হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা, বাংলা ভাগ ও পশ্চিমবঙ্গ দিবস
১ জুলাই ২০২৬ ২১:৪৬
॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
১৯৪৭ সাল বিশ্বের; বিশেষ করে ভারতের ইতিহাসে ঐতিহাসিক বছর। এই বছরই ভারতবর্ষ ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনতা লাভ করেছে। এই ১৯৪৭ সালেই ভারত স্বাধীনতার পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ায় মুসলিমদের জন্য পাকিস্তান নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এদিকে অবিভক্ত বাংলায়ও মুসলিমদের আরেকটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠিত হতে যাচ্ছিল। কিন্তু কংগ্রেসের হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতৃত্ব ও হিন্দু মহাসভার নেতাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বিরোধিতার কারণে বাংলা ভাগ হয়ে যায় এবং পশ্চিমবঙ্গ নামে একটি অংশ ভারতের অধীনে চলে যায়। পূর্ব বাংলা স্বাধীন পাকিস্তানের একটি প্রদেশ হিসেবে যোগদান করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, বাংলায় হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার উত্থানই দেশভাগের পটভূমি তৈরি করে এবং বাংলা ও পাঞ্জাবসহ ভারত ভাগ হয়ে যায়।
পশ্চিমবঙ্গের মানুষসহ ভারতের একটি বড় অংশের মানুষের ধারণা ও অভিমত, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযোগ যে মুসলিমরা বাংলা ভাগ করেছে। কিন্তু ইতিহাসের গভীর বিশ্লেষণে আজ এটা প্রমাণিত সত্য যে, কংগ্রেসের হিন্দুত্ববাদী নেতা ও হিন্দু মহাসভার নেতাদের কারণেই ভারত যেমন ভাগ হয়েছে, তেমনি বাংলাও ভাগ হয়েছে। হিন্দুত্ববাদী কংগ্রেস ও বিজেপির নেতারা এতদিন এ অভিযোগ করলেও এখন তারা বাংলা ভাগকে কেন্দ্র করে দিবস পালন করা শুরু করেছে। এবার পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতায় আসার পর বিগত ২০ জুনকে পশ্চিমবঙ্গ দিবস ঘোষণা করেছে এবং তারা দিবসটি পালনও করেছে।
পশ্চিমবঙ্গে সরকারিভাবে এই দিনটিকে উৎসব হিসেবে পালন করার ঘটনা এই প্রথম। তবে বেশ কয়েক বছর ধরেই বিজেপি ও বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠন এই দিনটিকে পশ্চিমবঙ্গের ‘ভারতভুক্তির দিন’ হিসেবে উদযাপন করে আসছিল। হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর এ কারণে ২০ জুনকে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ হিসেবে পালন করার দাবি তোলে। পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথম সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল ২০ জুনকে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা।
১৯৪৭ সালের ২০ জুন বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভায় অবিভক্ত বাংলা ভাগ করা হবে কিনা, সেই সিদ্ধান্ত নিতে ভোট হয়। এদিন পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রতিনিধি তথা আইনসভার সদস্যদের যৌথ সভায় ১২৬-৯০ ভোটে বাংলাকে এক রাখার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। অপরদিকে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিনিধিদের সভায় ৫৮-২১ ভোটে বাংলা ভাগ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, পূর্ববঙ্গের প্রতিনিধিদের সভায় ১০৬-১৫ ভোটে বাংলা প্রদেশকে এক রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।ব্রিটিশরা পশ্চিমবঙ্গের প্রতিনিধিদের সভার সিদ্ধান্তকে বাস্তবায়ন করে এবং বাংলাকে ভাগ করে দেয়। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পূর্ব বাংলা চলে আসে পাকিস্তানের অংশে, আর পশ্চিম দিকের অংশটি মিশে যায় ভারতের সঙ্গে। উল্লেখ্য, ঐ সময় অবিভক্ত বাংলার প্রাদেশিক পরিষদে অধিকাংশ সদস্য মুসলিম হলেও বাংলা ভাগের বিষয়ে হিন্দু নেতারা কূটকৌশলের আশ্রয় নেয় এবং ব্রিটিশরা তাদের সেই কূটকৌশ অনুযায়ীই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে। যেই দ্বিজাতি তত্ত্বের ব্যাপারে হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতা ও বাম প্রগতিশীল অংশ যথাযথ নয় বলে অভিমত দেয় তাদেরই বড় অংশ আজ পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালনের মাধ্যমে তা মেনে দিবস পালন শুরু করেছে। তাই দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রতি বিজেপির এই সমর্থনের অংশ হিসেবে দলটি এখন প্রকাশ্যেই দেশভাগ উদযাপন করছে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
১৯৪০-এর দশকে অবিভক্ত বাংলার জনসংখ্যার ৫৪ শতাংশ ছিল মুসলিম আর ৪১ শতাংশ ছিল হিন্দু। বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদে মুসলিমদের আসনও ছিল বেশি। ব্রিটিশ ভারতে অবিভক্ত বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদের আসন সংখ্যা ছিল ২৫০। ১৯৪৬ সালের বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে মুসলিম লীগ বিজয়ী ১১৩ আসনে, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ৮৬ আসনে, স্বতন্ত্র হিন্দু ১৩ ও স্বতন্ত্র মুসলিম ৯ আসনে বিজয়ী হয়েছিল।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পূর্বে অবিভক্ত বাংলার মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৬ কোটি। এর মধ্যে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৫৪% বা ৩ কোটি ২০ লাখ এবং হিন্দু জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৪১.৫% বা ২ কোটি ৫০ লাখ। অবিভক্ত বাংলা মানে দুই বাংলা পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম বাংলা মিলিয়ে মুসলিমরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ।
ভারতের স্বাধীনতা প্রাক্কালে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস এ একটি নীতিতে একমত হয়েছিল যে যেসব প্রদেশে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সেসব প্রদেশ পাকিস্তানে যোগ দেবে এবং যেসব প্রদেশে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ সেসব প্রদেশ হিন্দুস্তানে যোগ দেবে। আর ভারত স্বাধীনতা আইন অনুযায়ী প্রিন্সলি স্টেট তথা রাজা শাসিত প্রদেশগুলোর জন্য তিনটি অপশন তথা সুযোগ দেয়া হয়েছিল। প্রথমত, প্রিন্সলি স্টেটগুলো ইচ্ছে করলে স্বাধীন থাকতে পারবে। দ্বিতীয়ত, তারা ভারত ইউনিয়নে যোগদান করতে পারবে। তৃতীয়ত, পাকিস্তান ফেডারেশনের সাথে যোগ দিতে পারবে। কিন্তু ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতারা উল্লেখিত নীতিমালা না মেনে শুরু থেকেই ঘোষিত নীতি লঙ্ঘন করতে শুরু করে। উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, বিহার, ঊড়িষ্যা থেকে শুরু করে রাজস্থান, তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশের হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলো কিন্তু ভাগ না করে ভারতের সাথে সংযুক্ত করে নিয়েছে। কিন্তু বাংলা ও পাঞ্জাবের বেলায় তারা তা মানেননি। বাংলা ও পাঞ্জাবে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। কিন্তু কংগ্রেস ও হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতারা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোর ব্যাপারে ভারতে যোগদানের নীতিমালা মানলেও বাংলা ও পাঞ্জাবের বেলায় মানেনি। তারা এ দুই প্রদেশের মধ্যে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলোকে ভাগ করে ভারতে সাথে নিয়ে নেয়।
১৯৪১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, দিল্লির জনসংখ্যার প্রায় ৩৩.২% ছিল মুসলিম। অন্যদিকে বাকি ৬৬.৮% অংশে হিন্দু, শিখ এবং অন্যান্য ধর্মের মানুষ। উল্লেখ্য, ভারত ভাগের পর ব্যাপক দাঙ্গা এবং জনসংখ্যার স্থানান্তরের কারণে এই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। পরবর্তীকালে ১৯৫১ সালের আদমশুমারিতে দিল্লির মুসলিম জনসংখ্যা কমে মাত্র ৫.৭১%-এ নেমে আসে এবং হিন্দুদের সংখ্যা আনুপাতিক হারে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন ‘ইউনাইটেড প্রভিন্সেস’ বা যুক্তপ্রদেশে (বর্তমান উত্তর প্রদেশ) হিন্দু জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৮৪.৪% এবং মুসলিম জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৫%।
৪১ শতাংশ হিন্দু জনসংখ্যার জন্য যদি বাংলা ভাগ করে এক অংশকে ভারতের সাথে নেয়া যায়, তাহলে তো ৩৩ শতাংশ মুসলিমের অবস্থানের কারণে দিল্লি ভাগ করে এক অংশকে মুসলিমদের জন্য পৃথক এলাকা ঘোষণা করে স্বাধীন বা পাকিস্তানের যোগদানের সুযোগ দেয়ার দাবি যৌক্তিক ও নৈতিক দিক থেকেও গ্রহণযোগ্য। কিন্তু হিন্দু জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস নেতা ও বৃটিশরা দিল্লি ও উত্তর প্রদেশের ব্যাপারে বিপরীত অবস্থান গ্রহন করে।
বাংলা ভাগ ও কংগ্রেস
ভারত ভাগ ও বাংলা পাঞ্জাব ভাগ নিয়ে ইংরেজিসহ অনেক ভাষায় অনেক ইতিহাসবিদ গবেষণা করেছেন এবং অনেক বই প্রকাশিত হয়েছে। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জয়া চ্যাটার্জি বাংলা ভাগ নিয়ে একটি গবেষণার ভিত্তিতে ইংরেজি ভাষায় একটি বই লিখেছেন। Bengal Divided: Hindu Communalism and Partition, ১৯৩২-১৯৪৭, ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত এ নামের বইটি বাংলা ভাষায় প্রকাশ করেছে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড।
হিন্দু লেখিকা জয়া চ্যাটার্জি লিখিত ‘বাঙলা ভাগ হলো, হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও দেশ-বিভাগ ১০৩২-৪৭’ বইয়ের ষষ্ঠ অধ্যায়ে ‘দ্বিতীয় বারের বাঙলা বিভাগ ১৯৪৫-৪৭ শিরোনামের ২৬৬ পৃষ্ঠায় ‘বাঙলা ভাগের প্রাদেশিক উৎস, ১৯৪৫-৪৬, উপ-শিরোনামে লিখেছেন, ‘সাক্ষ্য প্রমাণ থেকে বলা যায় যে, বাঙালিরা তাদের প্রদেশ বিভক্তির সময় নিশ্চেষ্ট নিষ্ক্রিয় দর্শক ছিল না; নিজেদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরের ঘটনারও তারা শিকার ছিল না বা অনিচ্ছাকৃতভাবে নিজেদের মাতৃভূমির বিভক্তিকে গ্রহণ করার জন্য তাদের বাধ্যও করা হয়নি। বরং ব্যাপারটি তার বিপরিত। হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেসের প্রাদেশিক শাখাগুলোর সহায়তায় বাংলার অধিকসংখ্যক হিন্দু ১৯৪৭ সালে বাংলা বিভাগ ও ভারতে অভ্যন্তরে একটা পৃথক হিন্দু প্রদেশ গঠনের জন্য ব্যাপকভাবে প্রচারণা চালায়। এ আন্দোলনে নিশ্চিতভাবে কংগ্রেস হাইকমান্ডের সমর্থন ছিল, তবু এ আন্দোলনের উৎস নিহিত ছিল প্রদেশের অভ্যন্তরীণ ইতিহাসের মধ্যে।
জয়া চ্যাটার্জি ২৬৬ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ করার প্রচারণার ফলপ্রসূতা লক্ষ করা যায় ১৯৪৫-৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফলে। ১৯৩৬-৩৭ সালে হিন্দু ভোট বিভক্ত হয়ে যায় কংগ্রেস ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে। ১৯৪৫-৪৬ সালে হিন্দুরা সুস্পষ্টভাবে ভোট দেয় কংগ্রেসকে। ১৯৩৬-৩৭ সালে কংগ্রেস ৮০টি সাধারণ আসনের মধ্যে মাত্র ৪৮টি এবং বিশেষ হিন্দু আসনের মধ্যে ৪টি আসন লাভ করে; ১৯৪৫-৪৬ সালে কংগ্রেস লাভ করে ৭১টি সাধারন আসন এবং ১৫টি বিশেষ হিন্দু আসন।
জয়া চ্যাটার্জি তার বইয়ের ২৬৯ পৃষ্ঠায় লেখেন, বাংলা যাতে বিভক্ত না হয়, সেজন্য ঐক্যের প্রচেষ্টায় একজন মুখ্য ব্যক্তি হিসেবে এক সময়ে খ্যাত শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ১৯৪৬ সালে তার মত পাল্টান। হাতে লেখা ব্যক্তিগত এক নোটে তিনি মুসলিম লীগের শাসনে বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে মূল্যায়ন করেন, ‘বাঙলা যদি পাকিস্তানে রূপান্তরিত হয়… বাঙলার হিন্দুরা স্থায়ীভাবে মুসলমান শাসনের অধীন হয়ে যাবে। হিন্দু ধর্ম ও সমাজের ওপর যেভাবে আঘাত আসছে, তা বিবেচনা করলে বলা যায়, এটা হলো বাঙালি হিন্দু সংস্কৃতির সমাপ্তি। কিছু নিম্ন শ্রেণির হিন্দু থেকে ইসলামে ধর্মান্তরিত ব্যক্তিকে শান্ত করতে হলে অতি প্রাচীন হিন্দু সংস্কৃতিকেই বিসর্জন দিতে হবে।’
মুসলমান শাসনের থেকে দেশ-বিভাগ অধিকতর পছন্দনীয়, এ ধারণা পশ্চিমবঙ্গের অন্তত কিছু হিন্দুর মনে উদিত হয়। ১৯৪৪ সালে রাজগোপালচারী বলেন যে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলোর সমন্বয়ে পাকিস্তানকে গ্রহণ করা কংগ্রেসের উচিত- কলকাতার কিছু হিন্দু তার এই প্রস্তাবকে সাদরে গ্রহণ করে। রাজাগোপালচারীর এই ফর্মুলায় পাঞ্জাব ও বাংলা বিভক্তির কথা পরোক্ষভাবে প্রকাশ পায়।
জয়া তার বইয়ের ২৮৮ পৃষ্ঠায় লেখেন, ‘বাঙলা ভাগের যৌথ আন্দোলনে কংগ্রেস স্পষ্টতই ছিল অধিকতর অগ্রণী অংশীদার। আর বিভক্তির আন্দোলনে এর ভূমিকা (যাকে বলে নেতৃত্বের মর্যাদায়) হিন্দু মহাসভার সাথে শুধু সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সারা বাংলায় মহসভা ছাড়াই কংগ্রেস স্বতন্ত্রভাবে বাংলা ভাগের আহ্বান জানিয়ে জনসভার আয়োজন করে।’
হিন্দু মুসলিম ঐক্যের প্রতীক জিন্নাহ
বিজেপি নেতা ও ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী যশোবন্ত সিংহ রচিত ‘জিন্নাহ ভারত দেশভাগ স্বাধীনতা’ নামক বইয়ের ‘প্রস্তাবনা: একটি জটিল সূচনা’ অধ্যায়ে লিখেছেন, ‘বিংশ শতকের প্রথম ৪৭ বছর যিনি ছিলেন ভারতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রথম সারির নেতা- কেন তিনি নিজেকে ভারতের এক প্রান্তদেশে সরিয়ে নিলেন? সুতরাং এই যাত্রা ভারতে হিন্দু মুসলিম ঐক্যেরও যাত্রা। গোখলে এবং পরে সরোজিনী নাইডু যাকে ভারতের হিন্দু মুসলিম ঐক্যের প্রতীক বা দূত বলেছিলেন, তিনি কী করে পাকিস্তানের প্রথম এবং আয়েশা জালালের কথায় ‘একমাত্র মুখপাত্র হয়ে উঠলেন। তিনি কি সত্যিই তাই ছিলেন। নাকি এক সামগ্রিক ভুলের ফলেই তৈরি হয়েছিল তার পাকিস্তান। লয়েড এবং সুসান রুডলফ একটি বক্তৃতায় এই প্রশ্নটি সোজাসোজি তুলে ধরেছিলেন, ‘জিন্নাকে উদার, বহুসংস্কৃতিমান এবং ধর্মনিরপেক্ষ বলেই দেখা হতো, যিনি ভারতের ঐক্যের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। ভাইসরয় লর্ড লিনলিখগো যাকে বলেছিলেন, কংগ্রেসের চেয়েও বেশি কংগ্রেস।’ তা হলে ঠিক কী ঘটেছিল? কী করে দেশভাগের মতো বিধ্বংসী একটা ঘটনা ঘটতে পারল, যা চল্লিশের দশকের গোড়ায়ও কল্পনা করা যেত না, ১৯৪৬ সালের আগে যে বিষয়ে কোনো বুদ্ধিগ্রাহ্য ধারণাও জন্মায়নি। কেন এবং কখন ‘হিন্দু মুসলিম ঐক্যের দূত, উদারপন্থি সংবিধানবাদী, ভারতীয় জাতীয়তাবাদি মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠলেন।… মুসলিমদের একমাত্র মুখপাত্র হিসেবে জিন্নার কেন্দ্রীয় এবং ক্রমাগত দাবি, কারণ তিনিও চেয়েছিলেন মুসলিমদের একটি বিশেষ অনুপাতে প্রতিনিধিত্ব, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে, সরকারি চাকরিতে। গান্ধীজি আপত্তি করেছিলেন।’
‘Mountbatten made it clear that Nehru demand for our a sovereign Bengal because he thought that ”Partition now any way bring East Bengal into Hindustan in a few years.’ Countdown to partition the final days, by Ajit Bhatachariya. অর্থাৎ মাউন্টব্যাটেন এটা স্পষ্ট করেই বলেছিলেন যে, নেহরু একটি সার্বভৌম বাংলা দাবি করলেও তিনি চিন্তা করতেন যে এখন যে কোনো উপায়ে ভাগ হলেও কয়েক বছরের মধ্যেই পূর্ব বাংলা হিন্দুস্তানে চলে আসবে।’ অজিত ভট্টাচার্যের ‘কাউন্টডাউন টু পার্টিশন দ্য ফাইনাল ডেইস’ বইতে এ অভিমত তুলে ধরা হয়।
বাংলা ভাগ করেছে কে?
হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতিক, লেখক ও সাংবাদিকরা বিগত আট দশক ধরে যে অভিযোগ করে আসছে যে মুসলিম ও মুসলিম লীগই ভারত, বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগ করেছে, তা আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে আসছে। জয়া চ্যাটার্জি লিখিত ‘বাঙলা ভাগ হলো, হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও দেশ বিভাগ ১০৩২-৪৭’ বইটির ফ্লাপে লেখা হয়েছে, ‘মূলধারার অধিকাংশ ইতিহাসগ্রন্থে ভারতজুড়ে সংখ্যালঘু মুসলমান মধ্যবিত্ত ও সেটার প্রতিনিধি আকারে মুসলিম লীগের উত্থানকে সাম্প্রদায়িক উত্থানের প্রধান কারণ হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু জয়া চ্যাটার্জি তার এই গ্রন্থে দেখিয়েছেন বাংলার হিন্দু জনগোষ্ঠীর জন্য পৃথক একটি বাসভূমির দাবিটি মধ্যবিত্ত শেণির মাঝে জনপ্রিয় হয়ে ওঠার ঘটনাটিও হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার উত্থান এবং দেশভাগের পটভূমি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।’
ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত যে, জওহরলাল নেহরু এবং সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মতো কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা মুসলিম লীগের সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি বা স্বায়ত্তশাসনের দাবি মেনে নেওয়ার চেয়ে দেশকে ভাগই করতে চেয়েছিলেন।
১৯৪৬ সালের পর বাংলার হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং কংগ্রেসের হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতারা তীব্রভাবে বাংলা ভাগের দাবি তোলেন। তাদের যুক্তি ছিল, পুরো বাংলা যদি পাকিস্তানের অংশ হয়, তবে হিন্দুরা একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে এবং তাদের অধিকার ক্ষুণ্ন হবে। তাই তারা বাংলার হিন্দুপ্রধান অংশকে ভারতের সাথে যুক্ত করার জন্য জোর দাবি জানান। আর এ হিন্দু মহাসভা হচ্ছে আজকের বিজেপির মাদার সংগঠন তথা হিন্দু মহাসভার উত্তরসূরি হচ্ছে বিজেপি।
বিজেপি নেতা ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী যশোবন্ত সিংহ ও জয়া চ্যাটার্জির মতো নিরপেক্ষ লেখকদের নির্মোহ লেখা ও আলোচনার মাধ্যমে এটা স্পষ্ট হয়ে আসছে যে বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগের মতো ভারত ভাগও হয়েছে কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ ও হিন্দু সাম্প্রদায়িক নেতাদের ভারতে শুধু একটি হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার খায়েশের কারণে। যশোবন্ত সিংহও তার বইয়ে লিখেছেন, জিন্নাহ একটি ঐক্যবদ্ধ ভারত চেয়েছিলেন, কিন্তু করমচাঁদ গান্ধী ও কংগ্রেসের হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতাদের কারণেই ভারত ভাগ করা হয় এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দুটি প্রদেশ বাংলা ও পাঞ্জাবকেও ভাগ করে কিছু অংশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। হিন্দু মহাসভার উত্তরসূরি বিজেপি নেতারা শুধু ভারত ভাগ করেই ক্ষান্ত থাকেনি তারা আজ ২৫ শতাংশ মুসলিমদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়ে ভারত ছাড়ার হুমকি দিচ্ছে।
লেখক : বার্তা সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা।
ই-মেইল : ferdous.ab@gmail.com