আর্জেন্টিনায় ঘৃণা বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতার কবলে মুসলিমরা
২ জুলাই ২০২৬ ২১:২৮
সংকটে তরুণ প্রজন্ম
॥ মুহাম্মদ আল্-হেলাল ॥
আর্জেন্টিনা দক্ষিণ আমেরিকার দ্বিতীয় এবং পৃথিবীর অষ্টম বৃহত্তম দেশ। ১৮৩১ থেকে ১৮৫২ সাল পর্যন্ত আর্জেন্টিনা কনফেডারেশন (স্প্যানিশ: Confederación Argentina) ছিল বর্তমান আর্জেন্টিনার সর্বশেষ পূর্বসূরি রাষ্ট্র। ১৯৩১ সালে প্রদেশগুলো কোনো রাষ্ট্র প্রধান ছাড়াই একটি কনফেডারেশন হিসেবে সংগঠিত হয়। বুয়েনস আয়ারস প্রদেশের গভর্নর (অধিকাংশ সময়কালে হুয়ান মানুয়েল দে রোসাস) এই সময়ে দেশটির বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনা করেছিলেন। তার শাসনাধীনে আর্জেন্টিনা কনফেডারেশন ব্রাজিল, বলিভিয়া, উরুগুয়ে, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি আর্জেন্টিনা গৃহযুদ্ধ ও বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলোর আক্রমণ প্রতিহত করেছিল। দেশটির মোট আয়তন ২৭ লাখ ৮০ হাজার ৪০০ কিলোমিটার, জনসংখ্যা ৪৪.২৯ মিলিয়ন (ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক ২০১৭)। দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত ২০০৯ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী এখানকার মুসলিম জনসংখ্যা ৭ লাখ ৮৪ হাজার। আর ২০১০ সালের পিউ রিসার্চ অনুসায়ী, আর্জেন্টিনায় প্রায় ১০ লাখ মুসলিম রয়েছে। ‘দ্য অ্যাসোসিয়েশন অব রিলিজিয়াস ডেটা আর্কাইভস’-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ২ শতাংশ মুসলিম, যারা ইসলামোফোবিয়ায় জর্জরিত।
ইসলামের আলো : ইতিহাসবিদদের মতে, পঞ্চদশ শতাব্দীতে ‘মুরিশ-মরিস্কো’ (Moorish-Moriscos) মুসলিমরা স্প্যানিশ অভিযাত্রীদের সঙ্গে প্রথম এই অঞ্চলে আসেন। ‘মুরিশ-মরিস্কো’ মূলত উত্তর আফ্রিকান ও স্প্যানিশ বংশোদ্ভূত সেই মুসলিম যাদের স্পেনে জোরপূর্বক ইসলাম থেকে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণে বাধ্য করা হয়েছিল। ধর্মীয় নিপীড়ন ও বৈষম্যের কারণে তাদের অনেকেই নতুন জীবনের সন্ধানে আর্জেন্টিনায় বসতি স্থাপন করেন। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা স্প্যানিশ উপনিবেশ থাকাকালীন বহুসংখ্যক কালো আফ্রিকানদের দাস হিসেবে আনা হয় আর্জেন্টিনায়। এর মধ্যে ছিল আফ্রিকার দেশ মরক্কোর বহু মুসলিম বাসিন্দা।
আরব অভিবাসন : ঊনবিংশ শতাব্দীর বিভিন্ন সময় আরব দেশ তথা বর্তমান লেবানন ও সিরিয়া থেকে অনেকে অভিবাসী পাড়ি জমান দেশটিতে। মূলত ওসমানী খেলাফতের পতনের পর প্রায় সাড়ে ৩ লাখ আরব অভিবাসী আর্জেন্টিনায় আশ্রয় নেয়। এর মধ্যে অধিকাংশ ছিল আরব-খ্রিস্টান। এছাড়া কিছু মিজরাহি গোত্রীয় ইহুদি ও সংশয়বাদী ইহুদিও ছিল। প্রায় ১ লাখ মুসলিম তখন আর্জেন্টিনায় অভিবাসী হয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম’ এর রিপোর্ট অনুসারে আর্জেন্টিনায় বর্তমানে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুসলমান বাস করলেও সরকার কর্তৃক তারা নিষ্পেষিত।
মুসলিম ও আবর বংশোদ্ভূত প্রেসিডেন্ট : ১৯৮৯-১৯৯৯ সালে আরব বংশোদ্ভূত কার্লোস সাউল মেনেম আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আর্জেন্টিনার প্রথম মুসলিম ও আরব বংশোদ্ভূত প্রেসিডেন্ট। তার সাবেক স্ত্রী জুলিমা ইয়মা বলেন, ‘মেনেম ১৯৬৬ সালে ইসলামধর্ম ত্যাগ করে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন শুধু দেশটির প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য।’ তবে জানা যায় তিনি মুসলমানদের প্রতি উদার ছিলেন। আর্জেন্টাইন মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ‘দ্য ইসলামিক সেন্টার অব আর্জেন্টিনা’। এটি নির্মাণে সৌদির সহায়তার জন্য প্রেসিডেন্ট কার্লোস মেনেম ১৯৯২ সালে এক রাষ্ট্রীয় সফরে সৌদি আরবে যান। পরবর্তীতে সৌদি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এখানে একটি বৃহৎ আয়তনের মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার গড়ে তোলা হয়। ২০০০ সালে প্রখ্যাত সৌদি স্থপতি জুহায়ের ফাওয়াজের ডিজাইনে মসজিদটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। তবে এর আগে ১৯৮৫ সালে মুসলমানদের জন্য আর্জেন্টিনার মুসলিম স্থপতি আহমাদের ডিজাইনে আল আহমাদ মসজিদ এবং ১৯৮৩ সালে ইরানি দূতাবাসের সহযোগিতায় রাজধানী বুয়েনস আয়ারসে প্রথম ‘আত-তাওহিদ’ মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। লাতিন আমেরিকান মুসলমানদের সংগঠন ‘ইসলামিক অর্গানাইজেশন অব লাতিন আমেরিকার (আইওএলএ)’ সদর দপ্তরও আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আয়ারসে অবস্থিত। আর্জেন্টিনার স্থানীয় সংগঠনের মধ্যে ‘সেন্টার ফর ইসলাম ইন রিপাবলিক অব দ্য আর্জেন্টাইন (সিআইআরএ) সবচেয়ে প্রভাবশালী। ১৯৩১ সালে আর্জেন্টিনায় বসবাসকারী আরব মুসলিমদের দ্বারা এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে বর্তমান আর্জেন্টিনা সরকারের ইসলামবিরোধী নীতির কারণে এসব প্রতিষ্ঠানে মুসলিমদের উপস্থিতি কম।
Islam Almost Disappeared : ‘সিআইআরএ’র প্রতিনিধি আলেক্সিস আই সায়ের বলেন, ‘নাইন-ইলেভেনের পর আর্জেন্টিনার মুসলমানরা আতঙ্কে অনেকে নিজেদের মুসলিম হিসেবে পরিচয়ই দিত না।’ চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে আরো বলেন, ‘মুসলমানরা কর্মক্ষেত্রে সবসময় ৫ ওয়াক্ত সালাত, রমাদানে সিয়াম পালনের সুযোগ পান না।’ ‘কাউন্সিল অন হেমসিগ্রিক অ্যাফেয়ার্স’-এর সহযোগী ভিনসেন্ট লোফাসোর মতে, আর্জেন্টাইন মুসলিমদের সমস্যা হচ্ছে, ‘মাতৃভাষা, বিশেষ করে স্প্যানিশে কুরআন সহজলভ্য নয়। তারা অনেকে আরবি ভাষায় সূরা-ক্বিরাত জানে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘সেখানে ইসলামিক স্কুল ও প্রশিক্ষণকেন্দ্রের অভাব রয়েছে। ফলে অনেকে ইসলাম ভুলে খ্রিষ্টধর্ম দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছেন।’ ইসলামিক সেন্টার অব নর্থ অ্যামেরিকার ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল ওয়াক্কাস সাঈদের মতে, দেশটির মসজিদগুলোয় জুমার সালাতেও পর্যাপ্ত মানুষ পাওয়া যায় না। শায়খ ফারাজ রাব্বানী আর্জেন্টিনায় সফর শেষে তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি ভিডিও ডকুমেন্টারি বানিয়েছেন, ‘How Islam Almost Disappeared from Argentina’।
‘শাসন করা মানেই জনসংখ্যা বাড়ানো’ : আর্জেন্টিনা রাষ্ট্র গঠনের শুরু থেকেই দেশটির এলিটরা জনসংখ্যা ও সংস্কৃতিকে ‘শ্বেতাঙ্গ’ করার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়েছিল। ১৯৪৯ সালের সামাজিক সংবিধান বা ১৯৯৪ সালের গণতান্ত্রিক সংস্কারÑ কোনোটিই ইউরোপকে সেই শ্রেষ্ঠ ভাবার মানসিকতা বদলাতে পারেনি যে ধারণাকে আর্জেন্টিনার ১৮৫৩ সালের সংবিধানের মূল রূপকার হুয়ান বাউতিস্তা আলবার্দি সংক্ষেপে বলেছিলেন, ‘শাসন করা মানেই জনসংখ্যা বাড়ানো।’ যেটি সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে যুক্ত করে আদিবাসী ও মুসলিম কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে মুছে ফেলা এবং ইউরোপীয় অভিবাসনকে উৎসাহিত করতে রাষ্ট্রকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
‘The Free Womb Act’ : ব্রাজিলের মতো আর্জেন্টিনায়ও আটলান্টিক দাস বাণিজ্য চলে। ১৬ শতাব্দীর শেষদিকে আর্জেন্টিনায় কৃষিকাজের জন্য পেদ্রো গুমেস রেইনেল নামের এক পর্তুগিজ আদম ব্যবসায়ী বার্ষিক ৬০০ জন দাস নিয়ে আসার জন্য চুক্তিবদ্ধ হন। এভাবে ৩০০ বছরে আর্জেন্টিনায় প্রায় ২,০০,০০০ দাস আনা হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষদিকে (১৭৮০-৯০) আফ্রিকা থেকে আসা কৃষ্ণাঙ্গরা আর্জেন্টিনার জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকে পরিণত হয়। পরে ১৮১২ সালে আর্জেন্টিনায় দাসপ্রথা নিষিদ্ধের প্রস্তাব হয় এবং ১৮১৩ সালে দাসপ্রথা বন্ধে ‘The Free Womb Act’ অর্থাৎ দাস মাতাদের সন্তানরা স্বাধীন, আইনটি গৃহীত হয়, যা বিভিন্ন দেশে দাসপ্রথা বাতিলের দিকে বড় পদক্ষেপ। অঞ্চলটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে দাসপ্রথার সমাপ্তি ঘটে ১৮৫৩ সালে; যদিও আর্জেন্টিনায় ১৮৬১ সাল পর্যন্ত দাসপ্রথা কার্যকর ছিলো। এই কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য দেশটিতে ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট এগেইনস্ট ডিসক্রিমিনেশন, জেনোফোবিয়া অ্যান্ড রেসিজম’ কমিশন তৈরি হয়েছিল, যা আন্তর্জাতিকভাবেও প্রশংসিত হয়েছিল। ইন্টার-আমেরিকান কমিশন অন হিউম্যান রাইটস একে একটি বড় অগ্রগতি বলেছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার সংগঠনটি বন্ধ করে কৃষ্ণাঙ্গদের কয়েক দশকের লড়াইয়ের অর্জনকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। (রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, ফেদেরিকো পিটা; আর্জেন্টিনা)।
আর্জেন্টিনায় কালো মানুষ নিধন প্রকল্প : আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট বুদ্ধিজীবী ও লেখক ডমিঙ্গো ফস্তিনো সারমিয়েন্তো ছিলেন একজন হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট। তিনি ১৮৬৮-১৮৭৪ সাল আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। আর্জেন্টিনাকে ‘কালো মানুষমুক্ত’ করার জন্য তিনি উদ্যোগ নেন। ইতোপূর্বে ‘War of the triple alliance’ খ্যাত আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, উরুগুয়ে মিলে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। তিনি কৃষ্ণাঙ্গদের বাধ্য করেন সেনাবাহিনীতে যোগদানে। সেই যুদ্ধে হাজার-হাজার কৃষ্ণাঙ্গ মারা যায়। আর্জেন্টিনাকে কৃষ্ণাঙ্গমুক্ত করার জন্য কৃষ্ণাঙ্গদের ছোট-খাটো অপরাধে দীর্ঘদিন জেলে রেখে অপবাদ দিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। এছাড়া সারমিয়েন্তোর আহ্বানে ইউরোপ থেকে আসা প্রায় ৪০ লাখ সাদা চামড়ার ইউরোপীয় অভিবাসী আর্জেন্টিনাকে বানিয়ে নেয় হোমল্যান্ড। এভাবেই কালো মুসলিমদের নিধনের পর আর্জেন্টিনা পরিণত হয় সাদা মানুষের দেশ। দুঃখজনক হলেও সত্য, ২৫০ বছর পূর্বে যে দেশে সাদা-কালো মানুষের অনুপাত ছিলো প্রায় সমান, সেটির অনুপাত আজ ৯৭:৩।
মিলেইয়ের ইহুদি ও ইসরাইলী প্রীতি : আর্জেন্টিনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই রাজধানী বুয়েনস আয়ারসের পালাসিও লিবের্তাদ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে প্রভাবশালী ইহুদি ধর্মীয় নেতা রাব্বি মেনাহেম মেন্ডেল শ্নিয়ারসনের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রধান বক্তা হিসেবে মুসলিম গণহত্যাকারী ইহুদি-খ্রিস্টীয় মূল্যবোধের প্রশংসা করে বক্তব্য দিয়েছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চাবাদ আন্দোলনের কোনো বড় অনুষ্ঠানে দায়িত্বশীল একজন অ-ইহুদি রাষ্ট্রপ্রধানের আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নিবেদনের ঘটনা এটিই প্রথম। ২০২৩ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি ইসরাইলপন্থি পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেন। এর আগে মিলেই নিউইয়র্কে রাব্বি শ্নিয়ারসনের সমাধি পরিদর্শন করেন। এসবের প্রতিদানে ২০২৪ সালে মায়ামির একটি চাবাদ সিনাগগে মিলেইকে সম্মানিত করা হয়। সেখানে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে তিনি বলেন, তার বিশ্বাস, তার মধ্যে ইহুদি বংশধারা রয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইহুদি ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা করছেন। প্রেসিডেন্ট পদ থেকে অবসরের পর ইহুদি ধর্ম গ্রহণের ইচ্ছাও প্রকাশ করেন তিনি। ৪০ মিনিটের ভাষণে মুসলিমবিদ্বেষী মিলেই মূলত ইহুদি ধর্মীয় গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি দেন এবং সেগুলোকে তার অর্থনৈতিক দর্শনের ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন।
‘প্রেসিডেন্ট মেডেল’ : সম্প্রতি মিলেইয়ের আর্জেন্টিনা ও ইসরাইলের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলোর নামকরণ করা হয় ২০২০ সালের ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর অনুকরণে। আরব দেশের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ভিত্তি হিসেবে ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ পরিচিত। ধারণা করা হয়, আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মডেল লাতিন আমেরিকায়ও সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে মিলেই ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডসকে দুই দেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেন। দেশটির দাবি, ১৯৯২ সালে বুয়েনস আয়ারসে ইসরাইলি দূতাবাসে হামলা এবং ১৯৯৪ সালে একটি ইহুদি কমিউনিটি সেন্টারে বোমা হামলার পেছনে ইরানি কর্মকর্তা ও আইআরজিসির সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ রয়েছে। তবে ইরান বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। মিলেইকে মূল্যায়ন করেই ইসরাইলের রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা কমিটির সর্বসম্মত সুপারিশের ভিত্তিতে মর্যাদাপূর্ণ ‘প্রেসিডেন্ট মেডেল’ পুরস্কারের জন্য তাকে সম্প্রতি মনোনীত করা হয়েছে। কমিটির সভাপতিত্ব করেছেন সাবেক সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতি ইয়োরাম ড্যানজিগার। মিলেই আর্জেন্টিনার দূতাবাস জেরুসালেমে স্থানান্তরের মতো কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছেন। এই বিষয়ে ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ উল্লেখ করেন, যুদ্ধকালীন সময়েও মিলেই তার প্রথম আনুষ্ঠানিক সফরের জন্য ইসরাইলকে বেছে নিয়েছেন, যা দুই দেশের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব এবং তার অটল সমর্থনের প্রতিফলন। ‘প্রেসিডেন্ট মেডেল’ মূলত সেইসব ব্যক্তিদের প্রদান করা হয়, যারা গণহত্যাকারী ইসরাইল রাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করেন। এটি ইসরাইলের অন্যতম সর্বোচ্চ এবং মর্যাদাপূর্ণ বেসামরিক সম্মান হিসেবে বিবেচিত। মিলেইয়ের আসন্ন ইসরাইল সফরকালে প্রেসিডেন্ট ভবনে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্টের হাতে সম্মাননা তুলে দেবেন ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ।
ইউরোপীয় ইহুদিদের গন্তব্য আর্জেন্টিনা : ইউরোপে ক্রমবর্ধমান উদ্বিগ্ন ইহুদিদের মিলেইয়ের নেতৃত্বাধীন মুসলিমবিদ্বেষী আর্জেন্টিনায় বসবাসের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাবলো কুইর্নো সম্প্রতি ব্রিটেন ও ইউরোপের অন্যান্য দেশে বসবাসকারী ইহুদিদের উদ্দেশে দেওয়া এক বার্তায় আর্জেন্টিনার আকর্ষণীয় দিকগুলো তুলে ধরেন। ইহুদিদের প্রতি আর্জেন্টিনার এমন অবস্থান নিয়ে কথা বলেছেন দেশটিতে নিযুক্ত ইসরাইলের রাষ্ট্রদূত ইয়াল সেলা। তিনি বলেন, ‘আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আমি একমত। অবশ্যই ইহুদি জীবনযাপনের জন্য ইসরাইল সবসময়ই সেরা জায়গা। তবে ইউরোপের তুলনায় ইহুদিদের জন্য আর্জেন্টিনা অনেক ভালো একটি জায়গা।’
ধর্মীয় বৈষম্য : আর্জেন্টিনা সংবিধান রোমান ক্যাথলিক চার্চকে বিশেষ আইনগত মর্যাদা দেয়ায় মুসলিমসহ অন্যান্য সম্প্রদায় উদ্বিগ্ন। আর্জেন্টিনার ধর্মীয় স্বাধীনতা কাউন্সিল Cnter of Argentina Legal and Indepenence for Religions (CALIR) ও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে পররাষ্ট্র ও পূজাবিষয়ক মন্ত্রণালয় অ্যান্টিসেমিটিজম মোকাবিলার জন্য রাষ্ট্রের প্রথম বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে Fabiana Loguzzo-কে নিয়োগ করেছে। যদিও মিডিয়া রিপোর্ট এবং ইসলাম ফর পিস ইনস্টিটিউট অনুযায়ী, মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যরা ধর্মীয় বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতার শিকার। CIRA এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এসব বক্তব্যকে প্রকাশ্য ইসলামভীতির উদাহরণ বলে নিন্দা জানায়। এ প্রসঙ্গে আর্জেন্টিনা ইসলামিক সেন্টারের নির্বাহী সচিব মার্টিন সাদে এবং সান ক্রিস্টোবাল এলাকার আল-আহমদ মসজিদের ইমাম শাইখ মুহাম্মদ আহমদ জালাল মুহাম্মদ সংবাদদাতাকে জানান, ইসলামভীতি আর প্রান্তিক কোনো বিষয় নয়; বরং এটি আর্জেন্টিনায় উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে।
আল-কলম অনুষ্ঠান বন্ধ : CIRA নির্বাহী সচিব মার্টিন সাদে বলেন, সরকারের জাতীয় টেলিভিশনে বহু বছর ধরে প্রচারিত আল-কলম অনুষ্ঠানটি ২০২৪ সালের শেষদিকে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই বন্ধ করা মুসলিম সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আরেকটি বৈষম্য; তিনি বলেন এই অনুষ্ঠানটির কোনো খরচ ছিল না, সম্পূর্ণভাবে আমরা তৈরি করতাম। কিন্তু যখন ফিলিস্তিনে ইসরাইলের হামলা তীব্র হলো, তখনই হঠাৎ করে অনুষ্ঠানটি সম্প্রচার থেকে সরিয়ে নেওয়া হলো। তবে আল-আহমদ মসজিদের ইমাম শায়খ জালাল আর্জেন্টিনার আন্তঃধর্মীয় সংলাপকে আশার আলো হিসেবে উল্লেখ করে বলেন আর্জেন্টিনায় অন্যান্য ধর্মীয় সমাজের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ইতিবাচক। সমস্যা ধর্মগুলোর মধ্যে নয়; সমস্যা হলো কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠীর অপব্যবহার, যারা ঘৃণাচর্চা থেকে লাভবান হয়। তিনি আরও যোগ করেন দুর্ভাগ্যবশত বিচার বিভাগেও দ্বৈত মানদণ্ড স্পষ্ট; কেউ ইসরাইল নিয়ে মন্তব্য করায় মাসের পর মাস আটক থাকে অথচ যারা প্রকাশ্যে মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করার আহ্বান জানায়, তারা শাস্তি থেকে রেহাই পায়।
আর্জেন্টিনার অধিকাংশ মুসলিম তরুণ আরবি ভাষা থেকে দিন দিন দূরে সরে যাচ্ছে। এই ভাষাগত দূরত্ব তাদের জীবনে নতুন এক সংকটের জন্ম দিয়েছে। পাশাপাশি স্প্যানিশ গণমাধ্যমেও ইসলাম সম্পর্কে ইতিবাচক ও তথ্যভিত্তিক উপস্থাপনা খুব একটা দেখা যায় না। ফলে নতুন প্রজন্মের অনেক মুসলিম নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়, ঐতিহ্য এবং ইসলামের প্রকৃত শিক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত হতে পারছে না। ইসলামিক অর্গানাইজেশন অব লেটিন আমেরিকা (আইওএলএ)-এর মহাসচিব ড. মুহাম্মদ ইউসুফ জানান, আর্জেন্টিনার মুসলিমদের অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তিনি ইসলামের মৌলিক জ্ঞানে গভীর পাণ্ডিত্যের পাশাপাশি আরব ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে যোগযোগ ও গভীর সম্পর্ক স্থাপনের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন।
তথ্যসূত্র : ইসলাম ওয়েব ডটকম, আর মারিফা ডটকম, দ্য আর্জেন্টিনা ইন্ডিপেন্ডেন্ট, দ্য সিয়াসাত ডেইলি, বিবিসি, আল-জাজিরা।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল :alhelaljudu@gmail.com