কবি ফররুখ আহমদের কাহিনীকাব্য ‘হাতেম তা’য়ী’


২০ জুন ২০২৬ ১২:১৬

॥ তৌহিদুর রহমান ॥
ফররুখ আহমদের কাব্যসাহিত্যে আরব্যরজনী ও পারস্যের রোমান্টিক ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো ‘হাতেম তা’য়ী’। মানবতা, দানশীলতা ও সাহসিকতার প্রতীক হিসেবে হাতেম তা’য়ীর চরিত্রটি ফররুখ আহমদের কাব্যে বিশেষভাবে গুরুত্ব লাভ করেছে। তাঁর সাহিত্যকর্মের মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে ‘হাতেম তা’য়ী’।
‘হাতেম তা’য়ী’ ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত কবি ফররুখ আহমদের একটি সুপরিচিত কাহিনীকাব্য বা কবিতাগ্রন্থ। যা ‘হাতেম তা’য়ী’র নিঃস্বার্থ দান ও পরোপকারের আদর্শকে ধরনে করে রচিত হয়েছে। ‘হাতেম তা’য়ী’ এই ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে কবি ফররুখ আহমদ একাধিক গল্প, শিশুতোষ কাহিনী, কবিতা, ছড়া ইত্যাদি রচনা করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, ‘নৌফেল ও হাতেম’, যা ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয়। এটিও ফররুখ আহমদের একটি বিখ্যাত কাহিনীকাব্য। এতে সমুদ্রযাত্রার পটভূমিতে মানবপ্রেম, ঔদার্য এবং হাতেম তা’য়ীর মহিমান্বিত চরিত্রের রূপায়ণ ঘটেছে। এছাড়া ‘সাত ডাকাত আর হাতেম তা’য়ী’ এটিও তাঁর একটি জনপ্রিয় কাহিনি নির্ভর রচনা, যা শিক্ষামূলক ও রোমাঞ্চকর গল্পের সংকলন হিসেবে প্রকাশিত বেশ জনপ্রিয়। ফররুখ আহমদের সাহিত্যে ও কাব্যে হাতেম তা’য়ী একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবে ফুটে উঠেছে। ‘হাতেম তা’য়ী’ ফররুখ কাব্যে কেন আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, তা কবির রচনা থেকে অনুধাবন করা যায়।
সাহিত্য সমালোচকরা মনে করেন, ‘হাতেম তা’য়ী’ একটি মহাকাব্য। কবি ফররুখ আহমদ ‘হাতেম তা’য়ী’ এই কাহিনী কাব্য মূলত সৈয়দ হামজার ‘হাতেম তা’য়ী’ কাহিনী কাব্য অবলম্বনে লিখেছেন। আবার, সৈয়দ হামজাও অনুরূপ উর্দু কাব্য ‘আরায়েশ মহ্ফিলের’ অবলম্বন করে তাঁঁর ‘হাতেম তা’য়ী’ কাব্য রচনা করেন বলে জানা যায়। বাংলা ভাষায় মধ্যযুগে সৈয়দ হামজা ছাড়াও কবি মোহাম্মদ দানেশ রচিত আরো একটি ‘হাতেম তা’য়ী’ কাব্যের সন্ধান পাওয়া যায়। মধ্যযুগের এই কাহিনীকাব্য দুটির বিষয়বস্তু মোটামুটি এক ও অভিন্ন। ফররুখ আহমদ বিখ্যাত ওই দুটি কাব্যগ্রন্থই পাঠ করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। সৈয়দ হামজা রচিত ‘হাতেম তা’য়ী’ কাব্যেকে তিনি প্রধান অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন বলে অনেক গবেষক উল্লেখ করেছেন। ফররুখ আহমদ তার ‘হাতেম তা’যী’ কাব্যগ্রন্থে মাঝে মাঝে সৈয়দ হামজার ‘হাতেম তা’য়ী’ থেকে পুঁথির অনুকরণে কিছু কিছু অংশ উদ্ধৃত করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি যেমন পুঁথির আবহ সৃষ্টির প্রয়াস পেয়েছেন, তেমনি পুঁথির প্রকৃত রূপ-রস ও আবহ সৃষ্টির চেষ্টাও করেছেন বলে লক্ষ করা যায়। যেমন-
‘হেকমত করিয়া ওকে মার দাগা দিয়া।’
‘আপন ছুরত দেখে হইল তামাম।’
‘আল্লার জেকের করে বসিয়া ময়দানে।
আওয়াজ আসিয়া লাগে হাতেমের কানে ॥’
‘এই রূপে হাতেম আল্লার রাহে থাকে।
এলাহির নামেতে শুপিল আপনাকে ॥’
‘দূর দারাজের রাহা কি ডর আমার।’
‘ছওয়াল শিখায় দাই বিবির খাতির।’
‘ছুরত দেখিয়া বাদশা হইল দীওয়ানা।’
‘সওদারগরজাদী ছিল বড় হোশমন্দ।
আপনার দেলে বিবি করিল পছন্দ ॥’
‘নছিব সাবুদ যদি হয় কোন কালে।
মোরাদ হাছেল হয় পাহাড়ে জঙ্গলে ॥
তবে সে বিবির কাছে আসিব ফিরিয়া।
নহেত মরিব শোকে বানুর লাগিয়া ॥’ ইত্যাদি।
মহাকাব্যের মতো করে লেখা ফররুখ আহমদের ‘হাতেম তা’য়ী’ একটি অসাধারণ কাব্যগ্রন্থ। তবে এটি যথার্থ অর্থে মহাকাব্য কিনা সে বিষয়ে অনেক গবেষক ও সাহিত্য সমালোচক সম্পূর্ণ একমত হতে পারেননি। ফররুখ-গবেষক ডক্টর সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায় বলেন, “হাতেম তা’য়ী’ প্রকৃত পক্ষে মহাকাব্যিক মহিমা লাভ করতে পারেনি। মহাকাব্য রচনার কোনো সজ্ঞান ইচ্ছা বোধ হয় কবির নিজেরও ছিল না। পুঁথির রসলোক থেকে ‘হাতেম-চরিত্রটি’কে গ্রহণ করে, তাঁকে কবি আপন মনোগত আদর্শের ধারক ও বাহক একটি প্রতীকী তাৎপর্যমণ্ডিত চরিত্রে পরিণত করেছেন মাত্র। হাতেমের কর্মধারা যত বিচিত্র ও মহত্তব্যঞ্জক হোক, তার পরিক্রমণ ক্ষেত্র যত বিস্তৃতই হোক, তা কখনই আমাদের মনে মহাকাব্যিক জগতের স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল-বিস্তৃত বিশালতার ধারণা সৃষ্টি করে না। তারপর ‘হাতেম তা’য়ীর’ রূপকথার বল্গাহীন কল্পনার জগতে মহাকাব্যিক সংযত রসাবেশ প্রত্যাশা করা যায় না বলেই আমাদের ধারণা। রূপকথাধর্মী এ কাহিনীতে এমন কোনো অন্তর্নিহিত মহত্ত নেই, যার জন্য এটি জাতীয় মানসের গভীরে প্রোথিত হতে পারে। যদি তা হতো, তবে বিশেষ জাতীয় ও সামাজিক মানসের প্রক্ষেপ এতে অবশ্যই লক্ষ করা যেত। ‘হাতেম তা’য়ী’ কাব্যে তেমন কিছু হয়েছে বলে মনে হয় না। কাব্যের নায়ক ‘হাতেম’ চরিত্রে মহাকাব্যের নায়কের মহিমার আভাস থাকলেও, তার বিকাশটি মোটেই মহাকাব্যোচিত হয়নি। প্রতীকী-তাৎপর্যে সমৃদ্ধ হলেও এ চরিত্র মহাকাব্যের নায়কের সত্যিকার মর্যাদা পেতে পারে না। কারণ এ চরিত্র একমাত্রিক। এতে ওডিসি, ইলিয়াড, প্যারাডাইস-লস্ট, মেঘনাদবদ প্রভৃতি মহাকাব্যে বর্ণিত চরিত্রের সে জটিলতা, ব্যক্তিত্বের সংঘর্ষ কিছুই পরিদৃষ্ট হয় না। এ চরিত্রে বিরুদ্ধ জীবনাবর্তের সাথে সংগ্রামে লিপ্ত মানুষের ট্র্যাজেডির তীব্রতা নেই, মানবজীবনের বিচিত্রমুখী সম্ভাবনার ইঙ্গিত নেই। আর নেই দুর্লঙ্ঘ্য নিয়তির অপরূপ লীলা খেলা। জীবন এখানে কোথাও আপনার খাত রচনা করে চলে নি। হাতেমের অত্যদ্ভূত কার্যকলাপ আমাদের বিস্মিত করে, কিন্তু তা কখনোই বয়স্ক মানুষের বিশ্বাসের কোঠায় পৌঁছে না। প্রতীকী-ব্যাখ্যাও তার কার্যধারার সঙ্গতি ও স্বাভাবিকতা সম্পর্কে আমাদের মনে কোনো আস্থা সঞ্চার করে না। ‘হাতেম তা’য়ী’ কাব্যের মহাকাব্যত্বের দাবি আর একটি কারণেও ক্ষুণ্ন হয়েছে। তা হচ্ছে এই যে, কোনো মহৎ কেন্দ্রীয় কাহিনী না থাকায়, এতে মহাকাব্যের রস দানা বাঁধতে পারে নি। হুস্না বানু ও মুনীর শামীর ভালবাসার কাহিনী হাতেমকে সাত সওয়ালের পথে সফরের প্রবৃত্তি দিয়ে বিপুল জীবনাভিজ্ঞতার ঐশ্বর্যের অধিকার দিয়েছে সন্দেহ নেই, কিন্তু কাব্য মধ্যে তা কখনোই প্রাধান্য বিস্তার করতে পারেনি। সাত সওয়ালের পথে সফরের বিভিন্ন কাহিনীগুলোও বিশ্লিষ্ট। এদের পরস্পরের মধ্যে বিশেষ সংযোগ ও ঐক্য নেই। শুধু হাতেমের জীবনাভিজ্ঞতার প্রসারতার সূত্রে এরা অনেকটা শিথিলভাবে গ্রথিত হয়েছে মাত্র। এ কাব্যে অজস্র খণ্ড ক্ষুদ্র ঘটনার সমাবেশ হয়েছে এবং তার মধ্য দিয়ে হাতেম চরিত্রের অসাধারণত্ব কিছুটা পরিস্ফুট হয়েছে, তা ঠিক। কিন্তু কেন্দ্রীয় কোনো মহৎ কাহিনীর সমর্থনপুষ্ট না হওয়ায় সমস্ত ঘটনা এক পরিপূর্ণ অখণ্ড রসরূপ লাভ করেনি। এ কাব্যের কলাবন্ধের দিকটিও সর্বক্ষেত্রে মহাকাব্য-সৃষ্টির পোষকতা করেনি। যেখানে অষ্টাদশাক্ষরিক পংক্তিবিশিষ্ট অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রয়োগ ঘটেছে সেসব ক্ষেত্রে মহাকাব্যিক ভাব-ব্যঞ্জনা ও গাম্ভীর্য অনেকটাই সঞ্চারিত হয়েছে সন্দেহ নেই। কবির ভাষাশৈলী এক্ষেত্রে অনেকটাই মহাকাব্যের উপযোগী। (সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায় ঃ কবি ফররুখ আহমদ, প্রথম প্রকাশ, জুন ১৯৬৯, পৃষ্ঠা ২৪৫-৪৬)।
বিশিষ্ট সাহিত্য-সমালোচক ও সাংবাদিক আবুল কালাম শামসুদ্দীন ফররুখ আহমদের ‘হাতেম তা’য়ী’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথেই সে সময়ের আলোচিত ‘পূবালী’ পত্রিকায় এই কাব্যগ্রন্থটির ওপর একটি দীর্ঘ আলোচনা করেন। ঐ সময় ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকেও গ্রন্থটির ওপর আবুল কালাম শামসুদ্দীনের একটি আলোচনা প্রচারিত হয়। ‘পূবালী’তে প্রকাশিত তাঁর আলোচনার অংশবিশেষ এখানে উদ্ধৃত করা হলো-
‘হাতেম তা’য়ী’ কবি ফররুখ আহমদের লেখা প্রায় সোয়া তিন শত পৃষ্ঠায় সমাপ্ত এক বিরাট মহাকাব্য। এ আখ্যায়িকা কাব্যটি যখন সাময়িক পত্রিকা মাসিক ‘পূবালী’তে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল, তখনই কবি আব্দুল কাদির, ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক প্রমুখ সাহিত্য-সমালোচকগণ একে মহাকাব্য বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। আমিও মনে করি, সবদিক দিয়ে বিবেচনা করে একে মহাকাব্য বলে আখ্যায়িত করলে ভুল তো কিছু করা হবেই না, বরং তাতে এর যথার্থ মূল্যায়ন হবে।
প্রাচীন মহাকাব্যগুলোর আঙ্গিক, গাম্ভীর্য, ঝঁনষরসরঃু, স্বর্গ-নরক বর্ণনা, যুদ্ধ-বিগ্রহের জমকালো বিবরণ এতে নাই বলে কেউ কেউ একে ‘মহাকাব্য’ বলতে আপত্তি উত্থাপন করতে পারেন, কিন্তু মহাকাব্যের প্রাচীন রূপকেই যদি তার একমাত্র সনাতন অনড় রূপ ভেবে এ ধরনের আপত্তি উত্থাপিত হয়, তাহলে তা কতটা যুক্তিসহ হবে, তাই বিবেচ্য।…
তাছাড়া প্রাচীনকালে মহাকাব্য লেখা হতো পৌরাণিক বিষয়বস্তু নিয়ে। কিন্তু একমাত্র পৌরাণিক বিষয়বস্তু ছাড়া অন্য কোনো বিষয় নিয়ে মহাকাব্য লেখা চলবে না, মহাকাব্য রচনার ক্ষেত্রে এমন একটি বিধিনিষেধের কোনোরূপ যৌক্তিকতা আছে বা থাকতে পারে বলে আমি মনে করি না। অবশ্য হোমার, ভার্জিল, দান্তে, মিল্টন, গ্যেটে- এমনকি আমাদের মাইকেল মধুসূদন পৌরাণিক বিষয়বস্তু নিয়েই তাঁদের মহাকাব্যগুলো লিখেছেন; এ কথা ঠিক। কিন্তু ঠিক পৌরাণিক কাহিনী নয়, ইতিহাসের পর্যায়েই পড়ে এমন বিষয়বস্তু নিয়েও মহাকাব্য রচিত হয়েছে, তেমন দৃষ্টান্তেরও তো অভাব নেই। ইরানের মহাকবি ফেরদৌসীর ‘শাহনামা’কে মহাকাব্যই বলা হয়ে থাকে।… ‘শাহনামা’কে নিশ্চয়ই ইরানের ধারাবাহিক ইতিহাস বলে অভিহিত করা যায়। ‘শাহনামা’য় যুদ্ধ-বিগ্রহের বর্ণনা আছে বটে, কিন্তু স্বর্গ-নরকের বিবরণ তাতে নাই। তবু এই বিশাল ঐতিহাসিক কাব্য বিশ্বসাহিত্যে মহাকাব্যের মর্যাদা পেয়েছে বলেই জানি।…
অনেকেই ‘পাকিস্তান আন্দোলন’-এর একজন বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর বলে ফররুখ আহমদকে নানাভাবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করেন। ‘পাকিস্তান আন্দোলন’ তাঁর কাব্যপ্রেরণার একটি প্রেরণাশক্তি ছিল বলে আমরা মনে করি। কারণ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময়কালে শেরে বাংলা, শেখ মুজিবুর রহমান, হোসেন শহীদ সরোয়ারদীসহ এই অঞ্চলের আপামর জনসাধারণ সবাই মুসলিমদের জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমি চেয়েছিলেন। কবি ফররুখ আহমদও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। কবি সুফিয়া কামাল থেকে শুরু করে তখন সবাই ‘আজাদ করো পাকিস্তান’ নিয়ে কবিতা বা কাব্যগ্রন্থ লিখেছেন। ফররুখ আহমদ রাজনীতিবিদ ছিলেন না। তবে তিনি রাজনীতি সচেতন একজন কবি ছিলেন। সারাভারতের মুসলিমদের মতো তাকেও পাকিস্তান আন্দোলন স্পর্শ করেছিল। তখন যদি তিনি মওলানা আবুল কালাম আজাদের মতো ভারতের পক্ষে থাকতেন তাহলে এখন তাকে ভারতের দালাল বলা হতো। অতএব ফররুখ আহমদ পাকিস্তান আন্দোলনে যুক্ত থেকে যথাযথ কাজ করেছেন বলে আমরা মনে করি। কারণ সময়ের বিপরীতে চললে সমাজ সেটাকে ভালো চোখে গ্রহণ করে না। প্রখ্যাত সাহিত্যিক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেছেন, পাকিস্তান আন্দোলনের রাজনৈতিক তাৎপর্য ও ইসলাম ধর্মের বিশুদ্ধ আবেদন তাঁকে কাব্যধ্যানে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তবে শেষোক্তটিই মুখ্য; ইসলাম ধর্মের বিশুদ্ধ আবেদন। ধর্মের আচার-অনুষ্ঠানাদি নয়, অন্তর্গূঢ় শক্তিকে তিনি স্পর্শ করতে চান। একে তিনি ‘মানবতা’ বলে চিহ্নিত করতে ইচ্ছুক। অর্থাৎ যে উদার মানবিক আবেদন নিয়ে ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব হয়েছিল তার স্বপ্নধ্যান ফররুখ আহমদকে কাব্যপ্রেরণা দেয়। পাকিস্তান আন্দোলন তাই ফররুখ আহমদের কাছে রাজনৈতিক বিষয় যতটা নয়, তার চেয়ে বেশি ইসলামী মানবতার আদর্শ বাস্তবে রূপায়ণের পরিবেশ সৃষ্টির সম্ভাবনার উজ্জ্বল স্বপ্ন।… ‘হাতেম তা’য়ী’ কবি ফররুখ আহমদের কাব্যাদর্শের শ্রেষ্ঠ ফসল এবং এ কাব্যে কবির প্রতিভা তুঙ্গতম পরিণতি লাভ করেছে।” (মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান : ‘মাহে-নও’, ১৯৬৬)।
তিনি চেয়েছিলেন ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবন। কবি মুসলিম রেনেসাঁর আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি আরব-ইরানের ইতিহাস ও ঐতিহ্য থেকে উপাদান সংগ্রহ করে বাঙালি মুসলিম সমাজে নৈতিকতা ও সাহসের সঞ্চার করতে চেয়েছেন। দানশীলতা ও মানবতা যে মুসলিমদের ঐতিহ্য তা কবি ফররুখ আহমদ ‘হাতেম তা’য়ী’ চরিত্রের মাধ্যম্যে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। ‘হাতেম তা’য়ী’ মূলত নিঃস্বার্থ দান ও মানবকল্যাণের প্রতীক। ফররুখ আহমদের কাব্যে এই চরিত্রটি সমাজে নৈতিক অবক্ষয় রোধ এবং আর্তমানবতার সেবার আদর্শ হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে।
ফাররুখ আহমদের একটি বিখ্যাত কাহিনী কাব্য ‘হাতেম তা’য়ী’। এটি একটি জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ, যেখানে ‘হাতেম তা’য়ী’র কাহিনী বর্ণিত হয়েছে।
ফররুখ আহমদ বাংলা সাহিত্যের একজন বিখ্যাত কবি। তিনি ‘মুসলিম রেনেসাঁর কবি’ হিসেবে বেশ পরিচিত। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘সাত সাগরের মাঝি’, ‘সিরাজাম মুনীরা’, ‘নৌফেল ও হাতেম’, ‘মুহূর্তের কবিতা’, ‘হাতেম তা’য়ী’, ‘নতুন লেখা’, ‘কাফেলা’, ‘হাবেদা মরুর কাহিনী’, ‘সিন্দাবাদ’ এবং ‘দিলরুবা’ অন্যতম। ‘হাতেম তা’য়ী’ বইটি মূলত হাতেম তা’য়ীর জীবন ও কীর্তি নিয়ে রচিত। এখানে হাতেম তা’য়ীর ন্যায়পরায়ণতা, দানশীলতা এবং বীরত্বের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এটি একটি জনপ্রিয় কাহিনী কাব্য, যা ফররুখ আহমদের সাহিত্যকর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। (উইকিপিডিয়া)।