চট্টগ্রামে ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে ডা. শফিকুর রহমান

৭০ শতাংশ মানুষের রায়কে অগ্রাহ্য করে কোনো সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারে না


২০ জুন ২০২৬ ১৩:০৭

চট্টগ্রাম সংবাদদাতা : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের রায়কে অগ্রাহ্য করে কোনো সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারে না। জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করা গণতন্ত্রের চেতনার পরিপন্থী। জনগণ তাদের ভোটাধিকার ও গণরায়ের যথাযথ প্রতিফলন দেখতে চায়। সরকার যদি জনগণের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়, তাহলে জনগণই তার জবাব দেবে।
তিনি আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে যোগ্য, সৎ ও দেশপ্রেমিক লোকদের মূল্যায়ন না করে ভিন্নমতাবলম্বীদের দমন এবং দলীয়করণের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হচ্ছে। সংসদে জনগণের সমস্যা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও জাতীয় স্বার্থের বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে গেলেও নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। অথচ সংসদ জনগণের কথা বলার জায়গা।
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা বিদেশি শক্তির কাছে ইজারা দেওয়া হবে না। দেশের ১৮ কোটি মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে এই দেশকে রক্ষা করবে। আমরা জাতির সঙ্গে বেঈমানি করবো না; জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন হলে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতেও প্রস্তুত আছি।
গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ নিরসন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে গত ১৩ জুন শনিবার বিকেলে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে ১১ দলীয় ঐক্যের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি আজ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। নির্বাচিত ও জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে এসব অপসংস্কৃতির অবসান ঘটবে। জনগণের ন্যায্য অধিকার আদায়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গঠনের সংগ্রাম চলবে সংসদেও, রাজপথেও। ভয়ভীতি, মামলা-হামলা কিংবা কারাবাসের হুমকি দিয়ে জনগণের আন্দোলন দমিয়ে রাখা যাবে না।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে আমীরে জামায়াত বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিরোধীদল মিছিল করেছে বলে আজ কক্সবাজারে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে যে তথ্য তুলে ধরেছেন, সেটি মিথ্যা ও ভুয়া। প্রধানমন্ত্রীর মতো রাষ্ট্রের নির্বাহী পদে বসে এমন ভুলভাল বক্তব্য প্রদান জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে আমাদের লজ্জিত করবে।
সমাবেশে বক্তব্য রাখেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল অলি আহমদ (বীরবিক্রম), জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এমপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর শায়খুল হাদীস আল্লামা মামুনুল হক, খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইযহার, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির (বিডিপি) চেয়ারম্যান এডভোকেট এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম চান এবং আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও চট্টগ্রাম অঞ্চল পরিচালক মুহাম্মদ শাহজাহান।
নাহিদ ইসলাম এমপি বলেন, ‘সরকার ঘোষিত বাজেট সাধারণ মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি সংকট, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় জনগণ চরম দুর্ভোগে রয়েছে। অথচ বাজেটে এসব সংকট মোকাবিলায় কার্যকর কোনো দিকনির্দেশনা নেই।
ড. কর্নেল অলি আহমদ (বীরবিক্রম) বলেন, দেশের সার্বিক পরিস্থিতি জনগণকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, সামাজিক অস্থিরতা এবং জননিরাপত্তার সংকট সাধারণ মানুষের জীবনকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। নারীরা ঘরের বাইরে নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করছে, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ বিরাজ করছে।
আল্লামা মামুনুল হক বলেন, জনগণের আকাক্সক্ষা ও প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ও জনমতের বিপরীতে অবস্থান গ্রহণ না করে জনগণের দাবি মেনে নেওয়াই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার সঠিক পথ।
মুহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ‘জুলাই চেতনা ধারণ করে নতুন বাংলাদেশ গড়তে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরশাসকদের পরিণতি কখনো শুভ হয় না। আমরা সরকারকে বিরোধীদলসমূহকে সঙ্গে নিয়ে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও জনগণের প্রত্যাশা বাস্তবায়নের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গঠনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই।’
এছাড়া সমাবেশে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ও সাবেক এমপি মাওলানা আ ন ম শামসুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী এমপিসহ ১১ দলের জাতীয় ও স্থানীয় নেতারা।

স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আমরা আপস করব না
সিলেট সংবাদদাতা : জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপি বলেছেন, দেশ ও জনগণের স্বার্থে জামায়াত কোনো আপস করবে না। আমাদের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ হাসিমুখে ফাঁসির কাষ্ঠে জীবন দিয়েছেন, কিন্তু পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের সাথে কোনো আপস করেননি।
তিনি বলেন, দেশ ও জনগণের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে আমরা পিছপা হবো না। সংসদে সমাধান না হলে রাজপথে আন্দোলন চলবে। গণরায় বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করেই ছাড়বো।
গত ১৪ জুন রোববার রাতে সিলেট সার্কিট হাউসে ১১ দলীয় ঐক্যের নেতৃবৃন্দ ও সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। মতবিনিময় সভায় ১১ দলীয় ঐক্যের নেতা ও সিলেটে কর্মরত বিভিন্ন প্রিন্ট ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা ছাড়াও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ভালো নির্বাচন হলেই ভালো শাসক হওয়ার প্রমাণ নেই। রক্তাক্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় গিয়ে বর্তমান সরকার জুলাই সনদকে উপেক্ষা করেছে এবং প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের দেয়া গণভোটের রায়কে বাতিল করেছে। তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন মেনে না নিলে দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তাই জাতীয় বৃহত্তর স্বার্থে আমরা ফলাফল মেনে নিয়েছিলাম।
সীমান্তে অব্যাহত উত্তেজনা চলছে জানিয়ে জামায়াত আমীর বলেন, ওপার থেকে উসকানি দেওয়া হচ্ছে। আমরা দুই দুইবার স্বাধীন হলাম, কিন্তু প্রকৃত স্বাধীনতা পেলাম কি? জাতির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে আমরা কোনো আপস করব না।
নির্বাচনের ফলাফলে কারসাজির অভিযোগ তুলে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা সাড়ে ১৭ বছর একটা কঠিন অবস্থা অতিক্রম করেছি। সাড়ে ১৭ বছর পর এবার একটা অর্থবহ নির্বাচন জাতি আশা করেছিলো। আমার ব্যক্তিগত মত, নির্বাচন সুন্দর হয়েছে। কিন্তু ফলাফল সুন্দর হয়নি। ফলাফলে অনেক কিছু করা হয়েছে। যেটা এখন অনেকে স্বীকার করছেন।
সাবেক পুলিশপ্রধান বেনজীর আহমেদকে দুবাইয়ে গ্রেফতার প্রসঙ্গে আমীরে জামায়াত বলেন, বেনজীরকে আটক দেশের পুলিশের কৃতিত্ব নয়, এটা ইন্টারপোলের কৃতিত্ব। তার বিরুদ্ধে রেড এলার্টও বর্তমান সরকার জারি করে নাই। তবে বেনজীর আটক বাংলাদেশের একটা অর্জন। কিন্তু তিনি দুবাইয়ের কারাগারে থাকবেন নাকি দেশে আনা হবে, তা সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সংসদে বিরোধীদল চরমপন্থা ও গরমপন্থা অবলম্বন করবে না, মধ্যমপন্থা অবলম্বন করবে। সংসদকে আর আমরা মমতাজের সংসদ বানাতে চাই না। তিনি বলেন, আজকেও সংসদে একজন দাঁড়ালেন, আল্লাহর বিধান পর্দার বিরুদ্ধে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করলেন।
সরকারি দল ইতোমধ্যে স্পষ্টভাবে জাতির সাথে দেয়া ওয়াদা লঙ্ঘন করেছে দাবি করে জামায়াত আমীর বলেন, জনগণের রায় ব্যর্থ হলে টেকসই গণতন্ত্র বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে সংসদে সমাধান না হলে রাজপথে লড়াই চলবে। তবে সরকার দায়িত্বশীল আচরণ করলে দেশ ভাল থাকবে।
প্রস্তাবিত বাজেট প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বাজেটে অনেককিছু ওয়েভার এসেছে। কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও মোটরসাইকেলের ওপর সরকার কর বসাবে কি না, সেটা জানতে চান তিনি। দুর্নীতি বন্ধ আর দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে কি না, এই দুটি বিষয়ের স্পষ্ট উল্লেখ নাই বাজেটে। তিনি বলেন, এদেশে এক কোটি মানুষ ট্যাক্স দেওয়ার মতো আছেন, তাহলে শুধু ৩৪ লাখ কেন?
পুশইন সম্পর্কে তিনি বলেন, দেশের সাধারণ মানুষ বিজিবির সহযোগী হয়ে উসকানির সৃষ্টি হয় এমন কোনো কাজ আমরা মেনে নেব না। সেটা যদি মুসলমানরা করে, তাও মেনে নেব না। অন্য ধর্মের কেউ করলেও মেনে নেব না। এ দেশ আমাদের সবার। যেটা করলে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা হয়, সেটা করতে হবে। সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
মতবিনিময় সভায় বক্তব্য রাখেন ও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগরী আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, জেলা আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির সিলেট জেলা আহ্বায়ক জুনেদ আহমদ ও মহানগর আহ্বায়ক এডভোকেট আব্দুর রহমান আফজল, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস সিলেট মহানগর সভাপতি মাওলানা এমরান আলম, লেবার পার্টির সিলেট মহানগর সভাপতি মাহবুবুর রহমান খালেদ, এলডিপির সিলেট জেলা সভাপতি মোজাম্মেল হোসেন লিটন, জাগপা সিলেট মহানগর সভাপতি শাহজাহান আহমদ লিটন, সিলেট মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমীর ড. নুরুল ইসলাম বাবুল, জেলা নায়েবে আমীর অধ্যাপক আব্দুল হান্নান, মহানগর সেক্রেটারি মোহাম্মদ শাহজাহান আলী ও জেলা সেক্রেটারি মো. জয়নাল আবেদীন প্রমুখ।