসদীয় জবাবদিহী, জনমুখী আইনপ্রণয়নে বিকল্প প্রস্তাব প্রদান এবং সংসদের বাইরে মানবিক ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দলটি রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ইতিবাচক ও পরমতসহিষ্ণু সংস্কৃতির বার্তা দিচ্ছে।
অন্যদিকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ হলে তাকেও ছাড় দিচ্ছে না জামায়াতে ইসলামী। জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান একাধিকবার বিভিন্ন জনসভায় ঘোষণা দিয়েছেন, অন্যায় দুর্নীতি, চাঁদাবাজি করলে কোনো ছাড় নেই। তা তার নিজের বিরুদ্ধে গেলেও না, তিনি শাস্তি মাথা পেতে নেবেন। অতিসম্প্রতি একজন সংসদ সদস্যকে দল থেকে বহিষ্কার করে তিনি তার কথার প্রমাণও দিয়েছেন। কিন্তু অন্যদিকে সরকারি দলের একাধিক সংসদ সদস্য এবং প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ এলেও বিএনপি তার বিরুদ্ধে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। দল থেকে বহিষ্কার দূরের কথা, মন্ত্রণালয় থেকেও তাকে বাদ দেয়া হয়নি।
দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন জামায়াতে ইসলামীর হাত ধরে আসছে বলে মন্তব্য করেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।
গণতন্ত্র ও সুশাসনের নতুন মানদণ্ড
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির চিরাচরিত চিত্র- ক্ষমতার দাপট, ভিআইপি প্রটোকল, সংসদ বর্জন এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি থেকে দূরত্ব বজায় রাখা। তবে এ ধরনের প্রচলিত ধারার বাইরে এসে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচিত প্রতিনিধি ও শীর্ষনেতৃত্বের মাঠপর্যায়ের কাজ এবং সিদ্ধান্তসমূহ রাজনীতিতে এক ব্যতিক্রমী ও সুশাসনমুখী আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সরকারি হাসপাতালে সাধারণ রোগীর সাথে চিকিৎসা গ্রহণ, সরকারি স্বাস্থ্যসেবার অনিয়ম বন্ধে সংসদীয় তোড়জোড়, নিজস্ব উদ্যোগে ভোরে ঝাড়ু হাতে সড়ক পরিষ্কার কিংবা বন্যাকবলিত মানুষের দোরগোড়ায় ব্যক্তিগত উপস্থিতিতে সাহায্য পৌঁছানো- এসব কাজ সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনীতি ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণার উন্মেষ ঘটাচ্ছে।
প্রধান বিরোধীদল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী সংসদকে সংঘাতের বদলে যুক্তি ও রাষ্ট্রচিন্তার চর্চাকেন্দ্রে পরিণত করার কৌশল গ্রহণ করেছে। দলটির সংসদ সদস্যরা আইনপ্রণয়ন, বাজেট বিশ্লেষণ এবং জাতীয় সংকটে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখছেন।
ছায়া বাজেট ও বিকল্প অর্থনৈতিক রূপরেখা
সংসদীয় গণতন্ত্রে যা বিরল, জামায়াতে ইসলামী তা বাস্তবে রূপ দিয়েছে। জাতীয় বাজেট পেশের পূর্বে জামায়াতে ইসলামী দেশের অর্থনীতিবিদ ও নীতি-বিশ্লেষকদের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ছায়া বাজেট’ বা বিকল্প বাজেট প্রস্তাব জাতির সামনে উপস্থাপন করে।
বিরোধীদলীয় সংসদীয় দলের সদস্য ও অর্থনীতিবিদদের উদ্যোগে এই বাজেট তৈরি করা হয়। রাজস্বনীতি সংশোধন, সাধারণ ও নিম্নবিত্তদের ওপর করের চাপ কমানো, ব্যাংক খাতের সুশাসন এবং বৈদেশিক মুদ্রা সংকট দূরীকরণে দলটির প্রস্তাবনা সংসদে সরকারি দলের জন্য একটি বড় দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করেছে।
সংসদে সরকারের নীতি ও কাজের কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে জামায়াতে ইসলামী অন্য বিরোধী অংশীদারদের সাথে নিয়ে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করেছে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে নির্দিষ্ট এমপিদের দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছেÑ যাতে তাঁরা সংসদীয় বিতর্ক এবং স্থায়ী কমিটিতে সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্তসহ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রশ্ন তুলতে পারেন।
জ্বালানি সংকট ও জনমুখী প্রস্তাবনা
ইরানে আমেরিকার হামলার সময় সংসদের অধিবেশন চলাকালীন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের সময় সংসদ বর্জন না করে দলটি সংসদে বিস্তারিত তথ্যসহ সংকট সমাধানের দাবি তোলে। জ্বালানি মূল্য নির্ধারণে একটি সর্বদলীয় সংসদীয় তদারকি কমিটি গঠনের দাবি জানিয়ে জামায়াত প্রমাণ করেছে যে বিরোধীদলের কাজ কেবল বিরোধিতা নয়, বরং সমাধান দেওয়া।
সদস্যদের ব্যক্তিগত উদ্যোগের কয়েকটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা জনকল্যাণমূলক কাজের দৃষ্টান্তের সাথে সাথে জনগণকে সাথে নিয়ে চাঁদাবাজি, দখলবাজির বিরুদ্ধেও সোচ্চার হয়েছেন। তারা জাতীয় সংসদে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ ও দাবি তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো-
জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে শাহ আলী পাইকারি কাঁচাবাজারসহ বিভিন্ন বাজার পরিদর্শনে গিয়ে সরেজমিন চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বলেন। সংসদের ভেতর ও বাইরে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন। তিনি চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে বার্তা দেন যে, সংসদ সদস্যরা আশ্রয়-প্রশ্রয় না দিলে চাঁদাবাজি বন্ধ করা সম্ভব এবং ব্যবসায়ী-সাধারণ মানুষ চাঁদাবাজির প্রতিবাদে সত্য কথা বললে জামায়াত তাদের পাশে থাকবে। তিনি নিজ হাতে ঝাড়ু নিয়ে তার এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে জনগণকে উৎসাহিত করেছেন।
বিরোধীদলীয় উপনেতা ও সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। তিনি জাতীয় সংসদে আইনপ্রণয়ন ও সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। তিনি সংসদে প্রস্তাবিত আইনগুলোর বিস্তারিত বিশ্লেষণ ও প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে বিল প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে সমৃদ্ধ করেছেন। নিজ এলাকায় শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং তরুণদের ফ্রিল্যান্সিং ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের জন্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছেন।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের এমপি সাইফুল আলম খান মিলন রাজধানীর কাওরান বাজার ও মহাখালী বাসস্ট্যান্ড এলাকার চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নেন।
কাওরান বাজারে দৈনিক কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেটের তথ্য বাজেটের আগে আয়োজিত সংলাপে প্রকাশ্যে তুলে ধরেন এবং তা বন্ধ করার দাবি জানান। কাওরান বাজার ও মহাখালী বাসস্ট্যান্ড এলাকার চাঁদাবাজি পুরোপুরি বন্ধের জন্য সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্থ হবেন বলে ঘোষণা দেন।
ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেম (আরমান)। তিনি জামায়াত আমীরের সাথে সরেজমিন পাইকারি বাজার পরিদর্শনে অংশ নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের কাছ থেকে চাঁদাবাজির তথ্য সংগ্রহ করেন এবং চাঁদামুক্ত বাজার ব্যবস্থা গড়ার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেন।
ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য কর্নেল (অব.) আবদুল বাতেন। এলাকার প্রধান সমস্যা হিসেবে মাদক, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও দখলদারিত্বকে চিহ্নিত করে তিনি এসবের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ হলে এলাকায় চাঁদাবাজি ও সামাজিক অরাজকতা পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব। তিনি চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণার পর সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছেন, তারপরও তার অবস্থানে তিনি অনড়।
সিরাজগঞ্জ-৪ (উল্লাপাড়া) আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও বিরোধীদলীয় হুইপ মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান দায়িত্ব নেওয়ার পর অনেকগুলো আলোচিত ও ইতিবাচক ভূমিকা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। জাতীয় সংসদ অধিবেশনে তিনি তাঁর নিজ আসন উল্লাপাড়ার প্রান্তিক ও সাধারণ মানুষের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে একটি আধুনিক বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জোর দাবি উত্থাপন করেন। বিরোধীদলীয় হুইপ হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি সংসদীয় কার্যক্রমে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। সরকারি নীতি, স্থানীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে জাতীয় সংসদে তার গঠনমূলক আলোচনা প্রশংসিত হয়েছে।
কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজা। জনপ্রিয় ইসলামী বক্তা ও সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি এলাকায় ধর্মীয়-নৈতিক শিক্ষা বিস্তার, মাদকবিরোধী প্রচারণা এবং যুবসমাজকে অপসংস্কৃতি থেকে দূরে রাখার বিষয়ে সামাজিক ও কৌশলগত বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে আসছেন। নির্বাচনী প্রচারকালে আমির হামজা স্থানীয় জনগণের নানা সমস্যা ও দুর্নীতি রোধের কথা বলেন। একইসাথে নির্বাচনী প্রচারে রাজনৈতিক ও সামাজিক আচরণবিধি কঠোরভাবে প্রতিপালনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
নওগাঁ-২ (পত্নীতলা-ধামইরহাট) আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক। তিনি জনপ্রতিনিধিদের সাধারণ রোগের চিকিৎসায় ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতাল কিংবা বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার সংস্কৃতি ভেঙে এক নতুন দৃষ্টান্ত উপহার দিয়েছেন। তিনি হাইপারটেনশন ও গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা নিয়ে কোনো ধরনের আগাম প্রটোকল বা বিশেষ সুবিধা না নিয়েই ধামইরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। তিনি হাসপাতালে ভর্তি থাকাকালীন সাধারণ রোগীদের জন্য নির্ধারিত সরকারি খাদ্য গ্রহণ করেন। এতে স্থানীয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি আস্থা অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া সর্ববৃহৎ চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে রোগীদের দুর্ভোগ ও দুর্নীতির চিত্র পাল্টাতে যৌথভাবে মাঠে নেমে রোগী ও চিকিৎসকদের সাথে কথা বলেছেন রংপুর-৩, ৫ ও রংপুর-১ এর সংসদ সদস্য যথাক্রমে জামায়াতে ইসলামীর তিন সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল, গোলাম রব্বানী এবং রায়হান সিরাজী।
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যদের মতো অন্যরা সরকারি হাসপাতলে চিকিৎসা নিতে গেলে সমস্যাগুলো সরাসরি বুঝতে পারবেন। সাধারণ জনগণের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেয়া তাদের জন্য সহজ হবে। সরকারি চিকিৎসাসেবার মান বাড়বে।
রাজনীতি বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন
রাজনীতি বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধীদল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকাকে ইতিবাচক বলে মনে করেন।
এ প্রসঙ্গে সুশাসন সংক্রান্ত নাগরিক সংগঠন ‘সুজন’ (সুশাসনের জন্য নাগরিক)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বিভিন্ন সময়ে জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য এবং তাদের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে বিশ্লেষণাত্মক মূল্যায়ন পেশ করেছেন। ড. বদিউল আলম মজুমদারের মতে, সংসদীয় রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা অন্যান্য অনেক দলের তুলনায় নিয়মকানুন মেনে চলা এবং প্রস্তুত হয়ে আসার ক্ষেত্রে বেশ এগিয়ে থাকেন। সংসদে পেশকৃত বিল, আইন কিংবা বাজেট আলোচনায় তারা যুক্তি ও গবেষণানির্ভর বক্তব্য উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন।
সুজন সম্পাদক উল্লেখ করেছেন যে, সরকার ও প্রশাসনের দুর্নীতি, অনিয়ম এবং অপচয় চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে জামায়াতের প্রতিনিধিরা সংসদে ওয়াচ ডগ বা জবাবদিহী নিশ্চিতে ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোয় তাদের সক্রিয় উপস্থিতি সরকারি কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।
তিনি আরও পর্যবেক্ষণ করেন যে, নির্বাচন ব্যবস্থা, সংবিধান সংস্কার ও ভোটাধিকার রক্ষার দাবিসমূহে জামায়াতের ভূমিকা যেমন সোচ্চার, তেমনি সংসদীয় রাজনীতিতে একটি টেকসই ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বজায় রাখতে তাদের দলীয় নীতিতে আরও বেশি উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখা দরকার।
কর্নেল (অব.) অলি আহমদের (বীরবিক্রম) মতে, জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংসদে অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং যেকোনো আইনপ্রণয়ন, বিল আলোচনা বা সংসদে বক্তব্য পেশ করার আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে আসেন। সংসদীয় নীতি ও নিয়মকানুন মেনে আলোচনার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা বেশ সোচ্চার ও সুসংগঠিত।

হারুন ইবনে শাহাদাত