জুলাই বিপ্লবের চেতনা, ভারতের আধিপত্যমুক্ত দেশ
১ জুলাই ২০২৬ ২১:৪২
॥ ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম ॥
অনেক ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পৃথিবীর মানচিত্রে লাল-সবুজের পতাকার অভিষেক ঘটে। বুকের তাজা ক্ষতের মধ্য থেকে জন্ম নেওয়া এক নতুন স্বপ্ন। সেই রক্তাক্ত পথ পেরিয়েই একটি জাতি খুঁজে পেয়েছিল তার স্বাধীন পরিচয়, যার পেছনে ছিল দীর্ঘ সংগ্রাম, অসীম ত্যাগ এবং মুক্তির অদম্য আকাক্সক্ষা। কিন্তু কেন ৫৪ বছর আগে জন্ম নেয়া এদেশের মানুষ স্বাধীনতার সাধ থেকে বঞ্চিত। কেন আজও হাঙরের মতো আধিপত্যবাদী শক্তি গিলে ফেলার চক্রান্ত ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে। আজ ইতিহাসের পাতা থেকে তার আলোচনা করতেই হবে, আমাদের মঞ্জিলে পৌঁছাতে হলে।
এই বিজয়ের ইতিহাস ছিল যেমন গৌরবের, তেমনি ছিল বহুমাত্রিক। ভারতীয় মিত্রবাহিনী তখন ছিল আমাদের পাশে, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় সেদিনও ছিল এক গোপন অধ্যায়, যা পরে উন্মোচিত হয় সুব্রামানিয়াম ও জেনারেল উবানের লেখায়।
পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও ভারত সেই জন্মলগ্ন থেকেই যে বাংলাদেশের প্রতি বৈষম্য ও আধিপত্যের নীতি চালিয়ে আসছে, তা এখনো বলবৎ রাখছে। সীমান্তে বিএসএফের নির্বিচার গুলিতে নিহত হয়েছেন শত শত বাংলাদেশি; ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ডে উঠেছে ভারতীয় গোয়েন্দা যোগসাজশের অভিযোগ; আওয়ামী ফ্যাসিবাদের শাসনামলে দেশপ্রেমিক জামায়াত নেতাদের ‘বিচারিক হত্যা’ ও গত বছর তরুণ নেতা ওসমান হাদি হত্যার আসামিদের ভারতের মেঘালয়ে আশ্রয় দেওয়া- সবকিছুই সেই ধারাবাহিক অসম্মানেরই অংশ। আর আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের স্বৈরাচারী, গণতন্ত্রহীন শাসনকে ভারত যে নিঃশর্ত সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে, তা কি আর বলার অপেক্ষা রাখে?
২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের পর তাদের আধিপত্য কিছুটা কমলেও ভিন্ন ভাষায় নতুন মুখ নিয়েই হাজির হয়েছে। যেমন ভারতের নবনিযুক্ত হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশে প্রবেশ করেই বলে বসলেন, ‘ভারতের ১৪০ কোটি ও বাংলাদেশের ২০ কোটি জনসংখ্যা মিলে ১৬০ কোটি করা গেলে এবং এই দুই গণতান্ত্রিক দেশের শক্তি এক হলে তা বিশ্বশক্তিতে পরিণত হবে।’
কূটনৈতিক ভাষার মারপ্যাঁচ বাদ দিলেও এই বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ অত্যন্ত বিপজ্জনক। তিনি পরোক্ষভাবে ‘অখণ্ড ভারত’ বা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ন করার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন, যার সহজ অর্থ দাঁড়ায়- বাংলাদেশের উচিত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ভারতের আধিপত্য স্বীকার করে নেওয়া।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- আমাদের সংবাদমাধ্যম-কর্মীদের একটা অংশও কেন সেই প্রস্তাবে সাড়া দিচ্ছে ‘আমরা ছোট্ট রাষ্ট্র, আপনারা আমাদের লালন-পালন করবেন’ বলে? সরকারই বা কেন নীরব? কেন এখনো প্রশাসনে ভারতমুখী দোসর আর ‘র’-এর এজেন্টরা সক্রিয়? আর সামরিক দিক থেকে কি বাংলাদেশ সত্যিই এত অসহায় যে ভারতের ‘জুজু’তেই আতঙ্কিত হয়ে পড়তে হবে?
এই লেখায় আমরা ইতিহাস, দলিল, সামরিক বিজ্ঞান ও কূটনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে প্রমাণ করার চেষ্টা করব- বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রকৃত হুমকি ভারতের সেনাবাহিনী নয়, বরং ভারতীয় নেতাদের দীর্ঘদিনের অসম্মানজনক আচরণের বিরুদ্ধে আমাদের নিজেদের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং এক শ্রেণির বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর ও জগৎশেঠদের উপস্থিতি।
‘আধিপত্য মেনে নেওয়াই’ দিনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যের প্রকৃত অর্থ
দিনেশ ত্রিবেদী কে? তিনি তো একজন পেশাদার কূটনীতিক নয়; তিনি বরং বিজেপির রেল ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা একজন ঝানু রাজনীতিক। ভারত বাংলাদেশে এমন এক ব্যক্তিকেই হাইকমিশনার হিসেবে পাঠিয়েছে, যার কাজ সম্পর্ক রক্ষা করা নয়, বরং জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী তাদের আধিপত্যহীন বাংলাদেশে তাদের তথা ভারতীয় প্রভাব টিকিয়ে রাখা।
তাঁর ‘এক হয়ে যাওয়া’ শব্দটি কোনো ভুল শব্দচয়ন নয় বলেই আমরা মনে করি, বরং এটি একটি পরিকল্পিত উক্তি। এর সরল অর্থ: বাংলাদেশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ভারতের আধিপত্য স্বীকার করে নিক। কারণ পৃথিবীর কোনো কূটনীতিক দুই সার্বভৌম দেশের ‘এক হওয়া’ নিয়ে এভাবে কথা বলেন না। এটি ঠিক তেমনই, যেমন ১৯৭১ সালের এপ্রিলে ইন্ডিয়ান ইনিস্টিটিউট অব ডিফেন্স স্ট্রাটেজিক অ্যানালাইসিসের চেয়ারম্যান সুব্রামানিয়াম ডেইলি হেরাল্ডে লিখেছিলেন, ‘পূর্ব বাংলার সঙ্কট ভারতকে এমন একটি সুযোগ এনে দিয়েছে যে হাজার বছরের মধ্যে এরকম সুযোগ আর আসবে না’ (Sisson & Rose, War and Secession, p. 207)।
আসলে ভারত আমাদের বাংলাদেশের মুসলিমদের এবং আমাদের এই ভূখণ্ডের প্রতিটি সঙ্কটকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে জানে। ‘হাজার বছরের সুযোগ’ শেষ হলো জুলাই বিপ্লবের পর আ’লীগহীন নতুন বাংলাদেশে। তাই সুযোগ পুনরায় উদ্ধার করতেই দিনেশ ত্রিবেদী বার্তাবাহক হয়ে এলেন।
ঘরের শত্রু বিভীষণ
হাইকমিশনারের ধৃষ্টতার চেয়েও লজ্জাজনক ঘটনা ঘটেছে আমাদের সংবাদমাধ্যমের কর্মীর দ্বারা। এক বেসরকারি টেলিভিশনের (সম্ভবত NEWS24) সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করে বসেন, ‘আমরা ছোট্ট রাষ্ট্র, আপনারা বৃহৎ শক্তি; আপনারা আমাদের লালন-পালন করেন।’ এ বক্তব্যেও আওয়ামী শাসনামলের কতিপয় সাংবাদিকদের নতজানু নীতিই আবারো স্পষ্ট হলো। এরাই মীর জাফরদের বংশধর।
একটি দেশের সংবাদকর্মী যখন নিজের জাতির উদ্দেশে ‘লালন-পালন’ করার আবেদন জানান, তখন সেই জাতি কেবল অধীনস্থ হওয়ার স্বপ্নই দেখে না, বরং চিরতরে নিজেকে গোলামির জিঞ্জিরে নিমজ্জিত হয়ে এক নির্মম জিল্লতির জীবনকে আমন্ত্রণ জানায়। এটি পেশাদার সাংবাদিকতার ব্যর্থতা নয়, এটি ঘরে বসে থাকা ‘মীর জাফর’ বা ফ্যাসিস্ট আমলের মন্ত্রী আবদুল মোমেন ‘স্বামী-স্ত্রী তত্ত্ব’-এর প্রতিফলন। আশোকা রায়না তাঁর ‘ইনসাইড র: দি স্টোরি অব ইন্ডিয়াস সিক্রেট সার্ভিস’-এ লিখেছেন, বাংলাদেশের সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও ছাত্র রাজনীতিতে ‘র’ (RAW)-এর গভীর নেটওয়ার্ক কাজ করে (Raina, Inside RAW, pp. 86-87)। এই প্রশ্নটি যেন সেই নেটওয়ার্কেরই পরিকল্পিত কৌশল- উপমহাদেশীয় ভাষায় যাকে বলে ‘সেট আপ’।
১৯৭১-এর গোপন চুক্তি থেকে মৈত্রী চুক্তি
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ ভারতের উদারতায় হয়নি। এটি হয়েছিল এদেশের শহীদ বীরের রক্তের বিনিময়ে। ভারত তখন কেবল নিজের স্বার্থ দেখেছিল। ইতিহাসবিদ রিচার্ড সিসন ও লিও রোজের মতে, ভারতের কৌশলবিদেরা মুক্তিযুদ্ধকে ‘উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তার স্বার্থে’ ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন (Sisson & Rose, p. 207)।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত সরকার ও বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় সাত দফা গোপন চুক্তি, যার ধারায় বলা হয়েছিল বাংলাদেশের নিজস্ব কোনো সামরিক বাহিনী থাকবে না (Haq, R & CIA in the Liberation War of Bangladesh, pp. 92-93)। একই সময়ে, নির্বাসিত সরকারের অনুমতি ছাড়াই জেনারেল সুজন সিং উবান দেরাদুনে ‘মুজিব বাহিনী’ গঠন করেন। জেনারেল উবান তাঁর ‘ফ্যান্টম অব চিটাগাং’ গ্রন্থে স্পষ্ট লিখেছেন, এই বাহিনী গঠনের উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় স্বার্থ চরিতার্থ করা।
১৯৭২ সালে স্বাক্ষরিত ২৫ বছরের মৈত্রী চুক্তির ৮, ৯ ও ১০ ধারায় বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভারতের পরিপূরক করার কথা বলা হয়। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিজে লিখেছিলেন ‘সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ভারত ও বাংলাদেশ একে অন্যের পরিপূরক’ (Gandhi, Aspects of Our Foreign Policy, p. 100)| । কিন্তু বাস্তবে এই ‘পরিপূরকতা’ ছিল অধীনতার আরেক নাম।
পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সংসদ ভবন : ‘র’-এর লেলিয়ে দেওয়া সন্ত্রাস ও ‘অখণ্ড ভারত’-এর মানচিত্র
বাংলাদেশকে দুর্বল রাখতে ভারত নানা অপকৌশল নিয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘র’-পরিচালিত বিদ্রোহ। বীনালক্ষ্মী নিপ্রাম তাঁর ‘সাউথ এশিয়াস ফ্রাকচার্ড ফ্রন্টিয়ার’ বইতে লিখেছেন, ১৯৭৫ সালে চাকমা বিদ্রোহীদের অস্ত্র, গোলাবারুদ ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ত্রিপুরার সীমান্ত ছাউনি এবং দেরাদুনের ছাকরাটায় বিশেষ প্রশিক্ষণ শেষে বিদ্রোহীরা পার্বত্য চট্টগ্রামে অনুপ্রবেশ করে। আগরতলায় ‘র’-এর একটি দপ্তর এই অভিযান তদারক করত (Nipram, South AsiaÕs Fractured Frontier, p. 153)।
সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডেও ‘র’-এর জড়িত থাকার অভিযোগ এনেছিলেন জনতা দল নেতা সুব্রামানিয়াম স্বামী (সানডে, ১৮-২৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৮)।
এখন ভারত সেই ‘র’-এর কৌশল বাদ দিয়ে সরাসরি ‘অখণ্ড ভারত’-এর প্রতীকী আগ্রাসন শুরু করেছে। ২০২৩ সালে ভারতের নতুন সংসদ ভবনের উদ্বোধনের সময় সেখানে ‘অখণ্ড ভারত’-এর যে মানচিত্র টাঙানো হয়, তাতে বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার ও আফগানিস্তানের অংশ দেখানো হয়। এটাকে আমরা উপেক্ষা করেছি। দিনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্য সেই উপেক্ষারই পরিণতি।
সামরিক জুজুর ভয় ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা
অনেকে মনে করেন, ভারতের বিশাল সেনাবাহিনীর সামনে বাংলাদেশ অসহায়। এই ধারণা ভিত্তিহীন। সামরিক বিজ্ঞানের মৌলিক নিয়ম হলো, কোনো দেশকে আক্রমণ করতে গেলে আক্রমণকারীর অন্তত তিনগুণ (৩:১) শক্তির প্রয়োজন। বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর ১১টি ডিভিশনের বিপরীতে ভারতের লাগবে ৩৩টি ডিভিশন।
কিন্তু চীন-পাকিস্তান সীমান্তের উত্তেজনার কারণে ভারত কখনোই এত বিপুলসংখ্যক ডিভিশন পূর্বাঞ্চলে মোতায়েন করতে পারে না। পশ্চিম ফ্রন্ট ও উত্তরে চীন ও পাকিস্তানের হুমকি ভারতকে পূর্ব ফ্রন্টে সীমিত শক্তি রাখতে বাধ্য করে। ফলে ভারতের পক্ষে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু করা কৌশলগতভাবে অসম্ভবের কাছাকাছিই বটে।
তাছাড়া ভারতের স্বাধীনতার পর একমাত্র বড় সামরিক বিজয় ১৯৭১ সালে, সেখানেও মূল যোদ্ধা ছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও মুক্তিযোদ্ধারা। জেনারেল উবানের উক্তি অনুযায়ী, প্রতিটি সম্মুখ সমরে মুক্তিযোদ্ধারা ভ্যানগার্ড হিসেবে লড়েছেন। ইতিহাসকে বিকৃত করে নরেন্দ্র মোদি ২০২১ সালের ২৬ মার্চ দাবি করেন, তিনি ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সত্যাগ্রহ করে জেল খেটেছেন’ (The Business Standard, 26 March 2021)। এটি ইতিহাসের অবমাননা।
আমাদের প্রকৃত দুর্বলতা সামরিক নয়, বরং উচ্চকমান্ডে ভারতীয় প্রভাব ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। জুলাই বিপ্লবের পরেও সেনাবাহিনীতে ভারতীয় অফিসারদের ডেপুটেশনে থাকার খবর প্রকাশিত হয়েছে। বিদেশি পাসপোর্টধারী ব্যক্তিরা নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে রয়েছেন। ‘র’-এর এজেন্ট বহু জেনারেল এখনো সেনাবাহিনীতে প্রভাবশালী। এই বাস্তবতায় সরকার কীভাবে ভারতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবে তা সরকারকেই ঠিক করতে হবে।
‘যুক্তবাংলা’ থেকে ‘অখণ্ড ভারত’ : একই থিয়েটারের নতুন নাটক
১৯৯১ সালের ২৩ মে ভারতীয় বুদ্ধিজীবী শিব নারায়ণ রায় একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় ‘যুক্তবাংলা’-র ইঙ্গিত দিয়েছিলেন (সাপ্তাহিক খবরের কাগজ, ২৩ মে ১৯৯১)। তখন তিনি বলেছিলেন, বাংলার উভয় অংশের যুক্ত হওয়া অবশ্যম্ভাবী। তিন দশক পর ঠিক সেই একই মানসিকতার প্রতিফলন ঘটল গত সপ্তাহে, ভারতের নবনিযুক্ত হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী ঢাকায় পা দিয়ে বললেন, ভারতের ১৪০ কোটি ও বাংলাদেশের ২০ কোটি জনসংখ্যা ‘এক হয়ে’ বিশ্বশক্তি গঠন করবে।
১৯৯১ সালের সেই ‘যুক্তবাংলা’ কল্পনা আর ২০২৬ সালের এই ‘এক হয়ে যাওয়া’ প্রস্তাব, দুটিই একই সূত্রে গাঁথা : বাংলাদেশের স্বাধীন সত্তাকে মেনে নেওয়ার মানসিকতাই নেই ভারতের। নেহরুর ‘অখণ্ড ভারত’ থেকে শুরু করে শিব নারায়ণ রায়, আর আজকের দিনেশ ত্রিবেদী, সবাই একই পরিবারের সন্তান। ক্রমবর্ধমান সংক্রমণের ধারাবাহিকতা, যার নাম ভারতীয় আধিপত্যবাদ।
ইতিহাসের পাতা উল্টালেই দেখা যায়, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের জন্য কংগ্রেসই দায়ী ছিল। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ তাঁর ‘ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম’-এ লিখেছেন, নেহরু ও কংগ্রেস নেতারা মনে করতেন পাকিস্তান বেশি দিন টিকবে না (Azad, India Wins Freedom, pp. 19-20, 185, 197)। একই চিন্তা থেকেই জন্ম নেয় ‘যুক্তবাংলা’-র কল্পনা, যেখানে পশ্চিম বাংলা ও পূর্ব বাংলা এক হয়ে ভারতের একটি প্রদেশ হিসেবে থাকবে।
রবি রাখাই তাঁর ‘দি ওয়ার দ্যাট নেভার ওয়াজ’ গ্রন্থে আরও স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন, ‘পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে ভারতের সঙ্গে অঙ্গীভূত করেই স্বাধীনতাপূর্ব ভারত গঠন করতে হবে… পুনরাঙ্গীভূতকরণ, হয় শান্তিপূর্ণভাবে, নয়ত যুদ্ধের মাধ্যমে।’
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যদি শেষ পর্যন্ত ‘যুক্তবাংলা’ বা ‘অখণ্ড ভারত’-এর দিকেই ধাবিত হয়, তাহলে মুক্তিযুদ্ধ কী অর্থ বহন করে?
মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এখনই সময়
একটি প্রবাদ আছে: ‘প্রথম রাতেই বিড়াল মারা’- অর্থাৎ প্রথম আঘাতটিই হতে হবে শক্ত। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার দিনেশ ত্রিবেদীর ‘এক হয়ে যাওয়া’র প্রস্তাবে এখনো নীরব। ভারতের নতুন সংসদ ভবনে ‘অখণ্ড ভারত’-এর মানচিত্রে বাংলাদেশকে তুলে ধরার পরেও আমাদের কেমন ছিল আমাদের প্রতিবাদ, তা তো আমরা জানিই। পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘র’-এর তৎপরতা এবং সীমান্তে পুশইনের ঘটনায়ও বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে আমাদের কূটনীতি।
দিল্লির মনে রাখা উচিত, বাংলাদেশ আর আগের সেই তাঁবেদার শাসনামলে নেই। জুলাই বিপ্লবের পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীনভাবে বাঁচতে চায়। তারা কারো লালন-পালনের শিশু নয়, তারা শহীদ তিতুমীর থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক হাজারো জুলাইয়ের তরুণ শহীদ ওসমান হাদি এদেরই উত্তরসূরি। তাই ভারতের আগ্রাসী নীতি এবং ‘অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন’ কোনোদিন সফল হবে না, আমাদের এমন আত্মমর্যাদাবান দেশপ্রেমিক তরূণরা থাকতে। কিন্তু আমাদের আত্মমর্যাদা ধরে রাখতে ও সামগ্রিকভাবে সকলে নাগরিকের আত্মমর্যাদা ফিরে পেতে হলে যা দরকার:
১. ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাওয়া এবং অনভিপ্রেত শব্দের জন্য ক্ষমা চাওয়া।
২. সংবাদমাধ্যমে বসা ‘মীর জাফর’দের চিহ্নিত করে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় আনা।
৩. সেনাবাহিনী ও প্রশাসন থেকে বিদেশি এজেন্ট ও ভারতীয় ডেপুটেশন অপসারণ।
৪. ‘র’-এর কার্যক্রম মোকাবিলায় কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স জোরদার করা।
৫. সামরিকভাবে শক্তিশালী হওয়া। সকল তরুণকে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া।
সামরিক দিক থেকে আমরা নিরাপদ, ভারত কখনো বড় আকারের যুদ্ধ চাপাতে পারবে না। আমাদের প্রকৃত শত্রু শুধু বাইরে নয়, ভেতরে। যে ভিতরের মীর জাফররা ‘লালন-পালন’-এর ভাষায় অধীনতা স্বীকার করে নেয়, তারাই প্রকৃত বিপদ। বাংলাদেশকে স্বাধীন রাখতে হলে আগে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হবে। নেহরু থেকে মোদি, সবাই একই স্বপ্ন দেখেছে। তাদের স্বপ্নপূরণ হোক বা না হোক, আমরা জানি- একটি মাত্র বাণী: ‘আমার দেশ অন্যের অধীনতা নয়, আমার দেশ মাথা উঁচু করে থাকুক।’
১৯৭১ সালে আমরা প্রমাণ করেছিলাম, রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা কেনা যায়। ২০২৪ সালে প্রমাণ করেছি জীবন দিয়ে স্বাধীনতা পুনরূদ্ধার করা যায়। যদি প্রয়োজন হয়, ২০২৬ বা ২০৩৬ সালে কিংবা অন্য কখনো, আমরা আবারও প্রমাণ করব, আমরা কারো অধীন নই, তাবেদার নই। আমরা স্বাধীন, আমরা বাংলাদেশি।