দেশের স্বার্থ এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপস নয়


১৮ জুন ২০২৬ ১০:৪৪

॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
দেশের বয়স ৫৫ বছর। দেশের অর্থনীতিতে আমরা খুব একটা এগোতে পারিনি। অন্যদিকে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান উৎস ব্যাংক ব্যবস্থা। অর্থনীতিকে সুদমুক্ত করার জন্য ১৯৮৩ সালে দেশি-বিদেশি শেয়ারহোল্ডার মিলে দেশে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা হয় দেশের নামকরা কিছু দেশদরদি লোকদের নিয়ে। মরহুম আবদুর রাজ্জাক লস্কর, মো. ইউনূস সাহেবদের নেতৃত্বে ব্যবসায়ী সমাজ ও ইবনে সিনাসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয় সরকারি প্রথা অনুযায়ী। বর্তমানে প্রায় ৪০০ শাখা-উপশাখার মাধ্যমে প্রায় ৩ কোটি গ্রাহক সেবা পাচ্ছে। গত হাসিনার ফ্যাসিস্ট সরকার তার দোসর এস আলম গ্রুপ দিয়ে ব্যাংকের যাবতীয় কাজ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যায়। শুধু তাই নয়, দেশি-বিদেশিদের শেয়ার সরকারি বাহিনীর মাধ্যমে জোর করে নিয়ে নেয় তাদের নামে।
ব্যাংক এস আলমের বেদখল দেওয়ার পর কিছু অসাধু কর্মচারীর যোগসাজশে ব্যাংকে প্রায় ৮২ ভাগ টাকা লুট করে নিয়ে যায় এবং বিদেশে পাচার করে। অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগকৃত চেয়ারম্যান ও এমডিকে ইতোমধ্যে অবৈধভাবে পদচ্যুত করে এস আলমের দোসর লোককে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয় বর্তমান সরকার। ফলে গ্রাহকসাধারণ ও কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। ব্যাংকের গ্রাহকরা আতঙ্কিত হয়ে তাদের টাকা তুলে নিতে থাকে। ইতোমধ্যে কয়েকশত কোটি টাকা ব্যাংক থেকে তুলে নেয়া হয়। ব্যাংক এখন গ্রাহকদের ক্যাশ টাকা দিতে পারছে না।
গত ১৪ জুন রোববার বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ বোর্ড ভেঙে দিয়ে একজন প্রশাসক নিয়োগ করে। দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে হলে ব্যাংক সচল রাখতে হবে। গ্রাহকরা এলসি খুলতে পারছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকা লোন চাইলেও মাত্র ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা লোন মঞ্জুর করা হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে যোগ্য, অভিজ্ঞ লোক দিয়ে বোর্ড না করলে ব্যাংকের সমস্যা সমাধান হবে না। জাতীয় সংসদে সরকারি দলের পক্ষ থেকে ব্যাংক প্রকৃত সমস্যা তুলে না ধরে অসত্য তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, যা ব্যাংককে সচল করার ব্যাপারে প্রতিকূল অবস্থা বিরাজ করবে। বিরোধীদলের পক্ষ থেকে সরকারি দলের অসত্য বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করেছে এবং প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরেছে।
ইসলামী ব্যাংক রেমিট্যান্স আহরণে দেশের সব ব্যাংকের তুলনায় প্রায় ৫০% রেমিট্যান্স সংগ্রহ করে আসছে। ব্যাংকের অবস্থা স্বাভাবিক করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ ইসলামী ব্যাংক শুধু একটি বড় ব্যাংকই নয়, ইসলামী ব্যাংক সুদমুক্ত অর্থনীতির চাবিকাঠি। তাই দেশের ও বিদেশের গ্রাহকদের আস্থা ফেরাতে পূর্বের মালিকদের কাছে শেয়ার হস্তান্তর করে সৎ, যোগ্য লোকদের দিয়ে ব্যাংকের বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেয়া অতি জরুরি। প্রয়োজনে সরকারি ও বিরোধীদলের সংসদ সদস্যদের নিয়ে কমিটি গঠন করে ব্যাংক ডাকাতি, লুটপাটকারীদের চিহ্নিত করে, লুটের টাকা ফেরত আনার ব্যবস্থা করতে হবে। কোনোভাবেই যাতে ব্যাংক লুটকারীদের হাতে ব্যাংক ফেরানোর কোনো উদ্যোগ না নেয়া হয়। এ ব্যাপারে দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা করার স্বার্থেই সৎ, যোগ্য, দুর্নীতিমুক্ত লোকদের দিয়ে পরিচালনা বোর্ড গঠন করতে হবে।
আমাদের দেশের সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলো ভালো করার কারণে দেশের রোগীদের বিদেশ যাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। দেশেই সব চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। সরকার থেকে তদারকি বাড়ালে আমাদের রোগীদের আমাদের দেশের ক্লিনিক-হাসপাতালেই চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হবে।
একটি কুচক্রী মহল আদ-দ্বীন হাসপাতাল বন্ধ করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। আদ-দ্বীন হাসপাতাল কম খরচে দেশের মানুষকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন শত শত শিশু-মহিলা-পুরুষ এখানে সেবা নেয়। দুর্ঘটনাজনিত কারণে ৬ জন শিশু মারা গেছে। হাসপাতাল যেমন রোগীর চিকিৎসা করে। এতে ভালো হয় অধিকাংশই। আবার মারাও যায়। দুর্ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে এর ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। ইতোমধ্যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ৬ শিশুর মৃত্যুর কারণে প্রত্যেক পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যবস্থা করে জনপ্রতি ৮০ লাখ টাকা করে দিয়েছে। আরো কেউ জড়িত থাকলে তার বিচার করতে হবে দেশের নিয়মে। মাথাব্যথার কারণে মাথা কেটে ফেললেই হবে না। মাথার সঠিক চিকিৎসা করাতে হবে। আমার ১৪ দিনের নাতনি আমাদের পরিচালিত একটি হাসপাতালেই মারা গেছে। আবার আমার ২৫ বছরের মেয়ে হাসপাতালে মারা গেছে। আমরা উপস্থিত ছিলাম। চিকিৎসার কোনো গাফিলতি হয়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চিন্তাই থাকে কীভাবে রোগীকে ভালো করা যায়। তাই আদ-দ্বীন হাসপাতাল বন্ধ নয়, চিকিৎসার উত্তম ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের সব সরকারি বেসরকারি হাসপাতালে রোগী যেমন ভালো হচ্ছে আবার মারাও যাচ্ছে। তাই হাসপাতাল বন্ধ নয়, হাসপাতালের মান বাড়াতে হবে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায়।
দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের ওপর প্রতিবেশী দেশের আক্রমণাত্মক অভিযান চলছে। চতুর্দিকে ভারত আমাদের ঘিরে ফেলেছে। প্রতিদিন ‘পুশইন’-এর মাধ্যমে তাদের নাগরিকদের বাংলাদেশের সীমান্ত দিয়ে আমাদের দেশে পাঠানোর চেষ্টা করছে। আমাদের বর্ডারের বিজিবি তা প্রতিরোধ করছে। দেশের জনগণও বিজিবিকে সহযোগিতা করছে।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত নিয়ে বৈঠক কোনো কাজে আসছে না। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ করছি। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিষয়টি আলোচনায় আসতে হবে।
অন্যদিকে ভারতের নতুন হাইকমিশনার ৭৫ বছর বয়সী দীনেশ ত্রিবেদী সড়কপথে বাংলাদেশে ঢুকেই সাংবাদিকদের কাছে আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হেনে বক্তব্য দিয়েছেন, যা বাংলাদেশের মানুষের কাছে খুবই অনভিপ্রেত লেগেছে। তিনি ভারত-বাংলাদেশের সীমানা মুছে দিয়ে ১৪০+২০ কোটি মানুষের দেশ বানানোর একটি কুচক্রী প্রস্তাব দিয়েছেন, যা আমাদের দেশের জন্য মারাত্মক বলে আমরা মনে করি।
ভারত কোনো প্রতিবেশীদের সাথেই সুসম্পর্ক রেখে চলছে না। এই তো কিছুদিন পূর্বে ভারতপন্থী নেপালের রাজার পতন হয়েছে সে দেশের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের কারণে। মাত্র ৩৬ বছর বয়সের যুবক বালেন্দ্র শাহ প্রধানমন্ত্রী হয়ে ভারতপন্থীদের সাইজ করে ফেলেছেন। আবার মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েই ভারতের সৈন্য মালদ্বীপ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছেন।
অন্যদিকে ভারতের মোদি সরকার একটি হিন্দুত্ববাদী সরকার। তারা সে দেশের প্রায় ৩০ কোটি মুসলমানদের মৌলিক অধিকার খর্ব করছে। বাবরী মসজিদ ভেঙে রামমন্দির করেছে। মুসলমানদের মসজিদ-মাদরাসার ওপর অহরহই হামলা করছে। কাশ্মীরের জনগণকে তাদের স্বাধীনতা দিচ্ছে না।
৭ দেশের সার্কের উদ্যোগ ব্যাহত করছে। সার্কের ২২০ কোটি মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে ভূমিকায় বাধার সৃষ্টি করছে। আমরা এর প্রতিকার চাই। আর দীনেশ ত্রিবেদীর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা বিরোধী বক্তব্যের ব্যাখ্যা চাই। সরকারকে এ ব্যাপারে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে। প্রয়োজনে এই ত্রিবেদীর হাইকমিশনারের উদ্দেশ্য রুখে দিতে হবে এবং ভারতে তাকে ফেরত পাঠাতে হবে।
এ দেশের মানুষ ভারতের বয়ানে দীক্ষিত আওয়ামী লীগকে দেশ থেকে তাড়িয়েছে। শুধু প্রধানমন্ত্রী নয়, তাদের এমপি, মন্ত্রী, মেয়র, ইমাম, আমলা; এমনকি গ্রামের মেম্বারও পালিয়েছে। তাই এখন আবার বিএনপির আমলে ভারতের দূত ত্রিবেদী অকণ্ড ভারতের পক্ষে বয়ান দিবেন, তা হবে না।
২৪-এর গণবিপ্লবে প্রমাণ হয়েছে এ দেশর ছাত্র-জনতা কারো অধীনে নয়, স্বাধীনভাবে মাথা উঁচু করে বাস করতে চায়। জনগণের ভোটে সঠিক নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে দেশ চালাতে চাই। কোনো ডিপস্টেট বা পাতানো নির্বাচনে আর দেশ চলতে পারবে না।
এবারের নির্বাচনে যেভাবেই হোক বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু মাত্র ৩ মাসেই সরকারের হ-য-ব-র-ল অবস্থা পরিলক্ষিত হচ্ছে। ভারত থেকে ট্রেনিংপ্রাপ্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতীয় বয়ানে সংসদ চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। মনে রাখতে হবেÑ শহীদ জিয়া ও খালেদা জিয়া এ দেশের মানুষের মনের ভাব বুঝেই দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নিয়ে বাড়াবাড়ি না করে দেশ চালিয়ে গেছেন দেশের মানুষের ভালোবাসা নিয়ে। এখনো মানুষ তাদের কথা স্মরণ করে। আমরা চাই শহীদ জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানও তার মা-বাবার চিন্তায় দেশ চালাবেন। বিএনপির অনেক লোক সালাহউদ্দিন সাহেবের আচরণ ভালো চোখে দেখছে না। আমাদের বিরোধীদল ধৈর্যের সাথে ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে সরকারের ভালো কাজের সহযোগিতা করছেন, আবার দেশের স্বার্থবিরোধী কাজের কঠোর সমালোচনা করছেন। জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বিভাগীয় শহরে বিশাল বিশাল জনসভা করছেন। আবার সংসদও কাঁপাচ্ছেন। আমরা জনগণ স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে আপস করব না। আমাদের ৭০% মানুষের গণভোটের মর্যাদা দিয়েই দেশ চালাতে চাই। কোনো ছাড় নেই।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : rnabi1954@gmail.com