জনগণের আস্থাই ব্যাংকের মূল ভিত্তি


১৮ জুন ২০২৬ ১০:৫১

॥ ইকবাল কবীর মোহন ॥
একটি দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা দেশটির অর্থনীতির দর্পণ। যে দেশের ব্যাংকিং খাত যতটা শক্তিশালী, সে দেশের অর্থনীতির ভিত্তি ততটাই উন্নত ও স্থিতিশীল। দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে ব্যাংক ব্যবস্থার অবদান অনস্বীকার্য। ব্যাংক একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করা ব্যাংকের মূল লক্ষ্য। ব্যাংক মূলত সাধারণ মানুষের সঞ্চয় নিরাপত্তার জন্য আমানত হিসেবে গ্রহণ করে এবং সেই আমানত বা অর্থ ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ, শিল্প উন্নয়ন এবং ব্যক্তির বিভিন্ন প্রয়োজনে ঋণ বা বিনিয়োগ হিসেবে প্রদান করে। এর মাধ্যমে ব্যাংক মুনাফা অর্জন করে এবং সেই মুনাফা আমানতকারী, রাজস্ব খাত ও অন্যান্য সেবামূলক খাতে বণ্টন করে থাকে। তাছাড়া ব্যাংক অর্থ সংরক্ষণ ও স্থানান্তর, সহজ লেনদেনের জন্য চেক, ড্রাফট, ডেবিট ও ক্রেটিড কার্ড সহায়তা, জনগণের গহনা ও মূল্যবান দলিলপত্র সংরক্ষণের জন্য লকার সুবিধা এবং অনলাইন ও মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধা প্রদান করে। ব্যক্তির প্রয়োজনে শিক্ষা, চিকিৎসা, বাড়ি নির্মাণ ও গাড়ি কেনার জন্যও ব্যাংক ঋণ সুবিধা প্রদান করেÑ যাতে জনসাধারণ সহজে কিস্তিতে ঋণ পরিশোধ করার মাধ্যমে একটি সম্পদের মালিকানা লাভ করতে পারে। তাছাড়া ব্যাংক সরকারের পক্ষে বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, কর, ইন্টারনেট বিল, স্কুল কলেজের বেতন ইত্যাদি সংগ্রহ করে থাকে। তার অর্থ ব্যাংক জনগণের যেমন প্রয়োজন পূরণ করে, তেমনি সরকারেরর চাহিদা পূরণ করে থাকে।
একটি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও দেশ পরিচালনার লক্ষ্য অর্জনে ব্যাংক ক্যাটালিস্টের ভূমিকা পালন করে। তাই ব্যাংক ব্যবস্থার সুষ্ঠু পরিচালনা এবং এ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য শর্ত।
ব্যাংক পরিচালনায় তার যে পুঁজির প্রয়োজন হয় এর সিংহভাগ, বলতে গেলে পুরোটাই আসে সাধারণ জনগণের আমানত সংগ্রহের মাধ্যমে। আর দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে ব্যাংকের ভূমিকা ও অবদান সবচেয়ে বেশি। ব্যাংক মানুষের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় সংগ্রহ করে পুঁজি বা মূলধন গঠন করে এবং তা বৃহৎ ও ক্ষুদ্রশিল্প ও ব্যবসায় বিনিয়োগের জন্য ঋণ আকারে প্রদান করে। এতে দেশে কর্মসংস্থান তৈরি হয় এবং দেশের বেকারত্ব দূর হয়।
ব্যাংক বিদেশ থেকে দেশের জন্য, শিল্পের জন্য ও জনগণের চাহিদা মেটানোর জন্য কাঁচামাল বা তৈরি পণ্য আমদানি করে। আবার দেশীয় পণ্য বিদেশে পাঠানোর জন্যও ব্যাংক যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। দেশের মুদ্রা ছাপানো, ঋণের সুদের হার নিয়ন্ত্রণ ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখার জন্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারের পক্ষে দায়িত্ব পালন করে। শুধু তাই নয়, সরকারের আয়-ব্যয় ও রাজস্ব জমা নেওয়া এবং সরকারের উন্নয়নমূলক কাজের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সরবরাহ করার কাজটিও ব্যাংক করে থাকে।
জনগণ ও দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য ব্যাংকের এ কার্যক্রম পুরোটাই নির্ভর করে ব্যাংকের আমানতের ওপর। আর এ আমানত বা অর্থের জোগানদাতা হলো জনগণ বা আমানতকারী। আমানতকারী বা জনগণ তখনই ব্যাংকে অর্থ জমা রাখে, যখন সে তার আমানত ফেরত পাওয়ার নিরাপত্তা বোধ করে। এর অর্থ হলো জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসই হলো ব্যাংকের অস্তিত্বের মূল ভিত্তি। কোনো কারণে ব্যাংকের প্রতি গ্রাহক বা আমানতকারীর আস্থা নষ্ট হলে তা পুরো ব্যাংক ব্যবস্থা ও দেশের অর্থনীতির ওপর ভয়ানক বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। ফলে তা দেশের সর্বত্র অরাজকতা, জনগণের মধ্যে অসন্তোষ এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনে। ব্যাংকের ওপর জনগণের আস্থার ঘাটতি দেখা দিলে গ্রাহকরা একযোগে ব্যাংক থেকে তার সঞ্চিত অর্থ উত্তোলন করতে শুরু করে। ফলে ব্যাংকে নগদ অর্থের সঙ্কট দেখা দেয় এবং ব্যাংক পরিচালনা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এর ফলে বিনিয়োগ কমে যায়, ব্যবসা-বাণিজ্য চরম ক্ষতির মধ্যে পড়ে এবং রাজস্ব আয় ও কর্মসংস্থান ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় চরম বিপর্যয় সৃষ্টি হয়।
ব্যাংক কী কী ক্ষতির মধ্যে পড়ে : ব্যাংকের প্রতি কোনো কারণে জনগণের আস্থার সঙ্কট তৈরি হলে মানুষ তার গচ্ছিত অর্থ উত্তোলন করে তা তার ঘরে বা নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তখন ব্যাংকে তারল্য সঙ্কট তৈরি হয়। ফলে নতুনভাবে আমানত জমা বন্ধ হয়ে যায়। তখন ব্যাংক গ্রাহকের দৈনন্দিন লেনদেনের চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হয়। এর ফলস্বরূপ ব্যাংকের ঋণ বা বিনিয়োগ দানের ক্ষমতা হ্রাস পায়। পরিণামে ব্যাংকের আয় বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘসময় এ সঙ্কট চলতে থাকলে ব্যাংক লোকসানের সম্মুখীন হয় এবং একসময় ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যায়।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ক্ষতি : ব্যাংক একটি দেশের জাতীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তি। ব্যাংকের অগ্রগতি ও উন্নতির সাথে দেশের সামগ্রিক উন্নতি ও অগ্রগতির ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ব্যাংকিং খাতে তারল্য সঙ্কট তৈরি হলে দেশের শিল্প-কারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে বিরূপ প্রভাব পড়ে। এর ফলে ব্যাংক থেকে ঋণ বা বিনিয়োগ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এর প্রতিক্রিয়ায় নতুন বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে যায় এবং সামগ্রিক উৎপাদন ব্যহত হয়। মানুষ ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে ঘরে বা অন্য কোনো অনুৎপাদনশীল খাতে জমা করার কারণে বাজারে অর্থপ্রবাহ কমে যায়। এ অবস্থা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক মন্দার সৃষ্টি করে। তখন সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য অন্যান্য ব্যাংক থেকে টাকা ধার করে অথবা টাকা ছাপাতে বাধ্য হয়। এর ফলে বাজারে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যায়। মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে গেলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পায়। ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং সমাজে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হয় এবং ফলে সরকারের বিরুদ্ধে জনরোষের সৃষ্টি হয়।
তাছাড়া বাবসা প্রতিষ্ঠান বা বাণিজ্যিক ও শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো পর্যাপ্ত অর্থায়নের কারণে কর্মী ছাটাই করতে বাধ্য হয়। এর ফলে নতুন কর্মসংস্থান তো দূরের কথা, বরং কর্ম হ্রাস পায় এবং সামাজে বেকারত্ব ও বৈষম্য বেড়ে যায়। ব্যাংকে সৃষ্ট তারল্য সঙ্কট শুধু যে দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে তীব্র সঙ্কট তৈরি করে তা নয়, এর ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের ভাবমূর্তি দারুণ ক্ষুণ্ন হয়। ফলে দেশের আর্থিক ব্যবস্থপানায় সরকারের ব্যর্থতা প্রমাণিত হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যায়। পরিণামে বিদেশি বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে যায়। এ কথা অনস্বীকার্য যে, আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য বিদেশি বিনিয়োগের নির্ভরশীলতা অপরিহার্য। আর এটা বন্ধ হয়ে গেলে দেশ পরিচালনা করা এবং দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা স্থিতিশীল রাখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া ব্যাংক সঙ্কটের প্রেক্ষিতে দেশে রেমিট্যান্সপ্রবাহও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সামগ্রিকভাবে একটি ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা অর্থসঙ্কটে পড়লে ব্যক্তির ক্ষতির পাশাপাশি রাষ্ট্রেও সামগ্রিক বিপর্যয় ঘটে। মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যাওয়া, অর্থনৈতিক মন্দা সৃষ্টি হওয়া, কর্মসংস্থান হ্রাস হওয়া, বেকারত্ব বৃদ্ধি পাওয়া এবং বিদেশি বিনিয়োগ হ্রাসসহ নানাবিধ সঙ্কটে দেশ এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে নিপতিত হয়, যার ফলে দেশে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়। এরই প্রেক্ষাপটে দেশের জনগণের মধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে চরম অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়। মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং সরকারের পক্ষে ক্ষমতায় টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
বর্তমানে দেশের সামগ্রিক চিত্র : এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংকিং অবস্থা মোটেও ভালো নেই। বিগত স্বৈরাচার আমলে ব্যাংক খাতে যে চরম অনিয়ম, লুটপাট ও অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটেছে, তা এ দেশের ইতিহাস,; এমনকি দুনিয়ার ইতিহাসেও বিরল ঘটনা। ব্যাংকের অর্থ নামে-বেনামে আত্মসাৎ এবং তা বিদেশে পাচারের ফলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি একটি ভঙ্গুর অবস্থার মধ্যে পড়েছে। এর ফলে দেশের শিল্প-কারখানাগুলো চলতি মূলধন দিয়ে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাছাড়া অর্থের অভাবে নতুন নতুন শিল্প গড়ে তোলা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং দেশে কর্মসংস্থান বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে ব্যাংকে অযাচিতভাবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ব্যাংক ব্যবস্থায় চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এই অবস্থা মোটেও স্বস্তিকর নয়। দেশকে বাঁচাতে হলে এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হলে ব্যাংক ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল ও সুষ্ঠু নিয়মের মধ্যে ফিরিয়ে আনতে হবে।
বর্তমানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রকৃত অর্থে পাহাড়সম। মোট ঋণের প্রায় অর্ধেকই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থায় দেশের বাজেট চাহিদা পূরণ করার জন্য আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের যে সহায়তা প্রয়োজন, তা আটকে গেছে। বিশাল ঘাটতি বাজেট পূরণ করার জন্য ব্যাংক খাত থেকেও সরকারের ঋণ নেওয়ার যে টার্গেট রয়েছে, তা পূরণ করাও ব্যাংকগুলোর সঙ্কটের কারণে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। এজন্য ব্যাংকগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে না পারলে অনেক ব্যাংক যেমন দেউলিয়া হয়ে পড়বে, তেমনি সরকারের অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জন, দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে।
এ কথা সবারই মনে রাখা প্রয়োজন যে, ব্যাংক কে বা কারা প্রতিষ্ঠা করেছে, তা বিবেচ্য বিষয় নয়, ব্যাংক সচ্ছতার সাথে, নিয়মের মধ্যে থেকে সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা-ই বিবেচ্য বিষয়। ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্ষতি হবে জনগণের, সঙ্কটে পড়বে দেশ, বাধাগ্রস্ত হবে উন্নয়ন। তাই ব্যাংক আমাদের বেঁচে থাকার উৎস। উন্নয়নের প্রতীক। এ ধারণা ও চেতনা সবার মধ্যে ফিরে আসুক- এ কামনাই করছি।
লেখক : ব্যাংকার