বিএনপির সরকারকে প্রতারক হিসেবে দেখতে চাই না, শাসক হিসেবে দেখতে চাই : বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান

সোনার বাংলা অনলাইন
২ আগস্ট ২০২৬ ১৯:২৩

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে রোববার ২ আগস্ট জাতীয় প্রেস ক্লাবের আব্দুস সালাম মিলনায়তনে ‘জান দিব, জুলাই দিব না’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন আমীরে জামায়াত ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান

বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমরা বিএনপির বর্তমান সরকারকে একটি প্রতারক দল হিসেবে দেখতে চাই না, শাসক হিসেবে দেখতে চাই। আমরা চাই, তাঁরা জনগণের সাথে দেওয়া ওয়াদাটা অন্তত রক্ষা করুক। আমরা কথা দিয়ে যাচ্ছি, লড়াই আমাদের চলবে। সংসদে ততদিন থাকব, যতদিন থাকা দেশ ও জনগণের জন্য প্রয়োজন মনে করব। যখন মনে করব, প্রয়োজন নাই। তখন ওই জনগণের কাতারেই মিশে যাবো। এখন আমাদের ক্ষেত্র দুইটা। একটি সংসদে সমাধান হলে ঠিক আছে, না হলে আমাদের রাজপথ। রাজপথ কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। রাজবিহার জমিদারি জনগণ কাউকে দেয় নাই।

তিনি বলেন, মব সৃষ্টি করা হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়, মবের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন, নতুন বাংলাদেশে আর মব হবে না। এখন কারা করে? মবগুলো বন্ধ করেন। আমিও যদি মব করি তাহলে আমার হাত অবস করে দেন। মব করে বেশি দূর হাত আগাতে পারবেন না, আমরা সকল মবের বিরুদ্ধে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে রোববার ২ আগস্ট জাতীয় প্রেস ক্লাবের আব্দুস সালাম মিলনায়তনে ‘জান দিব, জুলাই দিব না’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মুস্তাফিজুর রহমান ইরানের সভাপতিত্বে প্রধান আলোচক ছিলেন এলডিপির প্রেসিডেন্ট ও সাবেক মন্ত্রী কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ বীরবিক্রম, বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর আল্লামা মামুনুল হক, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, জাগপার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ইকবাল হোসেন প্রধান, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মাওলানা মুছা বিন ইজহার। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ লেবার পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান এস এম ইউসুফ আলী, জোহরা খাতুন জুঁই, লেবার পার্টির মুখপাত্র মো. নাজমুল ইসলাম তালুকদার মুখপাত্র, যুগ্ম মহাসচিব আবদুর রহমান খোকন প্রমুখ।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যারা সরকারের দায়িত্বে আছেন তাদের সমালোচনা চলবে। দায়িত্বে যদি থাকতে চান সমালোচনা সহ্য করার মনও আপনাদের থাকতে হবে। যদি সমালোচনা সহ্য না করে তোষামোদকারীকে আপনারা যদি প্রমোট করেন, লালন করেন- তাহলে তারা আপনাদের বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করবে। বিরোধী দল লাগবে না। সেই পথ থেকে ফিরে আসুন। জনগণের অভিপ্রায়ের দিকে ফিরে আসুন।

আমীরে জামায়াত বলেন, বর্তমান সরকারি দলে যারা আছেন, তারা সাড়ে সতের বছর আমাদের মতোই মজলুম ছিল। জাতির উপরে যে জুলুমের পাহাড় নেমে এসেছিল। এই ক্ষেত্রটা কেন কীভাবে প্রস্তুত হয়েছিল? তারা যেন একবার চিন্তা করে। তারা যেন চিন্তা করেন সাড়ে ১৭ বছর বাংলাদেশের মানুষের উপর, বিশেষ করে সেই সরকারের বিরোধী যারা ছিলেন তাদের উপর।

তিনি বলেন, যে খাসলতটা ফ্যাসিস্ট সরকারের ছিল, সেটা বিএনপি আবার ধারণ করতে যাচ্ছে কেন? আমরা তো নতুন কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। তখন ফ্যাসিস্টরা যে চেষ্টা করেছে তার হুবহু ফটোকপি বিএনপির মধ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি। কোন জিনিসটা তারা বাদ দিয়েছে? কোন জিনিসের পরিবর্তন করেছে? ওরা যেমন বিরোধী মতকে দমন করার জন্য ষড়যন্ত্র, অপপ্রচার এবং বলপ্রয়োগের আশ্রয় নিয়েছিল, বিএনপি সবগুলো ইতিমধ্যে নিয়ে ফেলেছে বলেন আমীরে জামায়াত।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণভোটে হ্যাঁ বলেছে ৭০ ভাগ মানুষ। জনগণের অভিপ্রায় ও রায়কে আপনারা অপমান করছেন। অগ্রাহ্য করছেন কেন? বিএনপির পদস্থ একজন অ্যাক্টিভিস্টকে চুক্তিভিত্তিক নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে এক বছরের জন্য নিয়োগ দিয়েছেন। এই এক বছরের ভিতরে গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলো নির্বাচন হবে। যে লোক বিএনপির জন্য জানপ্রাণ দিয়ে কাজ করেছে, সেই লোককে একটি নিরপেক্ষ জায়গায় তারা বসিয়েছে, বলেন তিনি।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সরকার জনগণের অভিপ্রায়কে সম্মান করে চললে মানুষের মনোজগতে শক্ত আসন বা ভিত্তি করে। আর মানুষের অভিপ্রায়কে অপমান্য করলে জনগণ তাঁদের অন্তর থেকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করি। জনগণ এমনভাবে প্রত্যাখ্যান করে শেষ পর্যন্ত এই সব সাহসটাও থাকে না যে নিজের দেশে আমি থাকি আমি ফেস করি। দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়।

আমীরে জামায়াত বলেন, আমরা একটি মজলুম সংগঠন আপনারা জানেন ২৪ সালের ১ আগস্ট আমাদেরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। আমরা এটাকে সাথে সাথে প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। আমরা ধন্যবাদ জানাই, সেইদিন বিএনপি এটাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। আমাদের সমস্ত গণতান্ত্রিক ধারার দলগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে। শেখ হাসিনা আমাদের নিষিদ্ধ করেছিলেন নিজের গদিকে একদম নির্ভেজাল করার জন্য, নিরাপদ করার জন্য। কিন্তু ১, ২, ৩, ৪- এই দিনগুলোয় মজা লুটেছেন। কিন্তু পঞ্চম দিনে দুপুরের রান্না করা ভাত ফেলেই চলে যেতে হয়েছিল তাকে।

বিএনপির নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, হবিগঞ্জে ইনোসেন্ট ছেলে আলিফের চোখ রড দিয়ে পিটিয়ে শেষ করে দিয়েছে বিএনপির কর্মীরা। চোখ তো শেষ করেছিল শেখ হাসিনা। আপনার আবার শুরু করলেন কেন? আপনারা তাঁকে শেষ করে দিলেন কেন? প্রতিবাদ জানান বিরোধীলীয় নেতা।

তিনি বলেন, এই নির্বাচন হওয়ার পরে দুঃখজনক। বর্তমান সরকারি দলের হাতে আমাদের চারজন সহকর্মীকে জীবন দিতে হয়েছে। কেন এটা শুনতে হবে? কেন এটা দেখতে হবে। জায়গায় জায়গায় হামলা-মামলা শুরু হয়েছে, আশ্চর্য! আপনারা মারলেন, মব সৃষ্টি করলেন। লোকদের বন্দি করে রাখলেন, চোখটা কেড়ে নিলেন, তারপরে আবার উল্টো তাদের বিরুদ্ধে আইফোন চুরির মামলা দিলেন। আপনারা তো হুবহু ফ্যাসিস্টদের পথেই হাঁটছেন। হুবহু আপনারা ওইগুলোই করছেন। কোন জিনিসটা বাদ দিলেন?

আমীরে জামায়াত বলেন, এই বাংলাদেশে এসব দেখার জন্য রক্ত দেয়নি চব্বিশে। আমরা একটি অঙ্গীকার নিয়ে, জনগণের একটি আকাঙ্ক্ষাকে লালন করে আমরা বাঁচতে চাই। আমাদের অঙ্গীকার চবিবশকে আমরা বৃথা যেতে দেবো না। জুলাইকে আমরা হারিয়ে যেতে দেবো না, জুলাইকে সব কিছুর বিনিময়ে বাঁচিয়ে রাখবো। কারণ জুলাই এসেছে মূলত বৈষম্যের মূলে আঘাত দেওয়ার জন্য। বৈষম্য আর চলবে না বাংলাদেশে। সরকারে গিয়ে এখন যারা বৈষম্য করছেন, মাশুল আপনাদেরকেই দিতে হবে

তিনি বলেন,আমরা জানি, রাজপথ আমাদের ঠিকানা আসল ঠিকানা। সেই রাজপথে নামলে অনেক কিছু করতে পারে। আমাদের হয় জেলে নয় কবরে যেতে হতে পারে, আগের সরকারের তৈরি করা সেই আয়নাঘরে। এরকম যত ঘর হোক। সকল ঘরকে কোনো পাত্তাই দেবো না। আমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন বাংলাদেশে হবে, ইনশাল্লাহ।

সরকারের সমালোচনা করে আমীরে জামায়াত বলেন, বিএনপি নিজেদের প্রথম দফায় সংস্কারের কথা বলেছে। তারা নিজেরা ইলেকশনের সময় দাবি জানালেন, এখন তারা বলছেন যে এটা সংবিধানে নেই। সংবিধানে ২৬ সালের নির্বাচনও তো নেই। যদি সংবিধান বুঝেন, তাহলে এখন কোনো পার্লামেন্ট নেই। সংবিধান সংবিধান করলে এখন সরকারি দলও নাই, বিরোধীদল নাই। এটা ছিল জনগণের অভিপ্রায়। বাস্তবতা হলো সর্বোচ্চ আইন। এর ভিত্তিতে এটা হয়েছে। জনগণ এটাই মেনে নিয়েছে। একটি মানলেন আরেকটা মানলেন না। মানবেন, তবে অনেক পানি ঘোলা করে, বলেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের ভোটকে সম্মান করুন। তাহলে জনগণও আপনাদের সম্মান করবে। দলীয়করণের যারা একদম উলঙ্গভাবে পা বাড়িয়েছেন, ফিরে আসুন। তারা নির্বাচনের আগে বলেছিল মেরিটোক্রেটিক সোসাইটি চাই, আমরা পলিটোক্রেটিক সোসাইটি গড়বো। এখন তো পুরোটাই তার উল্টো করছেন।

তিনি বলেন, স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা মানুষের সেবা করবে। সেসব জায়গায় সরকার দলীয় নেতাদের বসিয়ে দিচ্ছে প্রশাসক হিসেবে। খন্ডকালীন প্রশাসক বসাতে হলে প্রশাসনের লোকদের বসান, সেখানে দলীয় নেতাকে বসাতে হবে কেন? প্রশ্ন রাখেন বিরোধীদলীয় নেতা।

আমীরে জামায়াত বলেন, যত তাড়াতাড়ি পারেন নির্বাচনটা দিয়ে জনপ্রতিনিধিদের সুযোগ করে দেন। বিএনপি সব জায়গায় ব্লক করে রেখেছে। এখন শুধু নির্বাচিত জায়গা নয়, যে সমস্ত জায়গায় প্রশাসনের লোকদের দায়িত্ব পালন করার কথা, এখন সরাসরি সেখানে নেতাদের আপনারা পদায়ন করছেন। আমরা পরিষ্কারভাবে ঘোষণা দিচ্ছি, এগুলো আমরা প্রত্যাখ্যান করলাম। এগুলো আমরা মানি না। এগুলো যদি আমরা মানবো না। কোটাবিরোধী আন্দোলন করেছিল কেন? এগুলো বন্ধের জন্য তো করেছিল। এখন সেই কোটাকে আরও বিপুল আকারে আপনারা নিয়ে এসেছেন।

তিনি বলেন, আন্দোলন কারও সৃষ্টি করতে হয় না। আন্দোলনের কারণ যখন তৈরি হয়ে যায়, আন্দোলন তখন অটোমেটিক্যালি সামনে চলে আসে। সম্ভবত এ জাতি একটি দুর্ভাগা জাতি। নইলে পদে পদে শাসকগোষ্ঠী কেন জাতির সাথে এত প্রতারণা করে? কথা দিয়ে কোনো কথা রাখে না। কেন নিজের কথার বাইরে গিয়ে উল্টাটা করে। জাতি অতীতে কাউকে ছেড়ে দেয়নি, বর্তমানেও ছেড়ে দেবে না। জুলাইয়ের এটাই আমাদের অঙ্গীকার। আমরা লড়াই করেই ভালো থাকব। মাথা নত করব না, মাথা উঁচু করে সামনের দিকে এগিয়ে যাব। এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।