আলোকে তিমিরে

তবুও তো ত্রিবেদী বাবু এক মুঠো জোনাকির আলো ছড়ালেন


১৮ জুন ২০২৬ ১০:৫২

॥ মাহবুবুল হক ॥
যে সময়ে সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া পশ্চিমবঙ্গসহ সারা ভারতে বিজেপি (ভারতীয় জনতা পার্টি) ফ্যাসিবাদী জান্তার মতো চরম উগ্রতার সাথে হিটলারের নাৎসি পার্টির অনুকরণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্র ধরে টান দিয়েছে, ঠিক সেই সময় বাংলাদেশে দায়িত্ব নিতে আসা ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেছেন, ‘ভালোবাসা আর আন্তরিকতার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।’ বড় কপালের অধিকারী একসময়ের ভারতের রেলমন্ত্রী আরো বলেছেন, ‘আমাদের শুধু অভিন্ন সীমান্ত নেই, অভিন্ন স্বপ্নও আছে। আমাদের আকাশ এক, বাতাস এক, চ্যালেঞ্জও অনেক ক্ষেত্রে এক, তাই আমাদের পথ ভুল হওয়ার সুযোগ নেই।’ ১২ জুন ২০২৬ তারিখে কলকাতায় নেজামী ভবন পরিদর্শনের পর সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এসব মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশে হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নিতে ঐদিন তিনি ঢাকায় এসেছেন। নিজের অগ্রাধিকারের প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘আমাদের একমাত্র অগ্রাধিকার হলো বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের সম্পর্ক। আমরা সবাই ভাই-বোন। বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্নের সাথেও আমরা যুক্ত। আমাদের স্বপ্ন অভিন্ন। আমাদের সবার স্বপ্ন গণতন্ত্র। আমি শুধু ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের কথা বলছি না। এর সাথে বাংলাদেশের আরো ২০ কোটি মানুষকে যোগ করছি। ১৬০ কোটি মানুষ, যারা আমাদের ভাই-বোন তাদের কল্যাণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি আরো বলেন, ‘ভারতের শুভ কামনা এবং বাংলাদেশের মানুষের সমর্থন আমাকে সাহায্য করবে। যাতে আমরা একসাথে এগিয়ে যেতে পারি। আমাদের লক্ষ্য অর্জনে সফল হতে পারি। একে-অপরের মঙ্গল কামনা করার চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারে না।’
উল্লেখ্য, ভারত এই প্রথম কোনো রাজনীতিবিদকে হাইকমিশনার হিসেবে বাংলাদেশে পাঠাল। দীনেশ ত্রিবেদী বিজেপির রাজনীতির সাথে যুক্ত।
কথাগুলো সুন্দর, শুনতে ভালোই লাগে, মধুর লাগে। এটা যদি ‘লাভ এ্যাট দ্য ফাস্ট সাইট’ হতো, তাহলে তো কোনো কথাই ছিল না। ত্রিবেদী সাহেবকে জড়িয়ে ধরা যেত। কিন্তু ৮০ বছর পর বাংলাদেশ ও ভারতের সাধারণ মানুষ পরিপূর্ণভাবে প্রেমে পড়ে যেত। আমাদের দুই দেশেরই বয়স প্রায় ৮০ বছর। মাঝখানে আমরা অর্থাৎ পূর্ববাংলা সেপারেশনে ছিলাম। সেপারেশন থেকে আমাদের তালাক সম্পন্ন হয়ে গেল। সুতরাং পুনরায় সম্পর্ক হতে কোনো অসুবিধা ছিল না। ১৯৭১ সালে ভারত ও বাংলাদেশের দৃঢ় সম্পর্ক সুগঠিত হলো। কারণ তালাকের ক্ষেত্রে সর্বতোভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা করেছিল ভারত। কথাটা অনস্বীকার্য হলেও অনেকেই এখনো বলেন; বিশেষ করে ভারতীয় মহল, ‘ভারতের সর্বাত্মক সাহায্য ছাড়া বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটত না।’ বাংলাদেশের কোনো মানুষ, কোনো মুক্তিযোদ্ধা বা বাংলাদেশ সম্পর্কে পরিজ্ঞাত কোনো দেশের নাগরিক এ ধরনের তথ্যকে কখনো কোনোদিন স্বীকার করেনি। আন্তর্জাতিকভাবে প্রজ্ঞাবান সবাই জানেন, পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ব বাংলা, যা এখন বাংলাদেশ, সেই ব-দ্বীপের সাথে ভারতের পরকীয়া ছিল। সেই প্রেমকে উচ্চকিত করার জন্য বা সমুজ্জ্বল করার জন্য সময় লেগেছিল মাত্র ২৫টি বছর। এ সময়ের মধ্যে পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে ক্রমাগতভাবে ভারতের যুদ্ধাবস্থা বিরাজিত ছিল। কিন্তু পূর্বাংশের প্রদেশ পূর্ব বাংলার সাথে ভারতের সম্পর্ক ছিল গোপন প্রেমের। একই দেশের দুই অংশের সরকার ও জনগণের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ছিল দুই রকম। নজরুলের সেই অত্যাশ্চর্য কবিতার মতো, ‘মোর এক হাতে বাঁধা বাঁশের বাঁশুরী, আরেক হাতে রণতুর্য।’ পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য ভারতের ছিল রণতুর্য আর পূর্ব বাংলার জন্য ছিল এক হাতে বাঁধা বাঁশের বাঁশুরী। এসব কে না জানে, কোনো মিথ্যা যেমন চিরকাল গোপন থাকে না, ঠিক তেমনি কোনো সত্যও চিরকাল গোপনে রাখা যায় না। সেটা মানুষের প্রেম হোক, সমাজের হোক বা রাষ্ট্রের।
তাছাড়া কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতা থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বাঘা বাঘা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ প্রকাশ্যে ও গোপনে বলে এসেছিলেন, ‘পূর্ব বাংলাকে ভারতের সাথে পুনরায় সংযুক্ত করতে তেমন কোনো অসুবিধা হবে না। এটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। এছাড়া পূর্ব বাংলার সাথে পশ্চিমবঙ্গের সম্পর্ক তো হাজার হাজার বছরের। তারা উভয়েই বাংলাভাষী। তাদের মধ্যে ধর্মের বিভাজন থাকলেও সংস্কৃতির বিভাজন ততটা নেই। সে কারণে ভারত সবসময় পূর্ব বাংলার সরকার ও রাজনৈতিক পক্ষের সাথে নমনীয় আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
আর ভারত যদি হিন্দুপ্রধান অঞ্চল নিয়ে ভারতীয় রাষ্ট্র গঠন করত এবং পাকিস্তান যদি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলসমূহ নিয়ে পাকিস্তান সৃষ্টি করতে পারত, তাহলে হয়তো ইতিহাস ভিন্নভাবে সৃষ্টি হতো। দ্বি-জাতি তত্ত্বের মূল বিষয় ছিল তাই। দ্বি-জাতি তত্ত্ব বা টু-নেশনস থিওরির উদ্যোক্তাও তো ছিল তারা। কারণ তাদের স্বপ্ন ছিল একটা হিন্দু রাষ্ট্র গঠন করা। তারা কখনো ভাবেনি তারা এতবড় দেশ পেয়ে যাবে। কারণ মুসলিমদের তারা অত্যন্ত শক্তিশালী ও সবল জাতি হিসেবে বরাবর বিবেচনা করত।
মুসলিমরা ভারত শাসন করেছে প্রায় ৭০০ বছর। এই বিষয়টি সনাতন ধর্মের মানুষের কাছে শুধু রহস্যময় বলে পরিজ্ঞাত ছিল না। ছিল অনেকটাই সুশৃঙ্খল ও বাস্তব। সনাতন ধর্মের সত্যপন্থী, দার্শনিক, ইতিহাসবিদ, চিন্তাবিদ, রাজনীতিবিদ যুগে যুগে, কালে কালে এই বিষয়টিকে প্রকাশ্যে না হলেও গোপনে স্বীকার করে এসেছিলেন। এখন তো বিজেপি যে হারে সাম্প্রদায়িক চূড়ান্ত দাঙ্গা-হাঙ্গামাসহ মুসলিমদের শুধু নির্মূল করা নয়, মুসলিমদের ঐতিহ্য-ঐশ্বর্য তথা মসজিদ, মাদরাসা, স্কুল, খানকা সবকিছু যখন প্রকাশ্যেই ধ্বংস ও লুটপাট করছে, তখনো সত্যপন্থী ভারতীয়রা মুসলিম জামানার সুখ-শান্তি ও স্বস্তির কথা সভা, সমিতি, মিটিংয়ে, মিছিলে চিৎকার করে এ ধ্বংসযজ্ঞের বিরোধিতা করছে। বরং সত্য কথা বললে ধ্বংসযজ্ঞের বিরোধিতা পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি বেড়েছে। এই যে ঢালাওভাবে বলা হচ্ছে, মুসলিমদের মসজিদ-মাদরাসাসহ যেকোনো স্থাপত্যের নিচে হিন্দুদের মন্দির রয়েছে। এই বিষয়টি যারা বলছে, তারা নিজেরাও বিশ্বাস করে না। বলার জন্য বলা। ঝগড়া করার জন্য ঝগড়া করা। সেই ঝগড়া যদি সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব হতো, তাহলেও কথা ছিল। কিন্তু বাবরি মসজিদসহ এখন পর্যন্ত এমনতর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
যে দেশের সর্বোচ্চ আদালত নানা ‘মিথ’-এ বিশ্বাস করে, কিংবদন্তিতে বিশ্বাস করে, কুসংস্কারে বিশ্বাস করে। সে দেশের একটি গোষ্ঠী সাম্প্রদায়িক উন্মাদনাকে শক্তিশালী করবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। একজন নিম্নশ্রেণির বা নিম্নপেশার সাধারণ যুবক ব্যক্তি স্বার্থে বা গোষ্ঠী স্বার্থে নানা ধরনের হিংসাত্মক ও অনিষ্টকর, অমঙ্গলজনক এবং অকল্যাণকর কথা বলতে পারে, কিন্তু একটি রাজনৈতিক দলের নেতা, প্রবীণ সাংবাদিক, প্রবীণ শিক্ষাবিদ, প্রবীণ বিচারপতিÑ তারা কি মূর্খ লোকের মতো কথা বলতে পারে? কাজ করতে পারে?
আসলে বিষয়টি এখানেই সীমাবদ্ধ নয়, ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ থেকে পাততাড়ি গোটাবার আগে শুধু স্যুটকেস গোছায়নি। অনেকটা সময় নিয়ে তারা ভবিষ্যতের জন্য তাদের ধ্যান-ধারণার মতো আমাদের ভালোভাবে গুছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। এ বিষয়ে তাদের তথা ব্রিটিশদের এই সংকট সন্ধিক্ষণে সহযোগিতা করার জন্য এগিয়ে এসেছে, জায়োনিস্টরা। স্মরণ করা যেতে পারে, ৪০ দশকের শেষ দিকে ব্রিটিশরা যখন ভারত থেকে নিজেদের দেশে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিল, তখন একই সময় তারা আরব দেশের একটি ভূখণ্ডকে জায়োনিস্টদের হাতে হস্তান্তর করেছিল। এটা ছিল একটা বিরাট উপঢৌকন। এই উপঢৌকনটি ছিল নাসারাদের পক্ষ থেকে ইহুদিরদের চরমপন্থীদের কাছে। জায়োনিস্টরা তখন সারা পৃথিবীতে বুদ্ধিজীবীদের ফ্রি-মেশনসহ কমিউনিজম, সোশ্যালিজম, পুঁজিবাদসহ নানাভাবে পৃথিবীকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে তুলেছিল। দর্শন, বিজ্ঞানসহ জ্ঞানের সকল শাখায় তারা নতুন নতুন ধারণার জন্ম দিচ্ছিল। এক কমিউনিজমকে তারা একেক মহাদেশে একেকভাবে উপস্থাপন করেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নে যে লক্ষ্য সামনে রেখে কমিউনিজমকে উত্থাপন করা হয়েছিল, সেটা তারা চীন দেশে করেনি। এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নের পাশে যুগোস্লাভিয়ায় করেনি। অর্থাৎ ভিন্নরূপে উপস্থাপন করেছে। ব্রিটিশদের কমিউনিজমকে তারা নাম দিয়েছে ‘ফেবিয়ান কমিউনিজম’। অর্থাৎ দেশীয় মনন, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এসবকে সামনে রেখেই কমিউনিজমের কত নাম তারা রেখেছে, এখন ধীরে ধীরে সেসব প্রভাতের আলোর মতো উদ্ভাসিত হচ্ছে। আমেরিকায় তারা পুঁজিবাদকে শক্তিশালী করেছে। আবার ঠিক তারা ল্যাটিন আমেরিকাসহ দক্ষিণ আমেরিকার ছোট ছোট দেশে পুঁজিবাদের বিপরীতে কমিউনিজম ও সোশ্যালিজমের বীজ রোপণ করেছে। অর্থাৎ পাশাপাশি দেশে বা পাশাপাশি মহাদেশে একই মতবাদের বীজ নিজেরা বপন করেনি এবং নাসারাদেরও বপন করতে দেয়নি। পৃথিবীতে দ্বন্দ্বকেই তারা উচ্চকিত করে রেখেছে। চিরায়ত করার নানা ফন্দিফিকির উদ্ভাবন করেছে। খুব লক্ষ করলে দেখা যাবে, ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে ক্রুসেডের গতিবিধি নদীর শাখা নদী ও উপনদীর মতো বহু শাখা মেলে ধরেছে। মেলে ধরলেও নাসারাদের কখনো মুসলিমদের বন্ধু হতে দেখা যায়নি, আবার ইহুদিরাও মুসলিমদের বন্ধু হয়নি। বরাবরই দেখা গেছে, খ্রিস্টান ও ইহুদির মধ্যে বন্ধুত্ব বিরাজমান ছিল। যদিও থিওলজিস্টরা বলে থাকেন, ভেতরে ভেতরে কখনো কেউ কারো বন্ধু ছিল না এবং এখনো নয়। মুসলিমদের মধ্যে প্রায় সবসময় একই প্রবণতা বিদ্যমান দেখা গেছে। তারা ইহুদিদের তুলনায় নাসারাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, আঞ্চলিক, যুদ্ধ ও বিগ্রহের কারণে খ্রিস্টানদের কিছুটা হলেও প্রশ্রয় দিয়েছে বা মাঝে মাঝে কিছুটা কাছাকাছি অবস্থান নিয়েছে। এই অবস্থানটা চিরকালীন নয়। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে অবশ্যই ছিল সাময়িক।
যে কথাটি বলতে গিয়ে পরিষ্কারভাবে বলা হলো না, তা হলো জায়োনিস্টদের সহযোগিতায় ব্রিটিশরা যেমন ভারতের মুসলিমদের শিক্ষায়-দীক্ষায় সংস্কৃতিতে বিভিন্নভাবে বিভাজিত করেছিল, ঠিক তেমনি ভারতীয় সনাতন ধর্মের মানুষকেও তারা নানাভাবে বিচ্ছিন্ন করার প্রয়াস পেয়েছিল। দুটি পৃথক জনগোষ্ঠীকে মোটামুটিভাবে তিন ভাগে বিভক্ত করেছিল। ১. মৌলবাদী, পৌরানিক এবং ঐতিহ্যবাদী। ২. দ্বান্দ্বিক, মধ্যমপন্থী ও আধুনিকতাবাদী। ৩. আবেগী ও চরমপন্থী। এই তিন পন্থার মধ্যে পরবর্তীতে হিন্দু ও মুসলিমের মধ্যে বহু পন্থা ও বহু পন্থীর জন্ম দিয়েছে; যা ধীরে ধীরে ভারতবর্ষকে চরমপন্থার দিকেই নিয়ে যাচ্ছে।
বলে রাখা ভালো, এ অঞ্চলের সনাতন হিন্দুদের মধ্যে জাতপাত ছিল না। জাতপাতের সৃষ্টি করেছিল দাক্ষিণাত্যের আর্য হিন্দুরা অর্থাৎ ব্রায়ীনিরা দ্রাবিড়দের নিম্নবর্ণের মানুষরূপে বিবেচনা করেছিল। এখনো যা বলবৎ আছে। দ্রাবিড়দের তারা পেশাভিত্তিক বিভিন্ন জাতে পরিণত করেছিল। মুসলিমদের মধ্যে বিভক্তি টানতে বা বিভাজন রচনা করতে ইহুদি ও নাসারাদের যত বিড়ম্বনা পোহাতে হয়েছিল, হিন্দুদের ক্ষেত্রে তেমন বিড়ম্বনা সহ্য করতে হয়নি। কারণ তাদের মধ্যে পূর্ব থেকেই বিভক্তি ছিল। ইহুদি-নাসারারা রাজনৈতিকভাবে হিন্দুদের দুই দলে বিভক্ত করেছে। যেমন কংগ্রেস ও আরএসএস। আরএসএস (রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘ)। এটি ভারতের ডানপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদী এবং স্বেচ্ছাসেবী আধাসামরিক সংগঠন। ১৯২৫ সালে কেশব বলিরাম এটি প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো- হিন্দু সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষা করা এবং ভারতকে একটি ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। এরই রাজনৈতিক শাখা হলোÑ বিজেপি। সেই বিজেপি দলের একজন প্রধান ব্যক্তি হলেন দীনেশ ত্রিবেদী। তিনি ঢাকা পৌঁছার আগে কেনইবা পশ্চিমবঙ্গে গেলেন, কেনইবা তিনি ‘নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু মেমোরিয়াল’ হলে গিয়ে এই কথাগুলো বলেছিলেন, সেট আমাদের সবাইকে গভীরভাবে ভাবতে হবে। যে দলের সৃষ্টি হয়েছে ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ গড়ার জন্য এবং যে দলটি প্রায় একশত বছর ধরে একই উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। তাদের কোনো মুখ্য ব্যক্তির মুখে এসব কথা শুনলে কী করে আস্থায় নেয়া যায়? আস্থায় নেয়া যেত, যদি ভারত হায়দরাবাদ, কাশ্মীর, জুনাগড় ও মানভেদর- এই রাজ্যগুলো মুসলিমদের জন্য ছেড়ে দিত। যে রাজ্যগুলোর কথা এখানে বলা হলো, সেই রাজ্যগুলো কি কখনো হিন্দুপ্রধান রাজ্যে পরিণত হবে? এর কি কোনো সম্ভাবনা আছে? যদি না থেকে থাকে, তাহলে তো সহজভাবে বোঝা যায়, এ মুসলিমপ্রধান রাজ্যগুলোর নাগরিকদের কী করা হবে? বা এখন কী করা হচ্ছে? হয় সেখানকার নাগরিকদের ভারত থেকে বিতাড়িত করা হবে, না হয় হিন্দু ধর্মে রূপান্তরিত করতে বাধ্য করা হবে। এছাড়া আর কী পদ্ধতি ও পন্থা আছে মুসলিমদের নির্মূল করার।
গত ৮০ বছরে ভারতে যত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা হয়েছে, তার হিসাব করলে দেখা যাবে ৮০০ বারের অধিক বেশি আমাদের মুসলমানদের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালানো হয়েছে সংঘবদ্ধভাবে।
সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায় এখন পর্যন্ত যা কিছু ঘটানো হচ্ছে, সেসবকে রাজনৈতিক কার্যক্রম বলে মেনে নেয়া যায়? ত্রিবেদী সাহেব যে গণতন্ত্রের কথা বললেন, সেসব কি গণতন্ত্রের সাথে কোনোভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ? বাংলাদেশি সন্দেহে প্রায় দেড় কোটি মুসলিম ও নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ভোটাধিকার হরণ ও শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয়গ্রহণের জন্য বাধ্য করা, নির্যাতন ও শক্তি প্রয়োগ করে বেআইনিভাবে পুশ করাÑ এসব কি উভয় রাষ্ট্রের বা জনগণের স্বপ্ন ও ভালোবাসার কথা?
সার্কের সময় সংশ্লিষ্ট সকল রাষ্ট্র মিলে পারস্পরিক বন্ধুত্ব, ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা, সম্ভ্রম, মানবাধিকার, সকল ধর্ম ও সকল আদর্শের উপস্থিতি যে বিরাট ও বিশাল ক্যানভাসে উপস্থাপিত ও উদ্ভাসিত করা হয়েছিল, তাকে ধ্বংস করল কারা? সার্কের সকল স্ট্র্যাকচার ভেঙে দিয়ে সংখ্যালঘুদের জান ও মালের নিরাপত্তা বিধানের পরিবর্তে নির্মূল করার অমানবিক প্রচেষ্টায় ভারত সরকার যখন ব্যস্ত, খোদ ভারতীয় সত্যপন্থী প্রতিবাদীরা যখন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, তখন ‘ত্রিবেদী’ যে স্বপ্নের কথা সঞ্চারিত করলেন, মনে হয় তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় এসব কথা তিনি বলেছেন। জাগ্রত অবস্থায় কোনো বিবেকসম্পন্ন মানুষ এখন এত বড় স্বপ্নের আকাশ রচনা করতে পারে না।
তবে বাবু ‘ত্রিবেদী’ যদি সত্যি বেদপন্থী হন। রামায়ণ, মহাভারতপন্থী না হন। তাহলে সুড়ঙ্গের ওপারের আলোর দীপ্তি-উদ্দীপ্ত না হলেও জোনাকির আলো জ¦ললেও জ¦লতে পারে। ব্যক্তির স্বপ্ন, আগ্রহ, অভিপ্রায়কে কখনোই ছোট করে দেখা ঠিক নয়। তিনি বিজেপিতে আছেন বলে বিজেপির অতীত ও বর্তমানকে সম্পূর্ণরূপে ধারণ করেন, সে কথা আমরা নির্দিষ্টভাবে ভাবতে চাচ্ছি না। আশাবাদী মানুষ সংস্কার-স্বপ্নে অনেক সময় উদ্বেলিত হতে পারেন, অসম্ভব কিছু নয়। এ সবকিছুকে মিলিয়ে আমরা ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে আন্তরিক অভিনন্দন, শুভেচ্ছা ও স্বাগত জানাচ্ছি।