গল্প দাদুর আসর-৪

জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের সংগ্রাম


১ জুলাই ২০২৬ ১৯:৫১

॥ মাহবুবুল হক ॥

মহররম নিয়ে দাদু ভাইয়ের আসর বসেছিল। ২৬ জুন ২০২৬ শুক্রবার ১০ মহররম। খুব গরম পড়েছে, সবাই আসতে পারেনি। সবার বাবা-মা সবাইকে ছাড়েননি। একদিকে গরম; আরেকদিকে বৃষ্টি। আষাঢ় মাসের ১২ তারিখ না। এজন্য ঢাকা শহরের একদিকে গুড়ুম গুড়ুম বৃষ্টি; অপরদিকে সূর্যের প্রচণ্ড দাপট। বর্ষারও একটা মমতা আছে স্নিগ্ধতা আছে, মন নাড়া দেয়ার বিষয় আছে। কবি বলেছেন, এইদিনে তারে বলা যায় … কাকে বলা যায়; কী বলা যায়, সে কথা কবি প্রকাশ করেননি।
অনুষ্ঠান শুরুতেই দাদাভাই কুরআনের আয়াত নিজে নিজেই পাঠ করে সবার উদ্দেশে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা তো এখন একটু বড় হয়েছ। কে কে রোজা রেখেছ বলো তো। আরিজ, নয়ন, তান্না হাত ওঠায়। আজকে উপস্থিত মাত্র সবাই মিলে ৭ জন। দাদু ভাই বললেন, আলহামদুলিল্লাহ।
আমিরা : আমি তো রোজা থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে আব্বু-আম্মু নিষেধ করেছে। তারা বলেছেন, তোমার এক্সজাম চলছে, এবার তুমি মহররমের রোজা রেখ না। সে কারণে আমার রাখা হয়নি।
দাদু ভাই : আরিজ বলতো, মহররমের রোজা কয়টি এবং সে রোজাগুলো কী ধরনের রোজা।
আরিজ : মহররমের রোজা দুটি। ১০ মহররম ঠিক রেখে ৯ বা ১১ মহররমের আর একটি রোজা আমাদের রাখতে হয়। এই রোজা দুটি নফল রোজা। তবে কেউ কেউ আবার মহররমের এই রোজা ১ মহররম থেকে ১০ মহররম পর্যন্ত রাখার চেষ্টা করে।
দাদা ভাই : বলতো তান্না মহররম মাস আরবি মাসের কোন মাস।
তান্না : আমি তো জানি না এবং আরবি সব মাস আমার মুখস্থ নেই। এ সময় নয়ন হাত তুলে বলে, মহররম মাস আরবি মাসের প্রথম মাস।
দাদা ভাই : তাহলে তুমি তো জান। তবে আরবি অন্যান্য মাসের নামগুলো বলো।
নয়ন : মহররম, সফর, রবিউল আউয়াল, রবিউল সানি, জমাদিউল আউয়াল, জমাদিউস সানি, রজব, শাবান, রমজান, শাওয়াল, জিলকদ, জিলহজ।
দাদা ভাই : আচ্ছা মহররম মাসে কেন আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
সমস্বরে সবাই বলে ওঠে, আমরা তো ভালো করে জানি না।
দাদু ভাই : না জানাটা এখন কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু বড় হলে তোমাদের এসব জানতে হবে। একটি মাসে তোমরা আলাদা করে ২টি রোজা রাখছো। অথচ জানো না কেন রোজা রেখেছো। দাদা ভাইয়েরা এটা তো ঠিক হলো না। না জেনে, না বুঝে আমাদের কোনো কাজ করা উচিত নয়। আমরা অন্ধের মতো কোনো কাজ করতে পারি না। যাই হোক, আজ তোমাদের আমি খুব সংক্ষেপে ১০ মহররমের কয়েকিট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের কথা উল্লেখ করছি।
১. মানবজাতির আদি পিতা আদম (আ.)-এর সৃষ্টি এবং পৃথিবীতে প্রেরণ। ২. নূহ (আ.)-এর নৌকা ৪০ দিন পর মাটি স্পর্শ করে। ৩. ইবরাহিম (আ.) এ দিনে জন্মগ্রহণ করেন এবং নমরূদের আগুন থেকে তিনি এদিনে মুক্তি পান। ৪. আল্লাহ তায়ালা ইদ্রিস (আ.)-কে এই দিনে আসমানে উঠিয়ে নেন। ৫. ৪০ বছর পর ইউসুফ (আ.)-এর সাথে তাঁর পিতা ইয়াকুব (আ.)-এর সাক্ষাৎ হয়। ৬. আইয়ুব (আ.) ১৮ বছর কুষ্ঠ রোগ ভোগার পর আরোগ্য লাভ করেন। ৭. ইউনূস (আ.) ৪০ দিন মাছের থাকার পর মুক্তি লাভ করেন। ৮. সোলাইমান (আ.) কিছুদিনের জন্য রাজত্ব হারান। আল্লাহ তায়ালা তাকে আবার রাজত্ব ফিরিয়ে দেন এই দিনে। ৯. মূসা (আ.) ও তার অনুসারীরা আল্লাহর অনুগ্রহে লোহিত সাগরের মধ্য দিয়ে পার হয়ে যান। তাদের পেছনে ছুটে আসা ফেরাউন ও তার দলবলসহ সমুদ্রে ডুবে মরেন। আল্লাহ তায়ালা মূসা (আ.)-এর সাথে তুর পাহাড়ে কথা বলেছিলেন। ১০. ঈসা (আ.)-এর জন্ম এই দিনে হয়। ইহুদিরা তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করলে মহান আল্লাহ তাঁকে সশরীরে আসমানে উঠিয়ে নেন। ১১. এদিনেই রাসূল (সা.)-এর পূর্বের এবং পরের সমস্ত ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দেয়া হয়। ১২. কাবা শরীফকে সর্বপ্রথম গিলাফ দ্বারা আবৃত করা হয়। ১৩. এদিনেই আল্লাহ তায়ালা সাত আকাশ, পৃথিবী, পর্বতমালা ও ফেরেশতাদের সৃষ্টি করেছেন। ১৪. মহান আল্লাহ এদিনে আরশে আজিমে অধিষ্ঠিত হন। ১৫. আকাশ থেকে দুনিয়ায় প্রথম বৃষ্টিপাত হয় এই দিনে। ১৬. কেয়ামত সংগঠিত হবে এই দিনে। ১৭. এদিনে নারীরা ছাড়া শহীদ হন রাসূল (সা.)-এর প্রিয় নাতি ইমাম হোসাইন (রা.)সহ তার পরিবারের ৭২ জন সদস্য।
দাদু ভাইয়েরা বড় হলে তোমরা এই বিষয়গুলো আরো ভালোভাবে জানতে পারবে। আমি বুঝতে পারছি আমি যে ঘটনাগুলো তোমাদের কাছে উল্লেখ করলাম এর বাইরেও হয়তো আরো অনেক বড় ঘটনা থাকতে পারে। তবে সব ঘটনা খুব বেশি আলোচনায় আসে না। আলোচনায় আসে পরিবারসহ রাসূল (সা.)-এর নাতি ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদাতবরণের মর্মান্তিক ঘটনাটি। দুনিয়ার নিষ্ঠুরতম ঘটনাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। তোমাদের কাছে ঘটনাটি পরিষ্কার করে বলা কঠিন। আবার সত্য ঘটনা চাপিয়েও রাখা যায় না। রাখলেও লাভ হয় না। দোষত্রুটি, অন্যায়-অবিচার যেই করুক তাকে অবশ্যই দুনিয়া ও আখিরাতে শাস্তি ভোগ করতে হবে।
দুনিয়ায় সবসময় চলছে সত্য ও মিথ্যার লড়াই। এই লড়াই চলতে থাকবে। মুসলমানদেরই একটি দল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মিথ্যা ষড়যন্ত্র করেছিল। তাদের বিরুদ্ধেই লড়াই করার জন্য রাসূল (সা.)-এর পরিবার কীভাবে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে ময়দানে নেমেছিলেন তার কোনো তুলনা দুনিয়ার ইতিহাসে নেই।
আমাদের দেশে তোমাদের মতো কিশোর ও তরুণরা ২০২৪ সালে যেভাবে জালেম সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল, সেই লড়াইয়ে তোমরা কেউ কেউ শরিকও হয়েছিলেন। সেই ঘটনার সাথে আমাদের দেশের এই ঘটনা হুবহু মিল না থাকলেও মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের লড়াইটাই তো ছিল প্রধান বিষয়। আমরা যদি বর্তমানের প্রেক্ষাপটে পূর্বের সেই লড়াইকে বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখবো সেই নৃশংস লড়াইটাও ছিল জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের সংগ্রাম। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নিরীহ জনতার সংগ্রাম।
আরিজ : জুমার আজান পড়ে গেছে। আমিরা এখন নাশতা আনেনি। দাদা ভাই তুমি যা বললে সবকিছু কিন্তু মাথায় ঢুকেনি। আগামী জুমাবার তুমি এই বিষয়গুলো নিয়ে আবারও আমাদেরকে বলবে।