চট্টগ্রাম-৪ আসন

শপথ নিতে পারবেন না আসলাম চৌধুরী এখন কী হবে?


২ জুলাই ২০২৬ ২০:৪৮

স্টাফ রিপোর্টার : ঋণখেলাপি হওয়ায় চট্টগ্রাম-৪ আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বে-সরকারি ভাবে বিজয়ী হওয়ায় বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরী সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিতে পারবেন না। ফলে সেই আসনে নতুন নির্বাচন হবে, নাকি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে সেই বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে আসলে ঠিক কোন পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে, সেটি নির্ভর করছে আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায়ের ওপর।
প্রার্থিতা বাতিল, শপথ নিতে পারবেন না : ঋণখেলাপি হওয়ায় চট্টগ্রাম-৪ আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বেসরকারিভাবে বিজয়ী বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরী সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিতে পারবেন না। গত ৩০ জুন মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন। এর আগে গত ১৫ জুন শুনানি শেষে রায়ের জন্য ৩০ জুন দিন ধার্য করেছিলেন। আসলাম চৌধুরীর পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন ও মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী, সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী রোকন উদ্দিন মো. ফারুক। অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল শুনানিতে অংশ নেন। ব্যাংক এশিয়া পিএলসির পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কামাল উল আলম শুনানি করেন। এর আগে গত ২০ জুন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ আসনে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা নিয়ে আপিল শুনানিতে অ্যামিকাস কিউরি (আদালত বন্ধু) হিসেবে মতামত দিতে দুজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীকে মনোনয়ন দেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। তারা হলেন এম কামরুল হক সিদ্দিকী ও প্রবীর নিয়োগী। একইসঙ্গে আসলাম চৌধুরীর আপিল আবেদন শুনানির জন্য গত ২৯ জুন সোমবার দিন ঠিক করেছিলেন আপিল বিভাগ। এরও আগে গত ৯ জুন আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণার বিরুদ্ধে ব্যাংকটির করা আপিল আবেদনের ওপর শুনানি শুরু হয়। গত ৩ জানুয়ারি সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বাছাই শেষে বৈধ ঘোষণা করেন। তবে তার বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগ এনে নির্বাচন কমিশনে আপিল করেন জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক। শুনানি শেষে গত ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন ওই আপিল খারিজ করে দিলে আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহাল থাকে। ইসির এ সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে পৃথক রিট আবেদন করে অভিযোগকারী পক্ষ। পরে ২৭ জানুয়ারি হাইকোর্ট শুনানি শেষে রিট আবেদন দুটি খারিজ করে দেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে হাইকোর্টের আদেশে বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরী প্রার্থিতা ফিরে পান।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে আসলাম চৌধুরী অংশ নেন। নির্বাচনে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হলেও তার ফলাফল প্রকাশ উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তে স্থগিত রাখা হয়। হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে ঋণ খেলাপির অভিযোগ তুলে লিভ টু আপিল করেন জামায়াত প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী। সেই আবেদন গত ৩ ফেব্রুয়ারি মঞ্জুর করেন আপিল বিভাগ। আদেশে বলা হয়, যদি তিনি (আসলাম চৌধুরী) নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে সফল হন, তবে সংশ্লিষ্ট আসনে নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ এ সংক্রান্ত আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। লিভ টু আপিল মঞ্জুর হওয়ার পর জামায়াতের প্রার্থী গত ৩১ মার্চ পৃথক আপিল আবেদন করেন। এরপর ২৮ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার জজ আদালত আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ ও নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য দিন ঠিক করে পাঠান। এর মধ্যে বেশ কয়েকবার আবেদনটি শুনানির জন্য সুপ্রিম কোর্টের কার্যতালিকায় ওঠে। এরই ধারাবাহিকতায় ২৯ জুন সোমবার দ্বিতীয় দিনের মতো শুনানি হয়।
কত টাকা ঋণ আসলাম চৌধুরীর
চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী ও দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা লায়ন আসলাম চৌধুরীর স্থাবর ও অস্থাবর মিলে প্রায় ৪৫৬ কোটি ৯৫ লাখ ৭ হাজার টাকার সম্পদ রয়েছে। বর্তমানে তার সর্বমোট ঋণ রয়েছে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে পাঁচটি ব্যাংকে ও অন্যান্য মিলে তার ঋণ রয়েছে ৩৫৪ কোটি ৪১ লাখ ৬৩ হাজার ২৬৯ টাকা। এছাড়া জামিনদার হিসেবে তার ঋণের পরিমাণ ১০৫৯ কোটি টাকা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ডিরেক্টর হিসেবে ২৮৫ কোটি টাকা। মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রাম-৪ আসনে এখন কী হবে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতার বৈধতা নিয়ে একই আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকীর করা আপিল মঞ্জুর করে গত ৩০ জুন মঙ্গলবার রায় দিয়েছেন আপিল বিভাগ। এই প্রেক্ষাপটে আসনটিতে কি আবার নির্বাচন হবে, নাকি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হবেÑ এমন আলোচনা সামনে এসেছে। রায়ের পর এক ব্রিফিংয়ে আনোয়ার সিদ্দিকীর আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, আসলাম চৌধুরী ঋণখেলাপি হিসেবে এই নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, আর নির্বাচনে তাঁর এই অংশগ্রহণ অবৈধ ঘোষিত হয়েছে এই রায়ের মাধ্যমে। অর্থাৎ আসলাম চৌধুরী অযোগ্য প্রার্থী হলেন। অযোগ্য প্রার্থী হওয়ার পরে আসনটিতে (চট্টগ্রাম-৪) কী হবে, তা আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে বিস্তারিত জানা যাবে। আইনজীবী শিশির মনির আরও বলেন, তবে কোনো আসনে প্রথম হওয়া ব্যক্তি অযোগ্য হলে সাধারণত দ্বিতীয় যিনি থাকেন (ভোটে দ্বিতীয় হওয়া) তাঁকে নির্বাচিত হিসেবে ঘোষণা করাটাই সাধারণ নিয়ম। কিন্তু এর বাইরেও আপিল বিভাগ বিশেষ কোনো নির্দেশনা দেন কি না, সে ব্যাপারটি পরিপূর্ণ রায় প্রকাশিত হলে জানা যাবে।
অবশ্য চট্টগ্রাম-৪ আসনে আবার নির্বাচন হলে বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর অংশ নিতে বাধা থাকবে না বলে মনে করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। আপিল বিভাগের রায়ের পর নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘দেখুন, একজন ব্যক্তির একটি নির্দিষ্ট সময়ের অযোগ্যতা তো সারা জীবন থাকবে না। পূর্ববর্তী নির্বাচনে যে কারণে আপিলটি মঞ্জুর হলো তাঁর (আসলাম চৌধুরী) নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও, তিনি হয়তো সেই নির্বাচনের ফলাফলটি ভোগ করতে পারবেন না এবং পরবর্তী নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনি যদি সে অযোগ্যতা কাটিয়ে যোগ্য হন, তাঁর তো নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত কোনো বাধা থাকার কথা না।’ আইনজীবীদের তথ্যমতে, এই মামলায় ইস্যু ছিল মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার দিনে আসলাম চৌধুরীর স্ট্যাটাস (ঋণখেলাপি কি না) কী ছিল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ আসনে বেসরকারি হিসাবে সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছিলেন বিএনপির আসলাম চৌধুরী। আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পান একই আসনের জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী।
রিভিউ আবেদন করবেন আসলাম চৌধুরী
আদালতের রায়ের পর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরী। গত ৩০ জুন মঙ্গলবার দুপুরে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি এ প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, মনোনয়নপত্র দাখিলের পর রিটার্নিং কর্মকর্তা সেটি বৈধ ঘোষণা করেন। পরে নির্বাচন কমিশনও মনোনয়ন বৈধ রাখে। বিষয়টি নিয়ে আদালতে রিট হলেও সেটি খারিজ হয়। পরবর্তী সময়ে আপিলের পরও তাকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয় এবং জনগণ বিপুল ভোটে তাকে নির্বাচিত করেন। আসলাম চৌধুরী বলেন, আপিল বিভাগের রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি এখনো প্রকাশ হয়নি। রায় হাতে পাওয়ার পর আইনগত বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে রিভিউ আবেদন করা হবে। আমাদের বিশ্বাস, রিভিউয়ের মাধ্যমে জনগণের রায়ের প্রতিফলন ঘটবে এবং আমরা ন্যায়বিচার পাব। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রতি আস্থা প্রকাশ করে তিনি বলেন, এই ঘটনার মাধ্যমে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করছে- এটি স্পষ্ট হয়েছে। আমরা আদালতের প্রতি সম্মান রেখে আইনগত প্রক্রিয়াই অনুসরণ করব।