নৈতিক মূল্যবোধের অভাবই শিশু নির্যাতনের কারণ


১ জুলাই ২০২৬ ১৯:৫০

॥ মু. দিদারুল আহসান ॥
মানবজীবনকে যথার্থ সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তোলে তার নৈতিক মূল্যবোধ। মনুষ্যত্বের সঙ্গে নৈতিকতার বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। সততা, ন্যায়পরায়ণতা, আদর্শবাদিতা ইত্যাদি গুণের সমাবেশেই নৈতিকতার স্বরূপ প্রকাশিত হয়। মানুষ যতদিন বিবেকবান হৃদয়ের অধিকারী হয়ে এই নৈতিক আদর্শকে সমুন্নত রাখে, ততদিন মনুষ্যত্বের গৌরব বিকশিত হয়। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ হিসেবে তার পরিচয় উজ্জ্বল হয়ে থাকে।
নীতি-আদর্শের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত জীবন ব্যবস্থার অভিব্যক্তিই নৈতিক মূল্যবোধ। জীবনে কোনো অন্যায়-অনাচার থাকবে না, স্বার্থপরতা সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত থাকবে জীবন। ঘুষ, দুর্নীতি, বঞ্চনা, শোষণ এসব থেকে মুক্ত থাকলেই সমাজে নৈতিকতার আদর্শ প্রতিফলিত হয়। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় আজ নানারকম দুর্নীতি অনুপ্রবেশ করায় সকল ক্ষেত্রে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় দেখা দিয়েছে। এখানে কোনো প্রকার অন্যায়ই আজ অন্যায় বলে বিবেচিত হয় না।
সম্প্রতি দেশে শিশু নির্যাতনের ঘটনা অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। এখন মায়ের গর্ভেও শিশুর নিরাপত্তা নেই। কোমলমতি শিশুরা আজ সমাজের খারাপ মানুষগুলোর হিংস্রতার শিকার হচ্ছে। অতীতের সেই সিলেটের রাজন, খুলনার রাকিবদের মতো সম্প্রতি আছিয়া ও রামিসারা তাদের জীবনের বিনিময়ে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেছে আমাদের সমাজের পচন আজ কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে। মানুষরূপী পশুগুলোর নির্মমতার মাত্রা কত তীব্র। শুধু আছিয়া কিংবা রামিসা নয়, এরকম অসংখ্য আছিয়া ও রামিসারা অধঃপতিত এ সমাজে আজ গুমড়ে কাঁদছে আর আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করছে। নীতি-আদর্শহীন অনিরপেক্ষ তথাকথিত কিছু মানবাধিকার কর্মীরা একটা ঘটনা ঘটলেই দু-চারদিন লাফালাফি করে তাদের দায়িত্ব শেষ করে। আমাদের প্রশাসন ব্যবস্থায় কোনো নৈতিকতার চর্চা নেই। এখানে প্রতিরোধমূলক কোনো ব্যবস্থা নেই বললেই চলে, বরং ঘটনা ঘটার পর নামকাওয়াস্তে শাস্তির বিধান আছে, যা আইনের মারপ্যাঁচের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আর এ কারণেই আজ আমাদের সমাজের এ দুরাবস্থা।
এ অবস্থা থেকে বের হওয়ার জন্য আজ প্রয়োজন জীবনের সকল ক্ষেত্রে নৈতিকতার সফল চর্চা। আর নৈতিকতা শিক্ষা দেয় ইসলাম। তাই সবার আগে আমাদের উচিত ইসলামের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ করা। শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে ইসলাম শিক্ষা উঠিয়ে দেয়া নয়, বরং এর আরও বিস্তার ঘটাতে হবে। সমাজের মধ্যে আগে নৈতিকতার বীজ বপন করতে হবে, তারপর ফল প্রতাশা করতে হবে। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। এ বিধানের বৈশিষ্ট্য, বিশেষত্ব ও বিরাটত্বের কারণ হচ্ছে তা জীবনের প্রতিটি বিষয় পূর্ণমাত্রায় পরিব্যাপ্ত। মানুষ যে পরিবেশে বসবাস ও জীবন ধারণ করে, অপরাধ ও অপরাধের শাস্তি সেই পরিবেশের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। সেক্ষেত্রে ইসলামের অবদান পর্ণমাত্রায় অনুধাবনীয়। ইসলামই একমাত্র জীবনবিধান, যা অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই তার প্রতিরোধ করে। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, চৈন্তিক, আত্মিক, আধ্যাত্মিক ও শিক্ষণ-প্রশিক্ষণের একটি দিক ও ইসলাম বাদ দেয়নি। যে যে ছিদ্র পথে অপরাধ প্রবেশ করতে পারে ও করার সুযোগ পায়, তার প্রত্যেকটিই ইসলাম আগে থেকে বন্ধ করার ব্যবস্থা করেছে। তাই ইতিহাস সাক্ষী অপরাধের সর্বনিম্ন মাত্রার দিক দিয়ে ইসলামী সমাজ আজও তুলনাহীন।
অতএব শুধু শিশু নির্যাতন নয়, সমাজের ক্রমবর্ধমান অবক্ষয় থেকে মুক্তি পেতে আমাদের আর ও সচেতন হতে হবে। নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটাতে হবে। নৈতিক মূলবোধের অভাবে জাতি আজ ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি। উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা ভবিষ্যৎ বংশধরদের আচরণ দেখে দিশেহারা হচ্ছেন। এ অবস্থার অবশ্যই পরিবর্তন দরকার। সেজন্য সমাজকে সর্বপ্রথম দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের মাঝে নৈতিকতার বীজ এমনভাবে বপন করতে হবে যে, জাতীয় জীবনের ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির প্রতি আস্থাশীল হয়ে তাদের মাঝে নৈতিক মূল্যবোধসংবলিত জীবনাদর্শ রূপায়িত হয়। আর এজন্য ধর্মীয় শিক্ষা, আইনগত শাস্তি, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও মানবিকতার বিকাশ একান্ত অপরিহার্য।
লেখক : প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, ইসলামাবাদ নেছারিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসা, মুলাদী-বরিশাল।