গাইবান্ধায় যুবদলের হামলায় আবারও শিবির নেতা নিহত
২৫ জুন ২০২৬ ১০:৫৯
স্টাফ রিপোর্টার : চব্বিশের ৫ আগস্টের পর থেকে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারে মরিয়া হয়ে উঠেছে বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। মাঠে-ময়দানে প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের ওপর বিভিন্ন সময় হামলা চালিয়ে আসছে তারা। করছে দখলবাজি। এখন পর্যন্ত বিএনপির হামলায় জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন। গত ২১ জুন রোববার গাইবান্ধার সাঘাটায় যুবদল নেতার হামলায় নিহত হন শিবির নেতা বোনারপাড়া ইউনিয়ন ছাত্রশিবিরের সভাপতি সাইফুল্লাহ বারী (২৪)। এই হত্যাকাণ্ডের সাথে বোনারপাড়া ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক মো. মোকলেছুর রহমান মুকুল ও তার সহযোগীরা জড়িত বলে জানা গেছে। অভিযুক্তরা গত ২১ জুন রোববার বিকাল পৌনে ৩টার দিকে সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়া চৌমাথায় প্রকাশ্যে দিনে-দুপুরে নিহত সাইফুল্লাহর ওপর বর্বরোচিত ও পরিকল্পিত হামলা চালায়। এ সময় সালাউদ্দিন নামের এক শিবিরকর্মীও গুরুতর জখম হয়েছেন। সাঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহাবুর রহমান ও বোনারপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ আব্দুল কাউয়ুম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাঘাটার কচুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি বিশেষ করে সভাপতি গঠনের বিষয়ে সাঘাটা উপজেলা চত্বরে স্কুলটির প্রধান শিক্ষক হাবিবুল্লাহর সাথে বোনারপাড়া ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক মুকুলের কথাকাটাকাটি হয়। পরবর্তীতে স্থানীয় নেতাদের সমঝোতায় বিষয়টি মীমাংসা হলে সবাই উপজেলা চত্বর থেকে চলে যান।
এর কিছুক্ষণ পর বোনারপাড়া ইউনিয়ন ছাত্রশিবিরের সভাপতি সাইফুল্লাহ ও শিবিরকর্মী সালাউদ্দিন বোনারপাড়া-সাঘাটা সড়কের উপজেলা সংলগ্ন বোনারপাড়া চৌমাথায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, পূর্বপরিকল্পিতভাবে বোনারপাড়া ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক মুকুল মিয়া ও তার ছোট ভাই পলাশ, বোনারপাড়া ওয়ার্ড বিএনপির সদস্য রবিউল ইসলাম, যুবদল নেতা আশরাফ, মোনারুল ও জব্বারসহ ১০-১২ জন সন্ত্রাসী ধারালো চাকু নিয়ে তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।
হামলাকারীরা প্রথমে শিবির কর্মী সালাউদ্দিনের গলায় আঘাত করে। তাকে বাঁচাতে ইউনিয়ন শিবির সভাপতি সাইফুল্লাহ এগিয়ে এলে সন্ত্রাসীরা তাকে ধাওয়া করে বোনারপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সামনের রাস্তার ওপর ফেলে নৃশংসভাবে গলায় ছুরি চালায়। এরপর খুনিরা মোটরসাইকেল নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
ঘটনার পর স্থানীয়রা দুজনকে উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। সাইফুল্লাহকে গাইবান্ধা আধুনিক হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। অন্যদিকে গুরুতর আহত শিবিরকর্মী সালাউদ্দিনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সাইফুল্লাহ রংপুর ধাপ সাতদাগারা কামিল আলিয়া মাদরাসায় অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিল।
এর আগে গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে বিএনপির হামলায় আহত হয়ে চিকিৎসাধীন থেকে গত ৩১ মে মারা যান জামায়াত নেতা সামিউল ইসলাম অভি। সামিউল হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করা হলেও বিচারকার্য ঝুলে রয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে সাইফুল্লাহর হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ ও অপরাধীদের বিচারের দাবি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার গত ২১ জুন রোববার এক বিবৃতিতে বলেন, গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়া এলাকায় প্রকাশ্য বাজারে সাবেক যুবদল নেতা মুকুল ও তার ভাই পলাশসহ সন্ত্রাসীরা ইউনিয়ন ছাত্রশিবিরের সভাপতি ও মেধাবী ছাত্র সাইফুল্লাহ বারীকে ধারালো অস্ত্র ও লোহার শাবল দিয়ে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে। প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘটিত এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড অত্যন্ত বর্বর, কাপুরুষোচিত ও মানবতাবিরোধী।
একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের জেরে এ ধরনের রক্তক্ষয়ী ও পাশবিক হামলা কোনো সভ্য সমাজ ও সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আমি এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
পিতার ইমামতিতে দাফন সম্পন্ন, খুনিদের দ্রুত গ্রেফতার দাবি ৩ এমপির
গত ২২ জুন সোমবার পিতার ইমামতিতেই গাইবান্ধা সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়া ইউনিয়ন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি সাইফুল্লাহ বারীর জানাজা সম্পন্ন হয়েছে। জানাজার নামাজ আদয়ের ইমামতি করেন নিহত শিবির সভাপতির পিতা উপজেলা জামে মসজিদের ইমাম হাবিবুর রহমান।
জানাজাপূর্ব বক্তব্য দেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা, গাইবান্ধা জেলা জামায়াতের আমীর ও সদর আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল করিম, গাইবান্ধা-৫ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর বীর মুক্তিযুদ্ধা আব্দুল ওয়ারেছ, গাইবান্ধা-৩ (সাদুল্লাপুর-পলাশবাড়ী) আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা নজরুল ইসলাম লেবু প্রমুখ।
এর আগে বেলা ১১টায় গাইবান্ধা জেলা শহরে স্থানীয় পৌর পার্কে শিবিরের উদ্যোগে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। পৌর পার্কে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন গাইবান্ধা-৩ আসনের সংসদ সদস্য জামায়াত নেতা মাওলানা নজরুল ইসলাম লেবু, জামায়াতের শহর আমীর একেএম ফেরদৌস আলম, শহর সেক্রেটারি আবু হাসান, শিবিরের জেলা সভাপতি ইউসুফ আল কারজাভী ও সেক্রেটারি ফাহিম মণ্ডল প্রমুখ।
খুনিদের গ্রেফতার ও ফাঁসির দাবিতে রংপুর মহানগরী শিবিরের বিক্ষোভ
গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়ায় বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ইউনিয়ন শাখা সভাপতি সাইফুল্লাহ বারী (২৪) হত্যার প্রতিবাদে এবং খুনিদের দ্রুত গ্রেফতার ও ফাঁসির দাবিতে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির রংপুর মহানগরীতে গত ২১ জুন রোববার দিবাগত রাতে এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল করেছে।
বিক্ষোভ মিছিলটি নগরীর লালবাগ এলাকা থেকে শুরু হয়ে নগরীর শাপলা চত্বরে গিয়ে এক সমাবেমের মাধ্যমে শেষ হয়। বিক্ষোভকারীরা সাইফুল্লাহ বারীর হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে শ্লোগানে মুখরিত করে তোলে রংপুর নগরীর রাজপথ।
সমাবেশে বক্তব্য দেন রংপুর মহানগর ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোহাম্মদ আনিছুর রহমান, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সভাপতি মোহাম্মদ সুমন সরকার, সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যবসায় শিক্ষা সম্পাদক গোলাম জাকারিয়া, রংপুর জেলা সভাপতি হামিদুল ইসলাম প্রমুখ।
সমাবেশে বক্তারা বোনারপাড়ায় শিবির নেতা সাইফুল্লাহ বারী হত্যাকারীদের দীর্ঘ সময়ে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি না দেয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অবিলম্বে খুনিদের গ্রেফতার করা না হলে জনগণকে সাথে নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনের ঘোষণা দেন তারা।