বাজেট পাস, বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ
২ জুলাই ২০২৬ ২১:০৮
* সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কর্মসূচির অভাব * ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা * মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামানোর ঘোষণা
॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার (৯.৩৮ ট্রিলিয়ন টাকা) বাজেট গত ৩০ জুন মঙ্গলবার কণ্ঠভোটে আনুষ্ঠানিকভাবে পাস হয়েছে। এটি দেশের ৫৫তম বাজেট।
২০২৬ সালের ৩০ জুন মঙ্গলবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই বাজেট পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। নতুন অর্থবছরের প্রথম দিন অর্থাৎ ২০২৬ সালের ১ জুলাই বুধবার থেকে এই বাজেট কার্যকর করা হয়েছে। বাজেট বাস্তবায়নে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাজেট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি দীর্ঘ ১৯ বছর পর জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে ও অবাধ অংশগ্রহণে নির্বাচিত কোনো সরকারের প্রথম জাতীয় বাজেট। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে হাসিনার ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর প্রায় দেড় বছর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশ পরিচালনা করে। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ ২০০১ সালের নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ২০০৬-০৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেছিল। সেই হিসাবে দীর্ঘ ১৯ বছর পর ২০২৬ সালে জনগণের ভোটের ম্যান্ডেট নিয়ে গঠিত কোনো সরকার এই বাজেট প্রণয়ন ও পাস করেছে। উল্লেখ্য, এবারের বাজেটও পেশ এবং পাস হলো বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের দায়িত্ব পালনকালে।
বিএনপি সরকারের ১৩তম বাজেট : এটি বিএনপির হাতে প্রণীত ১৩তম পূর্ণাঙ্গ জাতীয় বাজেট। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন মেয়াদে বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রীদের পেশ করা বাজেটগুলো হলো- ১. জিয়াউর রহমানের শাসনামল (৩টি বাজেট) : জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক থাকাকালীন এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর আমলে মোট ৩টি বাজেট (১৯৭৮-৭৯, ১৯৭৯-৮০ এবং ১৯৮০-৮১) পাস হয়। এর মধ্যে ১৯৭৮ সালের বাজেটটি তৎকালীন উপদেষ্টা এমএন হুদা এবং পরের দুটি বাজেট অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান পেশ করেন।
২. প্রথম খালেদা জিয়া সরকার ১৯৯১-৯৬ (৫টি বাজেট) : ১৯৯১ সালে বিএনপি সংসদীয় গণতন্ত্রে ফেরার পর গঠিত সরকারের অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান টানা ৫টি অর্থবছর (১৯৯১-৯২ থেকে ১৯৯৫-৯৬) পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ ও পাস করেন। ৩. দ্বিতীয় খালেদা জিয়া সরকার ২০০১-০৬ (৪টি বাজেট) : ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার গঠনের পর অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান আরও ৪টি পূর্ণাঙ্গ বাজেট (২০০২-০৩ থেকে ২০০৫-০৬ অর্থবছর) জাতীয় সংসদে পাস করান। ২০০৬-০৭ অর্থবছরের বাজেটটি সাইফুর রহমান পেশ করলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তা পূর্ণাঙ্গভাবে পাস করে যেতে পারেনি তৎকালীন সরকার। ৪. বর্তমান বিএনপি সরকার ২০২৬ (১টি বাজেট) : ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়ী হয়ে দীর্ঘ দুই দশক পর ক্ষমতায় এসে এটি বর্তমান মেয়াদে বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট। নতুন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর জীবনেরও এটি প্রথম বাজেট।
একনজরে বাজেটের চিত্র
বাজেটের মূল বিষয়গুলোর ওপর একনজরে চোখ বুলালে যে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দেখা যায় তা হলো-
১. বাজেটের শিরোনাম : ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’। ২. বাজেটের আকার ও প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাজেটের মোট আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। (চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেট ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা থেকে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি)। ৩. জিডিপি প্রবৃদ্ধি : আগামী অর্থবছরে ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ৪. মূল্যস্ফীতি : মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ধরা হয়েছে। ৫. আয় ও ব্যয় রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে আদায়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। ৬. পরিচালন ব্যয় : মোট পরিচালনা ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। (যার মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ অন্তত ৮৯ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা ব্যয় হবে)। ৭. উন্নয়ন ব্যয় (এডিপি) : মোট উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১৬…৭৫ কোটি টাকা। ঋণের সুদ পরিশোধ- দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ মেটাতেই সরকারের ব্যয় হবে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। ৮. বাজেট ঘাটতি ও অর্থায়ন মোট ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা (যা জিডিপির ৩.৬ শতাংশ)। ৯. অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ : ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হবে (এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা)। ১০. বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ : বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ধরা হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা।
অর্থবিলে আনা প্রধান কিছু সংশোধনী ও পরিবর্তন
বাজেট পাসের আগের দিন প্রধান কিছু সংশোধনী ও পরিবর্তনসহ অর্থবিল পাস হয়েছে। বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো অর্থবিল। বাজেটে সরকারের আয়-ব্যয়ের যে রূপরেখা দেওয়া হয়, তার মধ্যে কর ও শুল্ক সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো আইনিভাবে কার্যকর করার মাধ্যমই হলো অর্থবিল। এতে থাকে সরকারের রাজস্ব আদায়, করারোপ, শুল্ক পরিবর্তন ও আর্থিক আইন সংশোধনের আইনি প্রস্তাব। তাই প্রতি বছর বাজেট পাসের আগে সংসদে অর্থবিল পাস করা হয়।
এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তবে অর্থবিলে আনা গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংশোধনী ও পরিবর্তন বাজেট অনুমোদনের আগের দিন সংসদে পাস করা হয়েছে।
জনগণের আপত্তি, ব্যবসায়ী মহলের দাবি এবং প্রধান বিরোধীদল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জনসাধারণের সুবিধার্থে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব করেছিলো। সেই প্রস্তাবের আলোকে পরিবর্তন এনে অর্থবিল পাস করেছে জাতীয় সংসদ।
জনগণের আপত্তি, ব্যবসায়ী মহলের দাবি, জনগণের প্রতিনিধি প্রধান বিরোধীদল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের পর্যালোচনার প্রেক্ষিতে অর্থবিল-২০২৬-এ মোট ৬৪টি সংশোধনী ও পরিবর্তন এনে এটি পাস করা হয়েছে। বাজেট অনুমোদনের ঠিক আগে অর্থবিলে আনা প্রধান পরিবর্তনগুলো হলো-
১. আয়কর ও করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি : সাধারণ করদাতাদের স্বস্তি দিতে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হয়েছে। পরবর্তী ৫ বছরের জন্য এটি পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে (২০৩০-৩১ অর্থবছরে এটি ৫ লাখ টাকা হবে)।
২. ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে টিআইএন বাতিল : ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (TIN) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবটি সাধারণ গ্রাহকদের সুবিধার্থে পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া নামজারি (মিউটেশন) ও বণ্টন দলিলের ক্ষেত্রেও টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়েছে।
৩. ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের অতিরিক্ত ছাড় : পার্বত্য জেলা ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ব্যবসা ও কৃষির পাশাপাশি এখন থেকে বেতনজনিত আয়কেও করমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
৪. কালো টাকা ও করপোরেট কর সংশোধন এবং কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল : জমি বা ফ্ল্যাট কেনায় বিনা প্রশ্নে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা বিনিয়োগের বিতর্কিত সুবিধাটি তীব্র সমালোচনার মুখে পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছে।
৫. বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর হ্রাস : বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের ওপর প্রস্তাবিত ১০% কর কমিয়ে ৫% নির্ধারণ করা হয়েছে।
৬. কোম্পানির করপোরেট কর রেয়াত : তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করপোরেট করের হার শর্তসাপেক্ষে আরও ২.৫% পর্যন্ত কমানো হয়েছে। লভ্যাংশ আয়ের (Dividend Income) ওপর নিয়মিত হারে করারোপের প্রস্তাব বাতিল করে পূর্বের ২০% হার বজায় রাখা হয়েছে।
৭. ভ্যাট ও শুল্কের ক্ষেত্রে বড় ছাড় এবং ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে ভ্যাট হ্রাস : ফেসবুক, গুগল, ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্ম এবং অনলাইন মার্কেটে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ওপর প্রস্তাবিত ১৫% ভ্যাট কমিয়ে মাত্র ৫% করা হয়েছে। হুন্ডি প্রতিরোধ ও বৈধ চ্যানেলে পেমেন্ট উৎসাহিত করতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
৮. দেশীয় শিল্প ও গাড়ি উৎপাদন : স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বা অ্যাসেম্বলড ডাবল কেবিন পিকআপ ও মাইক্রোবাসের ভ্যাট ১৫% থেকে কমিয়ে ৫% করা হয়েছে।
৯. কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কছাড় : শিল্পে ব্যবহৃত পিভিসি (PVC) ও পিইটি (PET) রেজিনের আমদানি শুল্ক ১০% থেকে কমিয়ে ৫% করা হয়েছে। এছাড়া মাছ ও চিংড়িশিল্পের ফিড, ভিটামিন ও যন্ত্রপাতি আমদানির সব শুল্ক-ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে। সোনা ও জহরত আমদানিতে ক্যাপিটাল গেইন্স ট্যাক্স ১৫% থেকে কমিয়ে ৫% করা হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ
এবারের বাজেট বিশাল ও উচ্চাভিলাষী বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। বিরোধীদলীয় হুইপ ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান মন্তব্য করেন, ‘দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি এবং ব্যাংকিং খাতের এই দুর্বল দশার মধ্যে এত বড় বাজেট বাস্তবায়ন করা বর্তমান সরকারের জন্য অসম্ভব।’
সিপিডির ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান সামগ্রিক অর্থনীতি বিবেচনা করে মন্তব্য করেন, ‘বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে এই বাজেটে শুধু প্রবৃদ্ধির সংখ্যা বাড়ানোর দিকে নজর না দিয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো এবং সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়ার প্রয়োজন ছিল বেশি।’
তাদের মতো অধিকাংশ বিশ্লেষকই মনে করেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট খুবই চ্যালেঞ্জিং। তারা বাস্তবায়নে প্রধানত ৫টি বড় অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে এ বাজেট অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করেন। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডিসহ (CPD) দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, লক্ষ্যমাত্রাগুলোর উচ্চাকাক্সক্ষা এবং দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ভিত্তির দুর্বলতাই এই আশঙ্কার মূল কারণ।
বিশ্লেষকদের চিহ্নিত করা প্রধান ৫টি চ্যালেঞ্জ সংক্ষেপে তুল ধরা হলো-
১. উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ (Inflation Pressure); নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। বর্তমানে বাজারে জিনিসপত্রের দাম যেভাবে ঊর্ধ্বমুখী, তাতে শুধু নীতিগত ঘোষণা দিয়ে মূল্যস্ফীতি কমানো কঠিন। বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে এবং ডলার সংকটের কারণে আমদানি পণ্যের ব্যয় বৃদ্ধি পেলে এই লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব হতে পারে।
২. বিশাল রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা (Revenue Mobilisation); জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (NBR) ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা কর আদায়ের বিশাল লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। দেশের রাজস্ব আদায়ের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এখনো বেশ দুর্বল। করের আওতা (Tax Base) না বাড়িয়ে এবং কর প্রশাসনে বড় সংস্কার না এনে হঠাৎ করে এত বড় অংকের রাজস্ব আদায় করাকে অবাস্তব মনে করছেন বিশ্লেষকরা। লক্ষ্য পূরণ না হলে বাজেট ঘাটতি আরও বাড়বে।
৩. ব্যাংক থেকে সরকারের বিপুল ঋণ ও বেসরকারি খাতে ধাক্কা (Crowding Out Effect); বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। সরকার নিজেই যদি ব্যাংক থেকে সিংহভাগ টাকা তুলে নেয়, তবে বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় তারল্য সংকট দেখা দেবে। এর ফলে বেসরকারি উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা ঋণ পাবেন না, যা নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত করবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় ধাক্কা দেবে।
৪. ঋণের সুদ পরিশোধের পর্বতসম চাপ (Debt Servicing Burden); নতুন বাজেটে শুধুমাত্র দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ মেটাতেই সরকারের ব্যয় হবে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অনুৎপাদনশীল এই খাতে বাজেটের একটি বড় অংশ চলে যাওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ জনকল্যাণমূলক খাতে বরাদ্দ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ক্রমাগত ঋণনির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করতে পারে।
৫. প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা এবং বিনিয়োগ স্থবিরতা (GDP Growth Target); আগামী অর্থবছরের জন্য ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে ডলার সংকট, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে। ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগ না করলে এবং শিল্প উৎপাদন না বাড়লে শুধু সরকারি খরচ বাড়িয়ে এই উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বাজেটের আকার বা উদ্দেশ্যগুলো খারাপ নয়, তবে এটি বাস্তবায়নের জন্য যে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, সুশাসন এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক কাঠামো প্রয়োজন, তা রাতারাতি নিশ্চিত করাই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।