মূল্যস্ফীতির দীর্ঘ ছায়া

চাপে অর্থনীতি, সংকটে মানুষ


২ জুলাই ২০২৬ ২১:৩৫

॥ কাওসার রহমান ॥
“চার বছর আগেও মাসে ৩০ হাজার টাকা আয়েই কোনোরকমে সংসার চলে যেত। এখন একই পরিবারকে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য, বাড়ি ভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, যাতায়াত, শিক্ষা ও চিকিৎসা মিলিয়ে অন্তত ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা খরচ করতে হচ্ছে। কিন্তু আয় সেই হারে বাড়েনি। ফলে বাজারের ব্যাগ ছোট হয়েছে, খাবারের তালিকা সংকুচিত হয়েছে, সঞ্চয় ভেঙে চলছে সংসার। মূল্যস্ফীতি এখন আর কেবল অর্থনীতির পাঠ্যবইয়ের একটি সূচক নয়; এটি এখন দেশের মানুষের প্রতিদিনের জীবনের বাস্তবতা।’
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গত চার বছর ধরে সবচেয়ে আলোচিত ও উদ্বেগজনক বিষয় নিঃসন্দেহে মূল্যস্ফীতি। ২০২২ সালে শুরু হওয়া মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি ২০২৬ সালেও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এ সময়ে মূল্যস্ফীতি শুধু বাজারদর বাড়ায়নি; এটি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়েছে, সঞ্চয় ক্ষয় করেছে, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতই কোনো না কোনোভাবে এর অভিঘাত অনুভব করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে অর্থনীতিতে কিছুটা মূল্যস্ফীতি কাম্য। এটি উৎপাদন ও বিনিয়োগে উৎসাহ জোগায়। কিন্তু যখন মূল্যস্ফীতি দীর্ঘসময় ধরে উচ্চমাত্রায় থাকে এবং মানুষের আয় সেই হারে না বাড়ে, তখন তা অর্থনীতির জন্য এক নীরব সংকটে পরিণত হয়। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটা তেমনই। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, উচ্চ মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হন স্থির আয়ের মানুষ। কারণ তাদের আয় নির্দিষ্ট থাকলেও ব্যয় ক্রমাগত বেড়ে চলে। ফলে বাস্তব আয় কমে যায় এবং জীবনযাত্রার মানের অবনতি ঘটে। বাংলাদেশেও গত চার বছর ধরে সেটাই ঘটে চলেছে।
দেশের চলমান মূল্যস্ফীতির উলম্ফন শুরু হয়েছিল করোনা-পরবর্তী ২০২২ সালের মে মাস থেকে। সেই উলম্ফনের পর গত চার বছর ধরে দেশের মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে ছিল ঊর্ধ্বমুখী। সেটি ৯ থেকে ১০ শতাংশের আশপাশেই অবস্থান করছে। সেই হিসাবে ২০২৬ সালের মে মাসে দেশে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির চার বছর পূর্ণ হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, সরবরাহ চেইনে ব্যাঘাত এবং মুদ্রা অবমূল্যায়ন এর প্রধান কারণ হলেও নিয়ন্ত্রণে ছিল নীতিনির্ধারকদের চরম ব্যর্থতা। হঠাৎ করেই জ¦ালানি তেলের দ্বিতীয় দফায় অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে মে মাসে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৯.৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯.০৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.৭১ শতাংশ ছিল।
চার বছরের এক দীর্ঘ চাপ
বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির বর্তমান ধাপকে কোনো একক ঘটনার ফল বলা যাবে না। এটি বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা কারণের সম্মিলিত প্রভাব।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ববাজারে খাদ্যশস্য, জ্বালানি তেল, সার এবং পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। গম, ভোজ্যতেল, জ্বালানি এবং সার আমদানিতে নির্ভরশীল বাংলাদেশও এর সরাসরি প্রভাবের মুখে পড়ে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের আমদানি ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। ডলারের সংকট তৈরি হয়। আমদানি ব্যয় মেটাতে গিয়ে টাকার বিনিময়মূল্য কমতে থাকে। টাকার অবমূল্যায়নের ফলে একই পরিমাণ পণ্য আমদানিতে আরও বেশি টাকা ব্যয় করতে হয়। এর প্রভাব দ্রুত বাজারে পড়ে।
সেইসঙ্গে দেশের মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে ২০২২ সালে যে মূল্যস্ফীতি ছিল ৫.৮৬ শতাংশ, বছর শেষে তা ৮.৫৭ শতাংশে বেড়ে দাঁড়ায়।
২০২৩ সালে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। আমদানি নিয়ন্ত্রণ, ডলারের অস্থির বাজার, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যয়ের চাপ উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়। কৃষি, শিল্প এবং সেবা, সব খাতেই ব্যয় বৃদ্ধি পায়। ফলে উৎপাদক থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি স্তরে পণ্যের দাম বাড়তে থাকে। এতে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের ঘরে উঠে যায়। বছর শেষে মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৯.৮৬ শতাংশ।
২০২৪ সালে খাদ্য মূল্যস্ফীতি সাধারণ মূল্যস্ফীতির তুলনায় আরও বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে। চাল, ডিম, ভোজ্যতেল, সবজি, মাছ, মাংস প্রায় সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে শুরু করে। শহরের পাশাপাশি গ্রামেও এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বছরজুড়েই উচ্চ মূল্যস্ফীতি অব্যাহত থাকে এবং বছর শেষে মুল্যস্ফীতি অবস্থান করে ৯.৯৪ শতাংশে।
২০২৫ ও ২০২৬ সালে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমার প্রবণতা দেখা গেলেও তা এখনো বাংলাদেশ ব্যাংকের কাক্সিক্ষত সীমার চেয়ে অনেক বেশি। ২০২৫ সালে অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্কটি ৯ শতাংশে অবস্থান করে এবং বছর শেষে দাঁড়ায় ৮.৫৮ শতাংশে। ২০২৬ সালের শুরুতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই স্থিতাবস্থা বজায় থাকলেও নির্বাচনের পর নতুন সরকার হঠাৎ করেই প্রতিশ্রুতি ভেঙে জ¦ালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সমন্বয় করে। এতে সম্প্রতি দুই মাসে দেশে দুই দফায় জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ১৫ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ জুন মাসে পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ৫ টাকা করে বৃদ্ধি পেলেও, এর আগে এপ্রিল মাসে ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা এবং পেট্রোল ও অকটেনের দাম ১৯-২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল।
জ¦ালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি ‘জ¦লন্ত আগুনে ঘি ঢালার’ মতো অবস্থা তৈরি করে। ফলে গত মে মাসে মূল্যস্ফীতি আবার ১০ শতাংশের ঘরে উঠে যায়। মে মাসে সাধারণ মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৯.৪২ শতাংশে। ফলে দেশের অর্থনীতি পুরোপুরি আর স্বস্তিতে ফিরতে পারেনি।
কেন দীর্ঘস্থায়ী হলো মূল্যস্ফীতি?
অনেকেই মনে করেছিলেন যুদ্ধ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে মূল্যস্ফীতিও দ্রুত কমে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। কারণ বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির পেছনে কেবল আন্তর্জাতিক কারণ নয়, অভ্যন্তরীণ নানা কাঠামোগত দুর্বলতাও কাজ করেছে।
প্রথমত, দেশের অর্থনীতি এখনো ব্যাপকভাবে আমদানিনির্ভর। জ্বালানি, ভোজ্যতেল, ডাল, গম, শিল্পের কাঁচামাল সবকিছুর জন্য বিদেশের ওপর নির্ভরতা বেশি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও দেশের বাজারে বড় প্রভাব ফেলে।
দ্বিতীয়ত, টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন আমদানি ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। গত চার বছরে বাংলাদেশে মার্কিন ডলারের দাম প্রায় ৩৮ থেকে ৪০ টাকা বেড়েছে। ২০২০ সালের মাঝামাঝি সময়ে আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ১ ডলারের দাম ছিল প্রায় ৮৪ টাকা ৫০ পয়সার মতো। বর্তমানে তা বেড়ে ১২৩ টাকা থেকে ১২৩ টাকা ৫০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় শুধু আমদানিকারক নয়, স্থানীয় উৎপাদকরাও ব্যয় বৃদ্ধির মুখে পড়েছেন।
তৃতীয়ত, বাজার ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যকার দীর্ঘ সরবরাহ শৃঙ্খল, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাব, মধ্যস্বত্বভোগীর আধিপত্য এবং অনেক ক্ষেত্রে অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজির অভিযোগ মূল্যস্ফীতির চাপকে আরও বাড়িয়েছে।
চতুর্থত, কৃষি উৎপাদনে জলবায়ুজনিত অনিশ্চয়তা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগও খাদ্য সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে। কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও খরা, কোথাও বন্যা এসব কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে।
সবচেয়ে বড় আঘাত কার ওপর?
মূল্যস্ফীতির অভিঘাত সমাজের সর্বস্তরে সমানভাবে পড়ে না। উচ্চ আয়ের মানুষের ব্যয় বাড়লেও তাদের জীবনযাত্রায় তুলনামূলক কম প্রভাব পড়ে। কিন্তু নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটি হয়ে ওঠে টিকে থাকার লড়াই।
একজন বেসরকারি চাকরিজীবীর বেতন বছরে হয়তো পাঁচ থেকে সাত শতাংশ বাড়ে। কিন্তু একই সময়ে খাদ্যপণ্যের দাম যদি ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়ে যায়, তাহলে প্রকৃত অর্থে তার আয় কমে যায়। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় বাস্তব আয়ের (রিয়েল ইনকাম) ক্ষয়।
এর ফলে মানুষ প্রথমেই কমাতে শুরু করে পুষ্টিকর খাবার কেনা। মাছের পরিবর্তে ছোট মাছ, গরুর মাংসের পরিবর্তে মুরগি, পরে সেটিও কমে যায়। অনেক পরিবার দুধ, ফল ও ডিমের মতো পুষ্টিকর খাদ্য নিয়মিত কেনা বন্ধ করে দেয়। চিকিৎসা ব্যয় স্থগিত রাখা, সন্তানদের কোচিং বন্ধ করা, বিনোদনের খরচ কমানো- এসবও এখন অনেক পরিবারের বাস্তবতা। এত দীর্ঘসময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করায় সীমিত আয়ের মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। সংসারের খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। অনেকে ধারদেনা করে সংসার চালাচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মধ্যবিত্তের একটি অংশ ধীরে ধীরে নিম্ন-মধ্যবিত্তে নেমে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় নিম্নআয়ের মানুষের প্রকৃত মজুরি কমেছে, যার ফলে নতুন করে লাখ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। আবার নিম্নআয়ের অনেক পরিবার সঞ্চয় শেষ করে ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এতে ভবিষ্যতের আর্থিক ঝুঁকিও বাড়ছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, খাদ্য মূল্যস্ফীতির কারণে ২০২৫ সালে আরও ৩০ লাখ মানুষ অতিদরিদ্র হয়ে গেছে।
বিশেষ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় দারিদ্র্য বেড়ে গেছে। টানা চার বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে বর্তমানে প্রায় ২১.২ শতাংশ থেকে ২৭.৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ নিয়ে করা বিভিন্ন সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ তথ্যে এ চিত্র পাওয়া যায়। বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ অনুযায়ী, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও শ্রমবাজারের সংকটে জাতীয় দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২১.২ শতাংশে পৌঁছেছে। এর ফলে ৩ কোটি ৬০ লাখের বেশি মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পিপিআরসির তথ্যানুযায়ী, দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২৭.৯ শতাংশে ঠেকেছে এবং চরম দারিদ্র্যের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৯.৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান বলছেন, টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষ কষ্টে আছে। আমরা গবেষণা করে যে তথ্য তুলে ধরেছিলাম, সেই ধারাবাহিকতা এখনো অব্যাহত আছে। বিনিয়োগ না থাকায় দেশে কর্মসংস্থান হচ্ছে না, তরুণরা কাজ পাচ্ছে না। ফলে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হচ্ছে না।
মূল্যস্ফীতির আরেকটি বড় সামাজিক প্রভাব হলো আয়বৈষম্য বৃদ্ধি। যাদের সম্পদ, জমি বা ব্যবসা রয়েছে, তারা অনেক সময় মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে নিজেদের আয়ও বাড়াতে পারেন। কিন্তু বেতনভোগী, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি কিংবা দিনমজুরদের আয় সেই হারে বাড়ে না। ফলে ধনী ও নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে ব্যবধান আরও বাড়তে থাকে। টানা চার বছরের মূল্যস্ফীতিতে দেশে ধনী-গরিবের মাধ্যকার বৈষম্য বেড়ে গেছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্য রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নিম্নআয়ের মানুষের প্রকৃত আয় না বাড়ায় এবং নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় এই বৈষম্য আরও তীব্র হয়েছে।
আয়ের বৈষম্য পরিমাপের সূচক গিনি গুণাঙ্কে বাংলাদেশ এখন চরম বৈষম্যের দ্বারপ্রান্তে। পরিসংখ্যানে এই সূচকটি বেড়ে ০.৫০-এ দাঁড়িয়েছে (০.৫০ বা তার বেশি মাত্রাকে উচ্চ বৈষম্য হিসেবে ধরা হয়), যা আগে ছিল ০.৪৫। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের সবচেয়ে ধনী মাত্র ৫ শতাংশ মানুষের হাতে জাতীয় আয়ের প্রায় ৩০ শতাংশ সম্পদ কুক্ষিগত রয়েছে। আর এর বিপরীতে সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ মানুষের হাতে রয়েছে জাতীয় আয়ের মাত্র শূন্য দশমিক ৩৭ শতাংশ (০.৩৭ শতাংশ)।
মূল্যস্ফীতি শুধু বাজারদর নয়
অনেকের কাছে মূল্যস্ফীতি মানে শুধু বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া। কিন্তু অর্থনীতির দৃষ্টিতে এর প্রভাব আরও গভীর। উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের সঞ্চয় কমিয়ে দিচ্ছে। সঞ্চয় কমায় ব্যাংকে আমানত বৃদ্ধির গতিও কমে গেছে। ফলে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগানেও প্রভাব পড়েছে। একই সঙ্গে উচ্চ সুদের হার নতুন বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে।
অন্যদিকে মানুষ প্রয়োজন ছাড়া কোনো পণ্য না কেনায় ভোগ ব্যয় কমে গেছে। এতে শিল্প উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ব্যবসায়ীরা উৎপাদন কমানোয় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না; এমনকি অনেক জায়গায় কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটছে। অনেক শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে যায় কর্মসংস্থানহীন পরিবেশে কর্মঠ মানুষ আরও বেকার হচ্ছে। ফলে মূল্যস্ফীতির প্রভাব ধীরে ধীরে পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়েছে। অর্থনীতিতে এক ধরনের স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে।
অর্থনীতির সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা
গত চার বছরের অভিজ্ঞতা একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে তাা হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কেবল বাংলাদেশ ব্যাংকের একার দায়িত্ব নয়। এটি সরকারের রাজস্বনীতি, কৃষিনীতি, জ্বালানিনীতি, বাণিজ্যনীতি, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
অর্থনীতিবিদদের মতে, যদি উৎপাদন, সরবরাহ এবং বাজার ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না করা যায়, তাহলে কেবল সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। কারণ বর্তমান মূল্যস্ফীতির বড় একটি অংশ সরবরাহপক্ষের সংকট থেকে সৃষ্টি হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করেছে। নীতিসুদ বাড়ানো হয়েছে, বাজারভিত্তিক সুদের হার চালু করা হয়েছে এবং অতিরিক্ত তারল্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে।
এ ধরনের নীতির উদ্দেশ্য হলো বাজারে অর্থের প্রবাহ কমানো। মানুষ ও প্রতিষ্ঠান কম ঋণ নিলে ব্যয় কমবে, ফলে চাহিদা কমে মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণে আসবে- এটাই প্রচলিত অর্থনৈতিক তত্ত্ব।
কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। এখানে মূল্যস্ফীতির বড় অংশই এসেছে সরবরাহপক্ষের সংকট থেকে। অর্থাৎ উৎপাদন ব্যয় ও আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে পণ্যের দাম বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শুধু সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
বরং এর একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ঋণের সুদ বেড়ে যাওয়ায় উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ কমেছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মুদ্রানীতি প্রয়োজনীয় হলেও একে একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখলে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া কঠিন।
মূল্যস্ফীতি নিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, শুরুর দিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়নি। মূল্যস্ফীতি নিয়িন্ত্রণে মুদ্রানীতিসহ যে সমস্ত অর্থনৈতিক টুলস আছে, তা ব্যবহার করা হয়নি। এসব টুলস আমাদের অনেক পরে ব্যবহার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের দেশে শুধুমাত্র মুদ্রানীতির ব্যবহার করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। যেখানে বাজার অব্যবস্থাপনা এত বেশি, সেখানে শুধু মুদ্রানীতি কাজ করে না। আমাদের দেশে মার্কেট ম্যানিপুলেশন (বাজার কারসাজি), অলিগো-পলিক (একচেটিয়া) আচরণের কারণে বাজারে চাহিদা ও জোগানের মাধ্যমে মূল্য কমার স্বাভাবিক প্রবণতা বাধাগ্রস্ত করে। এর একটা উদাহরণ হলো দেশীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য যথেষ্ট সরবরাহ থাকার পরও কৃত্রিমভাবে মূল্যবৃদ্ধি করা হয়। তার মানে হচ্ছে, এখানে একটা সিন্ডিকেটের বিষয় রয়েছে।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আর্থিক পলিসির সঙ্গে মুদ্রানীতির একটা সমন্বয় করতে হয়। মুদ্রানীতি সংকোচন করা হলেও আমাদের আর্থিক পলিসি সংকোচনমূলক করা হয়নি; বরং সম্প্রসারণমূলক করা হয়েছে। ফলে সরকারি ব্যয় কমেনি। সরকারের পরিচালন ব্যয়, প্রশাসনিক ব্যয় অনেক বেশিই ছিল। ওইরকম একটা পরিস্থিতিতে শুধু মুদ্রানীতি সংকোচন করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের সাবেক গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ জায়েদ বখত বলেন, দুটি কারণে মূল্যস্ফীতির নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। একটি হলো মুদ্রাবিনিময় হার; ডলারের দাম ১১০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২২ টাকা করা হয়েছে। এখানে বড় জাম্প হয়েছে। আর দ্বিতীয় কারণটি হলো সুদহার; সদের হার বাড়ালেও এর প্রভাব আমরা এখানো পুরোপুরি পায়নি। মানি সাপ্লাই এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এসব কারণে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।
প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা কী বলে?
বাংলাদেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি এখন দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। প্রতিবেশী দেশ আফগানিস্তানে ৮.৬ শতাংশ, ভারতে ৩.৯৩ শতাংশ, পাকিস্তানে ১১.৭ শতাংশ, ভুটানে ৬.৬৮ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৩.৯ শতাংশ এবং নেপালে ৫.০৪ শতাংশ।
পাকিস্তান এখনো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং আর্থিক অস্থিরতার সঙ্গে লড়াই করছে। যদিও দেশটিতে গত বছর গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৪ শতাংশ।
২০২১ সালে শ্রীলঙ্কার মূল্যস্ফীতি ৪৯ শতাংশ উঠেছিল। আর ২০২২ সালে পাকিস্তানের মূল্যস্ফীতি ৩০ শতাংশে উঠেছিল। এ দুই দেশ মূল্যস্ফীতি ব্যাপকভাবে কমাতে পেরেছে। কিন্তু বাংলাদেশ কোনোভাবেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না।
সরকারের নানা উদ্যোগ কতটা সফল?
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার বিভিন্ন সময়ে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে ছিল- টিসিবির মাধ্যমে কম দামে নিত্যপণ্য বিক্রি, ওএমএস কার্যক্রম সম্প্রসারণ, কিছু পণ্যে আমদানি শুল্ক ও কর কমানো, বাজার তদারকি জোরদার, প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য আমদানি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ। সর্বশেষ বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে সীমিত পরিসরে ফ্যামিলি কার্ড চালু করেছে।
এসব উদ্যোগ স্বল্পমেয়াদে কিছু মানুষের জন্য স্বস্তি আনলেও সামগ্রিক বাজারে মূল্যস্ফীতির ওপর এর প্রভাব সীমিত ছিল। কারণ বাজারে সরবরাহ, প্রতিযোগিতা এবং বিতরণ ব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যাগুলো পুরোপুরি সমাধান হয়নি।
অনেক সময় দেখা গেছে, সরকার আমদানি শুল্ক কমালেও সেই সুবিধা পুরোপুরি ভোক্তার কাছে পৌঁছেনি। মধ্যবর্তী পর্যায়ে অতিরিক্ত মুনাফা যোগ হওয়ায় বাজারদর প্রত্যাশিত হারে কমেনি। অর্থাৎ শুল্ক ছাড়ের সুফল ভোক্তার নয়, মধ্যস্বত্বভোগী ও ব্যবসায়ীদের পকেটেই চলে গেছে। যে কারণে বাজার মূল্যে তার কোনো প্রভাব পড়েনি। এতে খাদ্য পণ্যের উচ্চ মূল্যস্ফীতি উচ্চই রয়ে গেছে।
তবে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি সাড়ে সাত শতাংশে নামিয়ে আনার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষা এবং অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নকে আগামী বাজেটে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষায় সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। আর এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির কার্যকর সমন্বয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ এবং বাজেট ঘাটতি সহনীয় পর্যায়ে রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তিনি আশাপ্রকাশ করছেন, শুধুই বাজার মনিটরিং নয়, বরং ব্যবসার খরচ কমানো এবং অর্থনীতিতে সুশাসন ও দক্ষতার মাধ্যমেই স্থায়ীভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। পাশাপাশি উৎপাদন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে ফিরিয়ে আনা হবে বাজারে স্থিতিশীলতা।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কী করা প্রয়োজন?
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার আলোকে কয়েকটি নীতিগত পদক্ষেপ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, কৃষি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত বীজ, সেচব্যবস্থা এবং সংরক্ষণ অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
দ্বিতীয়ত, খাদ্য ও নিত্যপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল আধুনিক করতে হবে। উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমাতে হবে। তৃতীয়ত, বাজার তদারকিকে শুধু অভিযাননির্ভর না রেখে তথ্যনির্ভর ও প্রাতিষ্ঠানিক করতে হবে।
চতুর্থত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও নীতিগত সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন, যাতে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য সামনে রেখে নেওয়া যায়।
পঞ্চমত, রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। একদিকে যদি সুদের হার বাড়ানো হয়; অন্যদিকে অতিরিক্ত সরকারি ব্যয় অর্থনীতিতে নতুন চাহিদা তৈরি করলে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া কঠিন হবে।
ষষ্ঠত, আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশীয় উৎপাদন ও কৃষি-শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সপ্তমত, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে আরও লক্ষ্যভিত্তিক, স্বচ্ছ ও কার্যকর করতে হবে, যাতে প্রকৃত দরিদ্র পরিবারগুলো দ্রুত সহায়তা পায়।
গত চার বছরের অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে একক কোনো নীতি যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতির পাশাপাশি প্রয়োজন কার্যকর রাজস্বনীতি, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা, দক্ষ সরবরাহ শৃঙ্খল এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- নীতিগুলোর মধ্যে সমন্বয়। কারণ একটি নীতির ইতিবাচক প্রভাব অন্য নীতির দুর্বলতায় অনেক সময় হারিয়ে যায়।
বাংলাদেশে কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে দীর্ঘ বিপণন শৃঙ্খল দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে কৃষক ন্যায্য দাম পান না অথচ শহরের ভোক্তাকে সেই পণ্যই কয়েকগুণ বেশি দামে কিনতে হয়। এতে বোঝা যায়, শুধু উৎপাদন নয়, বাজার ব্যবস্থাপনায়ও বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, ‘মূল্যস্ফীতিকে শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে মোকাবিলা করা যথেষ্ট হবে না। সুদের হার ও ঋণপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা, আমদানি ব্যবস্থাপনা, বিনিময় হার, জ্বালানি ব্যয়, বাজার তদারকিকে একসঙ্গে দেখতে হবে।
তিনি বলেন, বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো, মজুদদারি ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, কৃষি উৎপাদন ও পরিবহন ব্যবস্থার অদক্ষতা কমানো জরুরি। একইসঙ্গে গ্রামীণ ও শহুরে দরিদ্র, নিম্ন-মধ্যবিত্ত, স্থির আয়ের মানুষ ও অনানুষ্ঠানিক শ্রমজীবীদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা, স্বল্পমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, নগদ সহায়তা এবং কর্মসংস্থানভিত্তিক সহায়তা বাড়াতে হবে। কারণ মূল্যস্ফীতি শেষ পর্যন্ত শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি মানুষের খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা ও জীবনমানের ওপর সরাসরি আঘাত।
মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ
মূল্যস্ফীতির চার বছরের এই অধ্যায় বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে একটি কঠিন পরীক্ষা। এই সময়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে, মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নীতিনির্ধারকদের সামনে জটিল সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে।
তবে এই সংকট একইসঙ্গে একটি সুযোগও তৈরি করেছে। অর্থনীতির দুর্বল জায়গাগুলো এখন অনেক বেশি স্পষ্ট। কৃষি, জ্বালানি, বৈদেশিক মুদ্রা, বাজার ব্যবস্থাপনা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং আর্থিক খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার যদি এখনই শুরু করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতের ধাক্কা মোকাবিলা করা অনেক সহজ হবে।
মূল্যস্ফীতি কখনো পুরোপুরি শূন্যে নামবে না, সেটি কোনো অর্থনীতির লক্ষ্যও নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি স্থিতিশীল অর্থনীতি, যেখানে মানুষের আয় মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়বে, বাজার হবে প্রতিযোগিতামূলক, সরবরাহ ব্যবস্থা হবে দক্ষ এবং নীতিনির্ধারণ হবে তথ্যভিত্তিক ও সমন্বিত।
শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি শুধু অর্থনীতির একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণের মান, বাজার ব্যবস্থার দক্ষতা এবং মানুষের জীবনমানের একটি আয়না। গত চার বছরের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সংকট যতটা বৈশ্বিক ছিল, তার মোকাবিলার সক্ষমতা ততটাই নির্ভর করেছে দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক ভিত্তি ও নীতিগত প্রস্তুতির ওপর। আগামী দিনে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে মূল্যস্ফীতি আর মানুষের নিত্যদিনের অনিশ্চয়তার প্রতীক না হয়ে, নিয়ন্ত্রিত ও সহনীয় একটি অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হয়।