সম্পাদকীয়

চোখে চোখ রেখে কথা বলার দৃঢ়তা প্রয়োজন


১৮ জুন ২০২৬ ১০:৫০

আমরা স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিক। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অশেষ দয়ার দান আমাদের এ জন্মভূমি। উড়ে এসে জুড়ে বসা আর্যদের উত্তরসূরি ব্রাহ্মণবাদী শক্তির উগ্র আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম, নিম্নবর্ণের হিন্দুরা আন্দোলন করে পেয়েছে এ পৃথক ভূখণ্ড।
১৭৫৭ সালে বাংলা, বিহার, ঊড়িষ্যার স্বাধীন সর্বশেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার শাহাদাতের পর প্রথমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং এরপর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক দুঃশাসন চলে প্রায় দুইশত বছর। সেই দুঃশাসন থেকে মুক্তির আন্দোলন সংগ্রাম এদেশের আলেম-ওলামা, ধর্মপ্রাণ মুসলমান ও দেশপ্রেমিক অন্যান্য সম্প্রদায়ের নেতারা একদিনের জন্যও বন্ধ করেননি। যার ফসল ১৯৪৭-এর প্রথম স্বাধীনতা এবং সেই ভূখণ্ডের পূর্বাংশে যুদ্ধ জয়ের অর্জন এ সার্বভৌম ভূখণ্ড বাংলাদেশ। এর সুফল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে আমরা বর্তমান ভারতের দিকে তাকালেই উপলব্ধি করতে পারি। ভারতে প্রতিনিয়ত মুসলমান ও নিম্নবর্ণের হিন্দুরা আর্য ব্রাহ্মণদের হাতে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। বর্তমান উগ্র-হিন্দুত্ববাদী শাসকগোষ্ঠীর আগ্রাসনের শিকার দক্ষিণ এশিয়ার প্রত্যেকটি দেশ। অনেক স্বপ্ন নিয়ে গড়া সার্ক আজ ভারতের কারণে নিষ্ক্রিয়। সেই দেশের নবনিযুক্ত হাইকমিশনার দীনের ত্রিবেদীর বাংলাদেশের অখণ্ডতাবিরোধী বক্তব্যের গভীর অর্থ বুঝতে কারো বাকি থাকার কথা নয়। তাই তো এর প্রতিবাদ জানিয়ে তাৎক্ষণিক সোশ্যাল মিডিয়ায় মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান, সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার, বাংলাদেশ সরকারের তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনসহ জাতীয় নেতৃবৃন্দ ও দেশের কোটি কোটি নাগরিক।
আমরা জানি, ঢাকাস্থ ভারতের নবনিযুক্ত হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী গত ১২ জুন শুক্রবার বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থলবন্দর দিয়ে সড়কপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করার পর উপস্থিত সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক শুধু সীমান্তের নয়। বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্নের সঙ্গেও আমরা যুক্ত। আমাদের স্বপ্ন অভিন্ন। গণতন্ত্রের স্বপ্ন আমাদের সবার। এই অভিন্ন আকাক্সক্ষা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতেই সম্পর্ক জোরালো করবে দুই দেশ।’ বাংলাদেশের গণতন্ত্র হত্যা করে দীর্ঘ দেড় দশক ফ্যাসিজম কায়েমে ভারতের ভূমিকা কারো অজানা নয়। তিনি যেদিন বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেছেন, সেদিন সীমান্তে রক্ত ঝরেছে। কাঁটাতারের বেড়া এবং ভূ-দখলের অপচেষ্টা চলছে। উজানের পানি আটকে খরা ও বর্ষা মৌসুমে বিনা নোটিশে ছেড়ে দিয়ে পানিতে ডুবিয়ে মারার আয়োজন চলছে, তখন তার মুখে এমন মধুমালতি রাগ শুনে প্রতিবাদ হবেÑ এটাই স্বাভাবিক।
তাই আমরা মনে করি, ভারতের নবনিযুক্ত হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী যে বক্তব্য প্রদান করেছেন, তা কূটনৈতিক শিষ্টাচার, আন্তর্জাতিক রীতি-নীতি এবং রাষ্ট্রসমূহের পারস্পরিক সম্মানবোধের পরিপন্থী। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণকে একীভূত জনসংখ্যার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা এবং এমন কিছু মন্তব্য করা, যা বাংলাদেশের স্বতন্ত্র রাষ্ট্রসত্তা সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ধারণার জন্ম দিতে পারে, তা কোনো দায়িত্বশীল কূটনীতিকের কাছ থেকে প্রত্যাশিত নয়। তার এ মন্তব্যে সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বলে দেশের জনগণ মনে করে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে দেয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দীনেশ ত্রিবেদী ‘ভারত-বাংলাদেশের এক হয়ে যাওয়া’ বলতে কী বুঝিয়েছেন, আমাদের সরকারের উচিত হবে তার কাছ থেকে তা জেনে নেওয়া। তার এ বক্তব্য স্পষ্ট না হলে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হবে। যদি তিনি আক্ষরিক অর্থে এ ধরনের কিছু বুঝিয়ে থাকেন, তাহলে অবশ্যই তা নিন্দনীয়। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান, সমতা, ন্যায়বিচার এবং প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের ভিত্তিতে সহযোগিতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অব্যাহত থাকা উচিত বলে আমরা মনে করি। কোনো পক্ষের আধিপত্যবাদী বা কর্তৃত্ববাদী মনোভাব এ সম্পর্কের জন্য কখনোই কল্যাণকর হতে পারে না।
প্রধান বিরোধীদল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর এ বক্তব্যে দেশের আঠারো কোটি মানুষের মতামতের প্রতিফলন আমরা দেখতে পাচ্ছি। তাই আমরাও আশা করি, ভারতের নবনিযুক্ত হাইকমিশনারকে ভবিষ্যতে আরও দায়িত্বশীল ও সংযত ভাষা ব্যবহারের আহ্বান জানাচ্ছি এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় মর্যাদার প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করবেন।
বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আমাদের আহ্বান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এর যথাযথ ব্যাখ্যা দাবি করবে। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সমুন্নত রাখতে চোখে চোখ রেখে কথা বলার দৃঢ় কূটনৈতিক তৎপরতার বিকল্প নেই। আশা করি, বাংলাদেশ সরকার ভারতের সাথে আচরণে তা বুঝিয়ে দেবে।