প্রয়োজন তিনটি ভাষার সমাহার
১ জুলাই ২০২৬ ২১:৪৭
॥ মাহবুবুল হক ॥
বাংলা ভাষা আমাদের মাতৃভাষা এটা আমরা সবাই জানি এবং এটাও জানি যে, বাংলাভাষী মাত্রই বাংলা ভাষা জানে। বাংলায় বিশেষজ্ঞ এক ভদ্রলোক একবার জানিয়েছেন, তিনি তার সাথে তার সহকারী হিসেবে একজনকে সৌদি আরবে নিয়ে গিয়েছিলেন। তার বিশেষ প্রয়োজনে তিনি চাকরি থেকে অব্যাহতি গ্রহণ করেন। তো বিদায়ের সময় তিনি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারীকে জিজ্ঞেস করলেন- আমি তো চলে যাচ্ছি, আমার জায়গায় কোনো বাংলাদেশিকে নিচ্ছেন কিনা। ভদ্রলোক আশ্চর্য হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন, বললেন কেন? আপনার সাথে যিনি ছিলেন, তাকেই তো আমরা নেব বলে ঠিকঠাক করে নিয়েছি। বিশেষজ্ঞ ভদ্রলোক আশ্চর্য হয়ে বললেন, তিনি তো এক্সপার্ট লেবেলের অভিজ্ঞ ব্যক্তি নন। তার এ কথায় স্বত্বাধিকারী দ্বিগুণ আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললেন, কেন উনি কি বাংলাদেশি নন? তিনি কি ইন্ডিয়ান? বিশেষজ্ঞ ভদ্রলোক বিনয়ের সাথে বোঝানোর চেষ্টা করলেন, তিনি অবশ্যই বাংলাদেশি এবং বাংলাদেশি পাসপোর্টসহই তিনি আপনার দেশে এসেছেন। স্বত্বাধিকারী এরপর যা বললেন, তা যুক্তির ধোপে টেকে না। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশি হলে নিশ্চয়ই তিনি বাংলা জানেন। তাকে দিয়েই কাজ হয়ে যাবে, কোনো অসুবিধা হবে না। আমাদের দেশেও এই বিষয়টি এখন সত্য। আমাদের ধারণা, আমরা সবাই বাংলা ভাষা জানি। আরও একটা বদ্ধমূল ধারণা আমাদের আছে, যারা যেকোনো মাদরাসায় পড়েন না কেন, তারা সবাই কুরআনের ভাষা জানেন, আরবি জানেন; এমনকি যে কুরআনের সম্মানিত হাফেজগণ শুধু কুরআন মুখস্থ করেন, তারাও নাকি কুরআন জানেন, হাদিস জানেন, ইজমা, কিয়াস সব জানেন। আরও কিছু কিম্ভূত কিমাকার ধারণা ও বিশ্বাস আমাদের আছে যে, যারা লম্বা সৌদি ড্রেস পরিধান করে, তারা সবাই নাকি কুরআন-হাদিসসহ ইসলামের অনেক কিছু জানে। রাস্তা-ঘাটে লক্ষ করেছি, স্যুট পরিধান করা বিশিষ্ট একজন ব্যক্তি, যিনি ইসলাম সম্পর্কে তাবৎ ধারণা রাখেন, তাকে মাসলা-মাসায়েলের কিছু জিজ্ঞাসা না করে জোব্বা পরিধান করা, দাড়ি ও টুপি রাখা একজন সাধারণ মানুষকে মুফতি মনে করে ফতোয়া জানতে চান। এই অদ্ভুত দেশকে এ দেশের একজন মনীষী নাম দিয়েছিলেন ‘আজব দেশ’ আসলেই তাই। একালে এ দেশে যত ঘটনা ঘটছে, তাতে এ দেশের নিক নেইম ‘আজব দেশ’ বললে সবাই সানন্দে গ্রহণ করে নেবে।
জানা, বোঝা বা উপলব্ধি করাকে প্রকৃত অর্থে একাডেমির ডিসিপ্লিনের মাধ্যমে অর্জন করা বোঝায়। এই শৃঙ্খলার নামই হলো শিক্ষা। শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো জ্ঞানার্জন করা। শিক্ষাটা উদ্দেশ্য নয়। শিক্ষা হলো জ্ঞানার্জনের প্রধান মাধ্যম বা বাহন। আপনি গুলিস্তানে যাবেন, সেটা আপনার লক্ষ্য। আপনি যে বাহনে যাবেন, সেটা হলো আপনার শিক্ষা। শিক্ষা আবার দুই রকম। শিক্ষা ও প্রশিক্ষা। আমরা সহজভাবে বলি ‘ট্রেনিং’। সাধারণ কর্মী হতে চাইলে কারো অধীনে চাকরি-বাকরি করাই যথেষ্ট। ওটাই আপনার প্রশিক্ষা। আর আপনার যদি লক্ষ্য থাকে জ্ঞানের উচ্চস্তরে আপনি পৌঁছাবেন, তাহলে তো আপনাকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষার ডাবল সিঁড়িতে পা দিতে হবে। তা না হলে আপনি ব্যুৎপত্তি লাভ করতে পারবেন না।
প্রথমে আমরা বাংলা ভাষার কথায় আসি। ৬০-এর দশকের আগে এ দেশে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলা ভাষা ছিল না। ছিল ইংরেজি ভাষা। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুনে আমরা বড় ধরনের স্বাধীনতা হারিয়েছি। স্বাধীনতা হারানোর আগে আমাদের বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা ছিল ফার্সি। এর কারণ অনেক। সেদিকে আমরা যাচ্ছি না। তবে সংক্ষেপে নির্দ্বিধায় বলা যায়, ফার্সি ভাষার লোভে না পড়ে আমরা যদি আরবি ভাষার লোভে পড়তাম, তাহলে ভালো হতো। তাহলে আমাদের মাদরাসাগুলো উন্নত হতো। কুরআন, হাদিস অর্থাৎ প্রত্যাদিষ্ট জ্ঞান বা আসমানি জ্ঞানে আমরা সমৃদ্ধ হতে পারতাম। তখনকার সময় ফার্সি ভাষার রত্নভাণ্ডার তথা গদ্য-পদ্য, গান-গজল বিপুল পরিমাণে আমাদের দেশে আমদানি হতো। আরবি ভাষার রত্নভাণ্ডার সেই পরিমাণে আমাদের দেশে আসার সুযোগ ছিল না। যাও ছিল, তাও আলেমদের সামনে বা রাজা-বাদশাহদের সামনে অশ্লীলতা ও নোংরামির প্রতিচ্ছবি ছিল। ইমরুল কায়েসের কবিতা এখনো বিশ্বময় গৌরবের সাথে অধিষ্ঠিত হয়ে আছে। ইমরুল কায়েসদের মতো কবিদের কবিতা বা গজল ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম হলেও কাব্য-সাহিত্য সম্পর্কে জানার জন্য, বোঝার জন্য সেসব হারাম কবিতাই পড়তে হতো। যখন ফার্সি ভাষাকে এ দেশের রাষ্ট্রভাষা করা হয়, তখন আরবি ভাষা যে মধ্যপ্রাচ্যে বা আরব উপসাগরে উন্নত হয়নি, তা বলা যাবে না। কমিউনিকেশন গ্যাপ ছিল, আরবগণ তখনো বিপুলভাবে এ দেশে আগমন করেনি। তখন আর্থিকভাবে আরবগণ ততটা সমৃদ্ধ ছিল না। যতটা সমৃদ্ধ ছিল ইরানিগণ। তাদের সেক্যুলার সভ্যতা ছিল তখন থেকে আরও আড়াই হাজার বছর আগে। যার নাম ছিল বা এখনো আছে পারস্য সভ্যতা বলে।
যাহোক, যোগাযোগের ব্যবধান বা সভ্যতা ও সংস্কৃতি ব্যবধানের কারণে সুলতানি আমলে আরবি ভাষাকে তদানীন্তন বাংলা রাষ্ট্রের ভাষাকে আরবি করা সম্ভব হয়নি। এটা আমাদের জন্য একটা বড় ধরনের ঐতিহাসিক দুর্বলতা। এই দুর্বলতা থেকেই প্রমাণ হয়েছে বাংলার স্বাধীন সুলতানগণ কতটা অপরিণামদর্শী ও কতটা ইতিহাসবিমুখ ছিলেন। অন্যদিকে তাদের একটি বিষয়ে অনেক প্রশংসা না করেও পারা যায় না। এই সুলতানগণই আবার সনাতন ধর্মের বেদ-ঋদবেদ-রামায়ণ-মহাভারত প্রভৃতি বাংলা ভাষায় ভাষান্তর বা রূপান্তর করার বিপুল আয়োজন করেছিলেন। এই উদযোগকে কেউ খারাপ বলেনি বা এই মহান কাজকে কুটিল দৃষ্টিতেও কেউ দেখেনি। এটা ছিল স্বাধীন সুলতানগণের একটা মহৎ প্রচেষ্টা। এতে সবারই উপকার হয়েছে। অন্য ধর্মের মূল গ্রন্থগুলো অধ্যয়ন করার তাগিদ রয়েছে ইসলামী বিধানে। তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল, কুরআনসহ আল্লাহর তরফ থেকে যতরকম ‘স্কিপচার’ নাজিল হয়েছে, তার সবই তো পড়াশোনা ও অধ্যয়ন করার তাগিদ মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণ জানতে বলেছেন, পাঠ করতে বলেছেন। তবে মুসলিম মাত্রই সবার দুঃখ ও কষ্ট হলো সুলতানগণ এত বড় বড় কাজ করেছেন, কিন্তু কেন কুরআনের অনুবাদের কাজে হাত দেননি। সেটাই এক বিস্ময়কর বিষয়।
এই প্রেক্ষাপটে যতটুকু জানা যায়, তা হলো তখনকার আলেমগণ এ বিষয়ে দারুণভাবে ভয় পেতেন। তাদের আশঙ্কা ছিল অনুবাদ করতে গিয়ে যদি ভুল হয়ে যায়, তাহলে তো সর্বনাশ হয়ে যাবে। তারা ধারণা করেছেন, কুশিক্ষার চেয়ে বা ভুল শিক্ষার চেয়ে অশিক্ষা ভালো। আর সত্য কথা উপযুক্ত মানের বাংলা ভাষা একদিকে যেমন ছিল না, অপরদিকে যথাযথমানের বাংলাভাষী মুসলিম পণ্ডিতও ছিল না। তখনকার সময় ইরানি ভাষা বা ফার্সি ভাষা উন্নত ছিল বলে বাংলার স্বাধীন সুলতানগণ সেই ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা করতে বাধ্য হয়েছিলেন। মোদ্দাকথা, আরবি ভাষা ও বাংলা ভাষা তখন বাংলাদেশের সমাজে সেভাবে প্রচলিত ছিল না। কিছুটা প্রচলিত ছিল ফার্সি ভাষা।
সুলতানি আমলের পর হিন্দু ও মুসলিমদের যৌথ উদ্যোগে ইংরেজদের শাসন কায়েম হয়ে গেল। তারা কোনো কিছু চিন্তা না করেই তাদের রাজত্বে প্রধান ভাষা হিসেবে ইংরেজি ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করে। অফিস-আদালত ও স্কুল-কলেজে ‘মিডিয়াম অব ল্যাঙ্গুয়েজ’ হিসেবে ইংরেজি ভাষাকে গ্রহণ করে। ইংরেজি ভাষাকে যারা মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারেনি, হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে তারাই মাদরাসা ও টোল প্রতিষ্ঠা করে।
সনাতন ধর্মের মানুষ বুঝে না বুঝে বা নিজেদের স্বার্থকে উচ্চকিত করার জন্য এবং ইংরেজদের ‘ডিভাইড এন্ড রুল’কে বেগবান করার জন্য ইংরেজ শাসনকে স্বাগত জানায়। আরেকটি বিষয় তো না বললেই নয়, তা হলো ভারতবর্ষকে মুসলিমরা প্রায় ৬শত বছর একাধারে শাসন করেছে। তাদের শাসনের কারণে সনাতন ধর্মের মানুষ বাহ্যত খুশিতে অবস্থান করলেও ভেতরে ভেতরে তাদের অনেক জাতি বিরক্ত, অসন্তুষ্ট ও ক্ষোভিত ছিল। তারা ভেবেছিল মুঘলরা বা মুসলিমরা যখন পরাজিত হয়েছে বা পরাভূত হয়েছে, তখন তারা হয়তো আর মোচড় দিয়ে তাড়াতাড়ি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। এর মধ্যে সনাতন ধর্মের সকল শ্রেণি ও গোষ্ঠী একমত হয়ে ইংরেজদের তোষণসহ সাহায্য ও সহযোগিতা করলে সনাতন ধর্মের লোকদের ঐতিহাসিকভাবে সুবিধা হবে। তারা এও ভেবে নিয়েছিল যে, ইংরেজদের উপনিবেশ হয়তো বেশিদিন থাকবে না। সুতরাং দুদিকের শূন্যস্থান একসময় সনাতন হিন্দুরাই পূরণ করবে।
স্বাধীনতা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে মুসলমানরা বলতে গেলে ইংরেজ ও হিন্দুদের শত্রুতায় পর্যবসিত হয়। সনাতন ধর্মের লোকেরা ইংরেজদের কোলে তুলে নেয়। এই অবস্থায় মুসলমানগণ ইংরেজি ভাষা শেখাকে প্রত্যাখ্যান করে। কারণ শুধু শাসন বা রাজনৈতিক নয়। কারণটা ছিল ‘হলিওয়ার’। তারা খ্রিস্টানের শাসনকে ধর্মীয় দিক থেকেও বিবেচনা করেছে। মুসলমানদের মোদ্দাকথা ছিল, শাসন ও প্রশাসনে ছিল মুসলমানরা। তাদের ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পরাজিত করে সেই জায়গায় যখন হিন্দু ও খ্রিস্টানগণ বসে গেছে, তখন তাকে তো আর প্রশ্রয় দেয়া যায় না। জীবনবাজি রেখে (জিহাদ) এই মোনাফেকী ও কুফরি শাসন উৎখাত করার জন্য আমাদের অবশ্যই সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হবে।
এই পর্যায়ে ফার্সির সাথে সাথে কিছুটা আরবি ভাষার সংযোজন ঘটে। বিশেষ করে মুসলমানদের গড়া কওমি মাদরাসায়। এর সাথে যোগ হয় স্থানীয় ভাষা উর্দু এবং হিন্দি। মুসলমানদের মধ্যে বাংলাভাষা তখন পর্যন্ত সমুন্নত হয়নি। এর একটা উল্লেখযোগ্য কারণ ছিল সনাতন ধর্মের লোকেরা সংস্কৃত থেকে বাংলা ভাষা তৈরি করছিল। যে বিষয়টিকে অনেক উদারতা সত্ত্বেও মুসলমানরা গ্রহণ করতে পারেনি। সে কারণে বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে হিন্দুরা অনেকটা এগিয়ে গেলেও মুসলমানরা কিছুটা পিছিয়ে থাকলো। এটাই ছিল মুসলমানদের ভাষার ক্ষেত্রে মহাসংকট।
এই আলোচনা থেকে পরিষ্কার দেখা গেল, বাঙালি মুসলমানদের একটাই মাত্র প্রধান ভাষা, আর তা হলো মুসলমানি বাংলা ভাষা। যে ভাষাকে ভাষার মনীষী আবুল মনসুর আহমদ বলেছেন, কলকাতার বাংলা হলো টাওয়ার বাংলা, আর বাংলাদেশের বাংলা হলো খামার বাংলা। অর্থাৎ চাষা-চাষিণীর বাংলা, কৃষক-কৃষাণির বাংলা। বাংলাদেশের সমতল এলাকার বাংলা। যেই বাংলাকে স্বীয় সনাতন হিন্দুরাও গ্রহণ করেনি। যে মুসলমানি বাংলা ভাষাকে শত্রু হলেও কিছুটা উন্নত করার প্রয়াস পেয়েছেন ইংরেজরা। আর করেছেন বাংলাদেশর মুসলিম কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পী, গবেষক, শিক্ষাবিদসহ একাই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। আর তার বিষয়টিকে উজ্জ্বল-সমুজ্জ্বল ও উচ্চকিত করেছেন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, আবুল মনসুর আহমদ, আবুল কালাম শামছুদ্দীন, কবি গোলাম মোস্তফা, কবি কায়কোবাদ, কবি ফররুখ আহমদ, কবি জসীমউদদ্ীন, কবি ওমর আলী, কবি তালিম হোসেনসহ আরো শত শত কবি-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী ও ইতিহাসবিদ।
ইসলামের নামে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সব ধরনের মাদরাসায় শিক্ষার বাহন হিসেবে বাংলা ভাষাকে গ্রহণ করা হয়নি। গ্রহণ করা হয়েছিল উর্দু ভাষাকে। বাঙালি মুসলমানের জন্য উর্দু থেকে আরবি ভাষাই বেশি পরিচিত ছিল। কারণ চার বছর, চার মাস, চার দিন থেকে মুসলমানের বাচ্চারা আলিফ, বা, তা, ছা শিখতো। এই শেখাটা পাকিস্তান আমলে শুরু হয়নি। শুরু হয়েছিল প্রায় হাজার বছর পূর্বে। ধীরে হলেও এই ঢেউয়ের মধ্যে তরঙ্গ ছিল। মুসলমান বাচ্চাদের জীবনটাই শুরু হতো এই তরঙ্গের দোলনায়। একদিকে দিনে ৫ বার আযানের ধ্বনি; অপরদিকে সুবহে সাদিকের সময়কাল থেকে বাঙালি মুসলমানের ঘরে ঘরে কুরআনের যে হারমনি সৃষ্টি হতো তাতে দুলতো গাছপালা, পাহাড়-পর্বত-টিলা, নদী-নালা, বিল-হাওর, পশু-পাখিসহ তামাম প্রকৃতি ও সৃষ্টিজগৎ। ৫ম শ্রেণিতে ওঠার আগেই বাঙালি মুসলমানের বাচ্চা কুরআনের কিছু সূরা সুললিতকণ্ঠে পাঠ করতে পারত। মাদরাসায় ভর্তি হতে বাঙালি মুসলমান বাচ্চাদের কোনো ভর্তি পরীক্ষা বা অর্থ প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু তবুও আরবি ভাষাকে শিক্ষার বাহক ভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি।
এর চেয়ে দুঃখ আর কী হতে পারে। ভাষার ক্ষেত্রে এসব নানা কারণে বাংলাদেশের শিক্ষিত মুসলমান অনেকটা পেছনে পড়ে রয়েছে সব ভাষায়। আমরা অনেকগুলো ভাষা কিছু কিছু জানি। কিন্তু কোনো ভাষায় আমরা মাস্টার নই। আমরা ‘জোক অব অল ল্যাঙ্গুয়েজেজ বাট মাস্টার অব নান’- এমনকি নিজের ভাষায়ও। এখনো আমরা আল্লাহকে ‘ইশ্বর’ বলি। ফেরেশতাকে ‘দেবদূত’ লেখি। ভাগ্যকে বা সুন্দরকে ‘লক্ষ্মী’ বলি। লক্ষ্মী মেয়ে, লক্ষ্মী ছেলে। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের বাংলা ভাষা দুই রকম। একটা ‘সেক্যুলার বাংলা’ আরেকটা ‘মুসলমানি বাংলা’।
দুনিয়ায় কুরআন-হাদিসের পর তিনটি দুই অক্ষরের, তিনটি শব্দ মিলিয়ে একটা ‘হাইপেনিক’ বড় শব্দ আছে। স্থান-কাল-পাত্র। এই বড় শব্দটি ছাড়া কোনো যুগ-জামানাই চলেনি, এখনো চলে না। বাস্তবতার কারণে এখন আমাদের উপলব্ধি করতে হবে বাঙালি মুসলমানের জন্য অর্থাৎ তাদের ইহকাল ও পরকালকে সমুজ্জ্বল করার জন্য এখন আমাদের তিনটি ভাষা ভাঙা বা ভাবে নয়, পরিপূর্ণ অবয়বে অর্জন করতে হবে। ১. বাংলা ভাষা (আমাদের মাতৃভাষা, আল্লাহর দেয়া, পিতৃভাষা, না জানলে গুনাহ হবে)। ২. আরবি ভাষা কুরআনের ভাষা, রাসূলের ভাষা, নামাজের ভাষা, হাদিসের ভাষা, ইজমা-কিয়াসের ভাষা, খোলাফায়ে রাশেদীনের ভাষা, সাহাবা কেরামদের ভাষা, মুসলিম গবেষক, বিজ্ঞানী, চিন্তাবিদ, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, ইতিহাসবিদ ইত্যাদির ভাষা। ৩. ইংরেজি ভাষা, যে ভাষাটি কিছুটা আমরা জানি, দীর্ঘদিনের লিগ্যাসি (খবমধপু) আছে, বিশ্বায়নের জন্য এখনো এই ভাষাটি বিশেষভাবে প্রয়োজনীয়।
১. প্রথমে আমাদের আলেম সমাজকে ব্যাপকতর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই তিনটি ভাষা পরিপূর্ণভাবে শেখাতে হবে। যাদের বয়স ২৫ বছরের বেশি হয়ে আছে, তাদের অবশ্যই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই তিনটি ভাষা শেখাতে হবে। এ বিষয়ে সরকার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটকে শক্তিশালী ও জোরালো অবস্থায় নিয়ে আসতে পারে।
২. আমাদের যত রকম শিক্ষা ব্যবস্থা আছে, সকল শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষা কারিকুলামে এই তিনটি ভাষার সরগরম উপস্থিতি থাকতে হবে, অন্তত এসএসসিও দাখিল পাস করা পর্যন্ত। উচ্চ শিক্ষার বিষয়টি আমরা এখানে আনলাম না।
আমাদের ইহকালের শান্তি ও পরকালের সার্বিক মুক্তির জন্য উপযুক্ত তিনটি ভাষা জানা আমাদের জন্য অপরহার্য বলে মনে করি। আশা করি, সরকার ও বিরোধীদল এ বিষয়ে সমভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করবে।